তৃতীয় জন

Post Views: 480
15 min read

১.
এয়ারপোর্টের বাইরে ঝাঁ ঝাঁ রোদ। ফাঁকা রানওয়েতে বিশাল প্লেনটা একলা দাঁড়িয়ে আছে। লাউঞ্জে অনেক লোকের ভিড়। আবছায়া গুঞ্জনের মতো করে তারা কথা বলছে।

ওরা তিনজন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি।

ছেলেটির চুল বাতাসে কখন যেন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। মা অপলক দেখছিলেন তাকে, ভাবছিলেন সময় কি দ্রুতই না চলে যায়। সেদিনই না প্রথম স্কুলে গেলো ছেলে। আর আজ সে বিদেশ চলে যাচ্ছে। এখনও চুলটাও ঠিক করে আঁচড়াতে শিখলো না। ওখানে গিয়ে একা একা থাকবে কীভাবে? মায়ের হঠাৎ বুক ভেঙে কান্না এলো।

বাবা কখনোই বেশি কথা বলেন না। ছেলের দিকে তাকিয়ে তার ভারী গর্ব হলো। আড়চোখে খেয়াল করলেন, টাইয়ের নটটা ঠিকমতো বাঁধতে পারেনি সে। মনে মনে আবছা হাসলেন তিনি, এখনও ছেলেমানুষ। একবার ভাবলেন ঠিক করে দেবেন নটটিকে। পরে ভাবলেন, না থাক। লজ্জা পাবে বেচারা। পরে ঠিকই শিখে নেবে।

ছেলেটি এসবের কিছুই দেখছিল না। মাঝে মাঝে সে ঘাড় উঁচু করে খুঁজছিল কাউকে। অনেক মানুষের মধ্যে একজনকে।

ছোট ভাইটা এসে দাঁড়ালো পাশে।

‘ভাইয়া, প্লেনের সময় হয়ে যাচ্ছে। তোমার এবার এগোনো উচিত।’

বাবা-মা চঞ্চল হলেন। ছেলেটি নিচু হয়ে তুলে নিল ছোট্ট হ্যান্ডব্যাগটা। বাবা-মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমি যাচ্ছি।’

বাবাকে বিশাল মহীরুহের মতোন দীর্ঘ এবং বিস্তৃত মনে হচ্ছিল। তিনি ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘এগিয়ে যাও’।

মা কেঁদে ফেলেন। বাবা নিচুস্বরে বললেন, ‘আহ।’ তাঁর গলায় জলের আভাস স্পষ্ট। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে মা ছেলেটির হাত ধরে বললেন, ‘খোকা, ফিরে আসিস।’

দু’জনের দুই বিপরীত মন্তব্যে ছেলেটি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। তার চোখে দ্বিধা, হৃৎপিণ্ডে উচ্চাশা এবং বিচ্ছেদের মেঘ। সে বুঝছিল না কোন কথাটা তাকে মানতে হবে। ড্র হয়ে যাওয়া ফুটবল ম্যাচের দর্শকের মতো সে প্রশ্ন করতে চাইলো কাউকে। তৃতীয় কারো উপস্থিতি বড় দরকার ছিল তার। ভিড়ের মধ্যে আবারও সে খুঁজল কাউকে, অনেক মানুষের মধ্যে একজনকে।

২.
গ্রীষ্মের ছুটি বলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। অবশ্য সেটা বোঝার উপায় নেই। টিএসসিতে ছোট ছোট গ্রুপে আড্ডা চলছে। মধুর রেস্তোরাও ভর্তি। লাইব্রেরির নিচে জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েরা বসে আছে। দুপুরের রোদের তেজ কমে আসছে। গাছের ছায়ারা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

ছেলেটি বললো, ‘কোথায় যাওয়া যায় বলোতো?’

মেয়েটি মাথা নীচু করে হাঁটছিলো। আজ সে চুল বাঁধেনি। এলোচুলে মুখের একপাশটা ঢাকা পড়েছে। প্রশ্ন শুনে সে চোখ তুললো একটু, ‘যে কোন একখানে গেলেই হয়।’

ফুটপাথের উপর একটা বিশাল গাছ। সেটাকে পাশ কাটাতে যেয়ে মেয়েটির গায়ে প্রায় ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্যে একটা হাল্কা গন্ধ পেল সে। কোন পারফিউমের জানা নেই, তবে ভারী আকর্ষণীয়।

ছেলেবেলায় বাবা মাঝে মাঝে সুগন্ধী ইরেজার কিনে দিতেন। ভীষণ প্রিয় ছিল সেগুলো। স্কুল ব্যাগে থাকতো সবসময়, মধ্যে মধ্যে লুকিয়ে ঘ্রাণ নিতো সে। কোথায় যেন পড়েছিল, ফুলের মতো প্রতিটি মেয়ের গায়েও তার নিজস্ব গন্ধ থাকে। কেউ রজনীগন্ধা, কেউ সিগারেট, কেউ খবরের কাগজ। এই মেয়েটির গায়ে সুগন্ধী ইরেজারের ঘ্রাণ কেন, ছেলেটি ভাবে একটু। সব মেয়েরাই তো এক একটা ইরেজার, অতীতের দাগ টাগ মুছে ফেলে একমুহূর্তে। মেয়েদের সাথে ইরেজারের মিল খুঁজে পেয়ে নিজের উপর বেশ খুশী হয়ে পড়ে সে।

চৌমাথার মোড়ে যুগল দোয়েলের মূর্তি। তার ওপাশে লাল রঙা বাড়ির সারি, কার্জন হল।

‘চলো, আজ কার্জন হলে বসি।’

মেয়েটা মুখ তোলে এবার, একটু অবাক হয়েই তাকায় ছেলেটির দিকে। সাধারণত তারা বাইরে কোথাও বসে না কথা বলার জন্য।

ছেলেটা কৈফিয়ত দেওয়ার সুরে বলে, ‘অনেকবারই এখানে আসতে ইচ্ছে করেছে। আজ নাহয় একটু বাইরেই বসলাম। আবার কবে আসা হবে এখানে কে জানে।’

মেয়েটা কথা না বলে নিঃশব্দে মাথা নাড়ে সম্মতির ভঙ্গিতে।

গাছে ঘেরা পথ সোজা চলে গেছে। ভারী নির্জন এখন কার্জন হল। লাল বাড়িগুলোর চারপাশে সবুজ ঘাসের কার্পেট। তার মধ্যে বেখেয়ালী ভাবে ফুটেছে নানান বর্ণের ঘাসফুল।

একটা গাছের নিচে বসতে বসতে ছেলেটা খেয়াল করলো, মেডিকেল কলেজের ওপাশে আস্তে আস্তে সূর্য ঢলে পড়ছে। লালচে আলোয় মেয়েটির মুখ অন্যরকম দেখাচ্ছে। ভারী পবিত্র। মনে হয় স্বপ্নে দেখা কেউ। ঐ নামে, ঐ চেহারায় কাউকেই হয়ত বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

মেয়েটির চশমার কাচে ঠিকরে যাচ্ছে আলোর তীর, নাকের ডগায় চূর্ণ চূর্ণ ঘাম। ছেলেটির মনে পড়লো, তার পিতামহী বলতেন, যে মেয়ের নাক ঘামে, সে স্বামী সোহাগিনী হয়। কে হবে এই অপরূপ মেয়েটির স্বামী, কার পাশটিতে বসে বুলবুলির মতো মধুর স্বরে কথা বলবে মেয়েটি। হঠাৎ করে স্বামীর কথা মনে হলো কেন, ছেলেটি ভাবে। পরক্ষণেই মনে পড়লো যে অপরাহ্নের এই আলোকে বলে কনে-দেখা আলো। এই আলোতেই নাকি মেয়েদের প্রকৃত সৌন্দর্য দেখতে পাওয়া যায়।

“তোমার কপালে সুখ নেই জানো।” হঠাৎই কথা বলে মেয়েটি। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর এইবারই প্রথম কথা বললো সে।

ছেলেটি আনমনে একটা ঘাসের ডগা ছিড়ছিল। এ মন্তব্যে সে হতবাক হয়ে গেলো একটু।

“কেন বললে এ কথাটা?”

মেয়েটা শব্দ না করে অল্প হাসলো। “ঠাট্টা করছিলাম। তুমি এ পাখিটা উড়িয়ে দিলে কিনা।” লাল স্লিপারে মোড়া মেয়েটির ফর্সা পায়ের কাছে বসে আছে একটা ছোট্ট শালিক, তার ডানাটা দু’দিকে উড়ে যাচ্ছে।

“পাখির সাথে সুখ দুঃখের কী সম্পর্ক?” ছেলেটার গলা নিরুত্তাপ শোনায়।

মেয়েটি হাসলো আবার আগের মতোন। “বললাম না, ঠাট্টা করছিলাম। আমরা ছেলেবেলায় শালিক দেখলে একটা কবিতা বলতাম-

One for sorrow, Two for joy, Three for letter, Four for guest.

দুটো পাখি ছিল, Two for joy! তুমি আসাতে একটা উড়ে গেল, থাকলো একটা। One for sorrow! তাই বলছিলাম তুমি এলেই সুখ পালিয়ে যায়।”

মেয়েটির কথায় কোথায় যেন একটা রহস্যময়তা। ছেলেটি পরিষ্কার বুঝতে পারলো যে ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটি। তার চশমার কাচ যেন এক ফোঁটা অশ্রুর মুক্তো। হাসির আড়ালে টলটল করছে কান্নার বেহাগ।

“তুমি কিন্তু আজকে খুব চুপচাপ”, অনুযোগ করলো ছেলেটি।

“কেন জানিনা ভালো লাগছে না।”

“আমি চলে যাচ্ছি বলে মন খারাপ? আরে আমি কি একেবারে চলে যাচ্ছি নাকি? ওখানে পড়াশোনাটা শেষ করেই তো আমি আবার ফিরে আসছি। এই কয়েকটা দিন দেখতে দেখতে চলে যাবে।”

“নাহ, আমি সে কথা ভাবছি না।”

মেয়েটি মাথা নিচু করে একটি ঘাসফুলে আঙুল ছোঁয়াল। আনন্দে তিরতির করে কেঁপে উঠলো ফুলটি সে ছোঁয়ায়। পাশ দিয়ে একটা রিকশা চলে গেল ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে।

এলোচুলে আবারও একই ভাবে ঢাকা পড়েছে মেয়েটির মুখ। শেষ বিকেলের রোদে আবৃত তার পুরো শরীর। ছেলেটির আবারও মনে হলো, এর কোন কিছুই যেন সত্যি নয়। এই মেয়েটি, এই ঘাসফুল, এই নির্জনতা শুধুমাত্র স্বপ্নেই মানায়। বাস্তবে এর সাথে কোনদিনই দেখা হয় না।

নেশাগ্রস্তের মতো চারদিকে তাকালো ছেলেটি। কার্জন হলের অন্য প্রান্তের ছোট্ট চায়ের দোকানে তিন-চার জন মানুষ। একজন বয়স্ক মানুষ কথা বলছেন হাত নেড়ে নেড়ে। তার দাড়িতে মেহেদীর রং এতো দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে। রাস্তার ওপারে হাইকোর্টের গেটে ফুল বিক্রি করছে দু-তিন জন। পরদিন দুপুরে তার ফ্লাইট, সবকিছুই ছেড়ে চলে যাবে সে বহুদূরের দেশে। সেখানে কথা বলবার মতো মানুষ হৃদয়ের কোনো সঞ্চয় নেই, নির্বাসন ছাড়া আর কোন গন্তব্য নেই। আশ্চর্য, কবিতার কথা এতো সত্যি হয় কীভাবে।

“কাল দুপুর দুটোয় আমার ফ্লাইট। তুমি আসবে না? প্লিজ, তুমি এসো। তোমাকে না দেখে আমি কিন্তু প্লেনে উঠবো না।”

মেয়েটির শরীর থেকে আবারও সেই গন্ধটা পেলো সে। ভারী মন কেমন করা গন্ধ। নস্ট্যালজিক। পুরনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। কিশোর বয়সের স্মৃতি, জন্মক্ষণের স্মৃতি, এমনকি জন্মের আগের স্মৃতিরাও ভিড় করে একসাথে।

একটা চাপা শব্দে ফিরে তাকালো ছেলেটি। দু হাঁটুতে মাথা রেখে মুখ নিচু করে আছে মেয়েটি। পিঠের উপর ছড়ানো একরাশ চুলের ভাঁজে হাজার টুকরো আলো। মনে হয় যেন জোনাকিরা জ্বলছে, নিভছে। গভীর আবেগে ছেলেটির চোখে জল এলো। সে মেয়েটিকে নিবিড় করে ধরে নিজের কাছে আনলো। তার জামা আঁকড়ে ধরে আছে মেয়েটি, বুক পকেট ভিজছে চোখের জলে। সস্নেহে মেয়েটির চুলে মুখ রাখলো সে। ঈশ্বর, কেন তুমি প্রতিবারই মানুষকে শুধু দুঃখের বিনিময়ে স্থিতি দাও?

সূর্যের শেষ আলো এসে পড়েছে হাইকোর্টের চূড়ায়। আগুনের মতো জ্বলছে যেন। মনে হয় এ যেন মোজেজার অলৌকিক তুর পাহাড়। ঈশ্বরের প্রচণ্ড তেজে পুড়ছে। তবে কি ঈশ্বর কাছাকাছি কোথাও আছেন? সবার অলক্ষ্যে বসে দেখছেন তাদের দুজনের চোখের জল। হীরার মতো দামী পাথর ভেঙে নামছে দুর্লভ জলবিন্দু। ঈশ্বর বোধহয় মানুষকে কাঁদাতে বড় ভালোবাসেন। পৃথিবীতে কমে আসছে আনন্দ, যুদ্ধ বাড়ছে, হিংসা বাড়ছে। মানুষ পালাচ্ছে মানুষের কাছ থেকে। কোথাও শান্তি নেই, হাসি নেই, প্রিয়তমা রমণীর কপালের টিপের মতো সৌন্দর্য্য নেই। ছেলেটি দুহাতে আগলে ধরে থাকে মেয়েটিকে। কে যেন আসছে পায়ের শব্দ নিয়ে। পিছনদিকে যেন তারই পদশব্দ, ঘাড়ের ওপাশে নিঃশ্বাসের তপ্ত উপস্থিতি।

দুহাতের অঞ্জলিতে মেয়েটির মুখ তোলে সে। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে অদ্ভুত লাগে এই বিষণ্নতাকে। কপোলে জলের হালকা রেখা, ঠোঁট কাঁপছে অল্প। কানের ছোট্ট দুলটা আটকে আছে চুলের বৃত্তে।

ছেলেটির মনে হলো, সে যাকে চিনতো এ যেন সে নয়। পৃথিবীতে কোন যোগ্য পুরুষ নেই এই অপরূপ মুখখানির জন্য। এই চোখের জল দাবি করতে পারার মতো বিস্তৃত কোন প্রেম নেই। ভীষণ অচেনা এই মেয়েটি কে? একবার তার মনে হলো, এ যেন তার স্ত্রী, পুত্রশোকে আচ্ছন্ন। অথবা এ যেন তার কন্যা, স্বামীগৃহে যাবার আগে বিদায় নিতে এসেছে। মেয়েটির চোখ থেকে চশমাটা অল্প নেমে এসেছে। তার দৃষ্টি নত, দীর্ঘ আঁখিপল্লবে বৃক্ষের শ্যামলিমা।

ছেলেটি মেয়েটিকে আস্তে আস্তে বললো, “তুমি এতো ভেঙে পড়ছো কেন? আমি তো ফিরেই আসছি কয়েক বছর পর। আমার উপর বিশ্বাস রেখো। প্লিজ, কেঁদোনা। তুমি কাঁদলে আমার ভারী কষ্ট হয়।”

ছেলেটির বুকে কিসের যেন তোলপাড়। দূরে কোন মন্দিরে ঢং ঢং শব্দে ঘণ্টা বাজছে। সন্ধ্যা নামছে সারা চরাচর জুড়ে। বাতাসে ধূপের গন্ধ, জানালায় প্রদীপের সিঁথি শিখা।

স্নেহময় মেঘের মতো, শাখাবান উদার মহীরুহের মতো, দিকচক্রবালে অদৃশ্য হওয়া সূর্যের মতো ছেলেটি মাথা নামিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল মেয়েটির কপালের টিপে। এই তার প্রথম চুম্বনস্পর্শ। আনন্দ এবং অভিজ্ঞতার প্রচণ্ডতায় ছেলেটির সমস্ত শরীর কেঁপে গেল। তার রক্তকণায় প্রবল বেগে কে যেন ছুটছে, তার নিঃশ্বাসে মরুভূমির সর্বনাশা বালিঝড়। বোধের অন্তঃপুরে সে টের পেল যে প্রেম ব্যতীত কাম সম্পূর্ণ হয় না। তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে মোহের আবেশ, কে যেন চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছে আলোজ্বলা এক উৎসবের দিকে। অঙ্কুরের মতো বিস্মিত এবং উদগত হয়ে সে মেয়েটির নাম ধরে ডাকলো। মেয়েটি তার ডাকে সাড়া দিলো কিনা বোঝা গেল না।

তৃতীয়বারের মতো আবার গন্ধটি টের পেল সে।

মায়াবী হাসনুহেনা যেমন গন্ধ দিয়ে সাপকে আকর্ষণ করে, ঠিক তেমনি স্নায়ুকে আলিঙ্গন করে এই নেশা। মনের মধ্যে স্মৃতিরা নড়েচড়ে ওঠে, পরিচিত মানুষেরা হাত রাখে অন্তরঙ্গতায়।

তৎক্ষণাৎ বলতে গেলে হঠাৎই সে বুঝতে পারে পুরো ব্যাপারটা। এই গন্ধ সে পেয়েছে শুকনো ফুলের তোড়ায়, এই গন্ধের মধ্যে আগরবাতি আর কাঁচা মাটির অবিচ্ছেদ্য বসবাস। এ মৃত্যুর গন্ধ, এই গন্ধ বিচ্ছেদের। এই গন্ধে মনে হয় যেন ভোররাতে এক কুয়াশাময় স্টেশন থেকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে ট্রেন, তার বাঁশির তীক্ষ্ণ আওয়াজ মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে।

বিদ্যুতের ফলার মতোন এই উপলব্ধি ছেলেটিকে সচকিত করে। গভীর আবেগে সে তাকিয়ে থাকলো মেয়েটির চোখের দিকে। অশ্রুজলে চশমার কাচ ঝাপসা, ভেতরটা ভালো করে দেখা যায় না। তবুও সে দৃষ্টি রাখলো।

রূপকথার মতোন রহস্যময় এক পৃথিবী সেখানে। ঠিক যেন ভুবনবিস্তৃত এক অ্যাকোয়ারিয়াম। নীলাভ জলের কুয়াশার মধ্যে সোনার রঙের মাছেরা খেলা করছে, জলের প্রবাহে দুলে উঠছে আচমকা সবুজবর্ণের শৈবাল। পাথরে জন্ম নিয়েছে বিচিত্র বর্ণের প্রবাল। সেখানে শুধু সুখ থাকে। থাকে নিরুদ্দেশ প্রেম এবং প্রেমিকারা, কপালে কষ্টের চন্দন। ভারী শান্ত, ভীষণ নিভৃত। সুখী মানুষের অগম্য সে ভূমি, যে একবার যায় আর ফিরে আসে না। ফিরে আসা হয় না। বাতাসের শিস সেখানে সঙ্গীত, প্রকৃতিই একমাত্র তৈলচিত্র, নারীর মুখ সেখানে যথার্থই পূর্ণিমার চাঁদ।

ছেলেটির বুকের মধ্যে প্রবল ভাঙচুর। সে পরিষ্কার বুঝতে পারে, অদৃশ্য তস্করেরা নিয়ে যাচ্ছে তার সমস্ত উপার্জন। দহনের মতো প্রবল আগ্রাসী এক ক্ষয় বাড়ছে ক্যানসারের গতিতে। দ্রুত সবখানে ছড়িয়ে পড়ছে সে বিষ। সেই কবিতাটির কথা আবার মনে পড়লো তার, নির্জনতা ছাড়া হৃদয়ের কোন সঞ্চয় নেই, নির্বাসন ছাড়া আর কোন গন্তব্য নেই।

মোহমুগ্ধের মতো সে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।

৩.
ছোট ভাইটা আবার বললো, “ভাইয়া, সময় হয়ে গেছে। এবার যেতে হয় তোমাকে।”

বাবা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ছেলেটি বললো, “আমি যাই।” বাবা তার কাঁধে হাত রাখলেন, “এগিয়ে যাও।” মা আঁচলে চোখ মুছলেন আবার “খোকা, ফিরে আসিস”।

তৃতীয় কারো কথা শোনাটা বড় প্রয়োজন ছিল।

চারিদিকে শেষ বারের মতো আবার তাকালো সে। অনেক মানুষের মধ্যে খুঁজলো একজনকে। তৃতীয় মতামতটা সে ভীষণ শুনতে চেয়েছিল। দুঃখে এবং অভিমানে সে চোখ নামিয়ে ফেললো দ্রুত। সামনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে জামার আস্তিনে চোখ মুছলো ছেলেটি। সে বুঝতে পারলো, তৃতীয় মতটা আর কোনদিনই তার শোনা হবে না। শান্ত অ্যাকোরিয়ামের নীলাভ জলরাশির মৎস্যকন্যার সাথে তার আর কোনদিন দেখা হবে না।

এক্সিট লাউঞ্জের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে ছেলেটি একবার হাত নাড়লো সবাইকে। তারপর তাকে আর দেখা গেলো না।

১ আগস্ট, ১৯৮৬

সিয়াটল, ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র

প্রাক্তন বায়োকেমিস্ট, বর্তমানে ড্রাগ রেগুলেটরী এফেয়ার্স পেশায়। লেখালেখি বাংলা ব্লগ সচলায়তন ও পড়শী পত্রিকায়।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।