অধিক জনসংখ্যা কি অভিশাপ? পৃথিবীর অষ্টম জনবহুল দেশে বসবাস করার কারণে প্রতিনিয়ত যে অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়, তার কারণে এমন প্রশ্ন মনে উদয় হতেই পারে। প্রতিদিনকার ধাক্কাধাক্কির জীবনযাপনের নানান ক্ষেত্রে তা সার্বক্ষণিক একটা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু চার বছর পর বিশ্বকাপ ফুটবল এলে চিন্তাটা কিছু দিনের জন্য হলেও দেশীয় থেকে হয়ে যায় মহাদেশীয়। তখন অবশ্য বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ঘনবসতিপূর্ণ দেশের একটিতে বসবাস করার আক্ষেপ খানিকটা হলেও লাঘব হয়।
এই পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬২ শতাংশের বসবাস এশিয়া মহাদেশে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সব ক্ষেত্রেই তার আলাদা প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকার কথা নয় কি। অথচ ফুটবল মাঠে আমরা কী দেখি? বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এই মহাদেশের সেরা সাফল্য একবারই মাত্র সেমিফাইনাল খেলা! সেটাও ২০০২ সালের স্বাগতিক হিসেবে এই কৃতিত্ব দেখায় দক্ষিণ কোরিয়া। তার আগে ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে চমক সৃষ্টি করেছিল আন্ডারডগ উত্তর কোরিয়া। পর্তুগালের সঙ্গে তাদের ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম একটি সেরা ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হয়। ২৫ মিনিটের মধ্যে কোরিয়ানরা তিন গোল দিয়ে প্রতিপক্ষকে কাঁপিয়ে দিলেও অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য প্রদর্শন করে ৫-৩ গোলে জয় তুলে নেন ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ হিসেবে খ্যাত ইউসেবিও। বৃহৎ শক্তির সঙ্গে এশিয়ানদের মৌলিক পার্থক্য কোথায়, এ ম্যাচটাও তার দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ‘মরুর ম্যারাডোনা’ খ্যাত সাঈদ আল-ওয়াইরানের গোলটি ইতিহাসের অন্যতম একটি সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এই গোলের সুবাদে রাউন্ড ১৬তে উন্নীত হয় সৌদি আরব। কখনো কখনো শক্তিশালী দলগুলোকে হারিয়ে চমক দেখায় এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলো। ব্যস, এই পর্যন্তই।
জনসংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে আফ্রিকা। পৃথিবীর ১৯ শতাংশের মানুষের বসবাস এই মহাদেশে। ‘মানবসভ্যতার সূতিকাগার’ হিসেবে পরিচিত এই মহাদেশও একবারই সেমিফাইনালে উঠেছে। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত কাতার বিশ্বকাপে এ সাফল্য অর্জন করেছে মরক্কো। দুই মহাদেশ মিলিয়ে জনসংখ্যার ৮১ শতাংশ হলেও কখনো বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলতে পারেনি সংখ্যাগুরুরা। কারণটা কী? তার মানে কি দুই মহাদেশের নিয়ন্ত্রণে থাকা পৃথিবীর ৫০ শতাংশের বেশি স্থলভাগের ফুটবল মাঠ কি একদমই নিস্ফলা প্রান্তর? এই অঞ্চলগুলোর মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, প্রকৃতি, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি কি ফুটবলের অনুকূল নয়? এমন যদি হয়ে থাকে, তাহলে বেশি জনসংখ্যাকে আশীর্বাদ মনে করার কোনো কারণ নেই।
বিপরীত চিত্র দেখলে এই অভিমত আরও সুদৃঢ় হতে পারে। বিশ্বের জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশের মহাদেশ ইউরোপ সর্বাধিক ১২ বার এবং ৫ দশমিক ৩১ শতাংশের মহাদেশ দক্ষিণ আমেরিকা ১০ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় কী করে? ১৫ শতাংশের নিচের দুই মহাদেশ ভাগাভাগি করে নিয়েছে ২২টি বিশ্বকাপের শিরোপা। ফুটবল দেবতার এ কেমন বিবেচনা? সে ক্ষেত্রে জাগতিক খ্যাতি, অহংকার ও পার্থিব ঐশ্বর্যের অনিত্যতার মোহ কাটিয়ে এশিয়ান আর আফ্রিকানরা মনোবেদনা নিয়ে গাইতে পারেন রবীন্দ্রসংগীত, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’।
১৯৩৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে অনেকটা ফাঁকতালে এশিয়ার প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) অংশ নেয়। দলটি গড়া হয় দেশীয়, চিনেসেন (দেশীয়-চিনা বংশোদ্ভূতরা) ও ডাচ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে। ওলন্দাজ ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে থাকা এই দলটিকে কতটা এশিয়ার প্রতিনিধি বলা যায়, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। প্রকৃতঅর্থে ১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ডে প্রথম স্বাধীন এশীয় দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে অংশ গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে দক্ষিণ কোরিয়া। তারপর ১৯৬৬ সালে উত্তর কোরিয়া, ১৯৭০ সালে ইসরায়েল, ১৯৭৪ সালে অস্ট্রেলিয়া, ১৯৭৮ সালে ইরান, ১৯৮২ সালে কুয়েত, ১৯৮৬ সালে ইরাক, ১৯৯০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ১৯৯৪ সালে সৌদি আরব, ১৯৯৮ সালে জাপান, ২০০২ সালে চীন, ২০২২ সালে কাতার প্রথম অংশ নেয়। এবার যোগ দিয়েছে জর্ডান ও উজবেকিস্তান। এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে উন্নীত হওয়া ৪৮টি দেশের মধ্যে এশিয়ার প্রতিনিধি ১৫। এই প্রতিনিধিত্ব যতটা না যোগ্যতা দিয়ে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশ্বকাপ ফুটবলের পরিসর বাড়ার কারণে। এশিয়া আয়োজক হয়েছে দুইবার, ২০০২ এবং ২০২২ সালে। সঙ্গত কারণেই মনের মধ্যে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা আসতে পারে, এশিয়া কি বিশ্বকাপ ফুটবলের কেবলই শোপিস? না-কি এশিয়ানরা ফিফা ও বিশ্ব ফুটবলের জন্য একটি বিশাল টেলিভিশন দর্শক ও বাণিজ্যিক বাজার হয়ে থাকবে?
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এশিয়া মহাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল, যা বৈশ্বিক জিডিপির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি অর্থনীতির তিনটিই (চীন, জাপান ও ভারত) এশিয়ার। এটি বৈশ্বিক উৎপাদনের কেন্দ্র এবং বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। তরুণ ও কর্মক্ষম জনসংখ্যা থাকায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বাজার বড় করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। বাণিজ্যিক দিক দিয়ে এশিয়া অনেক বড় হলেও মাঠের পারফরম্যান্সে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ সারিতে কেন পৌঁছাতে পারছে না? সমস্ত হম্বিতম্বি কেন খেলার মাঠে থেমে যায়?
সাধারণভাবে বোঝা যায়, এশিয়া মহাদেশের ফুটবল দলগুলো বিশ্বকাপে এখনো চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার পেছনে মূলত সাংগঠনিক, কৌশলগত এবং অবকাঠামোগত কারণ দায়ী। আন্তর্জাতিক ফুটবলে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এশিয়া বেশ পিছিয়ে আছে। ফিফা বিশ্বকাপ সাধারণত ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার আধিপত্যে চলে। প্রাধান্য ইউরোপিয়ানদেরই। ফুটবল, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে এগিয়ে থাকার কারণে এমনটা হতেই পারে। আর নেতৃত্বে থাকলে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। সে ক্ষেত্রে এশিয়ানরা নেতৃত্বের শীর্ষে উঠে আসতে পারলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার একটা প্রভাব পড়বে। বিস্তৃত হবে এশিয়ানদের পরিসর। এ বিষয়টি নিয়ে এশিয়ার শক্তিমানরা কতটা ভাবেন, কে জানে?
যদিও জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা সৌদি আরবের মতো দলগুলো ইদানীং ভালো পারফর্ম করছে, তবুও বিশ্বসেরাদের কাতারে পৌঁছাতে এশিয়ানদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার মতো এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে শৈশব থেকে ফুটবলের তীব্র প্রতিযোগিতা বা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। এশিয়ার দলগুলো সাধারণত নিজেদের মহাদেশের মধ্যেই বেশি খেলে। ইউরোপের উচ্চমানের লিগ বা দলগুলোর বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা কম হওয়ায় বিশ্বমঞ্চে তারা হঠাৎ করেই চাপে পড়ে যায়।
ইউরোপীয় ও লাতিন দলগুলোর তুলনায় এশীয় খেলোয়াড়রা প্রায়শই শারীরিক শক্তি, গতি ও স্ট্যামিনায় পিছিয়ে থাকে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং বিশ্বমানের কোচিং স্টাফের অভাবে এশীয় দলগুলো বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে না। বড় দলের বিপক্ষে খেলার সময় এশীয় দলগুলো অনেক সময় অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে, যা তাদের জয়ের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। প্রতিপক্ষের তুলনায় এশিয়া বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ফুটবলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। যে সমস্যাগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠে, তা নিরসন করা অসম্ভব কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে যথাযথ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।
অধিক জনসংখ্যা আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলেও তা যদি দক্ষ ও কার্যকরী না হয়, তাহলে সুফল পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। বরং সেটা হয়ে ওঠে দায়ভার। এ কথা আমাদের চেয়ে বেশি কে আর জানে? এটা আমরা প্রতি মুহূর্তে অনুধাবন করছি। বর্তমান দুনিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো শক্তি বা সামর্থ্যের প্রকাশ নয়। মেধা, সৃজনশীলতা ও নিবেদন না থাকলে এগিয়ে যাওয়া যায় না। বিশ্ব ফুটবলে ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো মূলত তাদের খেলার মান, অবকাঠামো, কৌশল এবং প্রতিযোগিতার তীব্রতার ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপকে আধুনিক ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু মনে করা হয়, অন্যদিকে এশিয়া ফুটবলীয় উৎকর্ষের পথে থাকলেও ইউরোপের তুলনায় এখনো ঢের ঢের পিছিয়ে রয়েছে। এই ব্যবধান কমিয়ে আনতে হলে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পিছিয়েই থাকতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই পিছিয়ে থাকা থেকে এশিয়া কবে বের হতে পারবে?
২৩ মে, ২০২৬

দুলাল মাহমুদ | ঢাকা, বাংলাদেশ
ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়াবিষয়ক গবেষক। সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন বিষয়ে লেখার প্রতি ঝোঁক রয়েছে। কয়েকটি গ্রন্থের প্রণেতা।
