রাজীব আশরাফ কে আপনি না চিনলেও দেখেছেন, শুনেছেন কোথাও না কোথাও। এক তার ছেঁড়া পুরোনো ইয়ারফোনে, রেডিওতে, বই মেলা, শাহবাগে, শাহবাগ টু মিরপুরের বাসে, মিরপুর-১ এ নান্নু মার্কেটে কিংবা শওকতের কাবাবের দোকানে। আর সেসব কোথাও যদি দেখে বা শুনে না থাকেন তাহলে আজ থেকে অন্তত “ফুলগুলো সব লাল না হয়ে নীল হলো ক্যান?” প্রশ্নের উত্তর ভাবতে ভাবতে গীতিকবি, পরিচালক, অভিনেতা, লেখক রাজীব আশরাফের সাথে আপনার পরিচয় হোক! একজন আপাদমস্তক শিল্পীর শব্দ যাত্রায় আপনিও সঙ্গী হোন।
কিছু গান কানে শোনা যায়, কিছু গান থেকে যায় জীবনের ভেতরে। আর কিছু শব্দ— তারা একসময় গান থেকে বেরিয়ে মানুষের হয়ে যায়। রাজীব আশরাফের ‘হোক কলরব’ তেমনই এক শব্দের গল্প।
একদিন ঢাকায় বসে একজন তরুণ গীতিকবি লিখেছিলেন— “হোক কলরব…”
সম্ভবত তখন তিনি জানতেন না, কয়েক বছর পর এই দুটি শব্দ সীমান্ত পেরিয়ে অন্য একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠবে। জানতেন না, তাঁর লেখা একটি গানের নাম একদিন মিছিলের ব্যানারে উঠবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগ হবে, আর হাজারো তরুণের কণ্ঠে ফিরে ফিরে আসবে।
কিন্তু তার আগে রাজীব ছিলেন কবি। নিভৃত, অস্থির, কৌতূহলী এক কবি।
রাজীব আশরাফ গান লিখেছেন, কবিতা লিখেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, অভিনয় করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ধরেছি রহস্যাবৃত মহাকাল’। সংগীতশিল্পী অর্ণবের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিশীল সম্পর্ক বাংলা গানের একটি বিশেষ অধ্যায়। অর্ণবের কণ্ঠে তাঁর লেখা ‘হোক কলরব’, ‘প্রকৃত জল’, ‘নাম ছিল না’, ‘ঘুম’, ‘ধূসর মেঘ’, ‘রোদ বলেছে হবে’ সহ আরও অনেক গান তরুণ শ্রোতাদের কাছে আলাদা এক আবহ তৈরি করেছিল।
রাজীবের গানের জগৎ খুব চেনা অথচ অচেনা। সেখানে মেঘ আছে, জল আছে, জোনাকি আছে, শহর আছে—কিন্তু এগুলো কেবল দৃশ্য নয়। প্রতিটি দৃশ্যের ভেতরে যেন আরেকটি দৃশ্য লুকিয়ে থাকে। প্রেমের গান লিখতে গিয়েও তিনি শুধু প্রেমের কথা বলেননি; বলেছেন একাকিত্বের, অপেক্ষার, হারিয়ে যাওয়ার। তাঁর শব্দে তাই একটা বিকেল কখনো শুধু বিকেল থাকে না।হয়তো সেখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, যার কাছে ফিরে যাওয়ার মতো কোনো ঠিকানা নেই।
এই কারণেই রাজীবের গান শুনলে মনে হয়, তিনি আসলে গান লিখছিলেন না— একটি প্রজন্মের ভেতরের আবহাওয়া লিখছিলেন।
তারপর আসে ২০১৪ সাল। কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পুলিশের হস্তক্ষেপ ও আন্দোলন দমনের অভিযোগের পর প্রতিবাদ আরও ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই আন্দোলনের পরিচিত নাম হয়ে যায়— ‘হোক কলরব’। বাংলাদেশের একটি গানের নাম তখন কলকাতার রাস্তায় প্রতিবাদের স্লোগান।
সেই সময় Telegraph India লিখেছিল, ‘Hok kolorob’ শুধু প্রতিবাদের যুদ্ধধ্বনি হয়ে ওঠেনি; এর শব্দখেলা ও ব্যঙ্গাত্মক সুরও কলকাতার প্রতিবাদী ভাষাকে নতুন রং দিয়েছিল।অর্থাৎ, একটি গান তার জন্মস্থান অতিক্রম করে ফেলল।
‘হোক কলরব’ গানটির কথার ভেতরের প্রশ্নগুলো আন্দোলনের সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না। কিন্তু নামটি যেন একেবারে নিখুঁতভাবে ধরে ফেলেছিল সেই সময়ের তরুণদের মন— নীরবতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার আকাঙ্ক্ষা।
‘হোক’— মানে ঘটুক।
‘কলরব’— মানে সবাই কথা বলুক।
শব্দের এর চেয়ে সুন্দর পুনর্জন্ম আর কী হতে পারে?
রাজীবের সৃষ্টির আরেকটি দিক ছিল দৃশ্য। তিনি চলচ্চিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, অভিনয় করেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে ছিল ‘জলচর’, ‘বিস্ময়’, ‘অ্যাকুয়ারিয়াম’। অর্থাৎ গান, কবিতা, ক্যামেরা— সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজের জন্য অন্যরকম একটি ভাষা খুঁজেছেন।
২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে রাজীব আশরাফ চলে গেলেন।চল্লিশ বছর শিল্পীর জন্য খুব বেশি সময় নয়।তবু রাজীবের গল্পে বয়সের হিসাবটা শেষ পর্যন্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর শব্দগুলো কত দূর গিয়েছিল।
একজন কবি লিখেছিলেন। একজন শিল্পী সুরে তাকে তুলে দিয়েছিলেন। মানুষ শুনেছিল।তারপর একদিন অন্য দেশের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণেরা সেই শব্দ হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল।রাজীব তখন হয়তো কোথাও ছিলেন না। কিন্তু তাঁর শব্দ ছিল। এটাই সম্ভবত একজন গীতিকবির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি— একদিন নিজের কণ্ঠ থেমে গেলেও নিজের লেখা অন্য মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকা।
রাজীব আশরাফ তাই শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় গানের গীতিকার নন। তিনি সেই মানুষ, যার লেখা একদিন গান থেকে বেরিয়ে এসে হয়ে উঠেছিল মানুষের সম্মিলিত আওয়াজ।
হোক কলরব।
আর সেই কলরবের ভেতরেই, কোথাও খুব নীরবে, আজও বেঁচে আছেন রাজীব। কেউ হয়তো জানবেও না, এই কয়েকটি শব্দের পেছনে ছিলেন এক তরুণ কবি, যিনি শব্দকে কখনো পুরোপুরি বশে আনতে চাননি।
আর কোনো এক শহরে, কোনো এক মিছিলে, কোনো এক তরুণ আবার সেই শব্দ উচ্চারণ করবে। তখন রাজীব আশরাফ থাকবেন না। থাকবে তাঁর কলরব। কারণ রাজীব আশরাফের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো ছিল— তিনি সৃষ্টি করতে চাইতেন।তাঁর শুরু করা সেই সৃষ্টিশীল শব্দের যাত্রা আমরা কোনোদিনই থেমে যেতে দেবো না।

