“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান” এই নামের সাথেই আমি বড় হয়েছি।
১৯৬৯ সালে যখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাঁকে আমি প্রথম দেখি। আমার রাজনীতি সচেতন বাবা-মার কল্যাণে আমি তাঁর তিনটি ঐতিহাসিক বিশাল জনসভা এবং বজ্রকণ্ঠী ভাষণের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম: ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে তাঁর মুক্তির পর, ১৯৭০ সালের জুন মাসে নির্বাচনী ভাষণে—পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ছয় মাস আগে, এবং সবচেয়ে স্মরণীয়—১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তাঁর স্বাধীনতার ডাকের ভাষণে।
সেই বিশাল জনসমুদ্র আর দেশপ্রেমী পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরেই আমি আমার অভিজ্ঞতাগুলো ছবিতে রূপ দিতাম। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মুক্তি সংগ্রাম ও আন্দোলনের নানা ঘটনাও আমি আমার চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তুলেছিলাম। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ বাড়ি ও পাড়া ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে, আমার বাবা তেজগাঁওয়ের বাসার একটি কুয়োর ভেতর আমার সেইসব চিত্রকর্মের বেশিরভাগই ধ্বংস করে ফেলেন। শুধু বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনী ভাষণের ওপর আঁকা আমার ১৯৭০ সালের একটি ছবি কোনোভাবে টিকে গিয়েছিল, যা ৫৬ বছর পর এখনো আমার কাছে সযত্নে আছে।
ছয় বছর বয়স হওয়ার আগেই আমি তৎকালীন সমগ্র পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সবচেয়ে ভূষিত শিশু শিল্পী হয়ে উঠি। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগীতায় প্রথম হয়ে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল গোল্ড মেডেল’ (রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক) জয় করি। আমরা দুই ভাই মার সাথে ট্রেনে নানি বাড়ি যেতাম, ঢাকার কমলাপুর থেকে নোয়াখালীর সোনাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন ভ্রমণের সমস্ত অভিজ্ঞতা একটি ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছিলাম।
১৯৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে আমার এই স্বর্ণপদক নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেই অনুষ্ঠান ১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের মার্চ নাগাদ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল উত্তাল। ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এলেও, ২৫শে মার্চ রাতে পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনী নৃশংস গণহত্যা শুরু করে, যা নয় মাসের একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের জন্ম দেয়, বাংলাদেশের জন্ম হয়। প্রথম এবং একমাত্র অল-পাকিস্তান প্রেসিডেন্সিয়াল গোল্ড মেডেলটি আমার আর কোনোদিন হাতে পাওয়া হয়নি। তবে কোনো দুঃখ ছিল না, কারণ জল্লাদ ইয়াহিয়া খানের সাথে করমর্দন ও ভোজন করতে হয় নাই।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার ঘনিষ্ঠভাবে দেখা হয়, তাঁর ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন—আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান দুই মিত্র দেশে প্রথম সরকারি সফরের প্রাক্কালে। তিনি শিশুশিল্পীদের একটি দলকে রাষ্ট্রপতি ভবন ‘বঙ্গভবনে’ আমন্ত্রণ জানান, যেখানে আমরা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের বাছাই করা, আমাদের আঁকা, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বেশ কিছু চিত্রকর্ম তাঁর সামনে উপস্থাপন করি। আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে দেখানোর জন্য তিনি ছবিগুলো ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন।
আমার আঁকা ছবিটির শিরোনাম ছিল “রায়েরবাজার বধ্যভূমি”—বিজয় অর্জনের পরপরই যেখানে আমাদের সবচেয়ে প্রথিতযশা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল, যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আমার মা-বাবার ঘনিষ্ঠ পারিবারিক ও রাজনৈতিক বন্ধু, শীর্ষস্থানীয় চক্ষু বিশেষজ্ঞ, ডা. আলীম চৌধুরী। ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের পরপরই আমার মা আমাকে সেই বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই ভয়াবহতার নির্মম অভিজ্ঞতা থেকেই আমি ছবিটি এঁকেছিলাম। ছবিটি এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে আমাদের সেই গ্রুপ ছবি তৎকালীন প্রধান প্রধান পত্রপত্রিকায় গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল।
আমার উদয়ন বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মিসেস জামিলা হক ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ঠিক পাশেই থাকতেন। তাঁর বড় ছেলে শুভ্রও একজন নামকরা শিশু শিল্পী ছিল। কখনো কখনো সপ্তাহান্তে বা ছুটির দিনে আমরা তাঁদের বাড়িতে একসাথে ছবি আঁকতাম এবং দুপুরের দিকে আমরা সতর্ক থাকতাম, কারণ বঙ্গবন্ধু দুপুরের খাবার নিজের বাড়িতে খেতে পছন্দ করতেন। তাঁর গাড়ি যাওয়ার সময় হলেই আমরা দৌড়ে গেটের কাছে গিয়ে তাঁকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতাম, আর তিনিও সবসময় হেসে আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়তেন।
১৯৭০-এর দশক জুড়ে আমি চিত্রাঙ্কনে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করি, যার মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৭৩ সালে বিশ্বের বৃহত্তম “শঙ্কর আন্তর্জাতিক শিশু প্রতিযোগিতা” (Shankar’s International Children’s Competition)-এ বয়স-গ্রুপে সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘জওহরলাল নেহেরু গোল্ড মেডেল’ লাভ করা, আমার বয়স-গ্রুপ ছিল ৯-১১ বছর। স্বর্ণপদকটা ছিল কোনো বাংলাদেশির জয় করা প্রথম নেহেরু পুরস্কার।
সবচেয়ে বেশি পুরস্কৃত শিশু শিল্পী হওয়ার সুবাদে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে বেশ কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার করমর্দন করার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমাদের শেষ দেখা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে বঙ্গভবনে, জীবিত অবস্থায় তাঁর সর্বশেষ জন্মদিন উদযাপনের সময়, যেখানে আমি তাঁর গলায় একটি ফুলের মালা পরিয়ে দিয়েছিলাম—সেই মুহূর্তটি জাতীয় টেলিভিশনে এবং চলচ্চিত্র শুরু হওয়ার আগে প্রেক্ষাগৃহের পর্দায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ দেখানো হয়েছিল।
পাঁচ সদস্যের একটি বাংলাদেশি শিশু প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে ১৯৭৫ সালের পুরো জুলাই মাসটি আমি বার্লিনের কাছে একটি সামার ক্যাম্পে হাজারো শিশুর সাথে কাটাই এবং বার্লিন, পটসড্যাম ও অন্যান্য শহর ঘুরে দেখি। আমাদের বাংলাদেশে ফেরার মাত্র দুই সপ্তাহ পর বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তখন আমার বয়স মাত্র এগারো বছর হলেও, আমি প্রচণ্ড মর্মাহত হয়েছিলাম এবং সেই ট্র্যাজেডির রাজনৈতিক ভয়াবহতা বোঝার মতো যথেষ্ট সচেতনতা আমার ছিল।
আমার প্রগতিশীল বেড়ে ওঠার পরিবেশই মূলত আমার জীবনদর্শন গড়ে দিয়েছিল। আমার প্রয়াত পিতা গোপেশ মালাকার ছিলেন একজন দীর্ঘকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মী, যিনি কৃষক-শ্রমিকদের অধিকার, ভাষা আন্দোলন ও স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের সাথে অতপ্রত ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং এ কারণে প্রায় আট বছর কারাভোগ করেছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি চারুকলা ও সিরামিকে দ্বৈত ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে নিজের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চারুকলার একজন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আমার মা এডলিন (ডায়াস) মালাকারও চারুকলার একজন স্নাতক, একজন শিল্পী এবং নারী ও শিশু কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী। তিনি নারী কল্যাণের ক্ষেত্রে প্রখ্যাত কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাথে কাজ করেছেন। তাঁদের চারপাশের শিল্পী, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদের যে পরিমণ্ডল ছিল, তা আমার মধ্যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী বাংলাদেশের প্রতি আজীবন সচেতনতা তৈরি করেছিল—যে দেশ ও সমাজ ব্যবস্থা প্রগতি এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিবে। আমি বিশ্বাস করি, এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আদর্শ ও লক্ষ্য।
এখন আমার ষাটোর্ধ্ব বয়সে এসে, আমি এক পরিপক্ক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধুর কীর্তিকে অবলোকন করি। তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন: সাড়ে সাত কোটি মানুষের একটি জাতিকে স্বাধীনতার পথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে হারিয়ে যাওয়া সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং আমাদের একটি পতাকা ও একটি জাতীয় সঙ্গীত উপহার দিয়েছিলেন। তিনি যেমন একজন মহান নেতা ছিলেন, তেমনি তাঁকে এক ধ্বংসস্তূপ ও শোষিত দেশকে পুনর্গঠনের বিশাল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল—যার সাথে জড়িয়ে ছিল স্নায়ুযুদ্ধ (USA-USSR Cold War), ভূ-রাজনৈতিক সংকট (Geopolitical Crisis), নানামুখী ষড়যন্ত্র, মৌলবাদ, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এবং দুর্নীতি। একটি দেশকে একেবারে শূন্য থেকে গড়ে তোলার জন্য তিনি মাত্র চার বছরেরও কম সময় পেয়েছিলেন, যার মধ্যে যেমন ছিল ঐতিহাসিক সাফল্য, তেমনি ছিল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভুলত্রুটি। তবুও, ইতিহাসের সমস্ত জটিলতা ছাপিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান চিরকাল আমার হৃদয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘জাতির পিতা’ হিসেবেই বেঁচে থাকবেন।

