পড়শী সমসাময়িক বিষয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ও বাস্তবতা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ও বাস্তবতা

Post Views: 14
15 min read

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ সামরিক অভিযানের মুখে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে পালিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি। ফলে যে সংকটকে একসময় সাময়িক মানবিক বিপর্যয় বলে মনে হয়েছিল, প্রায় এক দশক পর তা এখন বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ও UNHCR-এর যৌথ হিসাবে দেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে কক্সবাজারে প্রায় ১১ লাখ ৬৬ হাজার এবং ভাসানচরে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ অবস্থান করছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রাখাইনে নতুন সংঘাতের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা ঘটেছে; ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি নতুন আগমনকারীকে বায়োমেট্রিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল ২০১৭ সালের ঘটনার ধারাবাহিকতা নয়; রাখাইনের বর্তমান সংঘাতও নতুন বাস্তুচ্যুতি সৃষ্টি করছে।

এ অবস্থায় প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের কাছে প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের তথ্য সরবরাহ করেছে। সর্বশেষ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য তারা যাচাই করেছে। মিয়ানমারের দাবি, তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত হয়েছে; ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য তারা যাচাই করতে পারেনি এবং ৪ হাজার ২৪১ জনের বিরুদ্ধে তারা তথাকথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছে।

এই সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো— এগুলো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নিজস্ব verification এবং classification। তাই এগুলোকে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে যারা মিয়ানমারের নিজের বিবেচনাতেই রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন, তাদের প্রত্যাবাসনের জন্যও এখন পর্যন্ত কার্যকর, নিরাপদ ও সময়াবদ্ধ ব্যবস্থা কেন তৈরি হয়নি?

পরিচয়ের সংকটই সমস্যার মূলে

রোহিঙ্গা সংকট মূলত সীমান্ত বা শরণার্থী ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং অধিকার। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বক্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়ের পরিবর্তে ‘বাঙালি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। কারণ ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে তাদের মিয়ানমারের ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠীর অংশ না দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
রাখাইন — ঐতিহাসিক আরাকান — অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির ইতিহাস দীর্ঘ। স্বাধীনতা-পরবর্তী বার্মায় রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্যদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের নজিরও রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকে তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে।

১৯৭৮ সালের ‘নাগামিন’ বা King Dragon Operation সেই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আরও বড় পরিবর্তন আসে ১৯৮২ সালের Citizenship Law-এর মাধ্যমে। আইনটি নাগরিকত্বকে পূর্ণ, সহযোগী ও naturalised— এমন কয়েকটি স্তরে বিভক্ত করে এবং তথাকথিত indigenous বা national races-এর সঙ্গে পূর্ণ নাগরিকত্বের প্রশ্নকে গভীরভাবে যুক্ত করে। এই ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের বড় অংশ কার্যত নাগরিকত্বহীন হয়ে পড়ে।

এর পরিণতি শুধু পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র না পাওয়া নয়। নাগরিকত্বহীনতা মানুষের চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিবাহ, কর্মসংস্থান, সম্পত্তির অধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ— জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে শুধু তাদের ভৌগোলিকভাবে রাখাইনে ফিরিয়ে দিলেই হবে না; তাদের আইনি পরিচয় ও কার্যকর নাগরিক অধিকার কী হবে, সেই প্রশ্নেরও সমাধান প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশন এবং ১৯৬৭ প্রোটোকল-এর পক্ষভুক্ত নয়। তারপরও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশন-এর আর্টিকেল ১এ(২)-এ শরণার্থীর সংজ্ঞার কেন্দ্রে রয়েছে জাতি, ধর্ম, জাতীয়তা, নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যপদ বা রাজনৈতিক মতের কারণে নিপীড়নের সুপ্রতিষ্ঠিত আশঙ্কা—well-founded fear of persecution।

আর আন্তর্জাতিক শরণার্থী সুরক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি হলো non-refoulement। রিফিউজি কনভেনশন -এর আর্টিকেল ৩৩ অনুযায়ী, এমন কোনো ভূখণ্ডে শরণার্থীকে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা গুরুতর হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। নীতিটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শরণার্থী সুরক্ষা কাঠামোরও একটি মৌলিক অংশ।

সুতরাং প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে শুধু মিয়ানমার কাউকে ‘verified’ করেছে কি না, সেটি যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রত্যাবাসনকে হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই। ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তও হতে হবে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে। এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সংকট।

বদলে যাওয়া রাখাইনের বাস্তবতা

২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে এসেছিল, তখন প্রধান নিরাপত্তা হুমকি ছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। কিন্তু ২০২৬ সালে রাখাইনের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারজুড়ে সংঘাত বিস্তৃত হয়েছে। রাখাইনে আরাকান আর্মি বা AA এখন অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি এবং উত্তর রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বাস্তবতা প্রত্যাবাসনের সমীকরণ মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাতেও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক শ্রম ও নিয়োগ, চলাচলে বাধা, আটক, সম্পত্তি হারানো এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিযোগ।

ফলে এখন প্রশ্ন শুধু — মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করবে কি না — সেটি নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা রাখাইনের যে এলাকায় ফিরবে সেখানে বাস্তবে কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, কে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং তাদের নাগরিক, ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার কে কার্যকর করবে? এই প্রশ্নগুলোর বিশ্বাসযোগ্য উত্তর ছাড়া বড় আকারের প্রত্যাবাসন বাস্তবসম্মত নয়।

বাংলাদেশের ওপর চাপ কতটা?

প্রায় এক দশক ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বাংলাদেশের ওপর স্বাভাবিকভাবেই বড় ধরনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান অনুযায়ী রোহিঙ্গা ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠী মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য সহায়তা কার্যক্রম পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু ২০২৬ সালের প্রয়োজন মেটাতেই জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থাগুলো ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে।

কিন্তু বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের কারণে রোহিঙ্গা পরিস্থিতির জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থায়ন কমলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

পরিবেশগত মূল্যও কম নয়। ইউএনডিপি ও অন্যান্য গবেষণায় কক্সবাজার অঞ্চলে বন উজাড়, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতি, মাটিক্ষয়, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং স্থানীয় কৃষি ও জীবিকার ওপর প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণে ২,২৮৩ হেক্টর বনভূমি হারানোর হিসাবও উল্লেখ করা হয়েছে।
একইসাথে অনেকে মনে করেন ক্যাম্পের অপরাধ, মানব পাচার, মাদক চোরাচালান বা সহিংসতার ঘটনা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দ্বারা সৃষ্ট, তবে এমনটি কোনভাবেই উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রহীনতা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার ঘাটতি, সংগঠিত অপরাধী চক্র এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—এসব কারণ নিরাপত্তা সমস্যাকে জটিল করে তোলে। তাই আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নের পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক কারণগুলোও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

ICJ ও ICC: জবাবদিহিতার দুটি ভিন্ন পথ

রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থায় দুটি বিচারিক প্রক্রিয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—International Court of Justice বা আইসিজে এবং International Criminal Court বা আইসিসি। তবে দুটি আদালতের ভূমিকা এক নয়।

আইসিজে-তে গাম্বিয়া মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে জেনোসাইড কনভেনসন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করেছে। গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো, মামলার মেরিটস বা মূল বিষয়ের ওপর শুনানি ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আরও ১১টি রাষ্ট্র মামলায় বিভিন্ন পযায়ে জড়িত হয়েছে। এখন মামলাটি আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।

অন্যদিকে আইসিসি ব্যক্তির অপরাধমূলক দায় নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশ/মায়ানমারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতির উপর আইসিসি ২০১৯ সাল থেকে তদন্ত অনুমোদন করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসি প্রসিউকিউটর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইং-এর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করা এবং নিপিড়ন করা সংক্রান্ত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়ে আবেদন করেন। সেই আবেদন এখন প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-এর বিবেচনায় রয়েছে।

অতএব আইসিজে ও আইসিসি প্রক্রিয়া পরস্পরের বিকল্প নয়। একটি রাষ্ট্রীয় দায়ের প্রশ্ন বিচার করছে; অন্যটি সম্ভাব্য ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায় অনুসন্ধান করছে। দীর্ঘমেয়াদে এই দুটি প্রক্রিয়াই রোহিঙ্গা প্রশ্নে জবাবদিহিতার আন্তর্জাতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে।

ভূরাজনীতি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু মানবিক আবেদন দিয়ে সম্ভব হয়নি— এটিই গত নয় বছরের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা। মিয়ানমারের অবস্থান বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের ভারত মহাসাগরীয় সংযোগের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দেশটিকে ঘিরে চীন, ভারত, ASEAN সদস্যরাষ্ট্র, পশ্চিমা দেশসহ বিভিন্ন শক্তির স্বার্থ রয়েছে। এসব স্বার্থের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান সবসময় একরকম নয়।

তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিল—এমন বলা ঠিক হবে না। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সিকিউরিটি কাউন্সিল রেজুলেশন ২৬৬৯ গৃহীত হয়; এতে মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ, উত্তেজনা প্রশমন এবং মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানানো হয়। প্রস্তাবটির পক্ষে ১২টি দেশ ভোট দেয়; চীন, ভারত ও রাশিয়া বিরত থাকে। তবে এখনও কূটনৈতিক ঘোষণা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিবর্তনের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।

তাহলে প্রত্যাবাসনের বাস্তব শর্ত কী?

এখন সবচেয়ে জরুরি হলো প্রত্যাবাসনের সংখ্যার চেয়ে প্রত্যাবাসনের শর্ত নিয়ে আলোচনা করা। একটি টেকসই প্রত্যাবাসন কাঠামোয় অন্তত কয়েকটি বিষয় যাচাইযোগ্যভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন: রোহিঙ্গাদের আইনি পরিচয় ও নাগরিকত্বের একটি গ্রহণযোগ্য পথ; তাদের পূর্ববর্তী বসতভিটা বা পছন্দের স্থানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ; চলাচলের স্বাধীনতা; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও সম্পত্তির অধিকার; নিরাপত্তার কার্যকর নিশ্চয়তা; এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বাধীনভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোহিঙ্গাদের নিজেদের মতামত। যাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাদের বাদ দিয়ে কেবল রাষ্ট্র-রাষ্ট্র আলোচনা টেকসই ফল দিতে পারে না। একজন মানুষ কেন এমন জায়গায় ফিরবেন যেখানে ফিরে যাওয়ার পর আবার ক্যাম্পে থাকতে হতে পারে, নাগরিকত্ব অনিশ্চিত থাকবে অথবা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকবে না—এই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাবাসন পরিকল্পনাতেই থাকতে হবে।

বর্তমান রাখাইনের বাস্তবতায় আরাকান আর্মির ভূমিকা নিয়েও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে বাস্তববাদী হতে হবে। কারণ কোনো এলাকার de facto নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সেখানে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বাস্তব কাঠামো তৈরি করা কঠিন। একই সঙ্গে যেকোনো আলোচনা বা নেগোসিয়েশনে মানবাধিকার, জবাবদিহিতা ও রোহিঙ্গাদের অধিকারকে কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে রাখতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে যে কূটনৈতিক পথ

বাংলাদেশের জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সংকটটির ব্যাপ্তি এখন দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর চেয়ে অনেক বড়। জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন এবং প্রভাবশালী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কূটনীতি তাই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা, মানবিক প্রবেশাধিকার, নাগরিকত্ব সংস্কারের পক্ষে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং রাখাইনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা—বিভিন্ন নীতিগত বিকল্প আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে। কোন ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর হবে তা নির্ভর করবে মিয়ানমারের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপর।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বার্তায় একটি বিষয় আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন: রোহিঙ্গা সংকটের ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের দায়িত্ব হতে পারে, কিন্তু এর স্থায়ী সমাধানের দায়িত্ব মূলত মিয়ানমারের এবং এ সংকট মোকাবিলার আন্তর্জাতিক দায়ও রয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সাফল্য কতজন মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করলেন—শুধু সেই সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না। প্রত্যাবাসনের প্রকৃত অর্থ হবে একজন রোহিঙ্গা নিজের দেশে ফিরে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন কি না; নিজের এলাকায় বসবাস করতে পারছেন কি না; স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারছেন কি না; সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারছেন কি না; কাজ ও সম্পত্তির অধিকার পাচ্ছেন কি না; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে— আবার নিপীড়িত বা বাস্তুচ্যুত হওয়ার ভয় ছাড়া জীবনযাপন করতে পারছেন কি না। এই নিশ্চয়তাগুলো ছাড়া প্রত্যাবাসন হয়তো প্রশাসনিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব, কিন্তু সেটিকে টেকসই সমাধান বলা কঠিন।

প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, সেটি অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে প্রত্যাবাসনও নতুন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

তাই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আসল পরীক্ষা শুধু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানো নয়; তাদের এমন একটি মিয়ানমারে ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে তারা পরিচয়, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে। আর সেখানেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রত্যাশা এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

২ অক্টোবর, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

সরকারি চাকুরীজীবি, পাশাপাশি লেখালেখি ও গবেষণা কাজে লিপ্ত। ছোটগল্প, ছোট উপন্যাস ও রম্য রচনা প্রধানত লেখার মুলধারা।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।