ইন্টারভিউয়ার: বুশরা আহমেদ/ পড়শী
অতিথি: ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা
গবেষণা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় অসম্পূর্ণ — একজন রসায়নবিদ-প্রশাসকের গল্প
আজকের পর্বে আমরা কথা বলব একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং প্রশাসকের সঙ্গে— ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন, University Grants Commission-এর সাবেক সদস্য এবং বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একজন মানুষ।
তার জীবনের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা নিয়ে ভাবনা এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য তার বার্তা— এসব নিয়েই আজকের এই আলাপ।
ব্যক্তিগত যাত্রা
পড়শী: ড. মোল্লা, আপনাকে অনুষ্ঠানে স্বাগতম। প্রথমেই জানতে চাই—রসায়ন নিয়ে আপনার যাত্রা শুরু কীভাবে?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: আমার বাবা-মা চেয়েছিলেন আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হই। কিন্তু ১৯৬৫ সালে Dhaka College-এ এইচএসসি প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার আগে আমার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। প্রকৌশল শিক্ষার খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, তাই আমার মায়ের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব ছিল না।
সেই কারণে রসায়নের জগতে আমার প্রবেশ অনেকটাই আকস্মিকভাবে হয়। কিন্তু আমি কখনও নিরাশ হইনি। কারণ আমি এমন কিছু নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের সংস্পর্শে এসেছিলাম, যারা আমাকে এই পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
পড়শী: বিদেশে পিএইচডি ও গবেষণার অভিজ্ঞতা আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে কী পরিবর্তন এনেছিল?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: তৎকালীন East Pakistan-এ গবেষণার অবকাঠামো খুবই সীমিত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণার জন্য তেমন সুযোগ-সুবিধা ছিল না।
আমার উপলব্ধি ছিল— গবেষণা ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে না। শিক্ষা ও গবেষণা— এই দুইটি সমান্তরালে চলতে হয়।
নেতৃত্ব ও শিক্ষা প্রশাসন
পড়শী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার কী ছিল?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: ডিন হিসেবে আমার প্রধান দায়িত্ব ছিল একাডেমিক প্রশাসনের তত্ত্বাবধান করা এবং বিভিন্ন বিভাগকে শিক্ষা ও গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জনে উৎসাহিত করা।
এর পাশাপাশি আমি নতুন কিছু উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। তার মধ্যে অন্যতম ছিল Mobile Science Museum প্রকল্প।
পড়শী: আপনি নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কোন গুণকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন— কঠোরতা, নাকি সহানুভূতি?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং নীতির ক্ষেত্রে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই একজন প্রকৃত নেতার সবচেয়ে বড় গুণ।
Mobile Science Museum উদ্যোগ
পড়শী: আপনার “Mobile Science Museum” উদ্যোগটি খুবই ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। এ সম্পর্কে একটু বলবেন?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: ২০১৩ সালে “Mobile Science Museum” নামে একটি কর্মসূচি চালু করা হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদ এবং Hanyang University (South Korea)-এর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়। এটি ছিল একটি ভ্রাম্যমাণ বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি, যার মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ প্রদান করা হতো। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি সুবিধা ছিল না, সেখানে বিজ্ঞান শিক্ষা পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য।
আমরা ঢাকা শহরের প্রায় ৩০টি স্কুল ও কলেজে এই মোবাইল বিজ্ঞান ইউনিট নিয়ে গিয়েছিলাম। এটি একটি অত্যন্ত সফল উদ্যোগ ছিল।
পড়শী: পরে যখন এই প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়, তখন আপনার অনুভূতি কী ছিল?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: আমি খুবই দুঃখিত ও হতাশ হয়েছিলাম। কারণ তরুণদের মধ্যে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য এটি একটি অসাধারণ উদ্যোগ ছিল। কিন্তু পরবর্তী প্রশাসন এটি চালিয়ে যায়নি এবং শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।
শিক্ষা নীতি ও সংস্কার
পড়শী: IQAC- Institutional Quality Assurance Cell প্রতিষ্ঠার পেছনে আপনার মূল ভাবনা কী ছিল?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: বাংলাদেশে আগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান নিয়মিতভাবে মূল্যায়নের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।
HEQEP- Higher Education Quality Enhancement Project প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে IQAC প্রতিষ্ঠা করা হয়, যাতে শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায়।
পড়শী: UGC-তে কাজ করার সময় উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে আপনার প্রধান উপলব্ধি কী ছিল?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: বাংলাদেশকে শিক্ষা ও গবেষণার মানে বিশ্বমানের সঙ্গে সমতা অর্জন করতে এখনও অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে।
বিশেষ করে গবেষণা সংস্কৃতি, অবকাঠামো এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রে উন্নতি জরুরি।
পড়শী: যদি রাষ্ট্র আপনাকে তিনটি পরিবর্তন করার সুযোগ দেয়, আপনি কী পরিবর্তন করতে চাইবেন?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা:
১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব স্তরে রাজনীতি বন্ধ করা।
২. শিক্ষা খাতে বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা।
৩. শিক্ষাব্যবস্থার সব স্তরে মাতৃভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা।
আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো—আমরা মাতৃভাষাকে উচ্চশিক্ষায় প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।
তরুণ প্রজন্মের জন্য বার্তা
পড়শী: তরুণ গবেষকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: তোমরা এখন একটি বৈশ্বিক ও ডিজিটাল পৃথিবীতে বাস করছ। মনোযোগী হও, নিষ্ঠাবান হও এবং অঙ্গীকারবদ্ধ হও। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একজন ভালো মানুষ হও। সফলতা তখন নিজে থেকেই আসবে।
পড়শী: আপনার মতে একজন “ভালো মানুষ” বলতে কী বোঝায়?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: বিশ্বাসযোগ্যতা, ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং নাগরিক সচেতনতা—এই মূল্যবোধগুলো যার মধ্যে থাকে, সেই প্রকৃত ভালো মানুষ। এই সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে সততা।
জীবনদর্শন
পড়শী: জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ কী— জ্ঞান, বিবেক, না সততা?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিবেক। কারণ বিবেকের মধ্যেই জ্ঞান ও সততার সঠিক ব্যবহার নিহিত থাকে।
পড়শী: শেষ প্রশ্ন— আপনার জীবনকে যদি এক বাক্যে সংক্ষেপ করতে হয়?
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা: আমি একটি গ্রামীণ পটভূমি থেকে এসেছি। জীবনে অনেক কিছু করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু কোনো আফসোস নেই। যা পেয়েছি তাতেই আমি সন্তুষ্ট। আমি সুখী।
পড়শী: ড. মোল্লা, আপনার সময় এবং মূল্যবান চিন্তাভাবনা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
আজকের আলোচনায় আমরা দেখলাম— একজন মানুষের জীবন কীভাবে শিক্ষা, গবেষণা এবং মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে। ধন্যবাদ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য। আবার দেখা হবে আগামী পর্বে।

ডঃ মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লা
ঢাকা, বাংলাদেশ
বুশরা আহমেদ
শার্লোট, নর্থ ক্যারোলিনা, যুক্তরাষ্ট্র
Appendix:
ড. মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মোল্লাহ ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Institutional Quality Assurance Cell (IQAC)–এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকছিলেন। তিনি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)–এর সদস্য হিসেবে ২০১৫–২০১৯ মেয়াদে কাজ করেন এবং স্বল্প সময়ের জন্য UGC–এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
তিনি DUET, KUET এবং শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় (নেত্রকোনা)সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে রসায়নে BSc (Hons.) এবং ১৯৭০ সালে MSc (Physical–Inorganic Chemistry) সম্পন্ন করেন। ১৯৭৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে PhD অর্জন করেন। পরে কানাডায় NSERC (Natural Sciences and Engineering Research Council of Canada) Postdoctoral Fellow (১৯৭৯–১৯৮১) এবং যুক্তরাষ্ট্রের Lamar University-তে Gill Chair Fellow (১৯৯৩–১৯৯৫) হিসেবে কাজ করেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল অব সায়েন্সেসসহ বাংলাদেশে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জার্নালের সম্পাদক/সম্পাদকীয় বোর্ড সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর প্রকাশনা-অভিজ্ঞতায় রয়েছে ১৩৫+ গবেষণা প্রবন্ধ, ১০টি বইয়ের অধ্যায়, এবং ৩টি সিম্পোজিয়াম প্রোসিডিংস। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে Agami Education Foundation-এর প্রতিষ্ঠাতা অর্থ পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
পড়শী-র পক্ষ থেকে: বুশরা আহমেদ
বুশরা আহমেদ একজন আন্তর্জাতিক কর্পোরেট নেতা, যার নেতৃত্ব, কৌশল ও পরামর্শদানে ২৩ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি Harvard Business School-এ শিক্ষা লাভ করেছেন এবং বর্তমানে Bank of America-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি UNC Charlotte-এর School of Data Science-এ শিক্ষকতা করেন এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার সহায়তার জন্য ACPP™ প্রোগ্রাম পরিচালনা করেন। নেতৃত্ব ও কমিউনিটি উন্নয়নে অবদানের জন্য তিনি জাতিসংঘের একটি সম্মানজনক পুরস্কার পেয়েছেন।
