পড়শী পড়শীর আরশি মেসি সেদিন কেঁদেছে বেশি

মেসি সেদিন কেঁদেছে বেশি

Post Views: 5
7 min read

টিনার আজ মন ভালো নেই। তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাঁদতে পারছে না। খুব কষ্ট হচ্ছে। এমন তো আগে কখনো হয়নি। কান্নার ব‍্যাপারে তার জুড়ি নেই। সামান্য মন খারাপে সে কাঁদে। চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরে। এমনও হয়েছে সে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুম থেকে উঠে সে মনে করতে পারেনি কেন রাতে কান্না করেছে। নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হয়ে ফিক করে একগাল হেসে বিছানা ছেড়েছে। মানুষ কতটা কষ্ট পেলে মন খারাপ করে, আর কত বেশি কষ্টে চোখের পানি ফেলে, আর কতটা দুঃখে চিৎকার করে কাঁদে টিনা জানে না। তবে তার জানতে খুব ইচ্ছে করে।

টিনা শান্ত প্রকৃতির মেয়ে। নিয়ম মেনে সব কিছু করে। শুধু কেনাকাটা করতে গেলে ওর তর সয় না। তাই স্টুডিওতে ছবি তুলতে গেলে সবসময় আর্জেন্ট চার্জ দিয়ে সাথে সাথে নেয়। দর্জির দোকানে গিয়ে একই কাজ করে। মজুরি বেশি দিয়ে আগে আগে ডেলিভারি নেয়। অর্থাৎ সবকিছুই তার আর্জেন্ট চাই। ব‍্যাপারটা জানাজানি হওয়ার পর বন্ধুরা তাকে টিনা না বলে আর্জেন্ট টিনা বলে ডাকে। টিনা নামটা খুব কমন না। তবুও ওদের ক্লাসে আরেকজন টিনা আছে। তাই টিনা প্রসঙ্গে কেউ কিছু বলতে গেলে অন্যরা বলে কোন টিনা? আর্জেন্ট টিনা? প্রথম প্রথম ওর বেশ মন খারাপ করতো। এখন আর করে না। কেন করে না সে নিজেও জানে না। হতে পারে সে আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক এ জন্যে।

ওর ছোট ভাই জামিলকে সে খুব স্নেহ করে, প্রশ্রয়ে রাখে। শুধু তার একটা জিনিস সে মেনে নিতে পারে না। জামিল ব্রাজিল দলকে পছন্দ করে। ঐটুকুন ছেলে সে খেলার কি বুঝে? টিনা তাকে আর্জেন্টিনায় ভেরাতে চেষ্টা করেছে অনেক কিন্তু সে সফল হয়নি। তার মুখে শুধু নেইমার, নেইমার। কিছুদিন আগে ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। জামিল মন খারাপ করেছে। ব্রাজিলের জন্যে নয় জামিলের জন্যে টিনার খারাপ লেগেছে। গতরাতে আর্জেন্টিনা স্পেনের কাছে নাস্তানাবুদ হয়েছে। টিনা প্রায় নিশ্চিত ছিলো এবার বিশ্বকাপ তারা জিতবে। সে এ বিজয় কিভাবে উদযাপন করবে ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু সারা মাঠে মেসি কিংবা অন্য কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র মার্টিনেজ জীবন বাজি রেখে গোল ঠেকিয়েছে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।

আর্জেন্টিনার পরাজয়ে জামিল ভীষণ খুশি হয়েছিল। চিৎকার করে লাফাচ্ছিলো। হঠাৎ তার চোখ পরে বোনের মুখের উপর। জামিল থেমে যায়। এই প্রথম বোধ করি একজন আর্জেন্টিনার সমর্থকের জন্যে এক ব্রাজিল সাপোর্টারের বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠে। জামিল তার বোনের কষ্ট কখনোই সহ্য করতে পারে না। সে বুঝতে পারল এখনই দাদাভাইকে ডাকতে হবে। দাদাভাই তাদের সাথে রাতে খেলা দেখেছে। এখন মনে হয় বিশ্রাম নিচ্ছেন।

দাদাভাই এলেন। এসেই বললেন, টিনা আপু তোমার কি মন খারাপ?

-জ্বী দাদাভাই।

-বেশি খারাপ?

-জ্বী।

-চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে?

-টিনা মাথা নাড়িয়ে বুঝাল হ‍্যাঁ।

-কান্না পেলে মন খুলে কান্না করো, কষ্ট কমে যাবে। কান্না চেপে রাখা ঠিক না। আল্লাহ কোন কিছুই শুধু শুধু দেননি।

-দাদাভাই আমি কাঁদতে পারছি না। আমার অনেক কষ্ট। আর্জেন্টিনা ফাইনালে হেরে গেলো!

-ভালো কিছু আশা করতে হয় আর সবচেয়ে খারাপ পরিনতির জন্যে প্রস্তুত থাকতে হয়। যে কোন সমস্যা মাথা দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হয়। মন যাই বলুক। বুদ্ধিমানরা তাই করে। তাছাড়া আর্জেন্টিনার হয়ে তুমি খেলোনি, প্রশিক্ষণও দাওনি ওদের। তুমি দলটিকে শুধু পছন্দ করো এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। ব্রাজিল দলের সমর্থকদের তুমি কখনো টিপ্পনি কাটোনা। তাহলে তোমার এতো মন খারাপ করবে কেন?

টিনার মন ভালো হতে শুরু করেছে। সে এখন কাঁদতে পারছে। তার চোখে জল। সে দাদাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

দাদা ভাই আবার বলতে শুরু করলেন… জগতের সব ঘটনা থেকে শিখতে চেষ্টা করবে। মেসি গোল করতে পারেনি বলে তোমার মন খারাপ। মনে রাখবে, জীবনের সব সময় একরকম যাবে না। মেনে নেওয়া শিখতে হবে। একটা দল দু’ একজন খেলোয়াড় দিয়ে কি সব খেলা জিততে পারে সব সময়? দেখ, স্পেনের সবাই মাথা ঠান্ডা রেখে একসাথে খেলেছে। তেমনি তুমি যদি পরীক্ষায় ভালো ফল পেতে চাও তবে তোমাকে শুধু অন্ক বা ইংরেজিতে ভালো হলে হবে না। সব বিষয়ে সুন্দর ধারণা থাকতে হবে। আবার খেয়াল করো মার্টিনেজ আর্জেন্টিনার হয়ে একা লড়েছে। সে কিন্তু সতীর্থদের দিকে তাকিয়ে থেকে হতাশ হয়ে বসে থাকেনি। তার মানে, যে কোনো কাজে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। খেলাধুলা মনকে প্রফুল্ল করার জন্যে মন খারাপ করে বসে থাকার জন্যে না। প্রতিবার যদি আর্জেন্টিনাই কাপ জেতে তবে অন্য দল খেলতে আসবে কেন?

টিনার মন একদম ভালো হয়ে গেলো। ওর বুকটা এখন বেশ হালকা লাগছে। আচ্ছা কষ্ট পেলে বুক ভারী হয় কেন? সে জানে না। দাদাভাই নিশ্চয়ই জানেন। এখন আর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। তবে সে নিজেই অবাক। সে তার দাদাভাইয়ের শশ্রুমন্ডিত নিস্পাপ চেহারার দিকে তাকিয়ে আবার কাঁদতে শুরু করলো। তবে এ কান্না দুঃখের নয় সুখের। তার মনে হলো এমন একজন দাদাভাই যার আছে তার কোনো দুঃখ থাকতে নেই। সে দাদাভাইকে জড়িয়ে ধরে বললো, দাদাভাই- ইউ আর গ্রেট, আমি তোমাকে ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি।

এবার জমির সাহেব লক্ষ্য করলেন তার চোখ জলে ভরা, তিনি কাঁদছেন। তার এমন কান্না করা ঠিক না। তিনি বুঝতে পারছেন কিন্তু কিছুতেই কান্না লুকাতে পারছেন না। জমির সাহেব ফাইনালে আর্জেন্টিনা দলকে সমর্থন করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন মেসি জীবনের শেষ ওয়ার্ল্ড কাপ খেলায় বিজয়ীর বেশে কাপটি মাথার উপর তুলে ধরুক।

টিনা বললো- দাদাভাই আপনি কাঁদবেন না। এটাতো খেলা। আমরা নিশ্চয়ই আবার কোনো বিশ্বকাপে জিতবো। দাদাভাইয়ের কান্না দেখে এবার জামিলও কাঁদতে শুরু করলো- যদিও সে জানে আজ তার কাঁদবার কথা না, আজ তার আনন্দের দিন। কিন্তু তবুও সে কাঁদছে। আবার এও বুঝতে পারছে- অন্যের দুঃখের দিনে হাসতে নেই।

২২ জুলাই, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

অধ্যাপক, বক্ষব‍্যাধি বিশেষজ্ঞ। সভাপতি, বাংলাদেশ ইন্টারভেনশনাল পালমনোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড স্লিপ সোসাইটি (বিপস)।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।