পড়শী সাহিত্য ও শিল্প সংগীতশিল্পী বাবনা করিমের সাথে পড়শীর একান্ত সাক্ষাৎকার

সংগীতশিল্পী বাবনা করিমের সাথে পড়শীর একান্ত সাক্ষাৎকার

Post Views: 50
10 min read

“এলোমেলো বাতাসে গীটার হাতে
নিস্তব্ধতা চৌচির উম্মাদ ঝংকারে কাঁদি”

“অবাক সুখের কান্না…” সংগীতশিল্পী বাবনা করিম এ গানটি লিখেছিলেন ভাইয়ের মৃত্যুর পর, কক্সবাজারের একটি পাহাড়ের উপর থেকে সমুদ্র দেখতে দেখতে। অনেক পরে এ গানের প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, “আমি এখনও সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাই। ঐ সময়ের স্তব্ধতা অনুভব করতে পারি। বিশাল কোনো কিছুর সামনে গেলে মানুষের যে অনুভূতি হয়, তখন তেমনই অনুভূতি হয়েছিল।”

অবাক ভালোবাসা, ওয়ারফেজ, বাবনা করিম — এ শব্দগুলো উচ্চারণেই মস্তিষ্কে তা সুরের মতোই শোনায়। বাংলাদেশের সঙ্গীত যাত্রার এই দীর্ঘ সময়ে নিজের লেখা গানের মতোই সব আলো নিভে গেলেও বাবনা করিম তারার মতোই জ্বলে থাকবার অবস্থান তৈরি করেছেন সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে, এক “অবাক ভালোবাসায়”।

porshi inside 2026 05 music nasimul moon babna
সংগীতশিল্পী বাবনা করিম

পড়শী: হেভি মেটাল সংগীত বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে নতুন সংযোজন। এর শুরুটা কীভাবে হয়েছিল, এবং কেন এই ধারাটি বেছে নিয়েছিলেন?

বাবনা করিম: ওয়ারফেজ ব্যান্ডটি ১৯৮৪ সালের জুন মাসে ঢাকায় গঠিত হয়। গিটারিস্ট ইব্রাহিম আহমেদ কামাল এবং তাঁর কয়েকজন সহপাঠী মীর, নাঈমুল ও হেলাল ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আমরা তখন নানা ধরনের পাশ্চাত্য সংগীত শুনতাম, তবে হার্ড রক ও হেভি মেটালের শক্তিশালী সুর এবং কথাগুলো আমাদের কিশোর মনকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল।

আমার ব্যক্তিগত বেড়ে ওঠা ছিল এমন এক পরিবারে, যেখানে আধুনিক বাংলা গান, নজরুলগীতি ও রবীন্দ্রসংগীত শোনা হতো। সংগীতে আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, আমার সংগীতজীবনের শুরু মূলত মামা-খালাদের মুখে ঐতিহ্যবাহী গান শুনে। তবে ছোটবেলায় বিদেশে বেড়ে ওঠার কারণে বিশ্বসংগীতের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উন্মুক্ত।

আমি যখন ঢাকার নটরডেম কলেজে পড়ি, তখন ১৬-১৭ বছর বয়সে গিটার বাজানো শুরু করি। প্রথম যে গানটি শিখেছিলাম, সেটি ছিল লাকি আখন্দের “আবার এলো যে সন্ধ্যা”। এরপর ধীরে ধীরে আরও বাংলা গান শিখতে থাকি। সেই সময় ঢাকায় এই ধরনের হার্ড রক বা হেভি মেটাল বাজানোর মতো মানুষ খুবই কম ছিল। তাই এই সংগীত আমাদের কাছে ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ।

একসময় মীর, যিনি লিড গিটারিস্টদের একজন ছিলেন (অন্যজন নাঈমুল), পড়াশোনার জন্য ব্যান্ড ছেড়ে দেন। আমি তখন কালাবাগান তৃতীয় লেনে থাকতাম এবং লেক সার্কাসে কামালের বাসায় ওয়ারফেজের রিহার্সালে প্রায়ই যেতাম। কামাল তখন বেজ গিটার বাজাতেন, কিন্তু প্রয়োজনে লিড গিটারও ধরেন। সেই সময় কামাল ও টিপু আমাকে বেজ গিটার বাজানোর প্রস্তাব দেন। আমি সানন্দে তা গ্রহণ করি। সেখান থেকেই আমার ওয়ারফেজ যাত্রার সূচনা।

পড়শী: বাংলাদেশে রক, পপ, জ্যাজ ও ফোক সংগীতের জনপ্রিয়তা কি বেড়েছে বলে মনে করেন? কোন ধরনের ব্যান্ড সংগীত বেশি জনপ্রিয়?

বাবনা করিম: আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশে রক ও পপ এখনো বেশ জনপ্রিয় এবং প্রাণবন্ত। বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে এই ধারাগুলো এখন আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে পরিণত রূপ লাভ করেছে।

পড়শী: সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের নেতৃত্বে যে গণআন্দোলন হয়েছে, তার কি সংগীতে প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন? তরুণদের পছন্দের কারণে কি ব্যান্ড সংগীত বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে?

বাবনা করিম: সংস্কৃতি কখনো স্থির নয়— এটি সবসময় পরিবর্তনশীল। নতুন ধারণা গ্রহণে তরুণরাই সবচেয়ে এগিয়ে থাকে এবং তারাই ভবিষ্যৎ গড়ে। তাদের শক্তি ও আগ্রহই সংস্কৃতির গতিপথ নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের যাত্রা শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের আগেই— তরুণদের উদ্দীপনা থেকেই। সংগীত, শিল্প ও সাহিত্য একটি জাতির স্পন্দন— এগুলো জাতির নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আবেগিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটায়। অনেক সময় প্রচলিত নিয়মের বাইরে থাকা গভীর সত্যগুলোও এসব মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা একটি সংস্কৃতির অগ্রগতির প্রাণশক্তি। পূর্বসূরিদের কাছ থেকে শেখা, নতুন ধারণা গ্রহণ করা এবং তা প্রাসঙ্গিকভাবে মিশিয়ে কিছু নতুন ও অর্থবহ সৃষ্টি করা— এটাই প্রকৃত সৃজনশীলতা। সংগীত, শিল্প ও সাহিত্যের মাধ্যমে আমরা নিজেকে প্রকাশ করতে শিখি এবং আরও উন্নত জীবনের পথে এগিয়ে যাই। ওয়ারফেজ সবসময় এই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করার চেষ্টা করেছে।

porshi inside 2026 05 music nasimul moon babna nasimul
জুম সেশনে নাসিমুল গনি (বায়ে) ও বাবনা করিম (ডানে)

পড়শী: আপনি রক সঙ্গীতকে ভবিষ্যতে কোথায় দেখতে চান? আপনাদের পরিকল্পনা কী? হেভি মেটালের সামাজিক প্রভাব কী হতে পারে? পপ সংগীত এখন কম শোনা যায় কেন?

বাবনা করিম: বাংলাদেশে রক ও হেভি মেটাল এখন অনেকটাই পরিণত এবং গ্রহণযোগ্য। ১৯৮৪ থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা দেশে বিশ্বমানের গিটারিস্ট তৈরি করেছে— যা আমাদের জন্য এক বিশাল সাংস্কৃতিক অর্জন।

প্রত্যেক কিছুরই ভালো ও খারাপ ব্যবহার রয়েছে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে হেভি মেটাল মানুষের গভীর আবেগ প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। কিছু অনুভূতি — যেমন ক্রোধ, প্রতিবাদ, বিদ্রোহ — ধীর লয়ের সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, নজরুলের কিছু বিদ্রোহী গান হার্ড রক বা হেভি মেটালের মাধ্যমে আরও শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।

গণসংগীত কখনোই কোমলভাবে পরিবেশনের জন্য নয়— এতে থাকতে হয় বিপ্লবী শক্তি। সংগীত মূলত মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির গল্প বলার একটি মাধ্যম, আর সেই গল্পের জন্য উপযুক্ত সুর দরকার। সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে হেভি মেটাল একটি ইতিবাচক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে আমি ফ্লামেঙ্কো সংগীত নিয়ে কাজ করছি, গত ২৫ বছর ধরে। এটি স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের একটি সমৃদ্ধ শিল্পধারা, যেখানে রোমা, মুরিশ, ইহুদি ও আন্দালুসিয়ান লোকসংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে। আমি মনে করি, আমাদের সেতার বা সরোদ-এর সঙ্গে ফ্লামেঙ্কোর মেলবন্ধন আমাদের সংগীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
এই ধারাটি আয়ত্ত করা কঠিন, কিন্তু সঠিক পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে আমরা বড় অগ্রগতি অর্জন করতে পারি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ ইতিমধ্যেই এ ধরনের ফিউশন নিয়ে কাজ করছে— আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি। তবে উন্নতির জন্য শর্টকাট নেই; বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াতে হলে আমাদের সত্যিকারের দক্ষ হতে হবে। গত ৪০ বছরে রক ও মেটালের মাধ্যমে আমরা যেমন নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছি, তেমনই ভবিষ্যতেও নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে হবে।

পড়শী: ওয়ারফেজের প্রতিষ্ঠাকালীন অনেকেই এখন আর নেই। তাঁদের অবদান কতটা? বর্তমান সদস্যরা কারা এবং তাঁদের ভূমিকা কী?

বাবনা করিম: ওয়ারফেজ সবসময় অসাধারণ সংগীতশিল্পীদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়া আর্থিকভাবে কঠিন হওয়ায় অনেক প্রতিভাবান শিল্পী অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

তবুও এই সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে পরিণত করেছেন টিপু, যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে ব্যান্ডটিকে টিকিয়ে রেখেছেন। নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান সদস্যরা যোগ দিয়ে নতুন ধরনের সুর ও ভাবনা নিয়ে এসেছেন। এর ফলে ওয়ারফেজের গান বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে — ভালোবাসা, দর্শন, রাজনীতি — সব ধরনের বিষয়ই তাদের গানে উঠে এসেছে।

গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সদস্যদের মধ্যে আছেন: টিপু (ব্যান্ড লিডার), কামাল (প্রতিষ্ঠাতা সদস্য), সঞ্জয়, রাসেল আলী, রজার, মিজান ও অনি।

বর্তমান সদস্যরা হলেন: টিপু (ড্রামস), কামাল (গিটার), শামস (কীবোর্ড), পলাশ (ভোকাল), সামির (গিটার), সৌমেন (গিটার), জাবের (বেজ)।

পড়শী: আমাদের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন?

বাবনা করিম: আমাদের শ্রোতাদের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ। তাঁদের সমর্থনই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে। “একুশে পদক” অর্জন আমরা উৎসর্গ করছি আমাদের সকল শ্রোতা, বর্তমান ও প্রাক্তন সদস্য এবং পুরো ব্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিকে।

নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের উদ্দেশ্যে বলব— নতুন কিছু করার সাহস রাখুন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে একটি কথা বলতে চাই: যখন কোনো ব্যবস্থা অত্যন্ত ভারী হয়ে যায়, তা রাজনৈতিক হোক বা সাংস্কৃতিক— তখন তাকে পাশ কাটিয়ে এগোতে হয়। অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলে অগ্রগতি সম্ভব নয়।

নিজের আবেগ ও ভালোবাসার পথেই চলুন। প্রয়োজনে আমাদের মতো পুরোনো প্রজন্মকেও অতিক্রম করুন। নির্ভীকভাবে নিজের পথ তৈরি করুন— সাফল্যের সম্ভাবনা সেখানেই সবচেয়ে বেশি।

পড়শী: আমাদেরকে আপনার মুল্যবান সময় দেওয়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। ওয়ারফেজ আরও এগিয়ে যাবে, এই প্রত্যাশা করছি। অনেক শুভ কামনা।

বাংলাদেশের জাতীয় পুরষ্কার “একুশে পদক” প্রাপ্ত সংগীতশিল্পী বাবনা করিমের সাথে এই সাক্ষাৎকারটি পড়শীর পক্ষ থেকে একটি জুম সেশনে নিয়েছেন নাসিমুল গনি। পেশায় দুজনেই প্রকৌশলী।

porshi profile nasimul gani

লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

প্রকৌশলী।

পাশে থেকে সহায়তা করেছেন আইডাহো থেকে মুন ইরা মীম এবং নর্থ ক্যারোলিনা থেকে সাবির মজুমদার।

porshi profile moon era meem

আইডাহো, যুক্তরাষ্ট্র

মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে অধ্যয়নরত। সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাচ, বিতর্কের পাশাপাশি লেখালেখির চর্চাও ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠায় বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলায় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।

porshi profile sabir majumder 1

শার্লোট, নর্থ ক্যারোলিনা, যুক্তরাষ্ট্র

নির্বাহী সম্পাদক, পড়শী


পড়শী

উত্তর আমেরিকার সবচে’ জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকা ‘পড়শী’ এখন ডিজিটাল মাধ্যমে, অনলাইনে!


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।