১. ভূমিকা: ৭৫ বছরের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়
১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের ৭৫ বছর পূর্তিতে বিশ্ব যখন শরণার্থী সুরক্ষার অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছে, তখন রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা সম্পর্কে এক কঠিন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থা মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী সেই সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে এই বার্ষিকীকে কেবল একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা না করে; এটিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য আত্মসমালোচনা এবং নতুন অঙ্গীকারেরও মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে ২০১৭ সালের গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে পালিয়ে আসা ১০ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ, কূটনৈতিক আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই বাস্তব সাফল্যের মুখ দেখেনি। কারণ প্রত্যাবাসনের মৌলিক শর্তগুলো যেমন: নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, স্বাধীন চলাচল এবং মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা ইত্যাদি আজও মিয়ানমারে অনুপস্থিত। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও জটিল হয়ে ওঠে। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ প্রসারিত হয় এবং রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি দ্রুত প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। অনেকের কাছে এটি সামরিক শাসনের বিকল্প রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা বলে মনে হলেও, রোহিঙ্গাদের জন্য বাস্তবতা তেমন পরিবর্তিত হয়নি।
ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, কিন্তু তাদের নিরাপত্তাহীনতা, রাষ্ট্রহীনতা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা একই রয়ে গেছে। বর্তমানে রাখাইনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল সামরিক বাহিনীর পরিবর্তে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এই পরিবর্তন রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের কোনো নতুন ভিত্তি তৈরি করেনি। বরং নতুন এক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে একই ভূখণ্ডে একাধিক সশস্ত্র পক্ষের নিয়ন্ত্রণ, চলমান সংঘাত এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের আলোচনাকে কেবল একটি কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করলে চলবেনা; বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেই প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: যে রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং যে ভূখণ্ডে কার্যকর ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বই অনিশ্চিত, সেখানে কি সত্যিই নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কেবল মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাই নয়, আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থার বিকাশ সবকিছুকেই একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কেবল সীমান্ত পারাপারের বিষয় না; বরং এটি নাগরিকত্ব, জবাবদিহিতা, মানবিক মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। রোহিঙ্গা সংকট আজ আর শুধু মিয়ানমার বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে নেই। এটি আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা, আঞ্চলিক সহযোগিতার কার্যকারিতা এবং বৈশ্বিক মানবিক দায়বদ্ধতার একটি কঠিন পরীক্ষাযা রূপ নিয়েছে। শরণার্থী কনভেনশনের ৭৫ বছর পূর্তির এই সময়ে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো; আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি কেবল প্রত্যাবাসনের সংখ্যা বাড়াতে আগ্রহী, নাকি এমন একটি প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে চায়, যেখানে রোহিঙ্গারা সত্যিকার অর্থে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মর্যাদাসহ নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন?
২. সামরিক জান্তা থেকে আরাকান আর্মি: প্রত্যাবাসনের নতুন বাস্তবতা
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বর্তমান আলোচনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায়। একসময় যেখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নিপীড়ন ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির প্রধান দায়ভার ছিল সামরিক জান্তার ওপর, সেখানে আজ রাখাইনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে আরাকান আর্মি (AA)। কিন্তু এই ক্ষমতার পরিবর্তন রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি করেনি। বরং সংঘাতের চরিত্র আরও জটিল হয়েছে এবং প্রত্যাবাসনের আইনি ও মানবিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেকে মনে করেন, সামরিক জান্তার দুর্বলতা এবং আরাকান আর্মির উত্থান রাখাইনে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিবর্তন মূল সমস্যার কোনো সমাধান নয়। কারণ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ যার হাতেই থাকুক না কেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, স্বাধীন চলাচল, ভূমির অধিকার এবং নিরাপত্তা ইত্যাদি এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো ইতিবাচক সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়। অর্থাৎ, শাসক পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু বৈষম্যের কাঠামো এবং নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা বহাল রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা কার্যত সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায় পরিণত হতে পারে। একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যখন কার্যকর কর্তৃত্ব বিভক্ত, সশস্ত্র সংঘাত অব্যাহত এবং বেসামরিক মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে, তখন সেই রাষ্ট্রকে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের উপযোগী বলা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৩. নন-রিফাউলমেন্ট: আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের মৌলিক নীতি
আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের ভিত্তিমূল হলো নন-রিফাউলমেন্ট (Non-refoulement) নীতি। ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের ৩৩ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের (Customary International Law) অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই নীতির মূল বক্তব্য হলো: কোনো শরণার্থীকে এমন কোনো দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মৌলিক অধিকার গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এই নীতি কেবল কনভেনশনের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্যই নয়; আন্তর্জাতিক আইনের বিকাশের ফলে এটি আজ এমন একটি সর্বজনস্বীকৃত নীতি, যা অধিকাংশ রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন বা ১৯৬৭ সালের প্রটোকলের সদস্য না হলেও, নন-রিফাউলমেন্ট নীতির প্রতি তার দায়বদ্ধতা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বর্তমান রাখাইনের বাস্তবতা এই নীতির গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে। সেখানে সামরিক জান্তা, আরাকান আর্মি এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। বহু এলাকায় প্রশাসনিক শূন্যতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানবিক সংকট বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন নিরাপদ হবে এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৪. স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রত্যাবাসন, নাকি কূটনৈতিক চাপ ?
আন্তর্জাতিক শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থায় স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন (Voluntary Repatriation) বলতে বোঝায় এমন প্রত্যাবর্তন, যা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, নিরাপদ পরিবেশে এবং মর্যাদার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (UNHCR) দীর্ঘদিন ধরেই এই তিনটি শর্ত, যেমন: ক. স্বেচ্ছা (Voluntariness), খ. নিরাপত্তা (Safety) এবং গ. মর্যাদা (Dignity) কে প্রত্যাবাসনের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। বর্তমান বাস্তবতায় এই তিনটির কোনোটিই পূরণ হচ্ছে না। কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থানরত অধিকাংশ রোহিঙ্গা এখনও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ছাড়া মিয়ানমারে ফিরতে অনাগ্রহী। অতীতের একাধিক প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে মূলত এই কারণেই যে, প্রত্যাবর্তনের পর তাদের নিরাপত্তা, স্বাধীন চলাচল কিংবা নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা ছিল না। এ অবস্থায় কেবল দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা বা রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু করা হলে তা প্রকৃত অর্থে স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবর্তন হবে না; বরং এটি Constructive Refoulement-এর ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। অর্থাৎ, প্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগ ছাড়াই রাজনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা মানবিক চাপের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শরণার্থীরা বাধ্য হয়ে অনিরাপদ পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে সম্মত হয়।
৫. প্রত্যাবাসনের আগে ন্যায়বিচার
রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কবে প্রত্যাবাসন হবে এটি নয়; বরং কী ধরনের এবং কী প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবাসন হবে। যদি প্রত্যাবর্তনের পরও তারা রাষ্ট্রহীন থাকে, স্বাধীনভাবে চলাচল করতে না পারে, নিজস্ব গ্রামে ফিরতে না পারে অথবা পুনরায় সহিংসতার ঝুঁকিতে বসবাস করতে বাধ্য হয়, তবে সেই প্রত্যাবাসন কোনো স্থায়ী সমাধান নয় বরং নতুন সংকটের সূচনা। তাই প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হওয়া উচিত নাগরিকত্বের আইনি স্বীকৃতি, নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, সম্পত্তির অধিকার পুনর্বহাল এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এসব শর্ত পূরণ না করে প্রত্যাবাসনের যেকোনো উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে এবং শরণার্থীদের আবারও একই নিপীড়নের চক্রে ফিরিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করবে। এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কেবল একটি কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, মানবিক সুরক্ষা এবং আইনের শাসনের প্রতি বৈশ্বিক অঙ্গীকারেরও পরীক্ষা।
৬. বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থা: শরণার্থী সুরক্ষার এক নীরব ভিত্তি
বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন কিংবা ১৯৬৭ সালের প্রটোকলের পক্ষভুক্ত নয়। ফলে অনেক সময় ধারণা করা হয় যে, শরণার্থীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো সুস্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। বাংলাদেশের সংবিধান, উচ্চ আদালতের বিচারিক ব্যাখ্যা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি বিচার বিভাগের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সব মিলিয়ে এমন একটি
নীতিগত কাঠামো গড়ে উঠেছে, যা শরণার্থী ও রাষ্ট্রহীন মানুষের মানবিক সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তা কেবল নাগরিকের জন্য নয়; “প্রত্যেক ব্যক্তি”-র জন্য প্রযোজ্য। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংবিধানিক ভাষ্য পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
ড. মহিউদ্দীন ফারুক বনাম বাংলাদেশ (1997, 49 DLR (AD) 1) মামলায় আপিল বিভাগ জনস্বার্থ মামলা (Public Interest Litigation)-এর পরিধি সম্প্রসারণের পাশাপাশি সংবিধানের মৌলিক অধিকারকে একটি মানবকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে। আদালত স্পষ্ট করেন যে, সংবিধানে সুরক্ষিত জীবন ও আইনের আশ্রয়ের অধিকার কেবল নাগরিকত্বের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এই ব্যাখ্যা পরবর্তী সময়ে অ-নাগরিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করে। একইভাবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (BNWLA) বনাম বাংলাদেশ সরকার (Writ Petition No. 5916 of 2008) মামলায় উচ্চ আদালত নির্দিষ্ট আইন না থাকা সত্ত্বেও সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে নারীদের যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষার জন্য নির্দেশনা জারি করেন। এই রায় প্রমাণ করে যে, আইনগত শূন্যতা কখনোই মানবাধিকার সুরক্ষার পথে বাধা হতে পারে না; প্রয়োজনে আদালত সংবিধানের মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে।
রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর অধিকারের ক্ষেত্রে আবিদ খান বনাম বাংলাদেশ সরকার (Writ Petition No. 3831 of 2001) এবং মো. সাদাকাত খান (ফাক্কু) বনাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (Writ Petition No: 10129 of 2007) মামলার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই দুই মামলায় আদালত ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী উর্দুভাষী বিহারিদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করেন। আদালতের যুক্তির কেন্দ্রে ছিল মানবিক মর্যাদা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং সাংবিধানিক ন্যায়বিচারের নীতি। যদিও এই মামলাগুলো সরাসরি শরণার্থী আইনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তবুও এগুলো রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর অধিকার সম্পর্কে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রগতিশীল অবস্থানকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। এই বিচারিক ধারাবাহিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়; বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো নাগরিকত্বের আনুষ্ঠানিক সীমারেখার বাইরে গিয়েও মানুষের মৌলিক অধিকারকে মূল্যায়ন করতে সক্ষম। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নৈতিক ও সাংবিধানিক অবস্থান মানবিক সহানুভূতির পাশাপাশি বিচারিকভাবে বিকশিত সাংবিধানিক মূল্যবোধের ওপরও প্রতিষ্ঠিত।
৭. রাজনৈতিক ক্লান্তি, আঞ্চলিক নীরবতা এবং ভাগাভাগি দায়িত্বের প্রশ্ন
নিঃসন্দেহে গত আট বছরে বাংলাদেশ বিপুল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ বহন করেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমাগত কমে আসছে, আশ্রয়শিবিরে নিরাপত্তা ও অপরাধ পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও এর প্রভাব বাড়ছে। এই বাস্তবতায় দ্রুত প্রত্যাবাসনের প্রতি বাংলাদেশের আগ্রহ রাজনৈতিকভাবে বোধগম্য। কিন্তু বাস্তবসম্মত ও অধিকারভিত্তিক প্রত্যাবাসনের পরিবর্তে কেবল দ্রুত প্রত্যাবর্তনের ওপর জোর দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান এনে দেবে না। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট (ASEAN) এখনও “অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার” নীতির আড়ালে কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ রাখাইনের সংঘাত কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বাংলাদেশসহ সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়েছে। জাতিসংঘের Responsibility to Protect (R2P) নীতির মূল দর্শন হলো: কোনো রাষ্ট্র যদি নিজ জনগণকে গণহত্যা, জাতিগত নিধন বা মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব সৃষ্টি হয়। রোহিঙ্গা সংকট সেই নীতির একটি কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া প্রায়শই রাজনৈতিক বিভাজন, কূটনৈতিক দ্বিধা এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কাছে সীমাবদ্ধ থেকেছে।
৮. ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন: সংকটের মূল উৎস
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় আইনি বাধা হলো মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন। এই আইন রোহিঙ্গাদের দেশটির স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর তালিকা থেকে কার্যত বাদ দিয়ে তাদের রাষ্ট্রহীনতার মধ্যে ঠেলে দেয়। এর ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বসবাস করেও তারা নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, চলাচল ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই আইন বহাল রেখে প্রত্যাবাসনের যেকোনো উদ্যোগ মূল সমস্যাকে অক্ষুণ্ণ রাখবে। কারণ নাগরিকত্ব ছাড়া প্রত্যাবর্তন মানে নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য এবং পুনরায় বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিকে বৈধতা দেওয়া। ফলে প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংস্কার অথবা এমন একটি আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যা রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব এবং সমঅধিকার নিশ্চিত করবে। অতএব, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কেবল সীমান্ত অতিক্রম করে মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নাগরিকত্ব, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন। এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধান ছাড়া প্রত্যাবাসন হবে সাময়িক, অনিরাপদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

ঢাকা, বাংলাদেশ
নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ শরণার্থী আইন গবেষণা কেন্দ্র, এবং সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস।

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
প্রভাষক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরিচালক, বাংলাদেশ শরণার্থী আইন গবেষণা কেন্দ্র।
