অন্য কোনো দেশের ইতিহাসে কোনো একটা নির্দিষ্ট মাস এমন গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত কিনা তা জানা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে আগস্ট বারবার নতুন কিছু নিয়ে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আগস্টের ১ তারিখ ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জর্জ হ্যারিসন কনসার্ট ফর বাংলাদেশের আয়োজন দিয়ে শুরু, সেই মাসেরই ২০ তারিখ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান শহীদ হন। এই দুটি ঘটনাই আমাদের মুক্তির সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করেছে। অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক।
দেশ স্বাধীন হবার পড় তিনটি বড় ঘটনা ইতিহাসের চাকাই ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমাদের আজকের প্রবন্ধের বিষয় এই তিনটি বড় ঘটনার ফলে কারা সুবিধাভোগী হলো। উল্লেখ্য, “সুবিধাভোগী”বলতে এখানে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটনাগুলোর ফলে যারা ক্ষমতা, প্রভাব বা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে তাদের বোঝানো হয়েছে; এটি কোনো নৈতিক সমর্থন নয়। আসলে কোনো ঘটনার পর তাৎক্ষণিক ফলভোগী হয়তো সহজেই বোঝা যেতে পারে কিন্তু তার সুদূর প্রসারী প্রভাব কি পড়েছে বা পড়তে পারে তা শুধু তাত্ত্বিক ভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।বাকিটা ইতিহাসের গতিপথের উপরই ছেড়ে দেয়া উচিত।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। যার নামে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল এবং দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই দেশেরই শাসন ক্ষমতা হাতে নেবার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় এই হত্যাকান্ড পুরো বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথকেই বদলে দেয়। এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের নানান ধরণের ব্যর্থতাকে হত্যাকাণ্ডের পেছনে যৌক্তিকতা প্রমানের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু কোনো ধরণের হত্যাকান্ডকেই ‘ঠিক হয়েছে’ প্রমান করা যায় না এবং সেটা নিয়ে আলোচনা আমাদের এই প্রবন্ধের অংশও নয়। তাৎক্ষণিকভাবে এন্টি মুজিব এবং আওয়ামী লীগ গোষ্ঠী লাভবান হয়ে যায়। এই মানসিকতাকে কাজে লাগিয়েই ৭৫ পরবর্তী ক্ষমতাসীনরা বাংলাদেশে আওয়ামী বিরোধী একটা মঞ্চ গড়ে তোলে। সত্যি কথা বলতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সেই দুটি রাজনৈতিক ধারাই বহমান: আওয়ামী রাজনীতি ধারা এবং এন্টি আওয়ামী রাজনীতি ধারা। তবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ধর্মকে ব্যবহার করে যারা রাজনীতি করছে তারা। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ইসলামী দলগুলো আবার রাজনীতি করার সুযোগ পায় । শুধু তাই নয় শাহ আজিজ, আব্দুল আলিম, মাওলানা মান্নানের মত রাজাকাররা মন্ত্রিসভার স্থান পায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডার বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের রাজাকার তোষণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার বিষয় হতে পারে। ১৫ই আগস্ট এর ঘটনা অবশ্যম্ভাবী ছিল কিনা সেটা বলা যায় না, কিন্তু ১৫ই আগস্ট এর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি যে চিরতরে বদলে গেছে তা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়। জিয়াউর রহমানের পর এরশাদ সাহেব ক্ষমতায় এসে সেই একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। ক্ষমতার অগোচরে মৌলবাদী শক্তি দিন দিন পায়ের নিচের মাটি শক্ত করে গেছে।
আগস্ট মাসের তারপর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে খালেদা জিয়ার শাসনামলে ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট আওয়ামী লীগের মিটিংয়ে গ্রেনেড হামলা। তৎকালীন বিএনপি সরকার কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই জর্জ মিয়া নাটকের অবতারণা করে যা কখনোই কারো কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। কিন্তু একই সাথে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে পরবর্তী সময়ে আওয়ামীলীগ এবং হাসিনা ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকার কালেও এই ঘটনার কোন বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হয়নি। বিরোধীদলে থাকাকালে ২১শে আগস্টের এই ঘটনার তাৎক্ষণিক সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলো। খটকাটা এখানেই, বিএনপির মত রাজনৈতিক দল এটা না বোঝার কোন কারণ নেই যে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে দিলে কে লাভবান হবে। এর উত্তরটা আসলে শুরু হয়েছে আরো কিছুটা পেছনে। ১৫ ই আগস্ট এর পর যে মৌলবাদী শক্তির উত্থান হতে শুরু করে তা বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো তারাই একুশে আগস্টের ঘটনা ঘটিয়ে অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে চেয়েছে। যাই হোক, আসলে এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী সুবিধাভোগীও মৌলবাদী শক্তি। তেমন করে কোথাও তাদের নাম আসেনি, কিন্তু তারা তাদের শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে পেরেছে। এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তাদের শাসন আমলে আওয়ামী লীগ মৌলবাদী শক্তিকে তেমনভাবে ঘাটাঘাটি করেনি সম্ভবত দুটি কারণে এক. ভোট ব্যাংক যারা ধার্মিক কিন্তু মৌলবাদীদের পেছনের হিংস্র শক্তি সম্বন্ধে অবগত নয় আর দুই. মৌলবাদীদের শক্তিমত্তা সম্বন্ধে আওয়ামী লীগের ধারণা থাকার কারণে, পর পর তিনটি ভোটারবিহীন নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকার কারণে রাজনৈতিক ভাবে কারো মুখোমুখি হবার মতো শক্তিও ছিল না।
আগস্ট মাসের সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত ঘটনা ২০২৪ সনের ৫ই আগস্ট হাসিনার পলায়ন। ২০০৮ এর নির্বাচনে সর্বজন গৃহীত ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ এর ভোটারবিহীন নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রেখে দিন দিন স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে হাসিনা এবং তার দল। তাই হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ভেতরে ভেতরে অনেকেই ফুঁসে ছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সামনে রেখে তাই দেশব্যাপী আন্দোলন তৈরি করা শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল এবং তা ছাত্র-জনতা নির্ভীক আন্দোলনের মাধ্যমে গড়েও তুলেছিল। অসংখ্য মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ১৭ বছরের শাসনামলের অবসান ঘটলেও তার সুবিধাভোগী যে মৌলবাদী শক্তি হবে তা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায়নি। গণ আন্দোলন যখন চলছিল তখন অনেকেরই পরিচয় অজানা ছিল, এবং আন্দোলন অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়েই সবার সামনে হাজির হয়েছিল। এসব তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরেও বলা যেতে পারে, পরপর তিনটি ভোটার বিহীন নির্বাচন করার অপরাধে হাসিনার বিরুদ্ধে এই গণঅভ্যুত্থান অবশ্যম্ভাবী ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর মৌলবাদী শক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অনেক বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এবং এখন অব্দি তাদের আস্ফালন বেড়েছে।
আমার দৃষ্টিতে এই তিনটি ঘটনার সুবিধা ভোগী হচ্ছে মৌলবাদী শক্তি। কিন্তু এর দায়ভার ৭৫ পরবর্তী তথাকথিত দলীয় হর্তাকর্তা/রাজনীতিবিদদের নিতে হবে যারা অন্ধভাবে ক্ষমতার লোভে অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করেছে। আমি আমার কাঠগড় তথাকথিত দল দাস বুদ্ধিজীবীদেরও দাঁড় করাবো।হয়তো সময়ের পরিক্রমায় রাজনীতি অনেক বদলে গেছে। পুরানো সময়ের মতো ত্যাগী, আদর্শবান, ভবিষ্যতদর্শী রাজনীতিক আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই আদর্শের পরোয়া না করে ক্ষমতার লোভে থাকা রাজনীবিদেরা এবং তাদের মোসাহেব বুদ্ধিজীবীরা হয়তো আর কখনোই ইতিহাস থেকে কিছু শিখতে চাইবে না। যদিও আমার খুব ইচ্ছে হয় বিশ্বাস করতে এই ঘটনাগুলো থেকে আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দল কিছুটা শিক্ষা নেবে। কিন্তু আমি এও জানি ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমার তাই মনে হচ্ছে।

