পড়শী মূল রচনাবলী মানব সেবায় ইউনাইটেড নেইশান্স উইমেন্স গিল্ড (ইউ এন ডব্লিউ জি), নিউ ইয়র্ক

মানব সেবায় ইউনাইটেড নেইশান্স উইমেন্স গিল্ড (ইউ এন ডব্লিউ জি), নিউ ইয়র্ক

Post Views: 112

ইউনাইটেড নেইশান্স উইমেন্স গিল্ড একটি অলাভজনক সেচ্ছাসেবী সংস্থা, যে সংস্থাটি জাতিসংঘের সাথে জড়িত। এটি ভাগ্যহীন ও অসহায় শিশুদের জন্য কাজ করে থাকে অর্থাৎ পৃথিবীব্যাপী যে সকল সংগঠন অসহায় শিশুদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করে থাকে সে রকম অনেক সংগঠনকে (রেজিস্ট্রিকৃত) অর্থ অনুদান দিয়ে থাকে।

আজ আমি ইউনাইটেড নেইশান্স উইমেন্স গিল্ডের জন্ম সূত্র ও আরও কিছু তথ্য তুলে ধরতে চাই এবং আমার অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের সংগে খানিকটা ভাগাভাগি করে নিতে চাই। আমি কিভাবে এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হলাম এবং শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি সেকথা বলবো।

এই গিল্ডের রয়েছে লম্বা ইতিহাস, সংক্ষেপে কিছুটা বলার চেষ্টা করছি। ১৯৪৮ সালে মাত্র ১০/১২ জন সদস্য নিয়ে গিল্ডের যাত্রা শুরু হয় হয়েছিল। উইমেন্স গিল্ড সংস্হাটি একটি সেচছাসেবী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান যেটি জাতিসংঘের অনুমোদন প্রাপ্ত। আমরা জানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের জন্ম হয় ১৯৪৫ সালে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপে যে ধ্বংসযজ্ঞ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃস্টি হয় তা নিরসনের জন্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের মত সংস্থার সৃস্টি হয়। নিউ ইয়র্ক জাতিসংঘ সদর দপ্তরের অস্থায়ী অফিস স্থাপিত হয় কুইন্সের লেক সাকসেসে। প্রথম অফিসাররা ছিলেন জেনেভা থেকে আগত একদল ব্যক্তি। তাদের স্ত্রীগণ যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিপর্যস্ত ইউরোপীয়ান শিশুদের সাহায্য করবার জন্য সেলাই ও উল বুনন প্রকল্প হাতে নেয়। তারা সেভ দি চিলড্রেন ফেডারেশনের মাধ্যমে দরিদ্র শিশুদের জন্য সোয়েটার বিতরন শুরু করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের অনুমোদন পেয়ে এই গ্রুপটির নাম হয় ইউনাইটেড নেইশান্স উইমেনস গিল্ড (UNWG)। সেই বছরের ২২শে এপ্রিল গিল্ডের প্রথম মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের পাশাপাশি সেচছাসেবী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘের কার্যক্রমকে সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে ইউ এন গিল্ডের কাজ শুরু করে যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।

নিউ ইয়র্কের গিল্ডকে মাদার গিল্ড হিসেবে অভিহিত করা হয়। কারন, পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশেও এই গিল্ডের শাখা রয়েছে, যারা নিউ ইয়র্ক গিল্ডের সংবিধান অনুসারে তাদের সংস্হাকে পরিচালিত করে থাকে।

গিল্ডের সদস্য হতে পারে ইউ এন, ইউ এন ডি পি, ইউনিসেফ, ইউনেস্কোতে কর্মরত কর্মচারীদের স্ত্রীগণ, মেয়েরা, মা-বোনেরা ও এসব সংসথায় কর্মরত নারীগণ। এছাড়া জাতিসংঘে বিভিন্ন দেশের মিশনে কর্মরত নারীগণ ও পুরুষ কর্মচারীদের স্ত্রীগণ। এছাড়া বিভিন্ন কনস্যুলেটে কর্মরত নারী কর্মীগন। মোট সদস্য সংখ্যার উপর ভিত্তি করে ১০% সদস্য নেয়া হয় জাতিসংঘের বাইরের সাধারন জনসংখ্যা থেকে। ৭৮ বছর যাবৎ গিল্ড একটি দাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিশু-কিশোরদের জন্য কাজ করে যাচেছ এবং এ বছর এপ্রিলের ২২ তারিখে ৭৮ বছর পূর্ন হয়েছে। শূণ্য থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত জনসংখ্যার জন্য গিল্ড সাহায্য দিয়ে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের যে সকল প্রতিষ্ঠান দরিদ্রও অসহায় শিশুকিশোরদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচেছ, সে সকল প্রতিষ্ঠানকে গিল্ড অর্থ অনুদান দিয়ে থাকে। ১৯৪৯ সালে গিলড সর্বপ্রথম গ্রীসের একটি প্রজেক্টকে ১৫০ ডলার অনুদান প্রদান করে।
এছাড়া গিলড প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও বিভিন্ন দেশকে অনুদান দিয়ে থাকে।

১৯৫১ সালে জাতিসংঘ সদর দপ্তর ম্যানহাটনে ইস্ট নদীর পাড়ে স্থানান্তরিত হয়। তখন সদস্য সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরবর্তীতে সদস্য সংখ্যা একটা সময় সাড়ে ৩০০ ছাডিয়ে যায়। এখন আবার সদস্য সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে।

প্রথম বাৎসরিক সাধারন সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালে। সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ১৯৫৪ সালে ৫টি গ্রূপ গঠিত হয়ে যায়। পরে আবার ৪টি গ্রুপে পরিণত হয়। ১৯৫৫ সালে সংবিধান তৈরী করা হয়। সেই বছরই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ফোক গল্প সংগ্রহকরে ‘রাইড উইথ দি সান’ বই প্রকাশিত হয়। এই বইটি ১৪টি ভাষায় প্রকাশিত হয়। ১৯৯৪ সালে ৫টি গল্প ইংলিশ-জাপানি ভাষায় সিডিতে প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে এই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণও বের করা হয়।

১৯৬০ সালে গিল্ডের নিজস্ব লোগো তৈরী করা হয়। ১৯৬৪ সালে তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ক্যালেনডার তৈরী শুরু হয় ক্যানভাস কাপড়ের উপর। স্পেশাল ডিজাইন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ডিজাইন পছন্দ করে এটি তৈরী করা হয়, যেটা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

আমি এ পর্যন্ত ৪ বার ক্যালেন্ডার ডিজাইন প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছি এবং আমার ডিজাইনে ৪ বার গিল্ডের ক্যালেনডার তৈরী হয়েছে – ২০০৫, ২০০৯, ২০১৮ ও ২০২৫ সালে। ঐ ক্যালেনডার গিল্ডের দোকানে বিক্রি করে তহবিল সংগ্রহ করা হয়।

ইউনাইটেড নেইশান্স উইমেন্স গিল্ড

১৯৬৭ সালে গিল্ড তাদের নিজস্ব দোকান শুরু করে জাতিসংঘের জেনারেল এ্যাসেমবলী বিলডিংয়ে, যেখানে গিল্ডের লোগোসহ নানান রকমের টি শার্ট ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি করা হয়। গিল্ডের তহবিল সংগ্রহের প্রধান উৎস হচ্ছে এই দোকানটি। এই দোকানটি পালাক্রমে ৪টি গ্রুপের সদস্যরা চালিয়ে থাকে। এক এক দিন এক এক গ্রুপের সদস্যরা দোকানে কাজ করে।

এছাডা বছরে নানান ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়। তার মধ্যে উল্লেখ্য দুটি নিয়মিত মেলার আয়োজন, একটি মে মাসে আর অন্যটি ডিসেম্বর মাসে। এছাড়া সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও খাবারের আয়োজনসহ তহবিল সংগ্রহের জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া যে কোন অংকের অনুদানও গ্রহন করা হয় বছরব্যাপী।
অনেক সময় আমরা যৌথভাবেও মেলার আয়োজন করি। বিভিন্ন দেশের মিশনের কূটনীতিকদের স্ত্রীদের সংগঠনের নাম ‘ডেলিগেশনস উইমেনস ক্লাব‘ (DWC) এই সংগঠনও মানবতার জন্য কাজ করে থাকে। অনেক সময় DWC এবং গিল্ড (UNWG) একসঙ্গে তহবিল সংগ্রহের আয়োজন করে থাকে। আবার গিল্ড যখন এককভাবে তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা করে থাকে, তখনও অনেক মিশন অংশগ্রহণ করে থাকে। অধিকাংশ সময় বাংলাদেশ মিশনও অংশগ্রহণ করে থাকে।

অনেক সময় জাতিসংঘের সেকরেটারী জেনারেল ও তার স্ত্রী (গিল্ডের অনারারী প্রেসিডন্ট) মেলার উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন, সেই সংগে বিভিন্ন মিশনের অনেক এ্যামবাসডরও যোগ দেন স্বল্প সময়ের জন্য। তবে গিল্ডের অনারারী প্রেসিডন্ট কয়েক ঘন্টা ঘুরেফিরে দেখেন, খাবার ও জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন, অনেক সময় রাফেল ড্রতে অংশগ্রহণ করেন, এবং বিজয়ীদের হাতে তিনি পুরস্কার তুলে দেন।

এই সংস্থাটি অত্যন্ত সুচারুরুপে পরিচালিত হয়। ৪টি গ্রুপের নিজস্ব নির্বাহী কমিটি রয়েছে, যারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। এছাড়া প্রতিটি গ্রুপ থেকে সদস্য নিয়ে বেশ কতগুলো সাব কমিটি গঠিত হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সেল্স কমিটি, প্রজেক্ট কমিটি। ৪ গ্রুপের সদস্য নিয়ে বোর্ড মিটিং প্রতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে অনুসঠিত হয়। প্রতিটি বোর্ড মিটিং প্রেসিডন্ট পরিচালনা করে থাকে। এই মিটিংয়ে প্রতিটি গ্রুপের আপডেট রিপোর্ট পেশ করা হয়। এছাড়া সেল্স কমিটি এবং কোষাধ্যক্ষ ঐ মাসের অর্থ সংক্রান্ত সকল রিপোর্ট পড়ে শোনান। ব্যাংকের তহবিলের সর্বশেষ হিসেব নিকেশ ও তার কপি সবাইকে বিতরন করা হয়। এই পদ্ধতিটি আমার অত্যন্ত পছন্দ, পুরোপুরি স্বচ্ছতা প্রকাশ করা হয় এভাবে। গ্রুপ ডিরেক্টররা ও বোর্ড রিপ্রেজেন্টেটিভ এসব তথ্য সাধারন সদস্যদের কাছে পৌছে দেন প্রতি মাসের নিয়মিত মিটিংয়ের মাধ্যমে।

প্রতি মাসে সাধারন সদস্যদের জন্য দুটি করে মিটিং থাকে। এছাড়া অন্যান্য কমিটির মিটিংগুলোও চলতে থাকে। প্রতি বছর এনুয়াল জেনারেল মিটিং (AGM) হয় মার্চ অথবা এপ্রিল মাসে। সারা বছরের রিপোর্ট ও আয় ব্যায়ের হিসেব নিকেশ, বোর্ডের নতুন অফিসার নিয়োগের জন্য নির্বাচন – সবই সেদিন অনুসঠিত হয়।

এত চমৎকার ব্যবস্থার পরেও সমস্যা আছে বেশ কিছু। যেহেতু সেচছাসেবী সংস্থা তাই অধিকাংশ সদস্যরা দায়িতব এড়াতে চায়। নিয়মিত কাজে আগ্রহী নয় একেবারেই। তবে সাধারণ সদস্যপদ থেকে শেষমেশ আমি প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত হতে পেরেছি এবং আমিই প্রথম বাংলাদেশী প্রেসিডেন্ট হিসেবে গিল্ডের হিষ্ট্রি বইতে নাম লিখাতে পেরেছি।

কিন্তু পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ মিশন, কিছু বাংলাদেশী ও কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনও আমার এই কাজে সহায়তা করেছে। আমাদের অনেক বাংলাদেশী বন্ধু বান্ধব গিল্ডকে অনুদান প্রদান করেছেন বিভিন্ন সময়ে। বেশ কয়েকজন চিত্রকর তাদের চিত্রকর্ম গিল্ডের তহবিল সংগ্রহ করার জন্য অনুদান করেন। এছাড়া গিল্ড মাঝে মাঝে মাল্টি কালচারাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। এসব অনুষ্ঠানে নিউ ইয়র্কের কয়েকটি বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন সময়ে নাচ, গান ও তবলা পরিবেশন করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে। ব্যক্তিগত ভাবেও কোন কোন শিল্পী কয়েকবার অংশগ্রহন করেছে। এছাড়া আমার পরিবার সবসময় গিলডকে সাহায্য করে নানান ভাবে।

আমি কিভাবে এই গিলদের সঙ্গে জরিয়ে গেলাম?

জাতিসংঘের সংগে বা জাতিসংঘ পরিবারের সংগে আমার যোগাযোগ বলা যায় আজন্ম। জীবনের বেশীর ভাগ সময়ে এই পরিবারের সংগেই আমার উঠাবসা। ছোটবেলা থেকেই এই সংস্থার প্রতি এক ধরনের আনুগত্য ছিল যেহেতু এটি বিশ্ব শান্তির জন্য গঠন করা হয়েছিল।

পরবরতীতে জাতিসংঘে কর্মরত হাসান ফেরদৌসের সংগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবার ফলে সরাসরি এই পরিবারভূক্ত হয়ে পরি। বিয়ের ৪ বছর পরেই ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এসে জয়েন করে হাসান ফেরদৌস। সেই সূত্রে আমিও নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা হয়ে পরি।

প্রথম দিকে এই গিল্ডের ব্যাপারটা আমরা মোটেই জানতাম না। কয়েক বছর পরে আমাদের দুই প্রতিবেশীর কাছ থেকে গিল্ডের কথা জানতে পারি। একজন লটি রবীনস ও অন্যজন যশোদা দিলওয়ালী। লটি জাতিসংঘ থেকে সবে তখন রিটায়ার করেছেন এবং যশোদার স্বামী জাতিসংঘে চাকরী করতেন। ওদের সংগে আলাপ হবার পরে ওরা রীতিমত আমাকে উৎসাহিত করতে লাগলো। গিল্ড কিভাবে সারা বিশ্বে মানবতার জন্য কাজ করছে সেসব আমাকে ও হাসানকে বোঝাতে লাগলো। এ ধরনের কাজের সংগে যুক্ত হলে বাংলাদেশের জন্যও কাজ করতে পারবো। খুব ভাল লাগলো এসব কথা শুনে।

একদিন লটি এক ব্যাগ বইপত্র নিয়ে হাজির। এই নাও, সব পড়ে দেখ আমরা কত ভাল কাজের সংগে যুক্ত। বলি, ঠিক আছে দাও, পড়ে দেখবো। আটঘাট বেঁধেই যে লটি মাঠে নেমেছে সেটা বেশ বুঝতে পারি, বেশ কয়েক বছরের বাৎসরিক নিউজলেটার, ইতিহাস বই, সংবিধান বই, ডিরেকটরি বই, ৫০ বছরপূর্তির সূভেনির বই, সান উইথ দি রাইড গল্প সংকলনসহ যাবতীয় তথ্য ব্যাগ ভর্তি করে দিয়ে যায়। আমি সেদিন থেকেই পড়তে শুরু করি। এক সপ্তাহের মধ্যেই আমি মোটামুটি সকল তথ্য জেনে যাই। মনে মনে ভাবি চমৎকার, এই সংস্খার সংগে যুক্ত হলে আমি এক অসাধারন কাজের মধ্যে নিজেকে পরিব্যপ্ত রাখতে পারবো, আমি বাংলাদেশের অসহায় ও অভাবী শিশুদের সাহায্য করতে পারবো। এর চেয়ে ভাল কাজ আর কি হতে পারে বলে সেই মূহুর্তে আমার মনে হল। সংগে সংগে সিদ্ধান্ত নিলাম আমার যেমনই লাগুকনা কেন, আমাকে এই গিল্ডের সদস্য হতে হবে। আমার দ্বারা যদি বাংলাদেশের শিশুদের সামান্য কিছু উপকার হয়, সেটাই হবে আমার জন্য বড় পাওয়া। অন্তত দেশের মানুষের জন্য সুদুর আমেরিকায় থেকেও কিছু একটা করা হবে।

বইগুলো পড়ে আরো জানতে পারলাম, যে কোন দেশের ৪টি প্রতিষ্ঠানকে অনুদান প্রদান করা যায়। দেখলাম কুইন্স গ্রুপে বাংলাদেশের মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান আছে যেটা সে সময় অনুদান পাচ্ছে। তার মানে আমি এখানে যুক্ত হলে আরো ৩টি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবো।

তবে সেই সময়টায় আমি আমার ক্যারিয়ার নিয়ে খানিকটা ভাবছিলাম। স্কুল সিসটেমে কাজ করার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু জাতিসংঘ গিল্ডের কার্যকারণ জানার পরে মনের ইচ্ছাটা সেচছায় বিসর্জন দিলাম। এরপর গিল্ডের সদস্য হলাম ও গিল্ডের কাজে নিজেকে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করলাম। কয়েক বছরের মধ্যেই আমি বাংলাদেশ থেকে আরো ৩টি প্রতিষ্ঠানকে গিল্ডের আওতায় এনে অনুদান দিতে শুরু করলাম। এক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করে নারী নেত্রী ড: মালেকা বেগম ও লেখিকা সেলিনা হোসেন। বাংলাদেশের ঐসব প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকবার আমি দেখতে গিয়েছি ও গিল্ডের অফিশিয়াল চেক পরিচালকদের হাতে তুলে দিয়েছি। এখনও মাঝে মাঝে অসহায় ও প্রতিবন্ধী শিশুগুলোর মুখ প্রায়ই চোখের সামনে ভেসে উঠে।

বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি শিশু সংস্থাকে আমার মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে অনুদান দিতে পেরেছি। যেমন কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন, উৎস বিদ্যানিকেতন, ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন, The Optimists Inc., Kiddi Bloom, কৃষ্ণা ফাউন্ডেশন (কলকাতা)। এর ভেতরে বেশ কয়েকটি অনেক বছর যাবত অনুদান পেয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে অনান্য দু’ একজন বাংলাদেশী সদস্যও বেশ কিছু বাংলাদেশী প্রোজেক্টকে অনুদান পাঠিয়েছে। আমি শুধু বাংলাদেশ প্রসঙ্গই তুলে ধরলাম।

আমি দীর্ঘদিন যাবত অর্থাৎ ২৬ বছর যাবত গিল্ডের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। প্রথম থেকেই বিভিন্ন পদে কাজ করেছি। কুইন্স গ্রূপের ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছি ৮ বছর। যাহোক, পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট পদের দায়িত্ব গ্রহন করতে হয়েছে।

বর্তমানে গিল্ডের অনারারী প্রেসিডন্ট হলেন জাতিসংঘের সেকরেটারী জেনারেলের স্ত্রী মিসেস গুতেরেজ। আমি ছয় বছর প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত ছিলাম। আমার পরে বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন ইরানীয়ান ও আর্মেনিয়ান বংশদ্ভুত Annette Hyrapetian.

ইউনাইটেড নেইশান্স উইমেন্স গিল্ড

২০২৩ সালে বড় একটি পরিবর্তন সাধন হয়, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৪টি গ্রুপ আবার একত্রিত হয়ে একটি গ্রুপে পরিনত হয়।

বর্তমানে আমরা অন লাইন অর্থাৎ অ্যামাজন স্মাইল, পে-প্যাল সিসটেমের মাধ্যমেও গিল্ডের দোকানের জিনিসপত্র বিক্রি করে থাকি ও অনুদান গ্রহন করে থাকি। আমাদের ওয়েব অ্যাড্রেস হল www.unwg.org। ওয়েবসাইট গেলে আমাদের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিষয়ে জানতে পারবেন। চাইলে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারবেন।

যাহোক, আসলে যারা কর্মঠ তাঁরাই অধিকাংশ কাজ করে থাকে, যার জন্য মুষ্টিমেয় কিছু সদস্যদের সারাক্ষণ ছুটোছুটির মধ্যে থাকতে হয়। এই গিল্ডের নিবেদিত প্রাণ কিছু ভাল মানুষ আছে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে গিল্ড এগিয়ে চলেছে। এসব কর্মীরা ভালবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকেই শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

পৃথিবীতে এখনও স্বার্থহীন ভালমানুষ আছে বলেই স্বেচছাসেবী সংস্থাগুলো টিকে আছে ও মানুষের সেবায় নিজেদের মূল্যবান সময়কে ব্যয় করে যাচ্ছে। যুগে যুগে এ ধরণের ভাল মানুষদের আগমন ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও আশাকরি এর অন্যথা হবে না। আমরা চাই পৃথিবীর সকল শিশুরা ভাল থাকুক, শান্তিতে থাকুক।

৭ জুলাই, ২০২৬


নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক, সমাজকর্মী ও সংগঠক।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।