যে গান রাস্তায় নেমে এলো : বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের বিবর্তন

মুন ইরা মীম | মার্চ ২৩, ২০২৬
April 16, 2026

কালো লম্বা এলোমেলো চুলের অদ্ভুত একটা ছেলে রাস্তায় হাঁটা শুরু করলো, যার হাতে বুঝি অ্যাকুয়েস্টিক আর পকেটে হারমোনিকা আছে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে জন্ম নেয়া রক ব্যান্ড “অর্থহীন” এ গল্পই সুরে সুরে ছড়িয়ে দিয়েছিলো। গল্পটা সাধারণ ছিলো বলেই সম্ভবত ২০০০ সালের সেই সুর ২০২৬ সালে এসেও তাই একই আবহ তৈরি করে। আজও একুশ পেরোনো কোনো অচেনা অদ্ভুত ছেলে শীষ বাজিয়ে শুনিয়ে যায়-

আমাদের এই বাংলাদেশে ছিল তার বাড়ি
কাউকে কিছু না বলে অভিমানে দূর দেশে দিল পারি
পকেটের টাকা শেষ, খাওয়া হয়নি কিছু
খিদে কেন ছুটছে শুধু তার পিছু পিছু?
অদ্ভুত ছেলেটি শুরু করল গাওয়া
হাতে তার অ্যাকুয়েস্টিক, পকেটে হারমোনিকা…

একটা শহরের শব্দ কখনও কখনও তার ইতিহাসের থেকেও বেশি সত্য বলে। বাংলা ব্যান্ড সংগীত সেই শব্দ—যেখানে বিদ্রোহ আছে, প্রেম আছে, আবার এক ধরনের নিঃশব্দ হারিয়ে যাওয়াও আছে। বাংলাদেশে ব্যান্ড সঙ্গীতের হাত ধরে আশির দশকে যে ধারার সঙ্গীতের আগমন হয়েছিলো তার তৎকালীন গ্রহণযোগ্যতা তো পরের হিসেব বরং একটা বিশাল অংশের প্রতিক্রিয়াই ছিলো- “এখানে হচ্ছে টা কী” ধরনের কিছুই! কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক এখন রক, হেভি মেটাল, ফিউশন, ইন্ডি, অ্যাকুস্টিক, ডিজিটাল-হোম-স্টুডিও, পোস্ট-রক—সব মিলিয়ে এক বিশাল ধারাবাহিক বিবর্তন। এখনো শতভাগ স্বীকৃতি দিয়ে আমাদের বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতকে সংস্কৃতির একটি অংশ মানতে কিছু জনতা নারাজ থাকলেও ২০২৬ সালে এসে এর ভিন্ন রকম পরিবর্তন চোখে পড়েছে। কিন্তু পেছনে তাকালে দেখা যায় একটা দীর্ঘসময় বাংলাদেশে ব্যান্ড মিউজিক অত্যন্ত অবহেলিত ছিলো। শিল্পের এই ঘরানার বিস্তৃতভাবে গ্রহণযোগ্যতা এসেছে অনেক পরে।

একসময় ব্যান্ড সঙ্গীত বলতেই যে প্রথম দৃশ্য লোকের চোখে ভাসতো তা হলো কিছু তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর, আনাচে কানাচে গিটার হাতে কন্ঠ ছাড়ছে জোরে। তখনকার মিডিয়া বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনেক সময় ব্যান্ড গানকে অনভ্যস্ত শৈলী হিসেবে দেখত। কিন্তু তরুণরা নিজেদের স্বাধীন প্রকাশ ও পরিচয়ের মাধ্যম মনে করত এই সঙ্গীত মাধ্যমকে। তাই সে সময় শহরের রাস্তায়, যেখানে গিটার আর ড্রামের আওয়াজ মানুষের ভেতরে কৌতুহল তৈরি করতো সেখান থেকেই জন্ম নিলো বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীত। তবে “অপসংস্কৃতি” বলে ব্যান্ড সঙ্গীতকে বিদ্রুপ করার চল ছিলো কারণ এটি প্রচলিত সাংস্কৃতিক ধারার বাইরে ছিল, কিন্তু সেই ‘অপসংস্কৃতি’ই পরে বাংলাদেশের আধুনিক সঙ্গীত সংস্কৃতির ভিত্তি হয়ে ওঠে।

খুব দূরে না গিয়ে যদি জুলাইয়ের গনভ্যুত্থাণের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে কালজয়ী ব্যান্ড মাইলসের গান পলাশীর প্রান্তরকে নতুন ভাবে জেগে উঠতে দেখেছিলো এ প্রজন্মের কিছু তরুণেরা, যারা ইংরেজি গান ছাড়া বাংলাতে কোনো আকর্ষণই খুঁজে পায় না। “মাইলস” যখন ২০২৪ এর জুলাইতে গানে গানে প্রাসঙ্গিক হয়ে সেসব সদ্য তরুণদের নতুন আবিষ্কার হিসেবে পরিচিতি পেলো, তখনই তারা জানলো অতীত ইতিহাস। পলাশীর প্রান্তরে বাংলা তার অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিলো, আরেক সংকট জুলাই গনভ্যুত্থাণের মতো পরিস্থিতিতেও তৈরি হয়েছিলো। তাই তো ইংরেজি মাধ্যমে পড়া কিশোরী কোনো এক মেয়ে তার জুলাই শহীদ বন্ধুকে স্মরণ করে গাইলো-
“কতটা তুমি হারালে বন্ধু কেঁদেছে অন্তর
জানো না তুমি হারাবার ব্যাথা
জানে পলাশীর প্রান্তর!
হারিয়ে গেছে সেখানে মায়ের সোনার নোলকখানি
গোলাভরা খেতের ফসল সাজানো ফুলদানি
হারিয়ে গেছে খুদিরামের স্বপ্ন ভরা চোখ
তিতুমীরের সফেদ পাগড়ী জ্যোতির্ময় আলোক এই হারানোর বেদনা তুমি রেখো অন্তরে দেখবে তোমার দুঃখ লুকাবে পলাশীর প্রান্তরে…”

ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের আরেক ব্যান্ড শূন্যের তৈরি গানে উদ্বুদ্ধ হয়ে মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমেছিলো শত শত আবালবৃদ্ধবনিতা। তারা “শূন্য” ব্যান্ডের সুর হৃদয়ে ধারণ করেই চিৎকার করে জয় ছিনিয়ে আনতে নেমে বলেছিলো-

আমার বিচার তুমি করো, তোমার বিচার করবে কে?
কবে তোমার দখল থেকে মুক্তি আমায় দেবে?
শোনো মহাজন, আমি নয় তো এক জন
শোনো মহাজন, আমরা অনেক জন…

অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই রাস্তায় এভাবেই নেমে এসেছে ব্যান্ড সঙ্গীত।

শহুরে ধাঁচের গান হিসেবে চিহ্নিত করা এই ব্যান্ড সঙ্গীত ঘরানা যে কবে মফস্বলের পাড়া-মহল্লায় প্রেমিক প্রেমিকাদের কষ্ট লুকাবার মাধ্যমে হয়ে গেলো তার প্রেক্ষাপট বড্ড পরিচিত। যেমন “আর্ক” ব্যান্ডের গান ক্যাসেটের দোকানে বাজতে শুরু করলে রাস্তা পেরোবার সময় প্রেমিক কিংবা প্রেমিকাকে সারাজীবনের মতো হারিয়ে ফেলবার বেদনা গান হয়ে উঠে আসতো এভাবেই-

সানাইয়ের সুর নিয়ে যাবে দূর
একটু একটু করে তোমায়
আজকে রাতে তুমি অন্যের হবে
ভাবতেই জলে চোখ ভিজে যায়,
এতো কষ্ট কেন ভালোবাসায়…!

শহুরে রক, আবেগপূর্ণ লিরিক এবং মেলোডিক গিটার রিফ এগুলো মিলিয়ে ব্যান্ড “এলআরবি” গান নয়, সময়ের অনুভূতি হয়ে উঠেছিলো বলেই গ্রামগঞ্জের বেকার প্রেমিকের হৃদয়ও সাড়া দিয়ে জানাতো-

সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে
সেই আমি কেন তোমাকে দুঃখ দিলেম
কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি
কীভাবে এত বদলে গেছি এই আমি,
ও বুকেরই সব কষ্ট দু’হাতে সরিয়ে
চলো বদলে যাই
তুমি কেন বোঝো না
তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়…

বর্তমানে আরেক পরিচিত দৃশ্য হলো, সদ্য কলেজ পেরোনো তরুণ বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে ফোনে তাকিয়ে মুচকি হেসে তার আধনষ্ট হেডফোনে শুনছে এ যুগের নতুন ব্যান্ডগুলোর গান। প্রথম প্রেমে পড়ার সেই অনুভূতিতে অনায়াসেই স্থান নিয়ে নেয় লেভেল ফাইভের গান “তুমি”, যুবকের চোখের হাসি আর ঠোঁট নাড়ানো বলে দেয়-

আলো জ্বলে আলো জ্বলে
আমার মনে আমার মনে
তোমার ছবি চোখের সামনে এসে ভাসে…

নির্দ্বিধায় বলাই যায় সেই সজীব হৃদয় ধারণ করছে নগরবাউলের গাওয়া সেই অনবদ্য লিরিক-

আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব
তুমি আমার…

গ্রন্থাগার থেকে কবিতার বই হাতে বের হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীটির মিষ্টি হাসি মনে করিয়ে দেয় “সোলস্” ব্যান্ড সেই কবেই তো বলেছিলো-

আমিতো সেই কবিতা পড়েছি
মনে মনে সুর দিয়েছি
কেউ জানে নি…
মন শুধু মন ছুঁয়েছে!

তুমুল প্রেমে থাকা বেকার প্রেমিক যুবক বুঝি মৌসুমী নামের প্রেমিকাকে আজও “ফিডব্যাক” ব্যান্ডের গান শোনাতে ভোলে না-

মৌসুমী কারে ভালোবাস তুমি
মৌসুমী বলো কারে খোঁজো তুমি
মৌসুমী আছি একা এই আমি
ভুলে অভিমান হও সঙ্গীনি।

প্রেমের রাস্তায় ব্যান্ড সঙ্গীতের চলার শুরু থেকেই কতশত গল্প যে এভাবে তৈরি হয়ে স্মৃতি বুনে দিয়ে যায় শ্রোতার জীবনে তার উদাহরণের অন্ত নেই।

৪০ বছর ব্যান্ড পূর্তিতে আমেরিকায় মিউজিক ট্যুর করতে এসে ১২ তম শেষ শো-তে ২০২৪ সালে হেভি মেটাল ব্যান্ড “ওয়ারফেজ” বলেছিলো তাদের যাত্রার গল্প। এ বছর বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড হিসেবে একুশে পদক পেয়েছে “ওয়ারফেজ”। যদিওবা খুব দেরীই হয়ে গেলো এ প্রাপ্তির কিন্তু ১৯৮৪ সালে জন্ম নেয়া এই ব্যান্ড তাদের বলিষ্ঠ শব্দচয়নের লিরিকের মাধ্যমে শ্রোতাদের হৃদয়ে যে জায়গা জুড়ে আছে, তার কৃতজ্ঞতায় এ রাষ্ট্রের জন্যেই যেনো তাদেরকে এ স্বীকৃতি দেয়ার ভীষণই প্রয়োজন ছিলো। আগামীতে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতকে মূল্যায়ন করার এমন প্রারম্ভিকা নিঃসন্দেহে ব্যান্ড মিউজিশিয়ানদেরকে আশাবাদী করেছে।

অতীতে এফএম রেডিও এর কল্যাণে ব্যান্ড সঙ্গীত অনেকটা পৌঁছে গিয়েছিলো প্রান্তিক সীমানাতেও। সেই সুযোগকে লুফে নিয়ে আগ্রহী হয়ে জন্ম নিয়েছিলো হারিয়ে যাওয়া কত কত ব্যান্ড। আর বর্তমানে সবচেয়ে চমৎকারভাবে ব্যান্ড সঙ্গীতের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে বাংলা সিনেমাগুলোতে। ইদানীং ব্যান্ড সঙ্গীত ব্যবহার করে ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র যেনো দর্শকদের বাড়তি আগ্রহের কারণ। চিরকুট,মেঘদল,অর্থহীন, লেভেল ফাইভ, আর্টসেল, ওয়ারফেজ, এলআরবি, মাইলস সহ আরো কিছু ব্যান্ডের গান সরাসরি সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড, গান হিসেবে বা থিম্যাটিক সাউন্ডট্র্যাক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এত দুর্দান্তভাবে ব্যান্ড সঙ্গীতকে উপস্থাপন করার এই চর্চা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। তাই ভবিষ্যতে ক্রিপটিক ফেইট, পাওয়ারসার্জ, ভাইকিংস, ব্ল্যাক, নেমসিস, দলছুট, আর্বোভাইরাস, বে অব ব্যাঙ্গল, কার্নিভাল, শিরোনামহীন, ইনডালো, অউনড, উইনিংস, ব্লু জিনস, প্রমিথিউস, মেট্রোলাইফ ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যান্ডের গানকে অন্য আঙ্গিকে ছড়িয়ে দেবার প্রতি আশাবাদী হওয়াই যায়।

বাংলা ব্যান্ড সংগীতের বিষয়বস্তুতে উঠে এসেছে সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রতিবাদী ভাব। ধীরে ধীরে এটি শহুরে জীবন, প্রেম ও পপ-কালচারের অংশ হয়ে উঠেছে। ব্যান্ড কনসার্ট এখন সহজ বিনোদনের অংশ। আজ ব্যান্ড গান সামাজিক আন্দোলন, সিনেমা, লাইভ কনসার্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত হয়, আর এটি শুধু শোনার জন্য নয়—অনুভব করার, সংহতি গড়ার এবং যুবসমাজের আবেগ প্রকাশের মাধ্যম। আশির দশকে শুরু হওয়া ব্যান্ড সঙ্গীতের এ যাত্রায় রাস্তা হারিয়েছে অনেক ব্যান্ড। রাষ্ট্রীয়ভাবে শিল্পীদের মর্যাদা দেবার কাতারে বাংলা ব্যান্ডকে জায়গা পেতে দেখে মনে পড়ে যায় দুর্দান্ত পুরোনো কিছু ব্যান্ডকে যারা হয়তোবা অনেকদূর যেতে পারতো। অতীত হয়ে মিলিয়ে গেলেও রেষ রেখে যাওয়া সেসব ব্যান্ডের মতো আগামীতে কোনো ব্যান্ড নিঃস্ব হয়ে না যাক। দেশের মানুষের কাছে আরো বড় আকারে এ ধারার গ্রহণযোগ্যতা বাড়া উচিৎ। দেশীয় বাদ্যযন্ত্র বাইরেও ভীনদেশী যন্ত্রের ব্যবহারে বাংলা ভাষায় যে সুরের জন্ম হচ্ছে তা রাস্তায় তৈরি হয়ে রাস্তায়ই নেমে আসুক কারণে অকারণে। বাংলা সঙ্গীতের বিবর্তনের এ যাত্রায় “শিরোনামহীন” ব্যান্ডের সুরেই বলতে হয়-

রোদ্দুর, একসাথে হেঁটে হেঁটে যেতে চাই বহুদূর!
বুকের ভেতর ডানা ঝাপটায় পাখি, বেপরোয়া ভাংচুর
তুমি চেয়ে আছো তাই আমি পথে হেঁটে যাই
হেঁটে হেঁটে বহুদূর, বহুদূর যেতে চাই…”
বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীত শীঘ্রই দেশের আঙিনা পেরিয়ে ছুটে চলুক, বহুদূর ছুটে চলুক
!


মুন ইরা মীম | আইডাহো, ইউএসএ

মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে অধ্যয়নরত। সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাচ, বিতর্কের পাশাপাশি লেখালেখির চর্চাও ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠায় বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলায় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।

Previous Story

জিও-পলিটিক্সের উন্মাদনা আর আমাদের অর্থনীতির বারোটা!

Next Story

দি ইলাভেন্থ আওয়ার