জিও-পলিটিক্সের উন্মাদনা আর আমাদের অর্থনীতির বারোটা!

সাকিব সারোয়ার আহমেদ | ২৪ মার্চ, ২০২৬
April 16, 2026

গত মাসখানেক ধরে বাংলাদেশের প্রধান সংবাদ মাধ্যম ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ছে আনন্দের বন্যা। আমেরিকা আর ইসরাইল মিলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইরানে যে হামলা (Epic Fury) চালালো, তাতেই নাকি সব শেষ! অনেকে তো স্ট্যাটাস দিচ্ছে, ইরান শেষ, ২ সেকেন্ডে সব খতম!

আসলে, কথা ঠিক। আমেরিকা চাইলেই আধুনিক অস্ত্র দিয়ে ইরানের অনেক কিছুই গুড়িয়ে দিতে পারে। প্রথম দিনেই মিসাইল মেরে ইরানের টপ লিডার আলী খামেনিকে মেরেও ফেলেছে। ট্রাম্প ভেবেছিল, মাথা কেটে দিলেই বডি সারেন্ডার করবে, যেভাবে মাদুরোকে ধরে ভেনিজুয়েলাকে শায়েস্তা করা গিয়েছিল। কিন্তু ইরান আর ভেনিজুয়েলা এক না। ইরান বসে নাই। তারাও গত কয়েকদিনে ইসরাইলের তেল আবিব আর গালফে থাকা আমেরিকার বেসগুলোতে (যেমন কাতারের আল উদেইদ) সমানে মিসাইল মারছে। ইতিমধ্যেই দুই পক্ষের হাজার দুয়েক মানুষ মারা গেছে। ক্ষয়ক্ষতি দুই পক্ষেরই ভয়াবহ, ইরানের অবকাঠামো, আর আমেরিকার আর্থিক।

কিন্তু এই যে আপনারা যারা “আমেরিকা জিতে যাচ্ছে” বা “ইসরাইল শেষ” বলে লাফালাফি করছেন, তারা কি জানেন বাংলাদেশের ওপর এই যুদ্ধের আসল ইমপ্যাক্ট কী? আমাদের আসল বিপদ কোথায়? মিডল ইস্টে! সেখানে আমাদের ৪৫-৫০ লাখের মতো রেমিট্যান্স যোদ্ধা আছে। সৌদি, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন-এই দেশগুলোর ওপর দিয়েই তো মিসাইল উড়াউড়ি করছে। ইতিমধ্যেই কয়েক জায়গায় হামলায় আমাদের বেশ কয়েকজন প্রবাসী মারাও গেছেন। আকাশসীমা বন্ধ, ফ্লাইট ক্যানসেল। সেখানকার কনস্ট্রাকশন কাজ, ব্যবসা সব স্থবির হয়ে যাচ্ছে।

এই মানুষগুলোর যদি চাকরি চলে যায়, আর তারা বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসে, তাহলে কি হবে ভেবে দেখেছেন? দুবাই বা রিয়াদে রোদে পুড়ে তারা যে টাকাটা পাঠায়, সেটা দিয়েই তো আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে। রিজার্ভ বাড়ে। এখন এই লাখ লাখ মানুষ যদি দেশে ফিরে আসে, আমাদের পুরো সিস্টেম কলাপ্স করবে। আমাদের নিজেদের তো এই লাখ লাখ মানুষকে চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নাই। অর্থনীতির একেবারে ১২টা বেজে যাবে। অথচ এদের নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নাই!

আর এই যে আপনারা লাফাচ্ছেন, খেয়াল করছেন আমাদের গার্মেন্টসের কী অবস্থা? আমাদের অর্থনীতির আরেকটা বড় খুঁটি তো এই আরএমজি (RMG) সেক্টর। টক শোতে তো বড় বড় কথা যারা বলে, তারা কেউ কি বলছে যে লোহিত সাগরে (Red Sea) জাহাজ চলাচলের কী হাল? যুদ্ধ তো আর শুধু আকাশে হচ্ছে না, সাগরেও তো আগুন লাগছে। ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় কন্টেইনার জাহাজ এখন আর ওই শর্টকাট রুটে যেতে পারতেছে না। পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) দিয়ে জাহাজ ঘোরানো লাগছে!

এতে কি হচ্ছে? মাল পৌঁছাতে ১৫-২০ দিন সময় বেশি লাগছে। আর সময় বেশি লাগা মানে কি? শিপিং খরচ বেশি, ইন্স্যুরেন্সের খরচ তিন-চারগুণ বেশি! বায়াররা কি এই বাড়তি টাকা দেবে? কক্ষনো না। তারা পুরা চাপ দিচ্ছে আমাদের দেশের ফ্যাক্টরিগুলোর ওপর। এমনিতেই ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে আমাদের দেশের গার্মেন্টস মালিকদের জান বের হয়ে যায়। এখন শিপিং কস্ট বেড়ে যাওয়ায় বায়াররা অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে। যাদের মাল পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, তাদের বাধ্য হয়ে বিমানে (এয়ার ফ্রেইট) মাল পাঠাতে হচ্ছে। এয়ারে মাল পাঠানো মানে লাভের তো গুড়ে বালি, উল্টো পকেট থেকে জরিমানা দেওয়া!

ফাস্ট ফ্যাশনের যুগে বায়াররা তো আর বসে থাকবে না। তারা এখন অর্ডার শিফট করে তুরস্ক বা মেক্সিকোর মতো কাছাকাছি দেশগুলোতে দিয়ে দিচ্ছে (Near Shoring)। মাঝখান থেকে কি হবে? আমাদের দেশের ছোট আর মাঝারি ফ্যাক্টরিগুলো এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে টুপটাপ বন্ধ হয়ে যাবে। লাখ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক, ওই যে মানুষগুলো সকাল বেলা টিফিন ক্যারিয়ার হাতে লাইন ধরে কাজে যায়, তারা রাতারাতি রাস্তায় বসবে। আপনারা যারা সোশাল মিডিয়া বা টকশোতে ‘আমেরিকা শেষ’ বা ‘ইসরাইল ধ্বংস’ বলে চিল্লাচ্ছেন, এই দিয়ে কি ওই লাখ লাখ শ্রমিকের পেট ভরবে?

ওদিকে আরেক বিপদ শুরু হয়ে গেছে দেশের ভেতরে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের জাহাজ বের হতে পারছে না। আর বিশ্ববাজার থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যারেল তেল নাই হয়ে গেলে কি হবে? সাপ্লাই কম, ডিমান্ড বেশি। তেলের দাম আগুন। আর আমাদের দেশের সিন্ডিকেট তো এইসব সুযোগেরই অপেক্ষায় থাকে! আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আগেই, আমাদের পাম্পের মালিকেরা আর ডিলারেরা আর্টিফিশিয়াল ক্রাইসিস বানানো শুরু করে দিয়েছে। ডিপো থেকে পাম্পে তেল আসছে না। মজুত করে রাখছে, যাতে পরে বেশি দামে বেচতে পারে। আর এর ফলটা কে ভোগ করছে? আপনারা যারা বাংলাদেশে বাইক আর গাড়ি চালান, তারাই।
বিপিসি (BPC) রেশনিং করে দিয়েছে—বাইকে ২ লিটার আর গাড়িতে ১০ লিটারের বেশি তেল দিচ্ছে না। পাম্পের সামনে দড়ি টাঙানো, লেখা “তেল নাই”। সারাদিন অফিস করে এসে, বা পাঠাও চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে, মানুষ রাতের পর রাত ৫-৬ কিলোমিটার লম্বা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকছে পেট্রোল আর অকেটনের জন্য। মশার কামড় খাচ্ছে, আর সিরিয়াল দিয়ে তেল নিচ্ছে। ঢাকা থেকে রাজবাড়ি-সবখানে একই ছবি!
পৃথিবীটা খুব অদ্ভুত জায়গা! আমেরিকা-ইসরাইল আর ইরান যুদ্ধ করছে, আর আমাদের দেশের আমজনতা ৫ কিলোমিটার লাইনে দাঁড়িয়ে ২ লিটার তেলের জন্য হাহাকার করছে! কোথায় জিও-পলিটিক্স, আর কোথায় এসে তার ধাক্কা লাগছে!

সব কথা ঘুরে ফিরে সেই এক জায়গায় এসেই থামে। এই যুদ্ধ যদি ঝটিকা কোনো রেজাল্ট না আনে, আর বছরের পর বছর চলতে থাকে, তাহলে গ্লোবাল ইকোনমির সাথে সাথে আমাদেরও দফারফা হয়ে যাবে।
যুদ্ধে কেউ জেতে না। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ফায়দা করছে কেবল চীন আর রাশিয়া। চীন চুপচাপ বসে থেকে নিজেদের অর্থনীতি স্ট্রং করছে, রাশিয়া নিজের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করছে, আর এদিকে আমেরিকা আবারো মধ্যপ্রাচ্যের কাদায় আটকা পড়ছে।

কিন্তু আমাদের তো হারানোর অনেক কিছু আছে। তাই দিনশেষে একটাই চাওয়া, এই যুদ্ধটা যেন ডি-এসক্যালেট করে। পাগলামি যেন বন্ধ হয়। তা না হলে, এই যে তেলের সিরিয়াল, প্রবাসীদের দেশে ফেরা আর গার্মেন্টস বন্ধ হওয়া-এটা তো কেবল ট্রেইলার। প্যান্ডোরার বাক্স একবার পুরোপুরি খুলে গেলে, বিশ্বজুড়ে যে সাপ্লাই চেইন ক্রাইসিস শুরু হবে, তাতে আমাদের জন্য যা অপেক্ষা করছে, তা হচ্ছে-দুর্ভিক্ষ!


সাকিব সারোয়ার আহমেদ | ঢাকা, বাংলাদেশ

স্থপতি ও উন্নয়ন কর্মী। ভাল লাগে ছবি তুলতে, গেমিং করতে আর আড্ডা দিতে ।

Previous Story

ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা-র সাথে আলাপচারিতা

Next Story

যে গান রাস্তায় নেমে এলো : বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের বিবর্তন