পড়শী স্বাস্থ্য কথা যেদিন আপনার শরীর ধর্মঘটে গেল

যেদিন আপনার শরীর ধর্মঘটে গেল

Post Views: 8

সকালের আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকছিল, কিন্তু আপনি তখনও অর্ধেক ঘুম আর অর্ধেক জাগরণের মাঝখানে আটকে আছেন। অ্যালার্ম বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই, তবু শরীর উঠতে চাইছে না। আজকের ক্লান্তিটা শুধু “ঘুম কম হয়েছে” এমন নয়— এটা যেন বহুদিনের জমে থাকা নীরবতার ফল।

হঠাৎই মনে হলো, শরীরটা যদি সত্যিই কোনো সিস্টেম হতো, তাহলে সে আজ কী বলত?

আর ঠিক তখনই শুরু হলো অদ্ভুত এক “ভিতরের সভা”।

একটা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠ বলল—

“আপনি কি জানেন, দীর্ঘ সময় বসে থাকা শুধু পেশি দুর্বল করে না, এটি রক্তে ইনসুলিনের কার্যকারিতাও কমিয়ে দেয়? ফলে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ধীরে ধীরে তৈরি হয়।”

কণ্ঠটা হৃদয়ের।

“আমি শুধু স্পন্দন চালাই না, আমি প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার লিটার রক্ত শরীরে ঘোরাই। কিন্তু আপনি যখন চাপ, অনিয়ম আর ঘুমের ঘাটতি তৈরি করেন, তখন আমার কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়ে যায়।”

এরপর মস্তিষ্ক কথা বলল—

“আপনি যেটাকে ‘স্ট্রেস’ বলেন, আমি সেটাকে বায়োকেমিক্যাল লোড হিসেবে পাই। কর্টিসল হরমোন দীর্ঘদিন বেশি থাকলে স্মৃতিশক্তি কমে যায়, মনোযোগ ভেঙে যায়, এমনকি আবেগ নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়।”

আপনি একটু থমকে গেলেন। এতদিন স্ট্রেস মানে শুধু মানসিক চাপ মনে হতো, কিন্তু এর শরীরবৃত্তীয় প্রভাব এত গভীর?

চোখ এবার কথা বলল—

“আমাদের সমস্যা শুধু ক্লান্তি নয়। আপনি জানেন কি, টানা স্ক্রিন দেখলে চোখের টিয়ার ফিল্ম নষ্ট হয়ে যায়, যার কারণে ‘ড্রাই আই সিনড্রোম’ তৈরি হয়? এতে শুধু জ্বালা নয়, দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টিশক্তিও প্রভাবিত হয়।”

তারপর পাকস্থলী ধীরে বলল—

“অনিয়মিত খাবার শুধু হজমের সমস্যা নয়। এটা অন্ত্রের ‘মাইক্রোবায়োম’ বদলে দেয়। এই ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হলে শুধু গ্যাস বা অ্যাসিডিটি নয়, মুড সুইং আর উদ্বেগও বাড়তে পারে।”

আপনি অবাক হয়ে ভাবলেন— খাবার, মুড, মন— সবকিছু এত গভীরভাবে যুক্ত?

ফুসফুস এবার হালকা কাশির মতো শব্দ করে বলল—

“এক জায়গায় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে ফুসফুস পুরোপুরি প্রসারিত হতে পারে না। ফলে অক্সিজেন এক্সচেঞ্জ কমে যায়, এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেন কম পৌঁছালে অকারণ ক্লান্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়।”

সব অঙ্গ যেন একসঙ্গে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাল।

“আমরা অসুস্থ হতে চাই না। কিন্তু আপনি আমাদের প্রতিদিন ধীরে ধীরে সীমার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।”

একটা নীরবতা নেমে এলো।

তারপর হৃদয় শেষবার বলল—

“আমাদের দাবি জটিল নয়। আমরা শুধু চাই— নিয়মিত ঘুম, যাতে মস্তিষ্কের রিসেট চক্র সম্পূর্ণ হয়। প্রতিদিন কিছুটা হাঁটা, যাতে রক্তসঞ্চালন ও হরমোন ব্যালান্স ঠিক থাকে। আর স্ক্রিন থেকে বিরতি, যাতে চোখ ও মস্তিষ্ক দুটোই পুনরুদ্ধার করতে পারে।“

আপনি চুপ করে শুনছিলেন। হঠাৎ অ্যালার্ম আবার বেজে উঠল। আপনি চোখ খুললেন।

সব আগের মতোই— ঘর, বিছানা, ফোন, নোটিফিকেশন। কিন্তু এইবার পার্থক্য একটাই: আপনি জানেন, শরীর কখনও হঠাৎ ভেঙে পড়ে না— সে আগে ছোট ছোট জৈবিক সংকেত দিয়ে বারবার সতর্ক করে যায়, যেগুলো আমরা ব্যস্ততার কারণে শুনতে শিখি না।

আপনি ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। জানালাটা খুললেন।

ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে এল, আর সেই প্রথম শ্বাসটা ছিল আগের দিনের সব তাড়াহুড়ো থেকে একটু আলাদা—কারণ এবার আপনি বুঝতে পারছিলেন, নিজের শরীরকে ঠিক রাখা কোনো বিলাসিতা নয়, এটা বেঁচে থাকার মৌলিক বিজ্ঞান।

৩ জুলাই, ২০২৬


আইডাহো, যুক্তরাষ্ট্র

মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে অধ্যয়নরত। সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাচ, বিতর্কের পাশাপাশি লেখালেখির চর্চাও ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠায় বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলায় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।