শেষের কবিতা : নামকরণের সার্থকতা

জয়ন্তকুমার সাহা
May 21, 2026
3 views
20 mins read

শেষের কবিতা-র নামকরণ ‘শেষের কবিতা’ কেন? সম্প্রতি, বইটি পড়া শেষ করে প্রথমেই এই প্রশ্নটি মাথায় এলো। এ প্রশ্ন অনেকের ভাবনাতেই এসেছে। যিনি যেভাবে ভাবনার রসদ খুঁজে পেয়েছেন, তিনি সেইভাবে বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন বা ব্যাখ্যা করেছেন। এবং সাহিত্য যেহেতু বিজ্ঞান নয়, সেহেতু কোনো বিশ্লেষণই ঠিক বা ভুল – তা নিশ্চিত করে বলা চলে না। 

অতঃপর, ব্যক্তিগত অনুভবের জায়গায় আসা যাক। আমার স্বল্পবুদ্ধিতে মনে হয়েছে, শেষের কবিতা-কে সাহিত্যের অর্থে কাব্যধর্মী উপন্যাস বলা হলেও, আসলে এটি একটি কবিতা। সাধারণভাবে কবিতা এত দীর্ঘ হয় না বলেই হয়ত এর পোষাকি নাম কাব্যধর্মী উপন্যাস। কিন্তু কবি কার্যত কবিতাই লিখেছেন। এর পরতে পরতে যে সংলাপ-ভাস্কর্য ও সৌকর্যের যে অভূতপূর্ব রূপায়ণ, তা একেবারেই কবিতার নিজস্ব বৈভব। এবং কোনোমতেই সেগুলি গদ্যের বা উপন্যাসের উপকরণ নয়। কিন্তু দৈর্ঘ্যের ভারে পাছে এটি এর কবিতা-পরিচয় থেকে দূরে স’রে যায় – তাই কবি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে এর নামকরণে কবিতার শীলমোহর চাপিয়ে দিলেন। এবং এই কারণেই এই ‘কবিতা’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে আমার ধারণা।   

অতএব, ‘কবিতা’ ব্যবহারের যথার্থতা খানিক পরিস্ফূট হল। এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন – কবিতার অনুষঙ্গে ‘শেষের’ শব্দটি এলো কেন? যে সময়ে কবি এটি লিখছেন, সেই সময়ে বার্ধক্য এলেও জীবনের প্রান্তসীমা নিকট নয়। কবি আরও লিখবেন, কবিতাও লিখবেন, এবং এ কথা তাঁর অজ্ঞাতও নয়। সুতরাং, তিনি সচেতন জানতেন যে, এটি তাঁর শেষ কবিতা নয়। তাহলে ‘শেষের কবিতা’ লিখলেন কেন?  

আমার ধারণা, এখানে  শেষের বা শেষ কথার অর্থ last নয়, বরং final বা ultimate। এই প্রেমের কবিতার মধ্যে দিয়ে সেই নরনারীর প্রেম সম্পর্কে কবি তাঁর চূড়ান্ত অনুভব প্রকাশ করলেন। তিনি নিজেই লিখেছেন, প্রেম চিরকাল রহস্যাবৃত ও ব্যাখ্যাতীত। তথাপি আজীবন সেই প্রেমের রাজ্যে বিচরণ ক’রে তাঁর চূড়ান্ত তথা শেষ আত্মোপলব্ধি তিনি ‘শেষের কবিতা’য় সমর্পন করে গেলেন। 

কী সেই উপলব্ধি? তিনি প্রেমকে দুভাগে ভাঙলেন- প্রথম প্রেম, খাঁচার পাখির প্রেম, দ্বিতীয় প্রেম, বনের পাখির প্রেম। ‘একদা কী করিয়া মিলন হল দোহে, কী ছিল বিধাতার মনে?’ সম্ভবত বিধাতার মনোবাঞ্ছা ছিল, রবিঠাকুরকে দিয়ে ‘শেষের কবিতা’ লিখিয়ে নিয়ে প্রেমের একটি আপাত উপসংহার টেনে দেওয়া। 

কবি অনুভব করলেন, যুগলের অনন্ত প্রেম ছড়িয়ে আছে ঘরে বাইরে। একটি ঘড়া পূর্ণ ও শূন্য করার নৈমিত্তিকতায় আবদ্ধ, অপরটি পুষ্করিণীর মতন ঔদার্যে উন্মুক্ত। একটি বাঁধা পড়ে, এবং তাতেই তার সহজাত পরিণতি। অপরটি অবাধ, তার সামনে পিছনে অতলান্ত সাগর, অনন্ত আকাশ। রামধনু দিয়ে বাড়ির বেড়া দেওয়া যায় না। তাকে চিরকাল ভালোবেসে আকাশেই ছেড়ে রাখতে হয়, যদিও ‘অন্তরে তার নিত্য যাওয়া আসা।’ এক প্রেম শিকড় হয়ে গেঁথে রাখে ভূমিতে, অপর প্রেম শাখাপ্রশাখায় অন্তর্লীন হয় অনন্ত বিস্তারে। তাই, উপান্তে পৌঁছে কবি লিখলেন, ‘দূরত্ব যদি সত্যি সত্যিই ভালোবাসার গভীরতা বাড়িয়ে দেয়া, তবে আমি দূরেই থাকতে চাই।’

এই কবিতায় শোভন ও কেটি দু’জন গার্হস্থ্য প্রেমের দুই শিকড়। শোভন লাবণ্যের প্রতি এবং কেটি অমিতের প্রতি অনুরক্ত। বিপরীত তরফের সমানুভূতি তেমন উচ্চকিত নয়। তবু তাঁরা পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হলেন। অথচ লাবণ্য ও অমিতর প্রেম সত্য, সুন্দর ও শাশ্বত। কিন্তু তাঁরাই অনুভবের একটি স্তরে উপনীত হয়ে পারস্পরিকভাবে দূরে স’রে গেলেন। জীবনসঙ্গিনী রূপে বেছে নিলেন এমন দু’জনকে, যাঁরা তাঁদের প্রতি অনুরক্ত। এই সিদ্ধান্তের ফলে শোভন ও কেটি তাঁদের ঈপ্সিত জীবনসঙ্গীকে কাছে পেলেন। তাঁদের যা কিছু অপূর্ণতা ও অপূর্ণতাজনিত অবসাদ- সব প্রেমের হোমাগ্নিতে ভষ্ম হলো। এই আপাতকঠিন ও মর্মান্তিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কবি শোভন ও কেটির সহজ সাবলীল ও নিষ্পাপ প্রেমের পূজা সফল ক’রে তুললেন। এবং একইসঙ্গে তিনি লাবণ্য ও অমিতের প্রণয়ের বেড়া ভেঙে তা চিরকালীন করেও দিলেন। ওঁরা বুঝলেন, এত প্রেম ধরে রাখার মতন জীবনের অবকাশ তাঁদের নেই। প্রাত্যহিক ঘাতে প্রতিঘাতে জড়িয়ে পড়লে তাঁদের এই প্রেম ক্ষতবিক্ষত হয়ে সতত ক্ষয়ে যাবে। হ্যাঁ, না চাইলেও যাবে। অথচ এই প্রেমকে অক্ষয় করে রাখতেই তো উভয়ের বাসনা। প্রেমের প্রথম মুহূর্তেই প্রেমিক প্রেমিকার মরণ হলে সে প্রেম নিজের শক্তিতে বেঁচে থাকতে চায় – এ কথা ঠিকই, কিন্তু সেই অঙ্কুরের গোড়ায় প্রতি মুহূর্তে একটু একটু করে ভালোবাসা ঢেলে না দিলে সে বেঁচে থাকলেও মহীরুহ হয়ে ওঠে না। এ নিঠুর সত্য গভীর আবেগ ও দুর্বলতার মুহূর্তে দাঁড়িয়েও লাবণ্য ও অমিত উপলব্ধি করলেন। আর কেবল যে উপলব্ধি করলেন তা-ই নয়, তাঁরা স্বীয় স্বীয় অন্তরের যোগটুকু অক্ষয় রেখে বাইরের যোগটুকু ছিন্ন করলেন। বাইরে চিরবিচ্ছেদ হয়ে গেলো, অন্তরে চিরযোগ। অতঃপর প্রতিদিন যখন তাঁরা একা হবেন, নিঃসঙ্গতার প্রহর যাপন করবেন, তখন তাঁরা একা থেকে ফের একত্র ও একত্রবদ্ধ হবেন। প্রতিদিন হবেন। প্রতি মুহূর্তে হবেন। প্রতি অনুভবে হবেন। জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নিশীথে, কিংবা অরণ্যের নৈঃশব্দে, অথবা শিলং পাহাড়ের নিরালায় তাঁরা আবার পুনর্বার ভিন্ন থেকে অভিন্ন হয়ে মিলিয়ে নেবেন একে অপরের চরাচর। কিন্তু তা এই বিদায়টুকু মেনে নেওয়ার মূল্যে। এবং সে মূল্যের ভার অপরিসীম জেনেও।            

আমরা সতত আবেগের দাস। প্রেম আমাদের আবেগকে উশৃঙ্খল ক’রে তোলে। ঋষি কবি তাকে বাঁধতে শেখালেন। গতিপথ দেখিয়ে দিলেন ভগীরথের মতন। কার্যত, কোনও প্রেমই  মরুপথে ধারা হারায় না। তাকে বাঁচিয়ে রাখার পথ খুঁজে নিতে হয়। সে পথে অমরত্বের ঠিকানা লেখা থাকে। কবি এ কথাই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন। 

তথাপি এর পরেও এক সত্য থাকে, তা হলো সে-ই বিচ্ছেদ, সে-ই বিদায়। সত্য হলেও, নিরুপায় হলেও, তা সহজ নয়। তার অণুতে অণুতে ভাঙনের শব্দ। ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যুর মধ্যেও’, ‘তবুও শান্তি, তবু আনন্দ’ গাইতে গিয়েও, কবি বিষন্নতার সুর বেঁধে ফেলেছিলেন। এ এক অপ্রতিরোধ্য বেগ। এখানেও লাবণ্য লিখছেন-

‘তোমা হতে বহুদূরে

মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে

পার হয়ে আসিলাম’।

তবুও প্রত্যয়, তবুও সেই লাবণ্যকে অতিক্রম ক’রে যাচ্ছেন আর এক লাবণ্য-

‘সবচেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়

সে আমার প্রেম।

তারে আমি রাখিয়া এলেম

অপরিবর্তনীয় অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।’

লক্ষ্যণীয় যে, ‘অপরিবর্তনীয় অর্ঘ্য’ শব্দবন্ধের ভারবহন কবিতার পক্ষে সহজ নয়, তবুও সচেতনভাবেই কবি এটি লিখলেন।

লাবণ্য তাঁর শেষ কথা উচ্চারণ করছেন-

‘উৎকণ্ঠা আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে

সেই ধন্য করিবে আমিকে ….

তোমারে যা দিয়েছিনু তার

পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার …

হে ঐশ্বর্যবান,

তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;

গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।’

কবি নিজেই লিখেছেন, ‘শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?’ তবুও কিছু কিছু উপলব্ধি শেষ কথার মতোই আছড়ে পড়ে। প্রেমের কবি তাঁর আজীবনের বোধ ও অর্জন দিয়ে মিলন বিচ্ছেদের আপাত ভাবনাকে বৃহত্তর পরিসরে মুক্ত করে দিলেন এই কবিতায়। সেখানে কখনও আমি শোভন, আমিই কেটি। আবার কখনও আমি লাবণ্য, আমিই অমিত। ঘরে বাইরে এই আমিই জুড়ে আছি আমাকে। কোথাও স্থির, কোথাও অস্থির, চাওয়া ও না-চাওয়া, পাওয়া ও না-পাওয়া – এই যে দ্বন্দ্ব, এই যে দোলাচল – এ তো সর্বজনীন। এর শেষ কোথায়? কীসে? কোন মোহানায়?  

‘শেষের কবিতা’ এই প্রশ্নের উত্তর বড়ো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে। নিবিড়ভাবে অথচ অন্তরঙ্গে, নিভৃতে। একান্তে কান না পাতলে, তা শোনা বড়ো কঠিন হয়ে ওঠে।


জয়ন্তকুমার সাহা | কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ

পেশায় একজন সরকারি আধিকারিক। বাংলা, ইতিহাস ও ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এবং সাংবাদিকতা ও জনসংযোগে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা। গত কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় কলকাতা বাংলা আকাদেমি থেকে লেখকের (যৌথ দায়িত্বে) একটি অনুবাদ গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

সম্পাদকীয়: জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ / মে ২০২৬

Next Story

আমেরিকার অনিঃশেষ যুদ্ধ

Latest from সাহিত্য ও সংস্কৃতি

মায়াবিনীর হেঁশেল

আকাশটা আজ উনুনের পাশে বসে থাকা বিমর্ষ এক নারী— ধোঁয়াটে শাড়ির আঁচল সামান্য সরিয়ে, ... লীনা ফেরদৌস-এর নাতিদীর্ঘ কবিতায় এক নারীর দীর্ঘ দৈনন্দিন।

প্লেট

অনেক চিন্তা ভাবনার পর সিদ্ধান্তে এলাম, না আর নয় হাড় কাঁপানো শীতে, আর আকাশ থেকে ঝড়া শুভ্র কণার স্নো পড়ার... গল্পটা লিখেছেন ফাহিম রেজা

স্ক্যান্দিনাভিয়ান নরকে

কিছু একটা ভুল হচ্ছে। একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তার মনে পড়ছে না। কিন্তু কেন গুরুত্বপূর্ণ তা ... দুই পর্বে গল্পটা লিখেছেন তালহা মুনতাসির নাফি।

যে মানুষটি আর ফিরে আসেনি

সকালটা অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল। এতটাই শান্ত যে নীরা বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছিল— কোনো শব্দ কি আসবে? ... কাজী আহমেদ শামীম লিখেছেন অসম্পূর্ণাতে পূর্ণতার গল্প।

গাজার শিশুরা

এই মুহূর্তে আমি যখন কাতারের পথে ভাসমান আটলান্টিকের আকাশে উড়ছি ... ড. দলিলুর রহমান-এর কবিতায় গাজার বিভীষিকা।