একদিন চট্টগ্রামের এক চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ গিটার বাজাচ্ছিলেন। খুব বড় কোনো মঞ্চ নয়, সামনে হাজার মানুষও নেই। কিন্তু তাঁর গিটার বাজানো দেখে একজন মিউজিশিয়ান থেমে গেলেন। সেই মিউজিশিয়ান ছিলেন জেমস এবং ছেলেটিকে দেখে তাঁর মনে হলো এই গিটারিস্ট ছেলেটার ভেতর অন্যরকম কিছু আছে। সেই ছেলেটিই পরে হয়ে উঠবেন আইয়ুব বাচ্চু।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যাঁকে আমরা আজ বাংলাদেশের গিটারের সঙ্গে প্রায় সমার্থক করে ফেলেছি, তাঁর নিজের শুরুটা হয়েছিল অন্যের গিটার দিয়ে। স্কুলে পড়ার সময় বাবার কাছ থেকে পাওয়া একটা সাধারণ অ্যাকুয়েস্টিক গিটার দিয়ে তাঁর শুরু। পরে বন্ধু কুমার বিশ্বজিৎ-এর Tisco গিটার ধার করে বাজাতেন। একসময় বন্ধুই সেটি তাঁকে দিয়ে দেন। তখন বাচ্চুর কাছে গিটার এমন এক জিনিস, যেটা হাতে পেলেই পৃথিবীটা একটু অন্যরকম শোনাত।
কেউ বিদেশে গিয়ে ঘড়ি কেনে, কেউ জমি। বাচ্চু খুঁজতেন গিটার। জীবনের শেষ দিকের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, বিদেশে গেলেও গিটার শপ খুঁজে বের করতেন। তাঁর সংগ্রহ একসময় ৬৫টির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু এই সংগ্রহকে নিছক শখের সংগ্রহ বললে ভুল হবে। প্রতিটি গিটারের আলাদা আওয়াজ এবং আলাদা প্রাণ, এমনভাবেই তিনি এদেরকে দেখতেন।
আর গিটার যে তাঁর কাছে কতটা ব্যক্তিগত ছিল, সেটা বোঝা যায় তাঁর শেষ দিকের একটি স্বপ্ন থেকে। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর গিটারগুলো দিয়ে নতুন গিটারিস্টদের একটা বিশাল আয়োজন করতে। তরুণরা অডিশন দিয়ে আসবে, তাঁর গিটার বাজাবে, প্রতিযোগিতা হবে। এমনকি এক পর্যায়ে তাঁর পরিকল্পনা ছিল দীর্ঘ সময় ধরে গিটার বাজানোর একটি বড় আয়োজন করার। স্পন্সর না পাওয়ায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। পরে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ সামলাতে তাঁর সংগ্রহের কয়েকটি গিটার তরুণ মিউজিশিয়ানদের কাছে বিক্রিও করেন। এখানে বাচ্চুর জীবনের একটা অদ্ভুত বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হয়। যে ছেলেটা একসময় অন্যের গিটার ধার করে নিজের হাত তৈরি করেছিল, জীবনের শেষে সে নিজের গিটারগুলো অন্যদের হাতে তুলে দিতে চাইছিল।
মাঝখানের গল্পটা অবশ্য অনেক বড়।
চট্টগ্রামের ক্লাব আর বিয়ের অনুষ্ঠানে ইংরেজি গান করা সেই তরুণ পরে ফিলিংস ব্যান্ডে গেলেন। তারপর সোলস। সোলসে তাঁর দশ বছর শুধু গিটারিস্ট হিসেবে কাটেনি, ধীরে ধীরে তিনি কম্পোজার হিসেবেও নিজের জায়গা তৈরি করলেন। অর্থাৎ যাঁকে আমরা পরে LRB-এর সামনে দাঁড়িয়ে গিটার হাতে দেখি, তাঁর ভিতটা তৈরি হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন তিনি অন্য ব্যান্ডের হয়ে বাজাচ্ছেন, অন্যের গান করছেন, স্টুডিওতে সেশন গিটারিস্ট হিসেবে কাজ করছেন।
তারপর এলো এলআরবি। কিন্তু এই গল্পেও একটা মজার ঘটনা আছে। নিজের ব্যান্ডের নাম বাচ্চু প্রথমে রেখেছিলেন Yellow River Band। এক অনুষ্ঠানে আয়োজকদের ভুলে সেটি হয়ে গেল Little River Band। বাচ্চু নামটা পছন্দ করে ফেললেন। পরে জানা গেল, অস্ট্রেলিয়ায় একই নামে একটি পরিচিত ব্যান্ড আছে। তখন নাম বদলে হলো Love Runs Blind। কখনো কখনো একটা ব্যান্ডের ইতিহাসও পরিকল্পনা দিয়ে নয়, ভুল দিয়ে শুরু হয়। LRB-এর প্রথম দিকের কাজেই বাচ্চু আরেকটা কাজ করেছিলেন। তিনি রককে শুধু অ্যালবামের ভেতর রাখেননি, গিটারকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। LRB-এর প্রথম দুই অ্যালবাম একসঙ্গে প্রকাশিত হয়ে বাংলাদেশের প্রথম ডবল অ্যালবামের উদাহরণ তৈরি করে। আইয়ুব বাচ্চু এলআরবি’র মাধ্যমে বাংলা রককে মূলধারায় মানে বাংলার মানুষের বেডরুমে পৌঁছে দিয়েছেন।
কিন্তু জনপ্রিয়তার জায়গাটাই তাঁর গল্পের শেষ নয়। বাচ্চুর নিজের সঙ্গীতের স্বাদ ক্রমাগত বদলাচ্ছিল। ছোটবেলা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন গিটারিস্টদের বাজনা তিনি শুনতেন, শিখতেন, নিজে পরীক্ষামূলক চেষ্টা করতেন। জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়েও নতুন গিটার কৌশল নিয়ে তাঁর আগ্রহ কমেনি। এই জায়গাটাই হয়তো তাঁকে অন্যরকম করে। অনেক শিল্পী বড় হওয়ার পর নিজেদের শিষ্য তৈরি করেন। বাচ্চু বরং শেষ বয়সেও নিজে শিখতে থাকার ক্ষমতাটা ধরে রেখেছিলেন। আর তাই তাঁকে শুধুই “বাংলাদেশের রক লেজেন্ড” বললে গল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।
কারণ বাচ্চুর সবচেয়ে বড় গল্প হয়তো কোনো হিট গানের গল্প নয়। সেটা শুধুই একটা গিটারের গল্প, যা প্রথমে তাঁর ছিল না। যেটাকে তিনি নিজের ভাষা বানালেন। তারপর অনেকগুলো গিটার, যেগুলো তিনি জমালেন। এবং শেষে সেই গিটারগুলোই নতুন কারও হাতে তুলে দেবার স্বপ্ন দেখলেন। ১৮ অক্টোবর ২০১৮-তে মানুষটা চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর গিটারগুলোর গল্প সেখানেই থামার কথা ছিল না, থামেও নি।
হয়তো কোথাও এখনো কোনো তরুণ-তরুণী মিউজিশিয়ান একটা পুরোনো গিটার হাতে নিয়ে প্রথমবার সোলো তোলার চেষ্টা করছে। সে হয়তো জানেও না, তার সেই চেষ্টার সঙ্গে অনেক দূরের একটা সম্পর্ক আছে সেই ছেলেটার, যে একদিন নিজের গিটার না থাকায় বন্ধুর Tisco হাতে নিয়েছিলো সুরের খেলায় মত্ত হতে!
আইয়ুব বাচ্চুর গল্পটা তাই শেষ পর্যন্ত কেবলই একজন রকস্টারের গল্প নয়। এটা একটা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ প্রেমের গল্প। আর সেই প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর দিকটা হলো শেষ পর্যন্ত তিনি গিটারগুলো নিজের কাছে রাখতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন, গানটা যেন তাঁর পরেও বাজতে থাকে। ঠিক যেভাবে প্রেম কখনোই শেষ হয়ে যায় না, রেশ থেকে যায় আমৃত্যু! যেভাবে বাচ্চু গেয়েই গেছেন-
“তুমি ভালোবেসো, আমার ভালোবাসা,
যখন কখনো আমি থাকবো না!”


অসাধারণ একটা লেখা! বাচ্চু ভাইয়ের জীবনের এই দিকটা নিয়ে খুব বেশি লেখা চোখে পড়ে না।