ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ ছিল না, তবে প্রায় ১৮ মাসের মধ্যে তারা একটি নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হয় এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
এই ১৮ মাস মোটেই মসৃণ ছিল না। নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি— সব মিলিয়ে সময়টা ছিল চ্যালেঞ্জপূর্ণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবুও সব অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও জনগণের মধ্যে ভোট নিয়ে উল্লেখযোগ্য উৎসাহ দেখা যায়। বড় ধরনের কোনো অঘটন ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
এবারের নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রদান—যা দেশের ইতিহাসে প্রথম। লক্ষাধিক প্রবাসী বাংলাদেশি এই সুযোগ গ্রহণ করেছেন। ফলে দেশ-বিদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা, মতবিনিময় ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে, রাজনীতি-সচেতন বাংলাদেশিদের দৃষ্টিভঙ্গি জানার জন্য পড়শী-র পক্ষ থেকে একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ পরিচালনা করা হয়। দেশে ও প্রবাসে বসবাসকারী বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেন। জরিপের প্রশ্নগুলো ছিল—
১. আপনি কি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন?
২. এবারের নির্বাচন কি সুষ্ঠু হয়েছে বলে মনে করেন?
৩. যদি না হয়ে থাকে, কী ধরনের অনিয়ম লক্ষ্য করেছেন?
৪. নতুন সরকারের কাছে আপনার প্রধান প্রত্যাশা কী?
৫. ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনায় গুণগত পরিবর্তন সম্ভব কি?
উত্তরদাতারা চাইলে নিজেদের নাম ও পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ পেয়েছেন।
অংশগ্রহণকারীদের মতামত:
জিয়া করিম (প্রবাসী), বয়স: ৫৫+
ভোট দেননি। তার মতে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং তৃতীয় বিশ্বের প্রেক্ষাপটে এটি সন্তোষজনক। তিনি নতুন সরকারের কাছে সুশাসন, দুর্নীতি দমন এবং তরুণদের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। জুলাই সনদ ছাড়াও ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (প্রবাসী), বয়স: ৫৫+
ভোট দিয়েছেন এবং নির্বাচনকে সুষ্ঠু বলে মনে করেন। তিনি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। তার মতে, গণভোটে জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে; তাই এটি বাস্তবায়ন ছাড়া গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
মোহাম্মদ রহমান (প্রবাসী), বয়স: ৩৬–৪৮
ভোট দেননি; তবে নির্বাচনকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক ও শান্তিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও মানুষের অংশগ্রহণকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেন। নতুন সরকারের কাছে তার প্রধান প্রত্যাশা—জুলাই আন্দোলনের শহীদদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (প্রবাসী), বয়স: ৩৬–৪৫
ভোট দিয়েছেন; তবে নির্বাচনকে সুষ্ঠু মনে করেন না। তিনি ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। তার মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, দুর্নীতি হ্রাস এবং আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (প্রবাসী), বয়স: ৫৫+
ভোট দেননি; তবে নির্বাচনকে সুষ্ঠু বলে মনে করেন। তিনি আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা চান। তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় গুণগত পরিবর্তনের জন্য কোনো সনদের চেয়ে নেতৃত্বের সততা ও দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (বাংলাদেশে বসবাসকারী), বয়স: ৩৬–৪৫
ভোট দেননি; তবে নির্বাচনকে সুষ্ঠু বলে মনে করেন। তার প্রত্যাশা— সরকারি ব্যবস্থায় অদক্ষতা দূর করে প্রযুক্তিনির্ভর (AI) সংস্কার আনা।
জান্নাতুল মাওয়া (বাংলাদেশে বসবাসকারী), বয়স: ২৬–৩৫
ভোট দিয়েছেন এবং নির্বাচনকে সুষ্ঠু বলে মনে করেন। তিনি আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন, বাস্তবমুখী সংস্কার ও কার্যকর নীতিমালার প্রত্যাশা করেন। তার মতে, কিছু পরিবর্তন জুলাই সনদ ছাড়াও সম্ভব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (বাংলাদেশে বসবাসকারী), বয়স: ৩৬–৪৫
ভোট দিয়েছেন; তবে নির্বাচনকে সুষ্ঠু মনে করেন না। তিনি জাল ভোট ও গণনায় অসংগতির অভিযোগ তুলেছেন। পেশাগত দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি টেকসই নগর পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দাবি জানান।
নাসির উদ্দিন (বাংলাদেশে বসবাসকারী), বয়স: ৫৫+
ভোট দিয়েছেন; তবে নির্বাচনকে সুষ্ঠু মনে করেন না। তার মতে, দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী অংশগ্রহণ না করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। তিনি খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, দুর্নীতি দমন এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মতামত থেকে একটি বহুমাত্রিক চিত্র উঠে আসে। নির্বাচন সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র—অনেকে একে তুলনামূলকভাবে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন, আবার কেউ কেউ অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং ভোট গণনায় অসংগতির অভিযোগ তুলেছেন।
তবে নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশার ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ঐকমত্য লক্ষ্য করা যায়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন, আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা— এসব বিষয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি ন্যায়বিচার, বাস্তবমুখী সংস্কার এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোও উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে।
‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে মতামত বিভক্ত। একদল মনে করেন, এটি বাস্তবায়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। অন্যদিকে আরেকদল মনে করেন, প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নেতৃত্বের সততা, সদিচ্ছা ও দক্ষতা—যা কোনো নির্দিষ্ট সনদের ওপর নির্ভরশীল নয়।
সবশেষে বলা যায়, এই জরিপ একটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরে— জনগণ পরিবর্তন চায়। তবে সেই পরিবর্তনের পথ, প্রক্রিয়া এবং অগ্রাধিকার নিয়ে এখনও মতপার্থক্য বিদ্যমান।

অস্টিন, টেক্সাস
কম্পিউটার প্রকৌশলীর, কাজ করছেন আইবিএম কর্পোরেশনে। লেখালেখি মূলত বাংলা ব্লগ সচলায়তনে।

