শুভাশিস মাথা নিচু করে এসএসকেএমের মেইন ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এলো। বেশ কয়েকদিন ধরে ও হাসপাতালেই পড়ে আছে, মা’কে সুস্থ করে ঘরে নিয়ে যাবে সেই আশায়। আজ শেষ আশাটুকুও ক্রমশ ম্রিয়মাণ। ডাক্তাররাও আশা ছেড়ে দিয়েছেন। ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন, ঈশ্বরকে ডাকো। মা, ক্রমশ ডিপ কোমায়, ভেন্টিলেশনে। একমাত্র যদি ঈশ্বর ফিরিয়ে দিতে পারেন তোমার মা’কে।
শুভাশিস হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে হাসপাতাল চত্বরে একটা মন্দিরের চাতালে এসে বসলো। পাশেই এক বুড়ি বসে ছিল। শুভাশিস অতটা খেয়াল করেনি।
শুভাশিসের বুকে যখন কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠছে তখন একটু আওয়াজ করে ফুঁপিয়ে উঠতেই পাশ থেকে বুড়ি বলল, “বাবা এলি? ডাক্তারের খোঁজ পেলি?”
শুভাশিস চমকে উঠে মুখ ঘুরিয়ে বুড়ির দিকে চেয়ে বলল, “আমাকে বলছো?”
বুড়ি বলল, “তোকে বলবো না তো কাকে বলব? তুই কখন আমাকে বসিয়ে রেখে ডাক্তারের খোঁজে গেছিস, একটু জল পর্যন্ত খেতে পাচ্ছি না। পেটের খিদেতে মাথা ঘুরছে। আগে একটু জল দে, আমার খাবার নিয়ে আয়।”
একে মায়ের দুঃখে কাতর, তার উপরে আবার এই বুড়ির কথা শুনে শুভাশিস হতবম্ব।
শুভাশিস নিজের জলের বোতলটা বুড়িকে এগিয়ে দিতে গিয়ে বুঝল, বুড়ি চোখে দেখতে পায় না। শুভাশিস জলের বোতলের ছিপিটা খুলে বোতলটা হাতে ধরিয়ে দিল।
বুড়ি এক নিঃশ্বাসে বোতলের সবটুকু জল খেয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “অনেকক্ষণ ধরে জল খাইনি, তেষ্টায় গলাটা শুকিয়ে আসছিল। জলের কলটা খুঁজে নিয়ে জল খাব তারও তো উপায় নেই। চোখের মাথা খেয়ে বসে আছি। সেজন্যই তো অনেকদিন ধরে বলে বলে তোর সাথে আজকে হাসপাতালে এলাম। কিরে! ডাক্তারের খোঁজ পেলি!”
শুভাশিস বুড়িকে ভালো করে বুঝিয়ে বলল, “আমি তোমার কেউ নই। আমার মা’ও এই হাসপাতালে ভর্তি আছে। তাই এখানে পড়ে আছি। তোমাকে কে এখানে রেখে গেছে?
বুড়ি উত্তরে, “আরে আমার ছেলেই তো বলল- তুমি এখানে বসো, আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করে আসছি। তোমাকে নিয়ে যাব। সেই থেকেই তো বসে আছি।”
শুভাশিস জিজ্ঞাসা করল, “কতক্ষণ বসে আছো?”
বুড়ি বলল, “অতশত আমি জানিনা, তা অনেকক্ষণ হবে। কতক্ষণ ঘুমিয়ে পড়লাম, কতবার জেগে উঠলাম, ছেলেকে ডাকলাম, তবুও ওর পাত্তা নেই। আচ্ছা বাবা, এখানে ডাক্তারের নাম লেখাতে কতক্ষন লাগে? তুমি তো তোমার মাকে নিয়ে এখানে চিকিৎসা করাচ্ছ? তোমার মাকেও বসিয়ে রাখতে হয়েছিল?”
শুভাশিস উত্তর দিতে গিয়েও কিছু বলতে পারল না। জিজ্ঞাসা করল, “বাড়িতে আর কে কে আছে?”
বুড়ি উত্তরে বলল, ‘কত্তা তো কবেই চলে গেছে পরপারে। এখন ছেলে, বউ আর নাতি নাতনির সংসার। ইদানিং চোখে দেখতে পাই না। ঘরের ফাই-ফরমাস কাজও করতে পারি না। নাতি-নাতনি গুলোকেও সামলাতে পারি না। সংসারে বোঝা। তাই কবে থেকেই ছেলেকে বললাম চোখে দেখতে পাই না। আমাকে নিয়ে সংসারে অশান্তি। তোকেও বৌমার গঞ্জনা শুনতে হয়। বৌমা বারবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। আমারও কোথাও যাবার জায়গা নেই। তার চেয়ে বরং হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আমার চোখটাকে ভালো করে দে। আমি চোখে দেখতে পেলে আবার মন দিয়ে তোদের ঘর সংসারের সব কাজ করে দেব। নাতি-নাতনি গুলোকে সামলাবো, বৌমা রেগে গিয়ে আমাকে আর ঘর থেকে চলে যেতে বলবে না।’
বুড়ি বলতে লাগলো, “বারবার বলার পর ছেলেই আমাকে নিয়ে হাসপাতালে এল। সকাল থেকে বসে আছি, কতক্ষণ হয়ে গেল। কি জানি রাত হয়েছে কিনা। এখনো তো সে ডাক্তারের খবর নিয়ে এলো না। একবার আমার খবরও নিলো না।”
শুভাশিস ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত প্রায় দশটা। বুড়িকে জিজ্ঞাসা করল, “সারা দিন কিছু খাওনি?” বুড়ি, বলল “না। আশিস বললো বসো, আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।“ বুড়ি মাথা নাড়িয়ে বললো, “খাবার না আনলেও হবে, তুমি বাবা আগে আমার ছেলের খবর নিয়ে এসো। না জানি ছেলেটার কোথায় কি হলো? সারাদিন ফিরল না, ডাক্তারের খবর আনল না। বড় ভয় হয়। পেটে ধরেছি তো। আমার ডাক্তারের খোঁজ করতে গিয়ে কোথাও কিছু হয়ে গেল নাতো! বাড়িতে ঘরে বউ, দুটি ছেলেপুলে। আমার কথা না হয় বাদ দিলাম। বাবা, তুমি একটু খবর নিয়ে এসো আমার ছেলের। ওর কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচবো কেমন করে?”
শুভাশিস বুড়িকে বসিয়ে খাবার আনতে গেল। রাতের বেলা হাসপাতালের বাইরের হোটেল থেকে রুটি আর সবজি কিনলো, পাশের মিষ্টির দোকান থেকে দুটো মিষ্টি। আর এক বোতল জল নিজের জন্য। মায়ের জন্য মন খারাপ শুভাশিসের, কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না।
শুভাশিস বুড়ির জন্য খাবার কিনে নিয়ে এসে বুড়ির হাতে তুলে দিল। বুড়ি খাবার মুখে তোলার আগে আবার জিজ্ঞাসা করল, “হ্যাঁগো আমার ছেলের কোন খোঁজ পেলে?”
শুভাশিস বলল, “খোঁজ করছি। তুমি এখানে বসে থাকো। ঘুম পেলে এই মন্দিরের চাতালে শুয়ে পড়ো।” এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুড়িটার প্রতি শুভাশিসের কেমন মায়া পড়ে গেছে? বুড়ির ছেলে বুড়িকে ইচ্ছা করে ফেলে রেখে চলে গেল না তো? হাসপাতালের মধ্যে ওর ছেলের কিছু হলে নিশ্চয়ই খবর হতো। তাহলে বাড়িতে বউয়ের চাপে বোঝা হয়ে যাওয়া মাকে হাসপাতালে ফেলে চলে যাওয়া? এটাও সম্ভব? শুভাশিস ভাবতে লাগল।
সেই মুহূর্তেই শুভাশিসের মোবাইল বেজে উঠলো। হাসপাতালের আই. সি. ইউ. থেকে ওয়ার্ড মাস্টারের ফোন। শুভাশিস ফোনটা ধরে অপর প্রান্ত থেকে আই.সি.ইউ-তে আসতে বলায় বুঝতে পারল, ওর মা আর নেই।
রাতেই চলে গেছে শুভাশিসের মা। তারপর চারিদিকে ফোন, আত্মীয়-পরিজন বাড়ির লোকের রাতেই হাসপাতালে চলে আসা। কয়েক ঘন্টা পরে ভোরের আলো ফুটলো। শুভাশিসের আত্মীয়-পরিজন বন্ধু-বান্ধব সবাই হাসপাতালে। গাড়িও প্রস্তুত, মায়ের দেহ বাড়ি হয়ে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। শুভাশিস বিষন্ন মনে আবার মন্দিরের চাতালে গিয়ে যখন বসল তখন বুড়ির কথা মনে পড়ল। বুড়ি তখনও এক মনে মন্দিরে শুয়ে বিড়বিড় করে ছেলেকে ডাকছে।
কেউ এসেছে বুঝতে পেরে বুড়ি বলে উঠলো, “খোকা এলি?” শুভাশিসের মনে হল, এই ডাকটা ভীষণ চেনা। চোখ দিয়ে জল পড়ছে ওর, মা চলে যাবার দুঃখে ভেঙে পড়েছে। বুড়ির পাশে এগিয়ে গিয়ে বলল, “আমাকে বারবার তোমার ছেলে বলে ভুল করছ, আমি তো শুভাশিস, গতকাল রাতে তোমাকে খেতে দিয়ে মন্দিরে শুইয়ে দিয়ে গেলাম।”
বুড়ি বুঝতে পেরে বলল, “হ্যাঁ।“ তারপর বলল, “হ্যাঁরে, আমার ছেলের খবর পেলি? আমি কেমন করে থাকবো ছেলেকে ছেড়ে একা একা এখানে?”
শুভাশিস জিজ্ঞাসা করল “তোমার বাড়ি কোথায়? তোমার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসছি।“
বুড়ি বলল, “আমার বাড়ি কুসুমপুর।“
শুভাশিস জিজ্ঞাসা করল, “সেটা কোথায়?”
বুড়ি বলল, “কানা নদী পেরিয়ে, অশ্বত্থ তলার পাস দিয়ে, বামুনপাড়া পেরিয়ে আমাদের বাড়ি। আমার বাড়ির সামনে একটা বড় মনসা ঠাকুরের বেদি।”
শুভাশিস জিজ্ঞাসা করল, “সে তো বুঝলাম! কিন্তু জায়গাটার নাম কি? আশপাশে রেলস্টেশন আছে!”
বুড়ি বললো, “অতশত জানিনা, বেশ কিছুটা হেঁটে এসে বাস ধরতে হয় গঞ্জে যেতে।“
শুভাশিস আবার জিজ্ঞাসা করল, “কোন জেলায় তোমার বাড়ি?”
বুড়ি বলল, “তাতো জানিনা। আমি তো বাড়ি থেকেই হেঁটে আমার বাপের বাড়ি যাই। আরেকটু দূরে ছিল পিসির বাড়ি। এ ছাড়া তো আমি তেমন কোথাও যেতাম না। কাল সকালে ছেলে ভ্যানে চাপিয়ে রাস্তার ধারে নিয়ে এসেছিল। তারপর আমাকে একটা, দুটো, তিনটে বাস থেকে উঠিয়ে আর নামিয়ে এখানে নিয়ে এল। এই মন্দিরের বেদিতে বসিয়ে বলল- ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলে আসছি, তুমি বসো। ব্যাস, আমি বসে আছি। শুভাশিস বুঝতে পারল বিষয়টা কি। বাড়ির লোকের গর্জনে আর শাসনে অকর্মনা মাকে চিকিৎসার নাম করে এনে হয়ত হাসপাতালে বসিয়ে রেখে চলে গেছে!
ওইদিকে শুভাশিসের মাকে নামানো হয়েছে। সবাই মিলে ফুলে সাজানো গাড়িতে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত। শুভাশিস ফুল সাজানো গাড়িতে শোয়ানো মাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল। মা ছাড়া যে ওর কেউ নেই। বাকি সব আত্মীয়-স্বজন যে যার বৃত্তে। শুধুমাত্র বিয়ে না করা শুভাশিস ছিল মায়ের ভরসা। সাত ভাই বোনের সংসারে বাকি সব দাদাভাই-বোনেরা মায়ের খরচ দিয়ে ক্ষান্ত। বাকি সবকিছুই শুভাশিস সামলাতো।
সবাই শববাহি গাড়ির পিছনের ফাঁকা গাড়িতে শুভাশিসকে উঠতে বলল। শুভাশিস উঠতে গিয়েও একবার দূরে মন্দিরের দিকে তাকিয়ে আবার ফিরে এলো মন্দিরে।
বুড়ি তখনো মন্দিরে বসে। শুভাশিস বুড়িকে বলল, “কতক্ষণ আর এখানে বসে থাকবে? বাড়ির ঠিকানা বলতে পারছ না। আমার সঙ্গে চলো আমার বাড়িতে। আমার বাড়িতে তো আমি এমনি একা থাকি। এতদিন মা ছিল, সেও চলে গেল। তুমিও না হয় কিছুদিন থাকবে। তারপর তো একাকীত্ব আছেই।”
চোখে দেখতে না পাওয়া বুড়িকে এক প্রকার পাঁজা কোলা করে গাড়িতে তুললো শুভাশিস। নিয়ে চলল নিজের বাড়িতে। সামনে মায়ের মরদেহ। যাওয়ার সময় নিজের নাম, পরিচয়, ঠিকানা, ফোন নম্বর হাসপাতালের ভিতরে পুলিশ ফাঁড়িতে লিখে দিয়ে গেল- যদি ফিরে এসে কেউ বুড়ির খোঁজ করে।
এক মা চলে গেল, তবু তো আর একটা মা এলো শুভাশিসের সংসারে।
ওই যে ডাক্তার বলেছিল গতকাল রাতে, একমাত্র ঈশ্বরই ফিরিয়ে দিতে পারে তোমার মাকে। সত্যি, ঈশ্বরই ফিরিয়ে দিল শুভাশিসের মা’কে।

