পড়শী পড়শীর আরশি বন্ধুত্বের কোনো এক্সপায়ারি ডেট হয় না

বন্ধুত্বের কোনো এক্সপায়ারি ডেট হয় না

Post Views: 4
11 min read

বিকেলের নরম সোনাঝুরি আলোটা যখন পুরোনো ঢাকার ডালপট্টির গলির মোড়ে এসে থমকে দাঁড়াল, তখন আমাদের তিনজনের মনে হলো—সময় বুঝি কোনো এক জাদুবলে আবার সেই পুরোনো দিনগুলোকেই ফিরিয়ে এনেছে, কত বছর পর আজ আমরা আবার একসাথে সেই পুরোনো জায়গায় এলাম!

একসময় ঠিক এই মোড়টাতেই ছিল একটা টিনের চালার ছোট্ট চায়ের দোকান। সারাক্ষণ ধোঁয়া ওড়ানো অ্যালুমিনিয়ামের কেটলিতে চা ফুটত, আর এক পাশে লোহার কড়াইয়ে ভাজা হতো গরম গরম ডালপুরি। দোকানের সেই পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ারটায় ভাঙা ভাঙা আওয়াজে প্রায়ই বাজত— “হাওয়া মে উড়তা যায়ে, মেরা লাল দোপাট্টা মলমল কা…”।

স্কুলে যাওয়ার পথে কিংবা ফেরার সময় কতবার যে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে এখান থেকে ডালপুরি কিনেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আমার আর রুমানার বাড়ি ছিল ডান দিকের ওই গলিটাতে, আর কাকলীর বাড়ি ছিল আরেকটু সামনে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের সেই একসাথে স্কুল যাতায়াতের দিনগুলো যেন রূপকথার পাতা থেকে ছিঁড়ে আনা এক টুকরো স্বর্গীয় অধ্যায়।

আজ এতগুলো বছর পার করে সেই চেনা বৃত্তে আমরা আবার এসে দাঁড়িয়েছি। তবে এবার আর পরনে নীল-সাদা স্কুলের ইউনিফর্ম নেই, পায়ে নেই ধুলোমাখা কালো বাটা জুতো, এমনকি ডালপুরি কেনার জন্য সেই খুচরো পয়সার হিসেবও নেই। আমরা এখন সমাজের চোখে প্রতিষ্ঠিত, সংসারী এবং ‘দায়িত্বশীল’ প্রাপ্তবয়স্ক নারী। আমাদের কারও কারও ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনা শেষ করে নিজেদের কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়েছে।

সময়ের আঁচড় পড়েছে আমাদের শরীরেও। আমার দুই বান্ধবীর একজনের চোখে এখন ভারী চশমা; তার যে দীঘল কালো চুল দেখে আমরা অবাক হতাম, এখন আর তার আগের মতো ঘন চুল নেই। একসময়ের শুকনো, রোগা-পটকা আমি এখন বেশ ভারী গড়নের এক মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা। আর আমাদের শান্ত রুমানা! ওর হাসিটা আর আগের মতো অবারিত নেই; হাসির ফাঁকে চট করে উঁকি দিয়ে যায় অসময়ে স্বামী হারানোর এক গভীর, নিভৃত কষ্ট। আমাদের সবার চোখের কোণেই এখন সময়ের এঁকে দেওয়া দু-একটা ভাঁজ—যা আসলে এক একটা ঝড়ের গল্প বলে।

আমরা সেই চায়ের দোকানে ঢুকলাম। শুরুতে পুরোনো সেই কাঠের বেঞ্চিতে বসতে আমাদের মধ্যে খানিকটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। সাধারণত এখন আমরা কেউ এসব জায়গায় বসি না, বাইরের রাস্তার ডালপুরিও খাওয়া হয় না বহুকাল। আগের সেই চেনা দোকানী মামাও নেই, তাঁর জায়গায় এখন এক অল্পবয়সী ছেলে বসে। আমরা তিন কাপ চা আর দুটো করে ডালপুরির অর্ডার দিলাম।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একটু ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে, কেমন আছিস?” রুমানা মুখে ওর সেই চেনা মিষ্টি হাসিটা জোর করে ফুটিয়ে বলল, “হ্যাঁ রে, ভালো। তোর বাড়ির সবাই ভালো তো?” “হ্যাঁ, ভালো,” কাকলী চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠিক করতে করতে উত্তর দিল, “কী খবর বল তোর?”

কথাগুলো ভীষণ চেনা, অথচ কেমন যেন একটা ফর্মালিটির খোলস, একটা আনুষ্ঠানিকতার মলাটে জড়ানো। মনে হচ্ছিল, আমরা বুঝি চেনা মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তিনজন একদম অপরিচিত মানুষ, যারা কেবল সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে টিকে আছি।

ঠিক তখনই, অলৌকিক কিছুর মতোই, দশ-বারো বছরের কয়েকটি মেয়ে স্কুলের ইউনিফর্ম পরে, পিঠে ভারী ব্যাগ ঝুলিয়ে খিলখিল করে হাসতে হাসতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেল। তাদের সেই নিষ্কলুষ, বাঁধভাঙা হাসি দেখে বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা পুরোনো রোদেলা দুপুর এক ঝটকায় ফিরে এলো।

আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। কাকলীর দিকে তাকিয়ে হুট করেই হেসেই ফেলে বললাম, “কিরে কাকলী, মনে আছে? স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে তুই কী বকবকটাই না করতিস! আমাদের তো কথা বলার কোনো সুযোগই দিতিস না!”

কাকলী এক মুহূর্তও দেরি না করে, সেই কিশোরীবেলার মতোই চোখ রাঙিয়ে, কপালে কৃত্রিম রাগ ফুটিয়ে ধমক দিয়ে বলল, “চুপ কর! ওটা আমি না, ওটা তুই ছিলি! সব সময় নিজের হুকুম চালাতিস আমাদের ওপর!” পাশে বসে রুমানা আর নিজেকে সামলাতে পারল না, সেই ছোটবেলার মতো করেই খিলখিল করে হেসে উঠল।

ব্যাস! ওই একটা মুহূর্তেই যেন জাদুমন্ত্রে সব বদলে গেল। মনে হলো, বয়সের সব আড়ষ্টতা, সামাজিক দূরত্ব, দায়িত্বের ভারী বোঝা—সব যেন কাচের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আমরা আর তিনজন মধ্যবয়সী নারী রইলাম না; মায়ার এক অদ্ভুত টানে আমরা আবার ফিরে গেলাম সেই তেরো-চৌদ্দ বছরের তিন চঞ্চল কিশোরীতে। চায়ের দোকানের ছেলেটি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিল, তিনজন অভিজাত ভদ্রমহিলা কীভাবে একে অপরের পিঠ চাপড়ে হেসেই খুন হচ্ছে, একজন আরেকজনের গায়ে হেলে পড়ছে— ঠিক যেন স্কুল ছুটির পরের কোনো এক দুরন্ত বিকেল!

“আচ্ছা, তোর মনে আছে রুমানা,” কাকলী চায়ের কাপটা টেবিলে ঠুকে বলল, “পঞ্চাশ পয়সা দিয়ে একটা পেয়ারা কিনে আমরা তিনজনে ভাগ করে খেতাম? আচ্ছা, সেই পেয়ারা কি আসলেই অত স্বাদের ছিল, নাকি বন্ধুদের সাথে একসাথে ভাগ করে খাওয়ার আনন্দটাই আসল ছিল রে? সেটা আজও আমি ভেবে পাই না।”

রুমানা চোখের কোণের জলটা একটু মুছে, আলতো হেসে উত্তর দিল, “আনন্দটাই আসল ছিল রে। তবে তখন আমাদের দলে সবচেয়ে বেশি ভাব ছিল কাকলির— মাথাভর্তি চুল, ফরসা, সুন্দরী।” কাকলী চট করে রুমানার কাঁধে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, “উহ্, রাখ তো! এই জন্যই তো পাড়ার বেশিরভাগ ছেলে তোর পেছন পেছন ঘুরত!”
আমি হেসে উঠে বললাম, “আহা, তোরা কেউ কারও চেয়ে কম ছিলি না! আর সেইসব সামাল দিতে হতো কাকে? আমাকেই তো!” ওরা দুজনে একযোগে আমার দিকে তাকাল। কাকলী চোখ নাচিয়ে বলল, “তা তো হবেই! তুই যা চঞ্চল ছিলি! তোর ওই মাতবরি আর স্মার্টনেস দেখেই তো সহজে যে কেউ তোর প্রেমে পড়ে যেত!”

“আর তুই ছিলি আমাদের ‘ইনোসেন্ট সুন্দরী’,” আমি রুমানার নরম গালটা টেনে দিয়ে বললাম, “খুব কম কথা বলতিস, কিন্তু মুখভর্তি একটা মিষ্টি হাসি থাকত সবসময়। এই দুই সুন্দরীকে আগলে নিয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতাম আমি, আর আমিই ছিলাম দলের স্বঘোষিত লিডার! বিকেলে কার বাড়ির ছাদে আড্ডা হবে, কে কখন বাড়ি থেকে বেরোবে— সব সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হতো!”

আমাদের কথার খৈ ফুটতে লাগল। মনে পড়ে গেল আমাদের কিশোরীসুলভ সেই অদ্ভুত সতর্কতার কথা। রাস্তায় কোনো ছেলে যদি আমাদের কারও পেছনে পেছনে একটু হেঁটে আসত, ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জরুরি বৈঠক। আমি গুরুগম্ভীর মুখে সিদ্ধান্ত দিতাম, “কাউকে কোনো পাত্তা দেওয়া যাবে না!” তখন মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝি আমার এই কাঁধেই ন্যস্ত!

কথা বলতে বলতে উঠে এলো আমাদের সেই প্রথম শাড়ি পরার স্মৃতি। শম্পার বাড়ির পিকনিকে কী উত্তেজনা ছিল সেদিন! কারও আঁচল বারবার খুলে যাচ্ছিল, কেউ শাড়ির কুচি সামলাতে না পেরে হোঁচট খাচ্ছিল, কেউ আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সিনেমার নায়িকা ভেবে লাজুক হাসছিল। আর সেদিন সেই কাঁচা হাতের খিচুড়ি আর ডিম রান্না করে আমরা যেন মনে মনে খুব বুঝে নিয়েছিলাম— একদিন আমরাই হব পৃথিবীর সেরা গৃহিণী!

কাকলী হাসতে হাসতে বলল, “আর স্কুলের ঘণ্টা বাজানোর কথা মনে আছে? টিফিনের বা ছুটির ঘণ্টা বাজানোর দায়িত্বটা যখন আমাদের ওপর পড়ত, আমরা এমন ভাব করতাম যেন পুরো স্কুল পরিচালনা কমিটির প্রধান আমরাই! কে কার আগে গিয়ে দড়িতে টান দেব, তা নিয়ে এক অলিখিত প্রতিযোগিতা চলত।”

“স্কুলের গেটটাও তো একটা আস্ত নাট্যমঞ্চ ছিল,” আমি চোখ টিপে ফিসফিস করে বললাম, “কোন মেয়ের জন্য কোন ছেলে গেটের উল্টো পাশে রোদে পুড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কে কার দিকে আড়চোখে তাকায়— সব গোয়েন্দা খবর এই আমার কাছে থাকত! মজার ব্যাপার হলো, তখন আমরা যারা প্রেম করত, তাদের খুব একটা ভালো চোখে দেখতাম না। মনে হতো তারা যেন কোনো ভয়ংকর ক্রাইম করে ফেলেছে! খুব ভাব নিয়ে বলতাম— ওদের সঙ্গে বেশি মিশিস না, ওরা প্রেম করে! যেন প্রেম একটা ছোঁয়াচে রোগ, কাছে গেলেই আমাদের ধরে ফেলবে!”


আজ এত বছর পর সেই কথাগুলো মনে করে আমরা হাসিতে ভেঙে পড়লাম। নাটকীয়তা তো এটাই— যাদের দেখে তখন আমরা ওভাবে নাক সিঁটকাতাম, তাদের অনেকেই কিন্তু আজ সেইসব প্রেমিক ছেলেদের সাথেই পরম সুখে ঘর-সংসার করছে! আর আমরা আজ নিজেদের সেই অবুঝ সরলতা দেখে হেসেই আকুল হচ্ছি।

বিকেলের সোনা রোদ ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসছিল। গোধূলির আলো জানান দিচ্ছিল, আমাদের এবার ফিরতে হবে— আবার যে যার চেনা সংসারে, চার দেয়ালের দায়িত্বে, একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবনে।

তবুও, বাড়ি ফেরার আগে একটা সত্য খুব স্পষ্ট হয়ে গেল। সময় মানুষের চেহারা বদলে দেয়, কণ্ঠস্বর বদলে দেয়, বদলে দেয় জীবনযাপন। কিন্তু কিছু সম্পর্ক আছে, যাদের শরীরে কখনো বয়স বাড়ে না। শৈশব-কৈশোরের বন্ধুত্ব ঠিক তেমনই। বছরের পর বছর দেখা না হলেও, মনের কোনো এক কোণে তারা ঠিক আগের মতোই সতেজ থাকে।
বিদায়ের আগে আমরা তিনজন পাশাপাশি একদম ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একটা সেলফি তুললাম। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে সেই চেনা গলি, সেই পুরোনো মোড়। ছবিতে ফ্রেমবন্দি হলো তিনজন মধ্যবয়সী নারী, কিন্তু সেই ছবির হাসিটা ছিল নিখাদ সেই তেরো বছরের কিশোরীদের।

বাড়ি ফিরে অন্ধকার ঘরে যখন ছবিটা দেখছিলাম, বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল। চোখের কোণের জলটা ছিল এক অদ্ভুত প্রাপ্তির। বুঝলাম, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো মানেই জীবন থেকে কিছু হারিয়ে যাওয়া নয়। সময় তো আসলে আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোকে মায়ার সুতোয় বেঁধে মনের অ্যালবামে জমিয়ে রাখে। আর এই যে আমাদের বন্ধুত্ব, যা সংসারের হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে ধুলো চাপা পড়ে থাকে। তারপর কোনো এক খামখেয়ালী অলস বিকেলে, চেনা কোনো গলির মোড়ে, এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের আলতো টোকা পেয়ে সে আবার জেগে ওঠে, সে আবার জানান দেয়— আমরা আজও সেই আগের মতই আছি কারণ ছেলেবেলার বন্ধুত্বের কোনো এক্সপায়ারি ডেট হয় না।

৩০ জুলাই, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

একাধারে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ, কিডজ লিডজ চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। কবি, ফিচার লেখক ও শিশুসাহিত্যিক। প্রকাশিত বই সাতটি; ৪টি শিশুতোষ ও ৩টি কাব্যগ্রন্থ।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।