বাংলা সিনেমার বিবর্তন ও কিছু কথা

অ্যান্থনি পিউস গোমেজ
May 17, 2026
8 views
38 mins read

অখন্ড সময়ের পথ ধরে ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনে চলমান বিশ্ব। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে নানা পরিবর্তন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুনত্বের সন্ধানে অরে উত্তরণের প্রত্যাশায় এগিয়ে চলছে মাববস্রোত, মাবব সভ্যতা। বিবর্তন মানব জীবনের এবং প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য বহমান ধারা, তারই সাথে আবর্তিত হচ্ছে আমাদের জীবনযাপন, আমাদের পথচলা, আমাদের সমাজ-সভ্যতার আগামীর বলয়ে ধেয়ে চলা। সময়ের চোরাবালিতে হারিয়ে যায় সময় আর বিবর্তনের পথ ধরে সৃষ্টি হয় ইতিহাস, গড়ে উঠে স্মৃতির পাহাড়। অবিরাম পথচলার মাঝে আমরা ফিরে যাই পেছনের দিকে, তাকিয়ে থাকি স্মৃতির জানালা ধরে সেই সময়ের দিকে, যে সময়টা একদিন আমাদের বর্তমান ছিল, যে সময়টাতে আমরা উপভোগ করেছি জীবনের অনির্বচনীয় নির্যাস, এক নষ্টালজিয়ায় আপ্লুত হয় আমাদের মন।

আমাদের জীবনযাপনের অন্যতম অংশ আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-কৃষ্টি। এগিয়ে চলার নানা বাঁকে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে চলমনা জীবন সংগ্রামের মাঝে সাহিত্য ও সংস্কৃতি আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাহিত্য-সংগীত, ঐতিহ্য-কৃষ্টি, শিল্প-সংকৃতি, চলচ্চিত্র এসবই যে কোন জাতির জন্য শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়, এসব একটি জাতির জীবনধারার দর্পন। আজকের যে প্রতিপাদ্য বিষয় তা হলো-  বাংলা সিনেমার বিবর্তন। গবেষণাভিত্তিক, তত্ত্ব ও তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণমূলক লেখা এটা নয়, বরং বিষয়টিকে ঘিরে কিছু ভাবনা মেলে ধরার প্রয়াস মাত্র।

সিনেমা বা চলচ্চিত্র সাধারণ ধারণায় বিনোদনের মাধ্যম, তা অনস্বীকার্য। শুধু আমাদের বাংলাদেশে নয়, বা ভারতীয় উপমহাদেশে নয়, সারা বিশ্ব জুড়েই সিনেমা বা চলচ্চিত্রের এই প্রভাব সমানভাবে বিস্তারলাভ করেছে এবং জাতীয় সংস্কৃতির এক বিশাল প্রতিফলন ঘটে এই চলচ্চিত্রকে আশ্রয় করে, একটি জাতির সংকৃতি ও জীবনধারার প্রতিফলন ঘটে সিনেমার রুপালি পর্দায় একেকটি গল্প বলার ছলে।

যদি বাংলা সিনেমার কথা বলি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি বলতে হয়, তাহলে উল্লেখ করতে হয় যে আমাদের সিনেমা শুধু আনন্দের আধারই নয়, এটি বাঙালির সমাজের যাপিত জীবন, জীবনের নানা অনুষঙ্গ, প্রেম-বিরহ, সমাজ ও সংসার, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ভাষা, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের এক চলমান দলিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে  বিগত প্রায়  শতবর্ষে সিনেমা নানা বিবর্তনের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, বদলে গেছে সিনেমার গল্প বলা, সিনেমার প্রেক্ষাপট, সংগীত, নৃত্য, সংলাপ, পোশাক, কারিগরি কৌশল ও ব্যবস্থাপনা, অভিনয়শৈলী ইত্যাদি এবং সাদা-কালো পেরিয়ে রঙের ছোঁয়ায় আলোকিত হয়েছে রুপালি পর্দার বিশাল ক্যানভাস। ষ্টুডিওর চত্বর, যেমন এফডিসি এবং বারী ষ্টুডিও ছিল এক সময় সিনেমার চিত্র ধরণের প্রধান কেন্দ্র, পরবর্তীতে সেখান থেকে বেরিয়ে বাইরের লোকেশান বা শুটিং স্থল  ছিল এক সময়ের বিশেষ আকর্ষণ। অতঃপর শুরু হয়েছিল দেশের বাইরে বিদেশের প্রেক্ষাপটে সিনেমার  শুটিং।  এসব ধারণা যুক্ত হয়েছিল অনেকটা ছবির আকর্ষণ এবং বাণিজ্যিক লক্ষ্য অর্জনের মুখ্য উদ্দেশ্যে। ভিন্ন মাত্রার দৃশ্যপট সিনেমা দর্শকদের  নানাভাবে আন্দোলিত করেছিল, আকর্ষিত করেছিল। এসব বিবর্তনের পথ ধরে  আবর্তীত হয়েছে চলচ্চিত্রের ইতিহাস, বাংলা সিনেমার পথচলা।

একটু পেছন ফিরে তাকালে সিনেমার ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই পুরোনো যুগের কথা। সেসময়টা ছিল সিনেমার নির্বাক যুগ।  আমরা সবাই জানি বাংলা সিনেমার যাত্রা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। তখন চলচ্চিত্র ছিল নীরব— অর্থাৎ সংলাপ ছিল না, শুধু দৃশ্য, অভিনয় ও সঙ্গীতের মাধ্যমে গল্প বলা হতো।  ত্রিশের দশকে বর্তমান বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচালক ছিলেন অম্বুজপ্রসন্ন গুপ্ত, যিনি ১৯৩১ সালে ঢাকায় নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র “দ্য লাস্ট কিস” পরিচালনা করেন (তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল)। ক্রমান্বয়ে বাংলা সিনেমা নীরব চলচ্চিত্র থেকে আধুনিক ডিজিটাল ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে পৌঁছেছে- এক বিশাল পরিবর্তনের পথ ধরে সিনেমা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তবে আগের যুগের সেই সময়ের সিনেমার কথা বলতে গেলে উল্লেখ না করলেই নয় যে, সে  সময়ে সিনেমা ছিল মূলত নাট্যশিল্পের সম্প্রসারিত রূপ। মঞ্চাভিনয়ের প্রভাব ছিল প্রবল, ক্যামেরা ছিল স্থির, আর গল্প বলার ধরন ছিল সরল। বাংলা ভাষায় সংলাপ, গান ও সঙ্গীত যুক্ত হওয়ার ফলে সিনেমা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। ত্রিশের দশকের সে সময়ে কলকাতা বাংলা চলচ্চিত্রের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। নিউ থিয়েটার্সের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলা সিনেমাকে শিল্পমান, সঙ্গীত, অভিনয় ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।  সে সময়ের আরেকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক হলো চলচ্চিত্র ছিল সাহিত্যনির্ভর গল্প, সামাজিক মূল্যবোধ, প্রেম, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং মানবিকতার বিষয়গুলোর গুরুত্ব ছিল প্রধান। আর সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের কথা বলতে গেলে সেসময়ের যাঁদের লেখা নিয়ে বা গল্প উপন্যাস নিয়ে সিনেমা তৈরি হতো, তাঁরা হলেন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকের সাহিত্যকর্ম।  

এছাড়া বাংলাদেশেও পরবর্তীতে কিছু কিছু সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র হয়েছে, যেমন- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর কাহিনী অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সিনেমা। দুই বাংলায়ই মানুষের বিনোদনের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের প্রভাব ছিল প্রচন্ড, তবে এই ধারার সিনেমায় মানুষের আবেগ, সামাজিক অসাম্য, পারিবারিক সম্পর্ক, নারী-পুরুষের অবস্থান, গ্রামীণ জীবন ও মধ্যবিত্ত সমাজের টানাপোড়েনই বিশেষভাব ফুটে উঠেছে বার বার এবং নাড়া দিয়েছে মানুষের মনে। জীবন সংগ্রামের মাঝে হাপিয়ে উঠা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে এটাই ছিল বিনোদনের এক অনন্য মাধ্যম। এছাড়া বাংলা সিনেমা ধীরে ধীরে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, সামাজিক চিন্তার বাহক হয়ে ওঠে। এটাও বিবর্তনের ধারায় স্মরণযোগ্য এক বিশেষ অধ্যায়। 

বাংলা সিনেমার সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হলো পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক। যাঁরা বাংলা সিনেমাকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন, তারা হলেন ভারতের সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের মতো মহীরুহ পরিচালকবৃন্দ। এই সময়ে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেন বাংলা সিনেমাকে বিশ্বমানের শিল্পরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের চলচ্চিত্রে মানবজীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতি, বাস্তবতা, নীরবতা ও নান্দনিকতা, দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন, বেদনা ও ইতিহাসের ক্ষত, শহুরে জীবন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রেণিসংগ্রাম ও সামাজিক প্রশ্নকে চলচ্চিত্রে নতুন ভাষা দেন।গভীরভাবে প্রকাশ পায়, ভারতীয় উপমহাদেসের বাংলা চলচ্চিত্র স্থান করে নেয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক মহিমান্বিত সম্মানের জায়গায়। অর্থাৎ সে সময় বাংলা সিনেমা শিল্প, দর্শন ও মানবিকতার দিক থেকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়, বলা যায় সে সময়টি ছিল চলচ্চিত্রের স্বর্ণ যুগ।

শুধু কোলকাতা বা পশ্চিম বঙ্গেই নয়, বাংলাদেশেও বাংলা সিনেমার একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি হয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামীণ জীবন, সামাজিক বাস্তবতা, প্রেম, পারিবারিক সম্পর্ক এবং জাতীয় চেতনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে।

বাংলাদেশে পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত যেসব নির্মাতাগণ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে চিন্তাশীল ও জাতীয় চেতনাসমৃদ্ধ ধারায় এগিয়ে যাবার প্রয়াসে এগিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন- আবদুল জব্বার খান, ফতেহ লোহানী, এহতেশাম, মহিউদ্দিন, সালাউদ্দিন, জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, বেবী ইসলাম, সাদেক খান, সুভাষ দত্ত, কামাল আহমেদ, চাষী নজরুল ইসলাম, আলমগীর কবির, নারায়ণ ঘোষ মিতা, আমজাদ হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও শেখ নিয়ামত আলী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য (তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল)।

সত্তর থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে আলমগীর কবির, চাষী নজরুল ইসলাম, সুভাষ দত্ত, নারায়ণ ঘোষ মিতা, আমজাদ হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, শেখ নিয়ামত আলী, আজিজুর রহমান, বাদল রহমান, কাজী হায়াৎ, মতিন রহমান, মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, আবু সাইয়ীদ, হুমায়ূন আহমেদ ও নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু (তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

নব্বই দশক থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, আবু সাইয়ীদ, হুমায়ূন আহমেদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, তৌকীর আহমেদ, নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, শামীম আখতার, সালাহউদ্দিন লাভলু, গিয়াসউদ্দিন সেলিম, মুরাদ পারভেজ, কাজী হায়াৎ, মতিন রহমান, মনতাজুর রহমান আকবর ও শহীদুল ইসলাম খোকন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য (তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল) ।

২০১০ থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, তৌকীর আহমেদ, নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, গিয়াসউদ্দিন সেলিম, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, রুবাইয়াত হোসেন, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, মেজবাউর রহমান সুমন, রায়হান রাফি, নুহাশ হুমায়ূন, আশফাক নিপুণ, অনম বিশ্বাস, আবু শাহেদ ইমন এবং সৈয়দ আহমেদ শাওকী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য (তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল)। উল্লেখিত সময়ের প্রেক্ষাপটে যেসব পরিচালকদের নাম এহানে উল্লেখ করে হয়েছে, সেগুলো আন্তর্জালিক তথ্যভিত্তিক, গবেষণাভিত্তিক নয়, তাই তথ্য সম্পূর্ণ সঠিক না ও হতে পারে।

পরবর্তীতে বাংলা সিনেমায় ধীরে ধীরে সামাজিক জীবনের প্রতিফলন ছাড়াও বিনোদনের অন্যতম উপকরণ হিসেবে বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে স্থান করে নেয় ভিন্ন ধারার সিনেমা, যেখানে পারিবারিক বা সামাজিক জীবনের গল্প ছাড়া বিনোদন এবং বাণিজ্যই  ছিল মুখ্য বিষয়….. বিলীন হয়ে যায় সুশীল সুন্দর পরিশীলিত সামাজিক চলচ্চিত্র যুগের, আধুনিকতার লেবাসে কিছু রুচিহীন, অশালীন বা বলতে দ্বিধা নেই অশ্লীলই বলা চলে এমন ধরণের চলচ্চিত্রের আগ্রাসনে হারিয়ে যায় বাংলা সিনেমার সে স্বর্ণযুগ। এটা দুই বাংলার চলচ্চিত্রেই পরিলক্ষিত হয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে।

আরেকটি বিশেষ দিকে আলোকপাত করতে হয়, তা হলো আশি ও নব্বই দশকের পর বাংলা সিনেমা নানা সংকটে পড়ে। আকাশ সংস্কৃতির অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসনে এবং আন্তর্জাতিক বিনোদন মাধ্যমগুলোতে অবাধ প্রবেশ পাওয়ায় ধীরে ধীরে মানুষের জীবনযাপনের ধারা, চিন্তা-চেতনা-মননশীলতা, সংস্কৃতির ধারা, বিনোদনের উপকরণ বদলে যেতে থাকে….. শ্লীল অশ্লীল দুটোই মানুষের কাছে সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ সেটার প্রতিই বেশি আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে, যেটা আমাদের উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে ছিল দুর্লভ,  মানুষকে টেনেছে দুর্নিবার আকর্ষণে।

ধীরে ধীরে সিনেমার প্রতি মানুষের আগ্রহ হারাতে থাকে, মানুষ ঝুকে পরে নিষিদ্ধ সংস্কৃতির মোহে ভিন্ন আনন্দ উপকরণে। সময়ের সাথে সাথে বাংলা সিনেমা দেখার জন্য মানুষের সিনেমা হলে যাওয়া কমে যায়, বাড়িতে বসে  ভিসিআর-এ ভারতীয় ও বিদেশী শ্লীল-অশ্লীল ছবি দেখার আকর্ষণে ডুবে যায় আমাদের সমাজ।  ক্রমান্বয়ে সিনেমা হলের সংখ্যা কমে যায়, মানসম্মত গল্প নির্মাণে ঘাটতি দেখা দেয়, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা বাড়ে এবং টেলিভিশন ও পরে ডিজিটাল বিনোদনের কারণে দর্শক হল থেকে দূরে সরে যায়। বাংলাদেশে এক সময় অশ্লীলতা, দুর্বল চিত্রনাট্য ও নিম্নমানের প্রযোজনা চলচ্চিত্র শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তবে বাংলা সিনেমার এই অন্ধকার যুগ পার হতে হতে পরবর্তীতে বিগত দুই দশকে বাংলা সিনেমায় নতুন পরিবর্তন আসতে শুরু করে, এখনো চলছে  তার ধারা। তরুণ নির্মাতারা বাস্তবধর্মী গল্প, শহুরে জীবন, নারী জাগরণ, জীবনের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি,  রাজনীতি, মানসিক সংকট, থ্রিলার, ইতিহাস ও সমকালীন সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং বেশ কিছু ভালো চলচ্চিত্র তৈরী হয়েছে পশ্চিম বাংলায় ও বাংলাদেশে এবং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আজ বাংলা চলচ্চিত্র স্থান করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে!

বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তি চলচ্চিত্র নির্মাণকে সহজ করেছে, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে এখন তৈরী হয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং নতুন দর্শকশ্রেণি বাংলা সিনেমাকে নতুন গতি দিয়েছে কিছুটা হলেও। এখন বাংলা সিনেমা শুধু সিনেমা হলে সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বব্যাপী দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হচ্ছে কিছু কিছু জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্রগুলো এবং দর্শকদের প্রশংসাও কুড়িয়েছে ছবিগুলো। এটা একটি ইতিবাচক দিক যে প্রবাসের মাটিতে বসেও আমরা ভালো কিছু বাংলা সিনেমা দেখার সুযোগ পাচ্ছি, তবে সংখ্যার দিক থেকে একেবারেই নগন্য! দেশের তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এই প্রয়াস অব্যাহত থাকুক, ভালো ভালো চলচ্চিত্র তৈরী হোক, সমাজকে আলোর দিশা দেখাক আমাদের বাংলা সিনেমা- সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সিনেমার বিবর্তন হলো একটি জাতির সাংস্কৃতিক যাত্রার প্রতিচ্ছবি। বাংলা সিনেমাও তার ব্যতিক্রম নয়। নীরব চলচ্চিত্র থেকে সবাক, সাদা-কালো থেকে রঙিন, সাহিত্যনির্ভর শিল্পচলচ্চিত্র থেকে ডিজিটাল ও ওটিটি যুগ— প্রতিটি পর্বে বাংলা সিনেমা নিজেকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছে। চ্যালেঞ্জ এখনো আছে, কিন্তু সম্ভাবনাও বিশাল। ভালো গল্প, উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী অভিনয়, আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ এবং সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রতি বিশ্বস্ততা থাকলে বাংলা সিনেমা আবারও বিশ্বমঞ্চে আরও দৃঢ়ভাবে স্থান করে নিতে পারবে বলে বিশ্বাস করি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চলচ্চিত্র আবার পুনর্জীবিত হোক, নির্মাতারা ভালো ছবি নির্মাণে অনুপ্রাণিত হোক, মানসম্মত চলচ্চিত্র আমাদের সমাজকে সমৃদ্ধ করুক, সেই  প্রত্যাশাই অন্তরের গভীরে অনুরণিত হচ্ছে।  


অ্যান্থনি পিউস গোমেজ | উডব্রিজ, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক, সম্পাদক, সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মী। লেখালেখি এবং সম্পাদনার সাথে সম্পৃক্ত দীর্ঘ চার দশকেরও বেশী সময় ধরে। প্রকাশিত গ্রন্থ দু’টি।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

প্রেক্ষাগৃহের রুপালী সময় : একে একে নিভে যাওয়া আলো

Next Story

আমার ঠাকুমা, অন্তরঙ্গ প্রমীলা নজরুল ইসলাম

Latest from রূপালি ফিতার গল্প

চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল-এর সাথে পড়শীর একান্ত সাক্ষাৎকার

তানভীর মোকাম্মেল কাহিনী ও প্রামাণ্যচিত্র মিলিয়ে মোট চব্বিশটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তানভীর ... সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ড. জাকিয়া আফরিন।

রূপালী পর্দার বিবর্তন

লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় প্যারিসে বাণিজ্যিকভাবে বায়োস্কোপ প্রদর্শনী শুরু করেন ১৮৯৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বর। ... লিখেছেন কুবলেশ্বর ত্রিপুরা।

উচিৎ সাজা

এই শহরে এক সিনেমা হল ছিলো প্রায় ২০টির মতো। ভাঙাভাঙির পর আজ এসে দাঁড়িয়েছে একটিতে। ... লিখেছেন অনোয়ার হোসেন পিন্টু।

শতবর্ষে পুডভকিনের ‘মাদার’

চলচ্চিত্রের প্রথম তিন দশকে এমন কিছু কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল, যেগুলো সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের মর্যাদা পেয়ে গেছে। ... লিখেছেন শৈবাল চৌধুরী।