পড়শী বিশ্বসংলাপ মক্কা প্রতিরক্ষা জোট এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা

Post Views: 709
13 min read

গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে এই ধরনের চুক্তি স্বভাবতই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে যতটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তার বাস্তব কাঠামো নিয়ে অস্পষ্টতা ঠিক ততটাই বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে যৌথ বিবৃতিতে রয়েছে চুক্তি স্বাক্ষরিত যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর অর্থ কী হতে পারে তা নিয়ে নানান আলোচনার মধ্যেই কিছু নতুন সিদ্ধান্ত এসেছে। চুক্তিটির অধীনে প্রথম ত্রিদেশীয় বৈঠকের পর কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। বৈঠকে রিয়াদে একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিনিধি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিন দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো, সামরিক বাহিনীর ইন্টারঅপারেবিলিটি (interoperability), যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মতো বিষয় নিয়ে কাজ করার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ, চুক্তিটি শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা হয়ে থাকছে না, বরং আপাত দৃষ্টিতে একটি সামরিক জোট হওয়ার পথে।

অবশ্য এতেও অস্পষ্টতা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। এই সহযোগিতাগুলো কীভাবে এগোবে, তা কিছুটা স্পষ্ট হলেও চুক্তি ঠিক কীভাবে কাজ করবে কিংবা বাস্তবে যৌথ প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি কীভাবে কার্যকর হবে সেই বিষয়টি এখনও পরিষ্কার নয়।

চুক্তিটির অস্পষ্টতার সুবিধা এবং সীমাবদ্ধতা দুটোই আছে। চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিপক্ষকে একটি সতর্কবার্তা দেয়া। যেকোনো ধরনের হামলায় কেবল একটি দেশ না বরং চুক্তি স্বাক্ষর করা বাকি দেশগুলোর সাথেও লড়তে হবে। সহজ করে বললে সৌদি আরবের উপর হামলা হলে তাকে একা লড়তে হবে না- পাকিস্তান ও তুরস্কও পাশে দাঁড়াতে পারে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশ ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, কী পরিস্থিতিতে সহায়তা কার্যকর হবে, নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা থাকবে কি না এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের এখনো কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হাকান ফিদানের ভাষ্য অনুযায়ী কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে সহায়তার ধরন ও মাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হবে না; বরং আক্রান্ত দেশকে সহায়তা চাইতে হবে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হবে। বাস্তবে কোনো সামরিক সংকট কিংবা আকস্মিক হামলার মুহূর্তে এই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। একই সঙ্গে এই অস্পষ্টতার একটি কৌশলগত দিক আছে। যেকোনো একটি দেশের সংঘাতে অন্যদের তাৎক্ষনিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে না। অর্থাৎ, সংকট তৈরি হলে তিন দেশই নিজেদের স্বার্থ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কীভাবে এগিয়ে আসবে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিবেচনায় এই নমনীয়তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

এটি কিন্তু চুক্তিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হয়ে উঠতে পারে। কোনো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ যদি মনে করে এই নীতির বাস্তবে কোনো সামরিক পরিণতি নেই, তাহলে চুক্তিটির ডিটেরেন্স ভ্যালু দুর্বল হতে পারে। সংঘাতের সময় তিন দেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে তার উপর চুক্তিটির সাফল্য ও কার্যকারিতা নির্ভর করবে। সে ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে হামলা থেকে বিরত রাখতে হলে চুক্তিতে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি থাকা জরুরি, যাতে হামলার আগে তারা পরিণতি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। সুতরাং, মক্কা চুক্তির শক্তি এবং দুর্বলতা একই জায়গায়- এর অস্পষ্টতা। এই অস্পষ্টতা সীমাবদ্ধতা নাকি কৌশলী পদক্ষেপ- দেশগুলোর ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত এই প্রশ্নের উত্তর দেবে।

চুক্তির সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তিন দেশই বলেছে, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং অন্য দেশগুলোর জন্যও এতে যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু চুক্তিটি ঠিক এমন এক সময়ে স্বাক্ষরিত হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে। চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরান সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল রিয়াদের কাছে এই নিরাপত্তা নিশ্চয়তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই এই সময়ে এমন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের অর্থ হলো সৌদি আরব ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। রিয়াদ এখন ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আর কী ধরনের বিকল্প তৈরি করা যায়, সেটিও খুঁজছে।

তাহলে প্রশ্ন আসে, বিকল্প অংশীদার হিসেবে পাকিস্তান ও তুরস্ক কেন? আসলে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের উপস্থিতি একেবারেই অপ্রত্যাশিত নয়। দুই দেশ এর আগেই একটি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। নতুন মক্কা চুক্তি সেই সম্পর্ককেই একটি ত্রিপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মিশরের সম্পর্ককে ঘিরে যে ‘R4’ কাঠামোর আলোচনা রয়েছে, তাতেও এই দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠতার একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে চুক্তিটিকে শুধু যৌথ নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে তিন দেশের আলাদা আলাদা স্বার্থও কাজ করছে।

প্রশ্ন হলো, এই হিসাবের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা হলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে অস্বাভাবিক মনে করা উচিত নয়। সমস্যা হলো এই ধরনের উদ্যোগকে শুধু ‘ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা’ হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়। ঢাকাকে চিন্তা করতে হবে এই চুক্তি আমাদের কোন বাস্তব নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করবে!

বর্তমান চুক্তিতে স্বাক্ষরিত দেশগুলোর নিরাপত্তা সংকট আর বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংকট এক নয়। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে রিয়াদ, ইসলামাবাদ এবং আংকারার নিরাপত্তা সংকটও ভিন্ন। তবে তারা কেন একজোট হলো? এই প্রশ্নের উত্তর আগেই দেয়া হয়েছে। এর বাইরে সৌদি আরবের প্রধান উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে ইরান, হুথি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, উপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং জ্বালানি অবকাঠামোর সুরক্ষা। পাকিস্তানের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ সীমান্তকেন্দ্রিক- ভারত এবং আফগানস্তান সীমান্তে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তুরস্কের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার আবার ন্যাটো, সিরিয়া, ইরাক, ভূমধ্যসাগর এবং তার নিজস্ব আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের বড় অংশ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্র নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলা। এসব সমস্যা এই ধরনের সামরিক জোটের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব না।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় হলো বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা বাজেট সৌদি আরব, তুরস্ক কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশের তুলনায় নগণ্য। ফলে এমন কোনো চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে প্রশ্ন উঠবে বাংলাদেশ এই জোটকে কী দেবে এবং বিনিময়ে কী পাবে? বাংলাদেশ হয়তো সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কিংবা গোয়েন্দা সহযোগিতার কিছু সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু এসব সহযোগিতা দ্বিপাক্ষিকভাবে অর্জন করা সম্ভব। বরং জোটে যোগ দিলে সংঘাতে জোড়ানোর দায় তৈরি হবে। বাংলাদেশ এমন কোনো সংঘাতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক মূল্য বহন করার অবস্থানে নেই। অন্য দেশের নিরাপত্তা সংকটের বোঝা নিজের কাঁধে নেওয়ার মতো দায়ও বাংলাদেশের জন্য তৈরি করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ স্থল ও নদী সীমান্ত, চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বঙ্গোপসাগর-কেন্দ্রিক সামুদ্রিক স্বার্থের কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাভাবিকভাবেই বহু-মাত্রিক। তাই কোনো নির্দিষ্ট সামরিক জোটে যোগ দেওয়া মানে শুধু নতুন কিছু নিরাপত্তা অংশীদার পাওয়া নয়; একই সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান সম্পর্কে একটি নতুন বার্তা পাঠানো। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy)। অর্থাৎ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা, কিন্তু কোনো একটি নিরাপত্তা জোটের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত না হওয়া, যাতে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার স্বাধীনতা কমে যায়। মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে।

এর সঙ্গে আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামরিক ইন্টারঅপারেবিলিটি ও যৌথ মহড়ার মতো সহযোগিতা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা সামরিক অবকাঠামো ব্যবহারের প্রশ্ন আসলে কিংবা সাময়িক সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব এলে বাংলাদেশ তখন কী করবে! সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ভারতের ক্ষেত্রে। মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তানের উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বিষয়টিকে অন্য যেকোনো সম্প্রসারণের চেয়ে বেশি জটিল করে তুলেছে। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা খাতে সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা আর যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর সদস্য হওয়া এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ যদি এমন একটি চুক্তিতে যোগ দেয়, যেখানে পাকিস্তানের ওপর হামলাকেও বাংলাদেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতিগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে, তাহলে প্রশ্ন আসবে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের কোনো পর্যায়ে বাংলাদেশ কী অবস্থান নেবে? বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ হলো আঞ্চলিক সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং কোনো পক্ষের সামরিক সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে না পড়া। কিন্তু এমন একটি প্রতিরক্ষা কাঠামোর সদস্য হলে সেই নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এমনকি এমন কোনো সংঘাতেও তাকে অবস্থান নিতে বা কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাপের মুখে পড়তে হতে পারে- যেখানে নিজস্ব নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই।

এই বিষয়টিকে এমনভাবে দেখারও সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দেবে কি না- তা মূলত ভারতের আপত্তি বা আগ্রহের ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ভিত্তি ভারত কী চায় তা নয়, বরং নির্ভর করে বাংলাদেশের জন্য কোন সিদ্ধান্তটি সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত এবং জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তার উপর। তবে এটিকে ঘিরে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এটিকে ভারতের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরার রাজনীতি অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু বাস্তবতার জায়গা থেকে দেখলে, এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা স্বার্থের খুব বেশি সম্পর্ক নেই।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এমনিতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, জ্বালানি ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্ক রক্ষার জন্য বাংলাদেশের কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা হতে পারে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে, সামরিক জোটের সদস্য হিসেবে নয়।

তাহলে বাংলাদেশের করণীয় কী? বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো কৌশল হতে পারে জোটে না গিয়ে অংশীদারিত্ব বাড়ানো। ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর যেকোনো উদ্যোগকে বাংলাদেশ সমর্থন করতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিকভাবে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো যেতে পারে। প্রয়োজন হলে- আঞ্চলিক সংঘাত প্রশমনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও রাখতে পারে বাংলাদেশ। যেহেতু, চুক্তিটির কাঠামো, কার্যকর প্রক্রিয়া এবং সদস্যদের দায়িত্ব এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, ফলে এতে যোগ দিলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে কী দায়িত্ব নিতে হতে পারে সেটা পরিষ্কারভাবে বলা যাচ্ছে না। কাজেই চুক্তিটি কীভাবে এগোয় এবং বাস্তবে কী রূপ নেয়, তা পর্যবেক্ষণ করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশি যুক্তিসঙ্গত।

শেষ পর্যন্ত “বিশ্ব মুসলিম সমাজের” অংশ হওয়া রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় একটি বক্তব্য হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের নিরাপত্তা নীতি কোনো রাজনৈতিক রেটোরিকের ভিত্তিতে নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য কোন অবস্থানটি সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক হবে তার উপর নির্ধারিত হওয়া যুক্তিযুক্ত।

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে একটি থিংক ট্যাঙ্কে কর্মরত আছেন।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।