যারা ৯/১১-এর আগে আমেরিকায় ছিলেন, তারা হয়তো আমার কথাটা বুঝবেন। ২০০১ সালের সেই সেপ্টেম্বর সকালের পর এই দেশের চেহারা এবং মানুষের মানসিকতায় এমন একটা পরিবর্তন এসেছিল, যা আর কখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। পৃথিবী সেদিন বদলেছিল কি না, সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু আমেরিকা যে বদলে গিয়েছিল, সেটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। কারণ আমি পরিবর্তনের ঠিক আগের আমেরিকাকে দেখেছিলাম। তারপর কয়েক মাসের ব্যবধানে দেখেছিলাম তার পরের আমেরিকাকে।
আমার জন্ম আশির দশকের শুরুর দিকে আমেরিকাতে, যখন বাবা মা উচ্চশিক্ষার স্বার্থে এ দেশে ছিলেন। তিন মাস বয়সেই অবশ্য আমি বাংলাদেশে ফিরে যাই। তারপর শৈশব আর কৈশোরে অবশ্য বেড়াতে বেশ কয়েকবার আসা হয়ে। ১৯৯১ সালে প্রথমবার, ১৯৯৬ সালেও এসেছিলাম । ২০০১ সালের জুলাই-আগস্টে আবার এলাম— এবার উদ্দেশ্য ছিল একটু ভিন্ন – বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখা, কোথায় পড়াশোনা করতে আসবো সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। সেই সময়ের আমেরিকাকে আমার আগের দেখা আমেরিকারই মতো মনে হয়েছিল— সহজ, স্বাভাবিক, অনেক বেশি নির্ভার। আর সেই সফরের একটি বিকেল আজও খুব স্পষ্ট মনে আছে।
মা, নানু আর খালা খালুর সঙ্গে সারা দিন নিউ ইয়র্ক শহর ঘুরেছি। এখন কানেকটিকাটের বাড়িতে ফেরার পালা। গাড়ি হাডসন নদীর পাশ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ চোখ পড়ল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দিকে। অস্তমিত সূর্যের কমলা আলোয় টুইন টাওয়ার দুটোকে মনে হচ্ছিল বাস্তবতার বাইরে কোনো অপার্থিব ইমারত। আলো তাদের গায়ে পড়ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি ছুটে চলেছে, আর আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছি। যতক্ষণ চোখের আড়াল হয়নি, তাকিয়েই রইলাম। সেদিন এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং দেখা হয়েছিল। মনে মনে ঠিক করলাম— পরেরবার নিউ ইয়র্কে এলে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে অবশ্যই যাব। তখন কে জানত, সেটিই হবে আমার শেষ দেখা।
তার প্রায় দেড় মাস পর, সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ। ততদিনে বাংলাদেশে ফিরে এসেছি। বাসার বসার ঘরে বাবা-মায়ের সঙ্গে টেলিভিশনে সিএনএন দেখছি। প্রথমে বুঝতেই পারছিলাম না কী ঘটছে। তারপর দেখলাম দ্বিতীয় বিমানটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দ্বিতীয় টাওয়ারে আঘাত করল। কয়েক সপ্তাহ আগেই যে ভবন দুটোকে হাডসনের ওপার থেকে সূর্যাস্তের আলোয় দেখেছিলাম, সেগুলো তখন আগুনে জ্বলছে। তারপর ধ্বসে পড়ল।
আমি শুধু ভবন দুটো ধ্বসে পড়তে দেখিনি। আমার নিজের একটি ছোট্ট স্মৃতিও যেন সেদিন ধ্বসে পড়েছিল। যে জায়গাটিতে যাওয়ার জন্য আমি ‘পরেরবার’-এর অপেক্ষায় ছিলাম, সেই পরেরবার আর আসেনি। কয়েক মাস পর, ২০০২ সালের জানুয়ারিতে যখন পড়াশোনা করতে আমেরিকায় ফিরলাম, তখন প্রথমবার সত্যিকার অর্থে বুঝলাম— আমি যে দেশটিকে আগস্টে ছেড়ে গিয়েছিলাম, সেটি আর নেই। পরিবর্তনটা সবচেয়ে আগে চোখে পড়ল বিমানবন্দরে।
৯/১১-এর আগে বিমান ভ্রমণ অনেক সহজ ছিল। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু তার পরিধি ও কঠোরতা আজকের মতো ছিল না। বিশেষ করে ডোমেস্টিক টার্মিনালে স্বজনেরা বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে একেবারে গেট পর্যন্তই যেতে পারতেন। শেষ মুহূর্তে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানানো যেত। কেউ দূর শহর থেকে ফিরলে তাকে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানানোও সম্ভব ছিল। এই ছোট ছোট স্বাধীনতাগুলো তখন এত স্বাভাবিক ছিল যে, আমরা সেগুলোর মূল্য বুঝতাম না।
৯/১১-এর পর সেগুলো চলে গেল। নিরাপত্তা তল্লাশি কঠোর হলো, পরিচয় যাচাই বাড়ল, নতুন নতুন বিধিনিষেধ এলো। এসব হয়ে গেলো পুরো যাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যাকে বলা যায় ‘new normal’। আমার নিজের ক্ষেত্রে পরিবর্তনটি খুব তীব্রভাবে অনুভব করেছিলাম, কারণ কয়েক মাস আগেই আমি ঠিক সেই বিমানবন্দরগুলোতেই সম্পূর্ণ অন্যরকম অভিজ্ঞতা পেয়েছিলাম।
জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিক হওয়ায় আমি হয়তো কিছুটা সৌভাগ্যবান ছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে একই সময়ে অন্যান্য অনেকে যারা পড়াশোনার জন্য আমেরিকায় আসছিলেন স্টুডেন্ট ভিসায়, তাদের অনেকের অভিজ্ঞতা ছিল আরো তিক্ত। বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদ, দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত তল্লাশি— বিশেষ করে মুসলিম নাম, বাংলাদেশি পরিচয় কিংবা দক্ষিণ এশীয় চেহারার কারণে কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের আর শুধু একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
যারা আমেরিকায় এসেছিলেন পড়াশোনা করতে, স্বপ্ন নিয়ে, ভবিষ্যৎ গড়তে— তাদের অনেককেই এমন একটি অপরাধের ছায়া বহন করতে হয়েছিল, যার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। একদল মানুষরূপী পিশাচ ধর্মের নামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল; কিন্তু তার অভিঘাত গিয়ে পড়েছিল অসংখ্য নিরপরাধ মুসলমান ও দক্ষিণ এশীয় মানুষের জীবনে।
আমি নিজে সরাসরি হয়তো সেরকম অভিজ্ঞতার অনেকটা থেকে দূরে ছিলাম। কিন্তু চারপাশে পরিবর্তনটা স্পষ্ট ছিল। আমেরিকার নিরাপত্তা-চিন্তা বদলে গেছে, মানুষের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বদলে গেছে, আর অপরিচিত মানুষকে দেখার চোখেও কোথাও একটা অদৃশ্য সংশয় ঢুকে গেছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধান। একই দেশ। একই শহর। একই বিমানবন্দর। কিন্তু যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা…
সময় অবশ্য থেমে থাকেনি। নিউ ইয়র্ক আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নতুন ভবন উঠেছে। বিমানবন্দর আরও নিরাপদ হয়েছে। যারা ৯/১১-এর সময় শিশু ছিল, তারা এখন বড় হয়েছে; অনেকের কাছে এটি কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায়। কিন্তু আমার কাছে ৯/১১-এর স্মৃতি শুরু হয় টেলিভিশনের পর্দায় ধ্বসে পড়া টুইন টাওয়ার দিয়ে নয়। শুরু হয় হাডসন নদীর ধারে সেই বিকেল থেকে।
এক কিশোর গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে। সূর্য ডুবছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে টুইন টাওয়ার। সে ভাবছে, পরেরবার এসে ভবন দুটির ভেতরে যাবে। সে জানে না, কয়েক সপ্তাহ পর সেগুলো আর থাকবে না। সে জানে না, কয়েক মাস পর যে দেশে ফিরে আসবে, সেই দেশটিও আর আগের মতো থাকবে না।
আমি জানি না, ৯/১১-এর সঙ্গে সঙ্গে পুরো পৃথিবী বদলে গিয়েছিল কি না। কিন্তু আমার দেখা আমেরিকা সেদিনের পর আর আগের জায়গায় ফেরেনি। আর এটাই আমার কাছে ৯/১১ নিয়ে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত উপলব্ধি: আমি এমন একটি আমেরিকা দেখেছিলাম, যেটি কয়েক সপ্তাহ পর চিরতরে হারিয়ে যাবে— কিন্তু তখন আমি তা জানতাম না।
আজও যখন সেই বিকেলটির কথা মনে পড়ে, মনে হয়, আমি আসলে শুধু টুইন টাওয়ার দেখছিলাম না। আমি এমন একটি পৃথিবীকে শেষবারের মতো দেখছিলাম, যে পৃথিবীটা আমি তখনও জানতাম না যে হারাতে চলেছি। সেই পৃথিবী আর ফিরে আসেনি।
আমিও সেই আগের আমেরিকাকে আর কখনো খুঁজে পাইনি।

