পড়শী পড়শীর আরশি ‘পড়শী’র প্রকাশনা নিয়ে কিছু কথা

‘পড়শী’র প্রকাশনা নিয়ে কিছু কথা

Post Views: 154

‘পড়শী’তে প্রকাশিত লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে এর সুন্দর নামকরণটি। ‘পড়শী’-র শব্দগত অর্থ ‘প্রতিবেশী’। বিপদে-আপদে, সুখে-দুখে, আনন্দ-বেদনায়, সামাজিক কর্মকান্ড প্রতিবেশীকেই সবার আগে কাছে পাই আমরা। সে অর্থে পড়শী আমাদের আপনজন। ‘পড়শী’তে যাঁরা লেখা দিয়েছেন তাঁরা ‘পড়শী’কে আপন ভেবেই লিখেছেন। এখানে তাঁদের লেখাগুলো অধিকতর পরিচ্ছন্ন, গুছানো, তথ্যনির্ভর এবং নির্ভুল বাক্যে বিন্যস্ত।

মে ২০২৬ (জ্যৈষ্ঠ) সংখ্যার মূল রচনাবলীতে রূপালী পর্দার বিবর্তন নিয়ে লিখেছেন পাঁচজন বিশিষ্ট লেখক। তারা হলেন- লেখক ও প্রকৌশলী কুবলেশ্বর ত্রিপুরা, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন পিন্টু, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিক্ষাবিদ শৈবাল চৌধুরী, কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার, অভিনেতা ও বিজ্ঞানী জাভেদ মাহমুদ শিপলু। আর চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেলের সাথে ‘পড়শী’র একান্ত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন ড. জাকিয়া আফরিন।

‘রূপালী পর্দার বিবর্তন’ শিরোনামে লিখেছেন কুবলেশ্বর ত্রিপুরা। চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত এর উত্থান পতন বিবর্তন ধারাবাহিক ভাবে বর্ননা করেছেন তিনি। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসের লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় কর্তৃক প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শন, পরের বছর তা উপমহাদেশে কলকাতা এবং ঢাকায় প্রদর্শন, ঢাকার নবাব পরিবার কর্তৃক ১৯৩১ সালে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘লাস্ট কিস’ নির্মান, ১৯৫৬ সালে পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র “দ্যা ফেস অফ দ্যা মাস্ক” তৈরী, অত:পর এর পরিসর বৃদ্ধি, উন্নয়ন, বিবর্তন ধারাবাহিক ভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম চলচ্চিত্র তৈরী করেন চাষী নজরুল ইসলাম ছবির নাম ‘ওরা এগার জন’। ক্রমে চলচ্চিত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে- মূল ধারার চলচ্চিত্রের পাশাপাশি কিছু ভাল চলচ্চিত্র এবং প্রমাণ্যচিত্র তৈরী হয়। এদের মধ্যে ষ্টপ জেনোসাইড, সূর্য দীঘল বাড়ি, আদিবাসীদের জীবন ধারা নিয়ে তৈরী প্রমাণ্য চিত্র। ২০০০-এর দশকে রুচিহীন কাহিনি এবং মানহীন নির্মান শৈলির কারনে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমতে থাকে। বর্তমান চলচ্চিত্র শিল্প সংকটকাল অতিক্রম করছে। কুবলেশ্বর ত্রিপুরার লেখাটি পড়লে যে কোনো পাঠকই এটিকে চলচ্চিত্রের ইতিহাস বিবেচনায় সংরক্ষণ করবেন।

অভিনেতা-বিজ্ঞানী জাভেদ মাহমুদ শিপলু লিখেছেন, ‘আলমগীর কবির একজন ভিন্ন মাত্রার চলচ্চিত্রকার’- শিরোনামে। অক্সফোর্ডে প্রকৌশল বিষয়ে পড়তে যান আলমগীর কবির। সেখানে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তার সংস্পর্শে আসেন। পরে বৃটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে চলচ্চিত্র তত্ত্ব, ইতিহাস ও নির্মাণশৈলী নিয়ে পড়াশোনা করেন। দেশে ফিরে ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রয়াসী হন। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত। এরপর তিনি নির্মাণ করেন সীমানা পেরিয়ে, ‘মোহনা’সহ আরো কিছু ভিন্ন ধারার ছায়াছবি। আলমগীর কবিরের চলচ্চিত্রে রাজনীতি ছিল, কিন্তু সেটি বক্তৃতা নয়, সেটি ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ভিতর দিয়ে উঠে আসা রাজনীতি। অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ঘনিষ্টতা ছিল আলমগীর কবিরের। সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর অকাল মৃত্যুতে দেশ- জাতি হারিয়েছেন একজন প্রজ্ঞাবান, প্রতিভাবান, সু’-ধারার চলচ্চিত্রকারকে। জাভেদ মাহমুদ শিপলুর লেখাটি পড়লে যে কোনো পাঠকই আগ্রহী হবেন তাঁর মতো একজন বিদগ্ধ চলচ্চিত্রকার, চিন্তক, তাত্ত্বিক সম্পর্কে আরও কিছু জানতে।

‘উচিৎ সাজা’ বিষয়ে লিখেছেন আনোয়ার হোসেন পিন্টু। তিনি লিখেছেন বর্তমানে বাংলাদেশের সিনেমা এবং সিনেমা হলগুলোর দুরাবস্থার চিত্র নিয়ে। সেখানে একটি শহরের আলোকোজ্জ্বল জমজমাট ২০টি সিনেমা হল থেকে কমতে কমতে অবশেষে একটিতে এসে ঠেকেছে। কিভাবে দর্শক কমতে থাকে, কেন কমতে থাকে, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় তাঁর লেখায়। সিনেমা এখন ড্রইং রুমের টিভির পর্দায়, স্মার্ট ফোনে, ইউটিউবে, ইন্টারনেটে। সিনেমা হলের বাজে পরিবেশ, টিকিট সংগ্রহে ঝামেলা, অরুচিকর ছবি প্রদর্শন-এসব কারণে সিনেমা হলে দর্শক সংখ্যা কমতে থাকে-এমনই একটি যৌক্তিক বক্তব্য উঠে এসেছে আনোয়ার হোসেন পিন্টুর লেখনিতে। লেখাটি মানসম্মত এবং বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

“শতবর্ষে পুডভকিনের মাদার” প্রবন্ধটি লিখেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা শৈবাল চৌধুরী। তিন দশকের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে সব কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে পুডভকিনের ‘মাদার’ তাদের মধ্যে অন্যতম। ম্যাক্সিম গোর্কির কালজয়ী উপন্যাস “মাদার” অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। বিশ্বের দেশে দেশে সাহিত্যে পাঠ্য হিসাবে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে ‘মাদার’ উপন্যাসটি। সেই মাদার উপন্যাসটি অবলম্বন করেই পুডভকিন সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী ‘মাদার’ চলচ্চিত্রটি যা চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতাদের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি উৎকৃষ্ট উপকরণ।

‘প্রেক্ষাগৃহের রূপালী সময়: একে একে নিভে যাওয়া আলো” – এই বিষয়ে লিখেছেন কবি সাংবাদিক ওমর কায়সার। তিনি লিখেছেন চট্টগ্রামের সিনেমা হলগুলোর বাস্তবতা নিয়ে। চট্টগ্রাম শুধু বন্দর, পাহাড় আর সমুদ্রের জন্যই বিখ্যাত ছিল না- ছিল সিনেমা হলগুলোর জন্য ও। সিনেমা প্যালেস, আলমাস এখন মুমূর্ষু অবস্থায় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছে। চলতি বছরে ঐতিহ্যবাহী আলমাস সিনামা হলটিও বিলুপ্ত হয়েছে। এক সময় সিনেমা হলকে কেন্দ্র করে উৎসব তৈwর হতো। ডিজিটালাইজেশনের যুগে এসে সিনেপ্লেক্সের দাবী উঠে কিন্তু সিনেপ্লেক্স নির্মিত হলেও তা সাড়া জাগায়নি এ শহরে। লেখাটি চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হলেও বাংলাদেশের সর্বত্র একই চিত্র দেখা যায়-বিষয়টি চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছেন কবি সাংবাদিক ওমর কায়সার।

চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেলের একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ড. জাকিয়া আফরিন। তানভীর মোকাম্মেল এ পর্যন্ত দশবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের পরিচালক। চলচ্চিত্রের সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি আস্থাহীন নন। তিনি মানুষের উপর আস্থা রাখতে চান। তাঁর কথায়, গভীর বোধ নিয়ে দর্শকদের কাছে উপস্থিত হয়েছেন তিনি এবং সফল ও হয়েছেন। লাল সালু, লালন, চিত্রা নদীর পাড়ে, নদীর নাম মধুমতি তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। বাংলাদেশে ২০২৪-২০২৫ এর পট পরিবর্তনের পর পীর, মাজার, বাউল সাধকদের উপর হামলা ও সহিংসতা প্রশ্নে তিনি তার স্বব্যাখ্যায়িত জবাবে বলেন উনিশ শতকের বেঙ্গল রেনেসাঁসের ফলে শহুরে বাঙ্গালী সমাজে চেতনার বিকাশ ঘটলেও বাঙালী মুসলমান সমাজে তা অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে নাই। ফলে গ্রামাঞ্চলে ধর্ম ব্যবসায়, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস থেকে যায়, যা আজও বিদ্যমান। সাক্ষাৎকারটি থেকে পাঠক, লেখক এবং সমাজতাত্ত্বিকদের অনেক কিছু জানার আছে।

‘পড়শী’র মে ২০২৬ সংখ্যার মূল রচনাবলীর সবগুলো লেখাই মানসম্মত এবং পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখাগুলোতে চলচ্চিত্রের ইতিহাস, সমস্যা এবং সমাধানের যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে স্বাধীনতাত্তোর কালে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক আরও ভালো ভালো ছবি তৈরী হতে পারতো। ওরা এগার জন, ধীরে বহে মেঘনা, হুলিয়া, আগামী ও স্টপ জেনোসাইড-এর মতো গুটিকয়েক ভালো মানের ছবি তৈরী হলেও একাত্তরে বাংলাদেশের গেরিলা যুদ্ধ, বড় বড় সম্মুখযুদ্ধ নিয়ে আরও ছবি হওয়া উচিৎ ছিল। কিংবা দেশ গঠনে ‘মাদার ইন্ডিয়া’র এর মতো গঠনমূলক ছবি হতে পারতো। ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র মতো আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি তৈরী হলেও এ ধরনের বিশেষ কোন প্রয়াস ইগানিং লক্ষ্য করা যায়না।

‘পড়শী’র প্রচ্ছদ, অলংকরণ, বিন্যাস, পরিস্ফুটন খুবই আকর্ষণীয় এবং প্রশংসনীয় হয়েছে-মর্মে পাঠক সমাজের অভিমত। সম্পাদনায় সংশ্লিষ্ট সকলের ঐকান্তিক চেষ্টা শ্রম ও মেধার ফসল পড়শী’র এ প্রকাশনা। সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিবাদন জানাই।

১৪ জুন, ২০২৬


শরিয়তপুর, বাংলাদেশ

কবি ও প্রাবন্ধিক।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।