পত্রিকা প্রকাশের শেষ কাজটি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। দেরি হয়ে গিয়েছিল, ভোর পেরিয়ে সকাল হয়ে গিয়েছিল। সাধারণত আমরা ভোরের মধ্যেই পত্রিকার কাজ শেষ করে ছাপাখানায় সব পাতা পাঠিয়ে দিতাম। সেদিন কি কারণে যেন দেরি হয়ে গিয়েছিল। দ্রুত হাতে কাজ করছিলাম। এরই মধ্যে ঘটে গেল সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা। দুটি যাত্রীবাহী বিমান দিয়ে হামলা চালানো হলো ম্যানহাটানের ওয়ার্লড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ারে।
আমাদের ‘এখন সময়’ পত্রিকার অফিসটি তখন ছিল উডসাইডে। অফিসে বসে কিছুই টের পাইনি। আমাদের এক বন্ধুর উত্তেজিত কন্ঠের ফোন পেয়ে ছুটে বেরিয়ে এসেছিলাম বাইরে। ওখান থেকে কিছুই দেখা যায় না। হাতের কাছেই পেলাম আমাদের পত্রিকা বিলি করেন এমন এক ভদ্রলোকের গাড়ি। তার গাড়িতেই ছুটলাম ম্যানহাটানের দিকে। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই বুঝলাম ম্যানহাটানে যাওয়া অসম্ভব। দেখলাম আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। দেখলাম ম্যানহাটান থেকে মানুষ পাগলের মতো বেরিয়ে আসছে। ইস্ট রিভারের ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। ম্যানহাটানের আকাশ জুড়ে ধোঁয়া আর ধুলো। তা ভেদ করে দৃষ্টি আর বেশিদূর এগোতে পারে না। টুইন টাওয়ারের দুটি ভবনই যে ধ্বসে গেছে তখনও বুঝতে পারিনি। কিছু দেখতে না পেয়ে চলে গেলাম পত্রিকার অন্যতম মালিক জাকারিয়া মাসুদ জিকোর এস্টোরিয়ার বাড়িতে। জিকো টিভি খুলে বসেছিলেন। সেখানেই দেখলাম দ্বিতীয় ভবনটিতে বিমান হামলার ভয়াবহ দৃশ্য।
দিনটি ছিল মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ, ২০০১ সাল। টুইন টাওয়ারে হামলা হয় একটিতে সকাল ৮:৪৬ মিনিটে, অপরটিতে ৯:০৩ মিনিটে। প্রথম হামলাটি কোন টেলিভিশনের পক্ষে সঙ্গত কারণেই ধরা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় হামলাটি টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গিয়েছিল। জিকোর বাসায় গিয়ে এই দ্বিতীয় হামলাটির দৃশ্য আমি টিভি’তে দেখেছিলাম।
এমন একটি হামলা ছিল অকল্পনীয়। সন্ত্রাসীরা দুটি ভিন্ন বিমানবন্দর থেকে আমেরিকান এয়ার লাইন্সের চারটি যাত্রীবাহী বিমান একযোগে হাইজ্যাক করে নিউইয়র্ক এবং ওয়াশিংটন ডিসি’র পাশে ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে এমন ধ্বংসলীলা চালাবে এ তো ছিল এক অসম্ভব ও অভাবনীয় ঘটনা। হামলায় টুইন টাওয়ারে নিহত হয়েছিল ২ হাজার ৭৫৩ জন। এদের মধ্যে ছিল এই দুটি ভবনে কর্মরত ২ হাজার ১৮৪ জন বেসামরিক নাগরিক আর বিমানটির যাত্রী ও ক্রু ১৪৭ জন।
এ দিনের এই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়দার ১৯ জন আত্মঘাতী সদস্য এই হামলায় অংশ নিয়েছিল। নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা প্রায় একই সময়ে বস্টন বিমানবন্দর থেকে একটি এবং নিউইয়র্কের জেএফকে থেকে পর পর তিনটি বিমান হাইজ্যাক করে সেগুলি দিয়ে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালায়। প্রথম দুটি বিমান দিয়ে হামলা চালানা হয় ম্যানহাটানের ওয়ার্লড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ারে। তৃতীয় বিমানটি আর্লিংটনে নিয়ে গিয়ে বিদ্ধস্ত করা হয় পেন্টাগন সদর দফতরের ওপর এবং চতুর্থ বিমানটি টার্গেটে পৌঁছাবার আগেই যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে বিদ্ধস্ত হয় পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে। সকাল ৮:৪৬ মিনিট থেকে ১০:০৩ মিনিটের মধ্যে এ সবগুলি হামলা সংঘটিত হয়।
প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, এই হামলার প্রধান হোতা মোহাম্মদ আত্তা বস্টন বিমানবন্দর থেকে প্রথম একটি বিমান হাইজ্যাক করে ৮:৪৬ মিনিটে আঘাত হানে ওয়ার্লড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে। এর সতের মিনিট পরই জেএফকে থেকে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের আর একটি বিমান হাইজ্যাক করে সাউথ টাওয়ারে হামলা চালায় মারওয়ান আল শেহি’র নেতৃত্বে আর এক গ্রুপ সন্ত্রাসী। আগুন আর ধোঁয়ার কুন্ডলিতে আচ্ছন্ন ভবন দুটি এক ঘন্টা বিয়াল্লিশ মিনিটের মধ্যেই পুরো ধ্বসে পড়ে। এর পরের হামলাটি হয় ৯:৩৭ মিনিটে পেন্টাগনের ওপর। এই হামলাটি পরিচালিত হয়েছিল হানি হানজোর নেতৃত্বে। আর চতুর্থ বিমানটি হাইজ্যাক হয়েছিল জিয়াদ জারা’র নেতৃত্বে। তাদের লক্ষ্যবস্তু কি ছিল জানা যায়নি, তবে মনে করা হয় লক্ষ্য ছিল হোয়াইট হাউস অথবা ক্যাপিটল ভবন। এটি পেনসিলভানিয়ার মাঠে বিদ্ধস্ত হয়েছিল ১০:০৩ মিনিটে। সব মিলিয়ে এক ঘন্টা ১৭ মিনিট।
আমেরিকার বুকে এমন দুর্ধর্ষ হামলার ঘটনা আর কখনও ঘটেনি। একদিকে বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর আর একদিকে আটলান্টিক পরিবেষ্টিত আমেরিকার সুরক্ষিত ভূখন্ডে হামলার কোন সুযোগই বলা যায় কারো নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জপানী হামলার ঘটনা ঘটেছিল এখানকার মূল ভূখন্ড থেকে বহু দুরে হাওয়াই-এর পার্ল হারবারে। সেটাই ছিল আমেরিকার বুকে একটা বড় ক্ষত। এই ক্ষত আজ অবধি আমেরিকানরা বয়ে চলেছে। এর প্রতিদান বড় মর্মান্তিকভাবে জাপানকে দিতে হয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আণবিক বোমা ব্যবহার করে আমেরিকা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো জাপানের দুটি সমৃদ্ধ জনপদ হিরোশিমা ও নাগাসাকি।
পার্ল হারবারের তুলনায় নাইন-ইলেভেনের হামলা অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক, অনেক বেশি ভয়াবহ। এ হামলা হয়েছে একেবারে খোদ আমেরিকার বুকে, একেবারে দুই বিখ্যাত শহর নিউইয়র্কে এবং ওয়াশিংটন ডিসি’র সংলগ্ন স্থানে। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার- সঠিক হিসাবে ২ হাজার ৯৭৬। আহত অসংখ্য, ক্ষয়ক্ষতি অপরিসীম। এই হামলার বদলা নিতে আমেরিকা অভিযান চালিয়েছে সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়দার বিরুদ্ধে। হত্যা করেছে সংগঠনের শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনকে। বিভিন্ন দেশ থেকে ধরে এনেছে হামলা পরিকল্পনাকারী সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের। আল কায়দা নামের সন্ত্রাসী সংগঠনটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
তাদের হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে ওয়ার্লড ট্রেড সেন্টারের আদি দুটি টাওয়ার, যা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ভবন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই নয়, এই দুটি টাওয়ারই ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন। উত্তরের ১১০ তলা টাওয়ারটির উচ্চতা ছিল ১ হাজার ৩৬৮ ফুট; আর দক্ষিণ টাওয়ার ছিল ১ হাজার ৩৬২ ফুট।
সেদিন আমাদের পত্রিকা ‘এখন সময়’-এর প্রকাশ বিলম্বিত হয়েছিল। আগের খবর ফেলে দিয়ে এই ধ্বংসলীলার খবর দিয়ে পাতা ভরিয়েছিলাম। এবং যেহেতু মঙ্গলবারে শুধু এই পত্রিকাটিই প্রকাশিত হোত তাই বাংলা সাপ্তাহিকগুলির মধ্যে একমাত্র আমরাই প্রথম এই সন্ত্রাসী হামলার খবরটি দিতে পেরেছিলাম।


1 Comment
দেখলাম। ভাল লাগল। ধন্যবাদ।