(১)
ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। খুবই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কাছের অল্প কজন মানুষ ছাড়া কারো সাথেই তা ভাগ করা হয়নি।
২০২২ সালের নভেম্বর মাসের ঘটনা। যখন বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের সাথে হেরে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা পড়ে গেছে টালমাটাল দশায়, ঠিক সেই সময়ে আমাদের পরিবারেও নেমে আসে ভয়ানক এক দুর্যোগ। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে আমার আম্মার ক্যান্সার ধরা পড়ে।
সারাজীবন প্যারাসিটমল খেয়েই দারুণ রকম কর্মক্ষম থাকতে দেখেছি যাকে, সেই আম্মার এমন অসুখ ধরা পড়ায় হাসপাতাল-সংক্রান্ত ব্যাপারে প্রায় অভিজ্ঞতাহীন আমাদের পরিবার রীতিমতো মুষড়ে পড়ে ওই সময়। আম্মার সাথে সাথে পরিবারের অভিভাবক বাবার মনোবলেও যেন এক ধরনের ঘাটতি দেখি তখন। সপ্তা তিনেক হাজারও রকম টেস্ট আর স্ক্যান সেরে অবশেষে আমরা জানতে পারি, আম্মাকে কেমোথেরাপি নিতে হবে।
এক ধরনের প্রবল মানসিক চাপের মাঝে থাকা আমাদের চোখের সামনে আম্মা যখন প্রথমবার কেমোর অভিজ্ঞতা নিলেন, ঠিক ওই সময়টাতেই শুরু হয়ে যায় বিশ্বকাপ। মেসির দল যেখানে হেরে বসে প্রথম ম্যাচেই।
কিন্তু ২০২২ এর সেই একটা মাসে বিশ্বকাপ আমাদের জানিয়েছে, ফুটবলের মতোই জীবনেরও সেকেন্ড হাফ আছে। প্রথমার্ধে হেরে গেলেও সেকেন্ড হাফে মানুষের পক্ষে জিতে আসা সম্ভব। ২০১৪ সালের ফাইনালের জ্বালা ভুলে ২০২২-এ মেসি তাই জিতে নিতে পারে বিশ্বকাপ। আর প্রথম কেমোর তিন সপ্তাহ পরে চিরকালীন কোমল, আবেগী ও ভঙ্গুর আমার আম্মা দ্বিতীয় কেমোর সামনে যেতে পারেন অনেকটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে।
কেউ বলে দেয়নি, কিন্তু অনুভব করেছি পরে, গঞ্জালো মন্টিয়েল যখন টাইব্রেকারে জালে বল জড়িয়ে আর্জেন্টিনাকে চূড়ান্ত জয় এনে দেয় ফাইনালে, দেড় মাস ধরে গুমোট হয়ে থাকা বিষণ্ণতাকে হটিয়ে দিয়ে আমাদের পরিবারেও তখন ফিরে আসে আনন্দ। ক্যান্সার নামক ক্ষমাহীন ব্যাধির সাথে লড়ার সাহস যোগাতে, জীবনে ওই আনন্দ ফিরে আসাটা আমাদের খুব দরকার ছিলো। (আম্মা বর্তমানে ক্যান্সার-মুক্ত। এখনও নিয়মিত বেশ ভারি ওষুধ তাকে খেতে হয় ওরাল কেমো হিসেবে, কিন্তু মোটাদাগে তিনি ভালোই আছেন। আপনারা যারা এই লেখা পড়ছেন, প্লিজ দোয়া করবেনঃ প্রাণশক্তিতে আম্মা যেন মেসির সাথে আরও অনেকদিন সমানে সমানে টক্কর দিতে পারেন।)
‘জীবন আর মৃত্যু নয়। ফুটবল তার চাইতে অনেক, অনেক বেশি কিছু!’—বলেছিলেন বিল শ্যাঙ্কলি। সেই কথাকে আমি পরম সত্য বলে মানি। মানি, শুধুমাত্র বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার জন্যই কয়েকশো বছর বেঁচে থাকার সাধ করতে পারে নশ্বর মানুষ। আনন্দের এর চেয়ে বড় উপলক্ষ মানুষের দুনিয়া আর দেখেনি আজতক। ভবিষ্যতেও দেখবে, তেমন আশা করি না।
(২)
জগতের সবচেয়ে বড় আনন্দযজ্ঞ ফুটবল বিশ্বকাপের আরেকটা মানেও হয়। আমার কাছে— দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাওয়া পিচ্চিদের মতো— বিশ্বকাপও সময়ের একটা একক। ক্যালেন্ডারে চারের গুণিতকে সেটা আমাদের বুড়িয়ে যাবার কো-অফিশিয়েন্ট।
প্রথম বিশ্বকাপ দেখার স্মৃতি বড় অস্পষ্ট। ক্লদিও তাফারেলের আবছা আবছা ঠেকিয়ে দেয়া টাইব্রেকে, মনে পড়ে, ডিভাইন পনিটেইলের অভিশাপে রবার্তো ব্যাজ্জিওর কিক চলে গেলো স্বর্গে।
পরের বার অবশ্য সবই ফকফকা। আজও চোখে ভাসেঃ গোল করার পর ধ্যানে বসে যাচ্ছেন ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরি, নিখুঁত কনভার্সন রেটে ছাক্কা নাম্বার পাওয়া সায়েন্সের ছাত্র টাকলা রোনালদোর বান্ধবী মিলেন ডোমিনিগুয়েজের সোনালি চুল উড়ে যাচ্ছে পত্রিকার পাতায়। তবে, ফরাসী ফাইনালের জিদান নয়, চোখে আজও লেগে আছে আরেকজনের তিন টাচের যাদু। কান পাতলেই যেন ধারাভাষ্যে আজও শুনি অবিশ্বাসের সেই চিৎকারঃ ‘ডেনিস বার্গক্যাম্প, ডেনিস বার্গক্যাম্প, ডেনিস বার্গক্যাম্প, ডেনিস বার্গক্যাম্প…’
পরের বিশ্বকাপটা দিনে দুপুরে। আংটিতে চুমু খাওয়া লর্ড অফ দা রিংস দক্ষিণ কোরিয়ার আন জুং হোয়ানকে ছাপিয়ে চোখে বসে যায় নতুন সুপারহিরো রোনালদিনিয়ো, এবং ইয়োকোহোমার বিকালে মোটকু রোনালদো দেখায় যে ওভাবেও ফিরে আসা যায়।
কলেজ দিনের শেষ সময়ে আবার বিশ্বকাপ, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে তুমুল অর্থহীন ঝগড়া। মুখে স্বীকার করি না তখন, কিন্তু নিখাদ বিস্ময় নিয়ে বারবার দেখি সার্বিয়ার সাথে ২৫ পাসের শেষে এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসোর গোল। আমার দেখা বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচের স্মৃতির স্মারক হয়ে রয় স্বাগতিক জার্মানির সাথে ফ্যাবিও গ্রসোর হেড, আর তারও পরে মাতেরাজ্জির ইটালিয়ান জব চুরি করে নেয় জিদানের বিশ্বকাপ।
ভুভুজেলার দূষণ ছিলো, কিন্তু আফ্রিকা বিশ্বকাপকে মনে রাখতে হয় তার সুর দিয়ে। শাকিরার ওয়াকা-ওয়াকা আর কোনানের ওয়েভিং ফ্ল্যাগ শেষ পর্যন্ত শুধু টুর্নামেন্টের গান হয়ে থাকেনি, আজও কান পাতলে শোনা যায়—দুনিয়া সেটাকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছে। ডাগআউটে সেবার ছিলো পাগলাটে এক আর্জেন্টাইন ঈশ্বর, আর মাঠে ছিলো সুয়ারেজের কামড় এবং জার্মান জয়রথ। কিন্তু একটি একটি গোলে প্রায় নিরাসক্ত সন্তের মতো সবাইকে বাতিল করে শেষ পর্যন্ত কাপ হাতে নেয় স্পেনের সোনালি প্রজন্ম।
পরের বারে, হরেক সুর আর হরেক নাটকের পরেও ব্রাজিল বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে ইউরোপের অঙ্ক কষা ফুটবলের সামনে লাতিন আমেরিকার নুইয়ে পড়ার গল্প। হামেস রদ্রিগুয়েজের অবিশেষণসম্ভব ওই গোলও ঢাকা পড়ে যায় দলগত জার্মান যন্ত্রের সামনে। রেপ্লিকা হাতে গ্যালারির সেই গোঁফওয়ালা বুড়োর জন্য চোখের জল যদি বা গোপন করা যায়, বিশ্বকাপের হাত ছোঁয়া দূরত্ব থেকে মেসির ছবিটা মানা যায় না কিছুতেই। যোগ্যতম দল হিসেবেই মারাকানায় মুকুট তোলে দুর্দান্ত জার্মানি।
পরের বিশ্বকাপ দুই হাত ভরে মাধুরী দান করে ফুটবলকে। দস্তয়েভস্কির জুয়াড়ি হয়ে স্বাগতিক রাশিয়া ছুটতে থাকে সমানে, চিরকালের ক্লাসিক হয়ে যাওয়া এক ম্যাচে বেলজিয়ামের সাথে শেষ মিনিটে হেরে যায় জাপান, টনি ক্রুসের ফ্রি-কিকে ভর করে সাতটি অমরাবতী, ফুটবলকে শব্দহীন জ্যোছনার ভেতরে উড়ে যাওয়া বুনোহাঁস করে তোলেন বেঞ্জামিন প্যাভার্ড। শেষ পর্যন্ত অবিরাম প্রাণশক্তিতে ছুটতে থাকা ক্রোয়াশিয়াকে থামিয়ে লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফুটবলের নতুন পোপ হয়ে বসে এমবাপ্পের ফ্রান্স।
সবশেষে কাতার বিশ্বকাপ, প্রায় সকলের স্মৃতিতে এখনও সেটা অমলিন। গ্রুপ পর্ব থেকেই সেখানে নাটকের পর নাটক। জার্মানি খাবি খায় জাপানের কাছে, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকেও ছোবল মারে বয়স, মরক্কো মিরাকল বিস্তৃত হয় সেমিফাইনাল পর্যন্ত; কিন্তু সারাজীবন মনে রাখার মতো এক ফাইনাল শেষে—ডিয়েগো ম্যারাডোনার স্মৃতিতেই বোধহয়— লুসাইল স্টেডিয়ামে পৃথিবীর সম্রাট হয়ে ওঠে লিওনেল মেসি।
… মেমোরির এইসব টুকরো মার্বেল বের করি, আর ভাবি, ঝুলিতে যার আট বিশ্বকাপের স্মৃতি—আয়ূর সম্ভবতঃ অর্ধেকটাই কেটে গেছে তার। নিজেকে তখন মনে হয় বিদায়ের পর শুন্য ন্যু ক্যাম্প স্টেডিয়ামে বসে থাকা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার মতো। কত ম্যাচ দেখা হলো দুনিয়ার কত মাঠে, কত তারকা এলো আর গেলো—নগণ্য এক দর্শক হলেও বিশ্বকাপের ওই যাত্রায় আমিও তো ছিলাম কোথাও সাগরের কোনো শৈবালের মতো। প্রাপ্তির পাল্লা তো আমারই ভারি। প্রতিবারই তো বিশ্বকাপ শেষ হলে এক মাসের সমস্ত নাটকের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয় যেঃ এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পাবে না কো কোনোদিন আর।
কিছুই না নিয়ে অবিরাম আমায় এভাবে দিয়ে গেছে যে বিশ্বকাপ, তার আগমনে কি এবারও খানিক নড়েচড়ে বসা উচিৎ নয়?
(৩)
ঘরে আর পরিচিত বৃত্তে অনেককেই বলতে শুনছি, মেসির বিশ্বকাপ জেতার পর এক ধরনের ‘নির্বাণ প্রাপ্তি’ ঘটে গেছে তাদের! ফুটবল নিয়ে এখন আর তাদের আগ্রহ নেই তেমন, তুচ্ছ বিশ্বকাপ কে জিতলো—তা নিয়ে তারা আর মাথাই ঘামান না আজকাল।
৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষে কাপ জেতা আর্জেন্টাইন সমর্থকদের জন্য তা হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে সত্য। কিন্তু খাঁটি ফুটবল ফ্যান হিসেবে অনুভব করি, বিশ্বকাপ নিয়ে আসলে ‘নির্বাণ’ পাওয়া যায় না কিছুতেই। একবার রেফারি হুইসেল বাজিয়ে দেওয়া মাত্র সাংসারিক সমস্ত কিছু তুচ্ছ হয়ে যায়, মাথায় ঘুরতে থাকে প্রিয়দলের স্কোয়াড সমস্যা কি পয়েন্ট টেবিল। মাঠে বল গড়ানোর আগ পর্যন্ত ‘অমুক কারণে এবার খেলা জমবে না বলা’ মানুষগুলোও শেষ পর্যন্ত ফিক্সচারের গায়ের ফলাফল লিখে হিসাব করতে থাকে জিতবে কে!
তেমনটা ঘটছে এবারও। রাজনৈতিক অস্থিরতা আর কোরবানির ঈদ মিলিয়ে বিশ্বকাপের জ্বর এখনও ঠিক শুরু হয়নি। কিন্তু ঈদের ছুটি শুরু হতেই টের পাচ্ছি হোমপেজের খোঁচাখুঁচি পোস্ট, ফুটবলীয় রিল, নতুন কেনা জার্সির ছবি। ভালোই জানি, খেলা শুরু হবার পর গোটা দেশ মেতে উঠবে টিভি কিনতে, আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের জার্সি গায়ে বুড়োরাও দুই ভাগ হয়ে নেমে পড়বে খেলার মাঠে, গলির এক চিলতে বারান্দায় পর্তুগাল কি ইংল্যান্ডের পতাকা উড়বে।
প্রতিবারের মতো এবারও টুর্নামেন্ট শুরুর আগের সবচেয়ে বড় প্রশ্নঃ কারা বিশ্বকাপের ফেভারিট?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর ক্রীড়া বিশ্লেষকদের হিসাব-নিকাশ ইতোমধ্যেই প্রকাশ পাচ্ছে নানা জায়গায়। দলীয় রসায়ন আর স্কোয়াডের গভীরতা মেপে প্রায় সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণীই বিশ্বকাপের ফেভারিট হিসেবে বলছে স্পেনের নাম।
সোনালি প্রজন্মের পর মাঝের দিন বদলের সময়টা ধাক্কা খেয়ে স্পেনের বর্তমান দলটা যথেষ্ট পরিণত, অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের চমৎকার সমন্বয় আছে দলে। কুকুরেয়া, রদ্রি, পেদ্রি, গাভি, নিকো উইলিয়ামস, মোরাতা—ইউরোপ কাঁপানো খেলোয়াড়ের ছড়াছড়ি আছে দলটায়। লামিন ইয়ামালের হ্যামস্ট্রিং নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা না থাকলে স্পেন কাগজে-কলমে নিশ্চিত ভাবেই ছাপিয়ে যেতো সবাইকে।
স্পেনের পরবর্তী ফেভারিট হিসেবে নাম আসছে গত বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট ফ্রান্স আর আর্জেন্টিনার। দলগত গভীরতার কারণে ফ্রান্স মনে হয় সেখানে খানিকটা এগিয়ে আছে।
ফ্রান্সকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেওয়া অধিনায়ক দিদিয়ের দেঁশম প্রায় একযুগ ধরেই দলের ম্যানেজার, শোনা যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ শেষে বিদায় নিচ্ছেন তিনি। হাতের দলটাও তার দুর্দান্ত। উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, এনগোলো কান্তে, উইলিয়াম সালিবা, ইব্রাহিম কোনাটে—অস্ত্রের অভাব দেশমের হাত নেই। ছোটোখাটো ইনজুরির কারণে দলের সেরা অস্ত্রটি এ মৌসুমে ঠিক ছন্দে নেই হয়তো, কিন্তু সবাই তো জানেঃ বড় আসরে কিলিয়ান এমবাপ্পের জ্বলে ওঠা প্রায় নিশ্চিত!
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনারও অস্ত্র প্রচুর। তবে এখনও তারা মেসি-নির্ভর দল। মার্কিন ফুটবল লিগে ইন্টার মায়ামির হয়ে মাঠ কাঁপালেও—ভুলে গেলে চলবে না– লিও মেসির বয়স এখন ৩৮। নিজেকে প্রমাণের জন্য তার, এবং ম্যানেজার লিও স্কালোনিরও, কিচ্ছু বাকি নেই। আরেকটা বিশ্বকাপ শিরোপার জন্য যথেষ্ট ক্ষুধা কি তাদের আছে? … সেই বিবেচনায়, অন্ততঃ আরেকজন আর্জেন্টাইনকে এবার ঝলসে উঠতে হবে দলের প্রয়োজনে। ম্যাক-অ্যালিস্টারদের ফর্ম তেমন ভালো না থাকায়, হুলিয়ান আলভারেজ হতে পারেন স্কালোনির সেই তুরুপের তাস।
আর্জেন্টিনার কথা এলো যেহেতু, বাংলাদেশি ফুটবল সমর্থকদের হৃদয়ের বাকি অর্ধেক—ব্রাজিল নিয়ে তাই বলতেই হয়।
সত্যিটাই হচ্ছে, হেক্সা জয়ের মিশনে ব্রাজিলকে এবার প্রথম সারির ফেভারিট ভাবছে না বিশ্লেষকেরা। অধিনায়ক হিসেবে বর্ষীয়ান ক্যাসেমিরো আছেন মাঝমাঠে, ভিনিসিয়াস জুনিয়র আর রাফিনিয়ারা আছে সামনে, ডিফেন্সে আছে মারকিনিয়োস-গ্যাব্রিয়েল-দানিলো লুইজের মতো তারকা—তারপরেও ব্রাজিল দলে যেন দলীর একটা সামগ্রিক বোঝাপড়ার অভাব আছে। কার্লো আনচেলোত্তি চমক দিয়েছেন ব্রাজিলিয়ানদের নয়ন-মণি হয়েও কিছুই না জেতা নেইমারকে দলে রেখে। নেইমারের মতো আরও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত যাদুর ওপরেই হয়তো শেষ পর্যন্ত ভরসা করতে হবে ব্রাজিলকে।
ব্রাজিলের সাথে প্রায় একই কাতারে, বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সারির ফেভারিট হয়ে আছে ইংল্যান্ড। দলটার বড় শক্তি হলো আক্রমণভাগ। ফিল ফোডেনকে স্কোয়াডে না রাখার পরেও বর্ষীয়ান হ্যারি কেইনের সাথে সেখানে আছেন বুকায়ো সাকা, মার্কাস রাশফোর্ড। মাঝমাঠ থেকে জুড বেলিংহামই নিয়ন্ত্রণ করবেন পুতুলনাচের মূল সুতো।
ফেভারিটদের তালিকা এখানেই শেষ। তবে কয়েকটা দলের কথা না বললে বিশ্বকাপ নিয়ে যে কোনো আলাপকেই অসম্পূর্ণ মনে হয়।
তেমন একটা দল হলো জার্মানি। বিশ্বকাপের চিরন্তন পাওয়ার হাউজ জার্মানি এবার বাজির দৌড়ে বেশ পিছিয়ে, কেউই বিশ্বকাপের দাবিদার ভাবছে না সম্ভবতঃ। বিশেষ করে জার্মান গোলস্কোরারদের ফর্মটা এবার ভালোই পড়তির দিকে। তবে, ম্যানেজার নাগেলসমান গ্রুপ পর্বে পেয়েছেন তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ আর নক-আউটে উঠে যেতে পারলে জার্মানরা যে কোনো কিছুই করতে পারে।
পর্তুগাল, ক্রোয়াশিয়া আর নেদারল্যান্ডস– বরাবরের মতোই তারা এবারও বিশ্বকাপের সমীহ জাগানো শক্তি।
পর্তুগালের ম্যানেজার রবার্তো মার্তিনেজের হাতের দলটায় গভীরতা আছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো সংক্রান্ত যত মিডিয়া-আকর্ষণ, সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, নুনো মেন্ডেজ, ভিতিনহাদের দলটা অনেক দূর যেতে পারে। নেদারল্যান্ডস দলটা কাগজে-কলমে ভালো হলেও তাদের খেলোয়াড়দের অনেকেই দীর্ঘ একটা মৌসুম কাটিয়েছে ইউরোপে, ফ্যাটিগ ভোগাতে পারে দলটাকে। আর বিশ্বকাপ এলেই অতিমানব হয়ে ওঠা লুকা মদ্রিচ আর ইভান পেরেসিচের দল ক্রোয়াশিয়া খারাপ করবে, সেটার পক্ষেও বাজি ধরার লোক কম।
প্রতিবার কোনো না কোনো আফ্রিকান দল চমকে দেখায় বিশ্বকাপে। সেই কাজটার মূল দাবিদার এবার আশরাফ হাকিমির দল মরক্কো, গত বিশ্বকাপে যারা থেমেছিলো সেমিতে গিয়ে। নজর রাখতে হবে সেনেগালের ওপরেও।
(৪)
একটা-একটা দল নিয়ে আলাপের পরে একটু বোধহয় মনোযোগ দেওয়া উচিৎ বিশ্বকাপের গ্রুপ বিন্যাস নিয়েও। বহুদিন ধরেই ৩২টা দল নিয়ে বিশ্বকাপের যে আদল, চ্যাম্পিয়ন হবার রাস্তায় কোনো দলকে যেখানে জিততে হতো ৭টা ম্যাচ—সেই ছক এবার ভেঙে গেছে।
১২টা গ্রুপে, প্রতিটায় ৪টা করে দল রেখে বিশ্বকাপে দল এবার ৪৮টা। ১২টা গ্রুপের প্রথম ২টা (মানে ২৪টা) দল তো পরের রাউন্ডে যাচ্ছেই, এছাড়া তৃতীয় স্থানে থাকা ১২টা দলের মাঝে সেরা ৮টাও যাবে নক-আউটে। এই (২৪+৮=) ৩২ দলকে নিয়ে শুরু হবে বিশ্বকাপের ‘রাউন্ড অফ থার্টি-টু’ নামের নক-আউট পর্ব। কাপ জিততে চ্যাম্পিয়ন দলকে এবার তাই খেলতে হবে ৮টা ম্যাচ।
তৃতীয় স্থানে থাকা দলগুলোর পরের রাউন্ডে যাবার সুযোগ থাকায় যা হয়েছে, নক-আউটের আগেই বড় কোনো অঘটনের সম্ভাবনা গেছে খানিক কমে। কিন্তু, বিশ্বকাপ যেহেতু, গ্রুপ পর্বের কোনো খেলায় চমকে দেওয়া ফলাফল এলে নিরপেক্ষ দর্শকেরা মনে হয় দুঃখের চাইতে খুশিই হবেন বেশি। বিশেষ করে, কয়েকটা গ্রুপের ফিক্সচার দেখে তো আগ্রহীরা এখনই মুখিয়ে আছেন জমজমাট লড়াইয়ের প্রত্যাশায়।
ফ্রান্স, সেনেগাল, নরওয়ে, ইরাক- এর গ্রুপটার (গ্রুপ ‘আই’) কথাই ধরা যাক। ফ্রান্স আর নরওয়ের খেলায় সেখানে টক্কর হবে ইউরোপিয়ান ফুটবলের দুই মহারথী এমবাপ্পে আর আর্লিং হালান্ডের মাঝে! সাথে আছে সাদিও মানে’দের সেনেগাল। ফুটবল-দর্শকরা তাই নিশ্চিত ভাবেই বিশেষ করে চোখ রাখবে এই গ্রুপের ওপর।
ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ঘানা, পানামা-এর গ্রুপ ‘এল’ও বেশ ইন্টারেস্টিং। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার পর্যন্ত খেলার ইতিহাস আছে ঘানার। আবার সাম্প্রতিক ফর্ম কি র্যাঙ্কিং বিবেচনায় ঘানার চাইতে এগিয়েই আছে পানামা। বাকি দুইটা দল তো মুখোমুখি হয়েছিলো ২০১৮ এর সেমিতেই! সেই খেলার স্মৃতি মনে পড়লে (ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিলো ক্রোয়াশিয়া) ইংল্যান্ড ম্যানেজার টমাস টুখেল বোধহয় বেশ সতর্কই থাকবেন নিজের গ্রুপটা নিয়ে। ইংরেজ মিডিয়া তো যথারীতি ফিসফাস তুলছে যে এটাই বিশ্বকাপের ‘গ্রুপ অফ ডেথ’!
সবচেয়ে কাছাকাছি শক্তির চারটা দল মনে হয় আছে গ্রুপ ‘এফ’-এ। নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন, তিউনিসিয়া—প্রতিটা খেলাই এখানে জমার কথা।
বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলছে এবার ৪টা দল। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, উজবেকিস্তান, জর্ডান।
দ্বীপ দেশ কেপ ভার্দের একাদশটাকে বিশ্ব-একাদশ টাইপ কিছু বলা যায়। তাদের খেলোয়াড়েরা ফুটবল খেলে বেড়ায় দুনিয়ার ১৪টা দেশে। ব্রাজিল থেকে হাঙ্গেরি, সৌদি থেকে ওয়েলস—দুনিয়ার সমস্ত প্রান্তের ফুটবল লীগেই কেপ ভার্দের একজন অন্ততঃ খেলোয়াড় আছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশটা কুরাসাও, তাদের জনসংখ্যা—খেয়াল করে পড়বেন—দুই লাখেরও কম!
জর্ডানের বিশ্বকাপ অভিষেক নিয়ে পড়তে গিয়ে মজার একটা তথ্য পেলাম। আধুনিক পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য বলে ধরা হয় যে সাতটি নির্মাণকে, পেট্রার দেশ জর্ডানের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সেই তালিকার ষষ্ঠ দেশটাও চলে গেলো ফুটবল বিশ্বকাপে। বাকি রইলো শুধু তাজমহলের দেশ ভারত।
বিশ্বকাপের অন্যতম স্বাগতিক দেশ কানাডাকে নিয়ে অমন একটা তথ্য দিয়েই শেষ করি এই পর্বটা। বিশ্বকাপে কানাডা এবার ম্যাচ আয়োজন করছে ১৩টা, তার মাঝে ৭টাই হচ্ছে ভ্যাঙ্কুভারে। আগে কখনো বিশ্বকাপ ভূ-গোলকের অ্যাতোটা পশ্চিমে পা ফেলেনি।
(৫)
ভবিষ্যদ্বাণী করতে গিয়ে গাণিতিক মডেলরা বলছে, এবারের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালের লাইন আপ হতে পারেঃ স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা (কিংবা ইংল্যান্ড), আর ফ্রান্স বনাম ব্রাজিল!
কী সহজে হয়ে গেলো বলা!
গাণিতিক মডেলের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হোক কি না হোক, বিশ্বকাপের ওই একটা মাসের রোলার কোস্টারকে কি এরকম কয়েকটা অক্ষরে নামিয়ে আনা যায়? বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনা দেখে– আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ে যাদের উল্লাস দেখে খোদ আর্জেন্টিনা রাষ্ট্র একটা দূতাবাস খুলে বসেছে ঢাকায়?
‘যা যা তোমরা পাওনি জীবনে/ তোমাদের যেখানে যেখানে অপমান/ যারা যারা দুরছাই করলো তোমাদের/ তার সমস্ত কিছুর জবাব দিতে’- মানুষ বাংলাদেশে বেছে নিয়েছে বীরপূজা।
শারিরীক প্রতিবন্ধকতা জয় করে দুনিয়ে জেতা মেসি, ফ্লাভেলা থেকে উঠে এসে প্যারিস দাপানো নেইমার, মানুষ হয়েও দানবের মতো বড় হয়ে ওঠা রোনালদো– এরা প্রত্যেকে যেন বাঙালির নিজের অপারগতা ভুলে যাবার মোক্ষ। মহামারি কি ইনফ্লেশনের যৌথ ডিফেন্স ভেঙে, ধূলোর শহরে যানজটের ট্যাকল এড়িয়ে, অফিস-আদালত-হাসপাতালের কাফকায়েস্ক ধাঁধার ফরমেশন উড়িয়ে দিয়ে, বিশ্বকাপের খেলা দেখা আমাদের অ্যান্টিবায়োটিক। চারটি বছরের জমে থাকা অনুভূতিকে বের করে আনতে বিশ্বকাপের পতাকা না উড়িয়ে আমরা যাবো কোথায়?
আমাদের ধর্ষণ উৎসবের মাঝেও তাই উজ্জ্বল হয়ে ফোটে ব্রাজিল বাড়ির রঙ, অশ্লীল যানজটের ওপরে নান্দনিকতা নিয়ে ভাসে আর্জেন্টিনার গ্রাফিতি। আমাদের টং দোকানের গলাগলি বন্ধু হয়ে যায় গালাগালি শত্রু, আমাদের নিয়ত ভাগ হয়ে থাকা মানুষিকতা হয়ে যায় পত্রিকা পরিসংখ্যান নয়তো ফেসবুক ফ্যাক্টের ফাইট।
ফুটবলারদের কাছে সে সোনার পাতে মোড়া এক টুকরো অমরত্ব, কিন্তু আমাদের কাছে সে অসহনীয় দুনিয়ার সার্কাসে একটি গোটা মাস অনুভূতির ট্রাপিজে ওড়ার সুযোগ।
চার বছর বুড়িয়ে যাবার আক্ষেপ ভুলে, জীবনের ইনজুরি টাইমের দিকে আরও কিছু এগিয়ে যাবো জেনেও তাই; আমরা অপেক্ষা করছি হে বিশ্বকাপ! খেলা হবে!
২৯ মে, ২০২৬

সুহান রিজওয়ান | ঢাকা, বাংলাদেশ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যন্ত্রপ্রকৌশলে স্নাতক। পড়তে পড়তেই নিজের ভালো লাগা বইগুলোর মতো কোনো উপন্যাস লিখতে চান।
