পড়শী নিয়মিত কলাম আপন অভিজ্ঞান

আপন অভিজ্ঞান

Post Views: 28

সন্তানের ইহকালের মঙ্গল-ভাবনায় আমরা অনেক কষ্ট ও অর্থব্যয়ে ইংরাজি ভাষা শিক্ষা দিই। তার চারদিকে উপমা রূপক বিহীন পরিপার্শে সে বিদেশী ভাষা শিখতে তারও কষ্ট হয়। কিন্তু সে ভাষা জানলে তার ভাল চাকুরী হবে, বিদেশে কাজ করতে সুবিধা হবে, অর্থে বিত্তে সে উপরে থাকবে- ভাষা শিক্ষার কালে আমরা নিজেরা তা না পারলেও তা বার বার বলি। ওরা তা বিশ্বাস করে।

সেই সন্তানকেই প্রধানত পরকালটা সুরক্ষিত করার জন্য, মস্ত সুখ সুবিধাদি পাওয়ার জন্য আরবি ভাষা শিক্ষা দিই। যেহেতু এটিও আরেকটি বিদেশী ভাষা তাই তার বেড়ে ওঠা, পরিবেশ, শব্দ ও চারদিকের উপমা রূপকে সে বিদেশী ভাষা নেই বলে তার অর্থ না বুঝে মুখস্ত করতে হয় বলে আরো কষ্ট হয়। তবে এর ব্যয়ভার ইংরাজির অনুরূপ তো নয়ই, তাঁর চেয়ে বহু কম।

তবে সবচেয়ে সস্তা হল বাংলা ভাষা। শেখাতে ও শিখতে গেলে তেমন কষ্ট নেই। আমরা বাঙালি বলে কোন রকম ব্যয়, পারিতোষিক, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা কোন ট্রেনিং ছাড়াই শুধু জন্মেই পেয়ে গেছি এন্তার সম্ভাবনাময় বাংলা ভাষার মধুর হাড়ি। কারণ এ আমাদের মাতৃভাষা। উত্তরাধিকার সুত্রে আমি পেয়েছি বলেই এতে আমার সন্তানেরও অধিকার। এ ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে জাগতিক বস্তু ও বাণিজ্য আয়ত্ব করা সম্ভব, রাষ্ট্রীয়ভাবে তার ব্যবস্থা করতেও রক্তদান করে গেছেন আমাদেরই পূর্বসুরিগণ। আমাদের কিছুই করতে হচ্ছে না।

তাই কি উল্লেখিত এ তিনটি ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষাকে সবার নিচে দাম দিই? এর অনাদর করি, যেনতেন করে বলি, এর বিশুদ্ধ রূপের সন্ধান করি না? দেশান্তরী হলে সেখানে নিজের ভাষা না বলে বলে এক সময় বলতে সংকোচ বোধ করি? শুধু বিদেশে নয়, দেশেই অনেক পরিবার বাংলা ব্যবহারে আগ্রহ বোধ করেন না। তাই কি সামাজিক ও গন মাধ্যমে চালু হয়েছে এক জগাখিচুড়ী ভাষার? আমি ঠিক বলতে পারবো না।

বহু বছর ধরে আমি বিদেশে দৈবের বসে আছি বলেই কি এসব পরিষ্কার দেখতে পাই? নাকি আমার নিজের সত্তর বছরের সুদীর্ঘ জীবনাভিজ্ঞতায় নিজ মাতৃভাষাকে ঠিকুজী করে ‘কমতো কিছু পাইনি বলে’ এই হাহাকার? এ ভাষা প্রাপ্তির উপ্ত বীজেই একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন।

এ ভাষার দেখভাল করার দায়িত্বও আমাদের। আসলে একেবারে শিশুকাল থেকেই সন্তানকে নিজেদের সংস্কৃতি ও দেশপ্রেমটাও ধর্মের মত গুরুত্ব দিয়ে শেখাতে হয়। এতেই রুচিশিক্ষা হতে পারে। আর সংস্কৃতি এমন এক ব্যাপার, তা শেখানো যায় না, তার মধ্যে বেড়ে উঠতে দিতে হয়। দেখেছি- ‘কাঁচাতে না নোয়ালে বাঁশ/ পরে করে ঠাস ঠাস’।

‘বিনে পয়সার ওষুধে কাজ হয় না’। তাই বাংলা ভাষাকে প্রথম দাম দিতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে অভিভাবকদেরই। তার পরে কাজ হবে শিক্ষকদের। এর অপার সম্ভাবনার উদাহরণগুলো তাদের জানাতে হবে। বাংলা বই পড়া, বাংলা গান শোনা, বাংলা ছবি দেখা- করতে হবে শুরু থেকে। সন্তানের উপলব্ধির দ্বার খোলা থাকবে তবেই। দেশকে ঘিরে নিজ সততা নিজের মায়ের মতই তখন মাথায় রেখে বড় হবে। না হলে একদিন তারা যখন বড় হবে তখন নিজ সংস্কৃতি বিচ্যুত হবার চরম বঞ্চনায় পাগল হয়ে উঠবে এবং তখন পরিবারকে বাবা-মা’কে যে নিন্দা করবে না বা দায়ী করবে না, তা কে বলতে পারে?

আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে আমাদের পোশাক ও সংস্কৃতি থেকে পিছলে যেতে দেখছি। ঈদ, বিবাহ, জন্মদিনের মত সামাজিক অনুষ্ঠাণগুলোটাতে গেলেই মন খারাপ হয়ে যায়। তাদের গায়ে, মাথায় বিদেশী আবরণ ও আভরণ। ছেলেদের দেখেছি কিম্ভূত আচকাণের সঙ্গে কোমরে তলোয়ার লট্‌কে বিয়ের আসরে- যেন বিয়েতো নয়, নারী জয়ের যুদ্ধে এসেছেন! কনেদের কথা কি বলবো! সে লীলাবালি ভারি লাহেঙ্গার জন্য হাঁটতেই পারেন না। বিয়েরও বিয়ের দিনের আগেই নাটকের মত স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী অভিনয় থাকে। বিয়ের দিনে তাঁর রিলিজ হয় বড়ো পর্দায় যেন বিদেশী সিরিয়াল!

এদিকে আবার দেখছি ভাষা ভুলে যাবার মতই কিছু মেয়েরা শাড়িপরা ভুলে গেছেন অথবা নিজে পরতে গেলে ঘর্মাক্ত হয়ে তা পরিত্যাগ করেছেন। অথচ যা কিনা ছোট বেলা থেকেই ঘরে মা-মাসি, বোন-ভাবীর কাছ থেকেই শাড়িপরা শিখবার কথা। সে সুযোগে বিউটি পার্লারগুলো মেকআপ, চুল বাঁধা, সৌন্দর্য চর্চার সঙ্গে যোগ করেছে শাড়ি পরানোও। তাজ্জুবি কাণ্ড হলো কিছু মায়েরাও মেয়েদের সাথে লাইন দেন। তারা ব্লাউস-পেটিকোট পরে দু’হাত উপরে তুলে পার্লারের পাহাড়ি কর্মীর সামনে আত্মসমর্পন করে দাঁড়ান। ওরা তাদেরে সহস্র সেফটিপিনে বারোহাত সারিতে গেঁথে দেয়। এখন আবার তৈরি পোশাকের মত ব্লাউস আটকানো তৈরি শাড়িও পাওয়া যাচ্ছে। দেশী শাড়ি কেনাও নাকি কমে গেছে, লংড্রেস ও সালোয়ার কামিজের মূল্য ও কদর বেড়েছে।

যাহোক তবু বৈশাখ, ফাল্গুনে, ফেব্রুয়ারীতে এখনো দেখা যায় দেশের তাঁতের শাড়ি। আচ্ছা, এই যে এরা দেশের কাপড়, মায়ের দেয়া অপেক্ষাকৃত কম দামী কাপড় পরেছে তাতে তাদের এক আউন্স কম সুন্দর লাগে? লাগে না। ভিন্ন পোশাক প্রয়োজনে, শারীরিক অক্ষমতা, খেলাধুলায় ও ভ্রমণে তো থাকতেই পারে। তবে তা আমাদের অন্যতম পোশাক গিলে খাবে কেন?
ভিন্ন পোশাক নিশ্চয়ই পরবেন। প্রয়োজনে, পীড়িত হলে, মাঠে নামলে, জলযাত্রায়। সে হবে ব্যতিক্রম। সেসব পোশাক আমাদের অন্যতম পরিচিতি গিলে খাবে কেন? এ যদি হয় হিন্দি সিরিয়াল দেখার কারণে, তবে তা আইন করে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। আমাদের দেশের ছত্রিশটা টিভি চ্যানেলে ‘চরিত্রের’ দাবী ছাড়া বিদেশী সাজ পোশাক একদম বন্ধ করে দেবার সুপারিশ জানাই। তার চেয়ে বড় কথা এতে নিজের দেশের টাকা দেশে থাকবে, দেশের বুনন শিল্পীর আহার জুটবে।

ধরে নিলাম বৈশ্বায়নের কারণে আমাদের সংস্কৃতির এ পরিবর্তন, সাহিত্যের এ পরিবেশনা নবায়ন অপরিহার্য। বিবর্তন না হলে এগুনো ব্যহত হয়। তবু আমার যে বুকটা চিন চিন করে, তার কারন কি? সে কি আমার নিজের ব্যাক্তিগত স্মৃতির উপমা হারিয়ে যাচ্ছে বলে নাকি আমাদের সমষ্ঠিগত আত্মবিক্ষনের অনুপান হারিয়ে ফেলছি বলে। কেউ কেউ ভাবতে পারেন তারও কি কোন দরকার আছে? ইমোশনের কারনে কিছু ধরে রাখা কি ঠিক? আমার ধারনা নিটোল বর্তমান বলে কিছু নেই। সবই আসলে অতীতের উপর দাঁড়ানো। তাই নিছক বর্তমান নিয়ে ভাবলে বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয় একদিন লুপ্তও হয়ে যেতে পারে। যখন আমাদের দেশে একটার পর একটা নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, আমি অনেক ভেবেছি। আর উপলব্ধি করেছি, এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের ছায়া আলাদা করে দেখবার দরকার আছে। কিন্তু তা নতুন নির্মানে হবে, পুরাতন মুছে নয়। জীব বৈচিত্র্য যেমন জীবের টিকে থাকার জন্য জরুরী, তেমনি দেশের যাতায়াত-জীবন, আবহাওয়া-আহার-বসবাসের সঙ্গে মানানসই সংস্কৃতি ও সাহিত্য তার স্থিতিশীলতার জন্য জরুরী।

এবার নিজের কথা বলি। সাড়ে তিন দশক ধরে আমি মূলত যে দেশে থাকি ইংরাজী ভাষাই তাদের লিংগুয়াফ্রাঙ্কা। আমার লেখার মূল ভাষা এখনও বাংলা। এবং তা বাংলা বলেই বাংলাদেশ ও সাহিত্য থেকে কখনো হইনি বিচ্যূত। এই বিদেশে সারাক্ষণই বাইরে ভিন ভাষা হলেও মনে মনে বলে চলেছি একটাই ভাষা – সেটা বাংলা ভাষা। তবে এই থাকা না থাকার কালে আমার ভাষার মধ্যে যা কিছু শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল তা ডায়াস্পোরার কূটো, কষ, ফুল, ফসফরাস, লেগুন ও লবঙ্গের সুগন্ধে ভরে দিতে চেষ্টা করেছি। এবং তা সম্ভব হয়েছে নিজ মাতৃভাষা পুঁজি করেই এবং বাঙালির অভিজ্ঞান বুকে ধারণ করেই।

পৃথিবীর সব জাতি সব গোষ্ঠীর শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিরই বিবর্তন ঘটে। বাঙালি সংস্কৃতিও সেই পথ ধরে চলছে। শত বছর আগের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে আজকের বাঙালি সংস্কৃতির পুরো মিল থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক। তবে ধারাবাহিকতা না থাকলে সেটাই এক সময় তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।


৯ জুলাই, ২০২৬


লন্ডন, যুক্তরাজ্য

বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত কবি ও সাহিত‍্যিক।


Next

1 Comment

  • Moazzem Hossain

    লেখাটির মূল উদ্বেগ—ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে আমাদের ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসা সম্পর্ক—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। বিশেষ করে ইংরেজি শেখার পেছনে অর্থনৈতিক সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা এবং আরবি শেখার সঙ্গে ধর্মীয় সওয়াবের প্রত্যাশার যে তুলনাটি লেখক করেছেন, তা যথার্থ। আরবি ভাষা শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই ভাষাটিকে বুঝে জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে কেবল ধর্মীয় কর্তব্য বা সওয়াব অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থেকে যায়—এই পর্যবেক্ষণ আমার নিজের অনুভূতির সঙ্গেও মিলে যায়। একইভাবে, বাংলা মাতৃভাষা বলে তাকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়া এবং সচেতনভাবে চর্চা না করার প্রবণতাটিও বাস্তব।

    লেখাটির বিভিন্ন অংশে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, পোশাক, বিবাহের রীতি, টেলিভিশন, দেশীয় শিল্প এবং ঐতিহাসিক স্মৃতি—অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এগুলো সবই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে বিষয়গুলো আরেকটু সুসংগঠিতভাবে কয়েকটি পৃথক অনুচ্ছেদ বা উপশিরোনামে বিন্যস্ত হলে লেখাটির কেন্দ্রীয় বক্তব্য আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী হতো। কিছু ক্ষেত্রে এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে পরিবর্তনটি বেশ দ্রুত হওয়ায় পাঠককে মূল সংযোগটি নিজে থেকে খুঁজে নিতে হয়।

    লেখার শুরুতে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার ওপর বেশ দৃঢ় অবস্থান দেখা যায়, আর শেষদিকে সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিবর্তনের কথাও স্বীকার করা হয়েছে। দুটি বক্তব্য পরস্পরবিরোধী না হলেও, পরিবর্তন ও আত্মপরিচয় রক্ষার মধ্যে গ্রহণযোগ্য সীমারেখাটি আরেকটু ব্যাখ্যা করা গেলে প্রবন্ধটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতো। কারণ সংস্কৃতি কখনো স্থির থাকে না; বাইরের প্রভাব গ্রহণ করেও একটি সংস্কৃতি তার নিজস্বতা ধরে রাখতে পারে। আসল প্রশ্ন সম্ভবত বিদেশি প্রভাব গ্রহণ করা নয়, বরং নিজের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলা।

    সব মিলিয়ে, এটি একটি আন্তরিক সাংস্কৃতিক উদ্বেগ থেকে লেখা ভাবনাপ্রবণ প্রবন্ধ। লেখকের মূল আহ্বান—পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে জীবন্তভাবে যুক্ত রাখা—অত্যন্ত মূল্যবান। গঠন ও বক্তব্যের ধারাবাহিকতা আরেকটু পরিমার্জিত হলে লেখাটি আরও প্রভাবশালী এবং পাঠকের কাছে আরও সহজবোধ্য হয়ে উঠবে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।