বিশ্বকাপ ফুটবল বা সকার শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ১২ই জুন থেকে, একেবারেই সন্নিকটে। ক্রীড়া জগৎ বা স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড এর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফুটবল। বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি আনন্দের উৎসব, স্মৃতির দরজা, বন্ধুত্বের ভাষা এবং হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকা এক চিরসবুজ আবেগ। বলতে দ্বিধা নেই বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতাই নয়; এটি পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের আবেগ, আনন্দ ও মিলনের এক মহোৎসব। যে দেশগুলো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না, সেই দেশগুলোর মানুষও সমান উৎসাহে বিশ্বকাপ উপভোগ করে। কারণ ফুটবলের সৌন্দর্য কোনো সীমানায় আটকে থাকে না, যে দেশেই অনুষ্ঠিত হোক না কেন আনন্দের ঢেউ খেলে যায় বিশ্বব্যাপী। একটি বল, সবুজ মাঠ, খেলোয়াড়দের ছুটে চলা, গোলের উত্তেজনা— সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ যেন পুরো পৃথিবীকে এক আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবার আগে কোয়ালিফাইং ম্যাচগুলো চলাকালীন সময়েও ক্রীড়ামোদীরা খেলাগুলো উপভোগ করেন সমান তালে। যার যার দেশের প্রতি সবারই আনুগত্য এবং ভালোবাসা আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু যে সব দেশ প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ন হয়ে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে পারে না, সেসব দেশের মানুষগুলোর দ্বিতীয় অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় কোন টিমকে সাপোর্ট করা। বিশ্বের যে কয়টি জনপ্রিয় টিম রয়েছে, তার মধ্যে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সাপোর্টারদের সংখ্যা অনেক। আর মাঝে মাঝে দুই দলের সমর্থকদের মাঝে অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটে যায় আমরা জানি। খেলার প্রতি সমর্থন বা প্রিয় খেলোয়াড়দের প্রতি সাপোর্ট বা ইমোশন কতদূর মানুষকে প্রভাবিত করে, সেটা মাঝে মাঝে অবাক করে দেয়। এমনকি আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের খেলাগুলোতেও সমর্থকদের মাঝে হাতাহাতি থেকে শুরু করে দাঙ্গা পর্যন্ত হয়ে যায়…. শুধুই ইমোশনের বশে। অর্থহীন কিছু বিষয় আছে আমাদের জীবনে- যেগুলো অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্খিত, কিন্তু তবুও ঘটে যায়। এটা মানুষের মনোজগতের এক অন্য রূপ, যেখানে যুক্তি নয় ভাবের আধিক্য মানুষকে মনুষ্যত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় সাময়িকভাবে। তবে এটা কি খেলার প্রতি ভালোবাসা, প্রিয় টিমের বা প্রিয় খেলোয়াড়দের প্রতি ভালোবাসার আধিক্য না কি ইল্লজিক্যাল ইমোশনাল আউটবার্স্ট, সেটা নির্ণয় করাটা মাঝে মাঝে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তবে এটা যে কোনোক্রমেই ক্রিড়ার প্রতি ভালোবাসার জন্য যুক্তিযুক্ত আচরণ নয়, গ্রহণযোগ্য আচরণ নয়….. তা বলাই বাহুল্য।
সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে। বদলে গেছে আমাদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, বিনোদনের ধরন এবং মানুষের ব্যস্ততা। তবু খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবল, এখনও মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা ধরে রেখেছে। বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই মনে হয়, পৃথিবী যেন কিছুদিনের জন্য এক ভিন্ন ছন্দে চলতে শুরু করে। সবাই নিজ নিজ প্রিয় দল, প্রিয় খেলোয়াড় এবং প্রিয় মুহূর্ত নিয়ে মেতে ওঠে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের কথা ভাবলেই মন চলে যায় পেছনে— শৈশব আর কৈশোরের সেই সোনালী দিনগুলোতে, নস্টালজিক হয়ে যাই…. চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ, বাতাসে উড়ে চলা সাদা কালো ফুটবল, গোলের অপেক্ষায় উত্তেজিত মুখ, আর সহপাঠী বন্ধুদের হাসিমাখা মুখগুলো, আজও কানে বেজে ওঠে গোলের মুহূর্তের সেই আনন্দ-চিৎকার আরো মুহুর্মুহু করতালির আওয়াজ। কত মানুষ, কত মাঠ, কত খেলা—সবকিছু যেন আজও হৃদয়ের গভীরে জীবন্ত হয়ে আছে! ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল আমার প্রাণের খেলা। ভোরবেলার আধো অন্ধকারে মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলার সেদিনগুলো ভেসে উঠে স্মৃতির পাতায়- বৃষ্টিস্নাত ভোর বা দুপুরের সে আনন্দময় খেলার স্মৃতিগুলো মনের মণিকোঠায় যেন জ্বল জ্বল করছে। আজও মনে পড়ে, স্কুল থেকে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বাড়ি ফিরে বুট পরে প্রস্তুত হয়ে ঠিক চারটার সময় রেডিওতে আ ন ম বজলুর রশিদের বানান ও উচ্চারণের অনুষ্ঠান শুনতাম প্রায় বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত, তারপর দৌড়ে চলে যেতাম মাঠে খেলা শুরুর হবার আগেই লাইনে দাঁড়ানোর জন্য, বাড়ি সংলগ্ন মাঠ হওয়াতে সুবিধা ছিল কয়েক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যেতাম লাইনের পেছনে। দেশে থাকতে অনেক ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেছি, জাতীয় পর্যায়ের টিমের খেলোয়াড়দের সাথে খেলার স্মৃতি এখনো অম্লান, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে নেমে খেলেছি, জয়ের আনন্দ আর পরাজয়ের কষ্ট দুটোই অনুভব করেছি। সোনালী সে সব দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেলো।
আজকের পৃথিবী অনেক বদলে গেছে, তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা বদলে গিয়েছে অনেক। হয়তো আমাদের সময়ের মতো খেলাধুলার সেই সরল আনন্দ ও মুগ্ধতা নতুন প্রজন্মের কাছে ততটা নেই। প্রযুক্তি, মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর ব্যস্ত জীবন তাদের বিনোদনের ধরন পাল্টে দিয়েছে। আজকাল খেলার মাঠ শূন্য পড়ে থাকে- ফোন, আড্ডা, টিভি বা কম্পিউটার, এটাই ওদের পৃথিবী। আমাদের সময়ের সেই খেলাধুলা আর নির্মল আনন্দ আজ আর নেই। আকাশ সংস্কৃতি আর অন্তর্জালের মোহে ভেসে গেছে ক্রীড়ার প্রতি ভালোবাসা। দেশে-প্রবাসে প্রায় একই ধারায় চলছে, যেটুকু বেঁচে আছে তা ক্রমাগতই ম্রিয়মান। সবকিছু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সপে দেয়া যায় না, এটিই বাস্তবতা। বৈশ্বিক পরিবর্তনের জোয়ারে আমরা সবাই ভেসে যাই এটাই সত্য। তবুও আমরা যারা এখনো পুরোনো প্রজন্মের আছি, যাদের অন্তরে শেকড়ের টান, যাদের অন্তর জুড়ে দেশ-ঐতিহ্য-সংকৃতি-ক্রীড়া- তারা সেকেলে বলে আখ্যায়িত হলেও আমাদের যাপিত জীবনের আনন্দস্মৃতি, অনুভব একান্তই আমাদের অন্তরের গভীরে সঞ্চিত আনন্দের আঁধার। কিন্তু আমরা যারা পুরোনো দিনের মানুষ, তাদের হৃদয়ে ফুটবলের সেই টান এখনও অটুট। যতদিন বেঁচে থাকব, ফুটবলের প্রতি সেই ভালোবাসা ও আবেগ আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে।
৩ জুন, ২০২৬

অ্যান্থনি পিউস গোমেজ | উডব্রিজ, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
লেখক, সম্পাদক, সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মী। লেখালেখি এবং সম্পাদনার সাথে সম্পৃক্ত দীর্ঘ চার দশকেরও বেশী সময় ধরে। প্রকাশিত গ্রন্থ দু’টি।
