ড. খলিলুর রহমান

ড. খলিলুর রহমান: কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, নাকি বাংলাদেশের নতুন ভূরাজনীতির স্থপতি?

সাকিব সারোয়ার আহমেদ
June 16, 2026
19 views
21 mins read

ধরুন, বছর দুই আগে, বাংলাদেশের যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের কোন শিক্ষার্থীকে আপনি প্রশ্ন করলেন, ড. খলিলুর রহমান কে? মোটামুটি নিশ্চিত যে সেই শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা করেও এই নামটি শোনেনি তখন পর্যন্ত।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ বছর দুয়েক আগেও নামটি শোনেনি। অথচ আজ তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারও আগে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। আর এখন তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। মাত্র দুই বছরে একজন মানুষের এইরকম উত্থান বেশ অবিশ্বাস্য ব্যাপার মনে হচ্ছে না?

খলিলুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বিসিএসের প্রথম ব্যাচে শীর্ষস্থান অর্জন করে ১৯৭৯ সালে কূটনৈতিক সার্ভিসে যোগ দেন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লেচার স্কুল ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নেন এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এরপর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন।

কাজেই তিনি হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়া কোনো চরিত্র নন, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চার দশকের বেশি সময় কাটানো একজন পেশাদার কূটনীতিক।

কিন্তু, এতদিন তিনি কোথায় ছিলেন? তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক আমলাতন্ত্রের ভেতরে। জাতিসংঘে কাজ করা মানুষদের অনেক সময় নিজেদের দেশের সাধারণ জনগণ খুব একটা চেনে না। কিন্তু বিশ্ব কূটনীতির জগতে তাদের পরিচিতি থাকে। ড. খলিলুর রহমান সেই শ্রেণির একজন কর্মকর্তা।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খলিলুর রহমানকে প্রথম বড় আকারে জনসমক্ষে দেখা যায়। প্রথমে রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চ প্রতিনিধি, পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। আর এখানেই তাকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলতে আমরা কী বুঝি? বেশিরভাগ দেশে এটি এমন একটি পদ, যার হাতে সামরিক, গোয়েন্দা, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক সমন্বয়ের দায়িত্ব থাকে। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, তিনি কি বাংলাদেশের ‘স্পাইমাস্টার’? নাকি মির্জাপুরের কালীন ভাইয়ার মত তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী ‘কালীন’ ভাইয়া?

ব্যাপারটা আসলে এত সরল নয়। কারণ বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান আলাদা আলাদা ব্যক্তি। তবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে খলিলুর রহমান নিরাপত্তা নীতির সমন্বয়কারী ভূমিকায় ছিলেন। তাই তাকে গোয়েন্দা প্রধান বলা যাবে না, আবার তিনি নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে, এটাও বলা যাবে না।

মূলতঃ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যখন তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন, সেখান থেকেই এই জল্পনা শুরু হয়। যখন দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মুখোমুখি বসেন, ধরেই নেয়া হয় আসলে দুই ‘স্পাইমাস্টার’ দেখা করছেন। আবার সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও তিনি আবার দোভালের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এখন, যেহেতু অজিত দোভাল ভারতের ‘স্পাইমাস্টার’ নামে সুপরিচিত, তাই খলিলুর রহমানকে নিয়ে এই প্রশ্ন উঠছে। যদিও বাস্তবে নিরাপত্তা উপদেষ্টারা শুধু গোয়েন্দা তথ্য নয়, সীমান্ত, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ, বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেন।

এরপর দেখা গেল, অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি তুলনামূলক বিরল ঘটনা। কারণ সাধারণত নির্বাচিত সরকারগুলো নিজেদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকেই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নির্বাচন করে। কিন্তু খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছে। আর তার ফলেই শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

অবশ্য, ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার পেছনে যে কারণ থাকতে পারে, সেটা হচ্ছে, যেহেতু কূটনীতির জগতে দীর্ঘদিন চলাফেরার কারণে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অলিগলি তার চেনা, আর বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জের মুখে, এই সময়ে তার অভিজ্ঞতা ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের জন্য উপকারী হবার সম্ভাবনা আছে।

কিন্তু, ব্যাপার হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্য সমঝোতা এবং শুল্ক আলোচনায় খলিলুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সরকারের দাবি, এই সমঝোতা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেছে এবং পোশাক খাতকে বড় ধাক্কা থেকে বাঁচিয়েছে।

কিন্তু সমালোচকেরা অন্য প্রশ্ন তুলছেন। যখন একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘ এবং মার্কিন একাডেমিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তখন তার নীতিগত অবস্থান কি নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ আছে? এটি বৈধ প্রশ্ন হলেও, প্রমাণ ছাড়া এরকম প্রশ্নের কোন উত্তর দেয়া সম্ভব না। কারণ একদিকে তিনি আমেরিকার কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য, এটা যেমন সত্যি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দরকষাকষি করার জন্য এমন গ্রহণযোগ্যতা আর অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, সেটাও সত্যি।

প্রশ্ন আসে, খুব অল্প সময়ে একইসঙ্গে এতগুলো ভূমিকায় কাজ করছেন তিনি, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হচ্ছে না? অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব আন্তর্জাতিক সমঝোতা বা নীতি আলোচনায় খলিলুর রহমান যুক্ত ছিলেন, নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রী হিসেবে সেগুলোর বাস্তবায়ন তদারকি করাও এখন তার দায়িত্ব। ফলে একজন আলোচক ও বাস্তবায়নকারীর ভূমিকা একই ব্যক্তির হাতে চলে এসেছে। আবার, তিনি একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং বাণিজ্য কূটনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। এতে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এদিকে, সদ্য নির্বাচিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তার নতুন ভূমিকা আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষতা দাবি করে, অথচ তিনি একই সময়ে একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। যদিও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এটি নিষিদ্ধ নয়, তবু পর্যবেক্ষকদের কাছে এটি একটি আলোচ্য বিষয় হতে পারে, তিনি কি আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করছেন? এখানে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের ভূমিকা হওয়া উচিৎ নিবিড় পর্যবেক্ষকের।

কারণ কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা আর সেই রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করা সবসময় এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি, রপ্তানি, রেমিট্যান্স, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন- সবকিছু বিবেচনায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা বাংলাদেশের প্রয়োজন। একইভাবে দিল্লি, বেইজিং, টোকিও, ব্রাসেলস এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গেও সম্পর্ক জরুরি।

আসল কথা হচ্ছে, তিনি কি এইসকল ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবেন? আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত এটাই। আজকের বাংলাদেশকে একই সঙ্গে ভারতকে আশ্বস্ত করতে হবে, চীনের বিনিয়োগ ধরে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার রক্ষা করতে হবে, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করতে হবে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হবে।

এ ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করা বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। তবে খলিলুর রহমানের পক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি আছে যে তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাষা বোঝেন। চার দশকেরও বেশি সময় তিনি সেই ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করেছেন। আবার তার বিপক্ষেও একটি প্রশ্ন আছে, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কি সবসময় জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সমার্থক? সময়ই এই প্রশ্নের উত্তর দেবে।

পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য বিশ্বের এইসব বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারাটা একটা অগ্নিপরীক্ষা! খলিলুর রহমান তার মিশনে সফল হবেন কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ কি এই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নিজের কূটনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে? কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নয়, পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য নির্ভর করে রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের স্বার্থকে সংজ্ঞায়িত ও রক্ষা করতে পারে তার ওপর।


সাকিব সারোয়ার আহমেদ | ঢাকা, বাংলাদেশ

স্থপতি, শিক্ষা উন্নয়ন কর্মী। শিল্প-স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চায় থাকি।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

ঘেউউউ
Previous Story

ঘেউউউ

Next Story

প্রবাসে কেমন আছেন বয়স্ক বাবা-মা?

Latest from বিশ্বসংলাপ

যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে পালটে দিচ্ছে যুদ্ধ ও মানবাধিকারের সংজ্ঞা

জান্নাতুল মাওয়ার এই প্রবন্ধে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথেচ্ছ ব্যবহার, এর ফলে সৃষ্ট নৈতিক সংকট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের আইনি দিকগুলোর গভীর বিশ্লেষণ ফুটে উঠেছে।