ফেরেশতারা শাসন করে না। অলক্ষে মানুষকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রাখে, ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীরা এমনই ভাবেন। কোন দেশই হয়তো আদর্শ শাসক পায় না।ফেরেশতাতুল্য শাসক তো নয়ই কিন্তু জনবান্ধব শাসকদেরই ফেরেশতা জ্ঞান করে মানুষ। আমাদের ফেরেশতাদের শাসনের খোয়াব খোয়াবই থেকে যাবে?
সরকার বিরাজ করে রাষ্ট্রে।মানুষ রাষ্ট্রের সাবজেক্ট। মানুষকে শাসন করে আইন-বিধি আর সেই বিধির নিয়ন্ত্রক সরকার।নিয়মের নিগড়ে বাধা মেট্রোপলিটন বা আরাবান কিংবা রুরাল জনসমাজ। এইখানে নিয়ম মেনে চাললে প্রত্যক্ষ কোন পুরষ্কার হয়তো নাই কিন্তু নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলেই আইন আদালত না হয় জরিমানার শাসন।
নাগরিকদের সুকৃতির আর আর দুষ্কর্মের হিসাব রাখে সরকারের আইন প্রয়োগকারী সব প্রতিনিধি। আর ইসলামের অনুসারীরা বিশ্বাস করে তাদের সঙ্গে যে ফেরেশতা আছে তারা হিসাব রাখেন তাদের দৈনন্দিন পাপ পূণ্যের যেটি সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় নিয়ম আর অনিয়ম। অন্যান্য ধর্মেও এমন হোলি স্পিরিটের উল্লেখ আছে যা ব্যাক্তির নিয়ন্ত্রক। কিন্তু নাগরিকরা যেহেতু ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির না তাই তাদের আইন আদালত সরকার রাষ্ট্র এসব লাগে। শুধু ফেরেশতার শাসন শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।
রাষ্ট্র পরিচালনার সাধারণ শাস্ত্রীয় রীতি হচ্ছে- এক সরকার আরেক সরকারকে দায়িত্ব হস্তান্তর করে। রক্তাক্ত জুলাইয়ের পর নজিরবিহীন এক পরিস্থিতিতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে এক সরকারের জন্ম হয়। তিনদিনের সরকারবিহীন অবস্থা থেকে নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। দেড় মাসের এক সর্ববিস্তারী জন-আন্দোলনের প্রেক্ষিতে একটা জন-অভ্যুত্থানের ফলাফল হিসেবে জন্ম হয়েছিল নতুন এক অন্তর্বর্তী সরকারের।
বাংলাদেশের এক আবহমান রাজনৈতিক বাস্তবতা যে, রাজনৈতিক অচলাবস্থার জটিলতা কাটাতে সবসময় অরাজনৈতিক ব্যক্তির উপরই ভরসা করতে হয়েছে।নব্বই সালে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ, ২০০৭ সালে সেনা সমর্থনপুষ্ট ফকরুদ্দীনের সরকার আর এই সর্বশেষ দফায় অরাজনৈতিক প্রফেসর ইউনূসকে দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য! একজন যোগ্য সূত্রধর কি তিনি হতে পারবেন? সংশয়বাদীদের সংশয় ছিল প্রথম থেকে।
সংস্কার আমাদের রাজনীতিতে নতুন কোন প্রত্যয় নয়। আগেও এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অতীতে রাষ্ট্র সংস্কারের সময় যে ভুলগুলো হয়েছিল, সেগুলোর পুনরাবৃত্তির বিষয়ে সতর্ক থাকা কর্তব্য ছিল। সংস্কার না হলে প্রকৃত রাজনৈতিক রুপান্তর সম্ভব নয়। আর সংস্কার না হলে ভেস্তে যেতে পারে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খা। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দীর্ঘ ইতিহাসে স্থায়ী উদাহরণে পরিণত হবে বাংলাদেশ।
দায়িত্ব নেয়ার পর চব্বিশ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস বলেছিলেন, একটা বিষয়ে সবাই জানতে আগ্রহী, কখন আমাদের সরকার বিদায় নেবে। যেন জন্মের আগে মৃত্যু নিশ্চিত করতে চাওয়া জাতক তিনি এবং নিয়েছেন জাতির দায়িত্ব। তিনিও বলেছিলেন, এটার জবাব আপনাদের হাতে, কখন আপনারা আমাদেরকে বিদায় দেবেন। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আমরা কেউ দেশ শাসনের মানুষ নই। আস্বস্ত করেছিলেন এই বলে যে,আমরা শুধু ফ্যাসিলিটেটর, কোনো শাসক না।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সমগ্র জাতি এক নতুন ইউটোপিয়াযর দেখা পেয়েছে যেন। সাড়ে পাঁচ দশকের নীতি বৈকল্য যেন কোন সংস্কারের যাদু স্পর্শে দূর হয়ে যাবে। সাবধানে সংস্কার স্বপ্ন দেখতে হবে, এটা ভুলে গিয়েছিল জাতি। কারণ নীতিহীনতার যে উদযাপন চলছিল তার প্রেক্ষিতে সংস্কার যেন অপ্রিয় বাস্তবতা।
বাংলাদেশ তার সাড়ে ৫ দশকের রাজনৈতিক অভিযাত্রায় নানা ধরনের সরকার দ্বারা শাসিত হয়েছে। নির্বাচিত সরকার, অনির্বাচিত সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেনাসমর্থিত সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার, কোনটা সাংবিধানিক কোনটা সংবিধানাতীত আর এই পরিক্রমায় বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এর ৮৬ দিন স্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেটিকে উদ্দেশ্য করে সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান “ফেরেশতাদের শাসন” শব্দজোড়টি ব্যবহার করেন। আর সেই সফল সরকারের সাফল্য নিয়ে যশস্বী সাংবাদিক গবেষক আলতাফ পারভেজের একটা আকরধর্মী গবেষণা কাজ “ফেরেশতাদের শাসন” শিরোনামে বই পাওয়া যায়।
খোয়াবনামা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ম্যাগনাম ওপাস। বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ সাহিত্য কীর্তি। খোয়াবনামায় তিনি দেখিয়েছেন মিথের সফল ব্যবহার। কাৎলাহার বিল এক আলোচিত স্থান নাম যেটি বাংলা সাহিত্যের সচেতন পাঠকমাত্রই কল্পনায় দেখতে পান। সেই কাৎলাহার বিলের ধারের ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে বাঘের ঘাড়ে জোয়াল চাপিয়ে আবাদ শুরু। সেসময় কোন এক বিকেলবেলায় মজনু শাহর বহু সংখ্যক ফকিরের সঙ্গে মহাস্থানগড়ের দিকে যাওয়ার সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈনিক টেলারের গুলিতে মারা যায় মুনশি বয়তুল্লাহ শাহ। কাৎলাহার বিলের দুই ধারের গিরিরডাঙা ও নিজগিরির ডাঙার মানুষ সবাই জানে, বিলের উত্তরে পাকুড়গাছে আসন নিয়ে বিল শাসন করে মুনশি।
এই উপন্যাসের মিথ ও বাস্তবতার নানা পরত দেখা যায়। বিলের জঙ্গলা পরিষ্কার করে যে বাঘের ঘাড়ে জোয়াল চাপিয়ে আবাদ শুরু করে, এসব মিথ। কহিনী পরম্পরায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনার গুলিতে মুনশি বয়তুল্লাহ যে মারা যায় এটা ঐতিহাসিক সত্য।
বাংলাদেশ যদি হয় অপশাসনের জঙ্গল ভরা কাৎলাহার বিল আর প্রফেসর ইউনূস ছিলেন যেন সেই মুনশি বয়তুল্লাহ। ‘খোয়াবনামা’য় মুনশি বয়তুল্লাহ মারা গিয়েছিল সৈনিকের গুলিতে আর প্রফেসর ইউনূসকেও ব্যর্থ করার চেষ্টারত ছিলেন তাঁর সভাসদগণ, আর কিছু অরাজনীতিক ব্যক্তি অথবা আমরা যা জানি না এমন গভীরের কিছু (যারা ডীপ স্টেট নামে পরিচিত)।
তবে ২০২৫ সালে স্বাধীনতা দিবসের পরেই প্রফেসর ইউনূসের চীন সফর বেশ আলোচনায় ছিল। সফল চীন সফর তকমা পাওয়া গিয়েছিল সেসময়। চীন এক বিশেষ দেশ। মনে থাকার কথা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগের সফরটিও ছিল চীনে। এক বছরের অল্প সময়ের ব্যবধানে একই বাংলাদেশ বিপরীত মাত্রার অভিবাদন পেল যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির ধারাপাত বদলের মতো কিছু। আর এই সাফল্যকে পূঁজি করে কেউ কেউ আরো ৫ বছর ইউনূস সরকারকে চায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন প্রচারণা চলছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার ফেরেশতা কালক্রমে আদেশ না মানার কারণে শয়তানে রুপান্তরিত হয়েছিল। আর রাজনৈতিক সরকারের ভালো বিকল্প এখনো জানা নেই মানুষের।
দেশের এক ক্রান্তিলগ্নে প্রফেসর ইউনূস অপ্রিয় হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই হয়তো দায়িত্ব নিয়েছেন অন্তর্নিহিত শ্রেয়বোধ থেকে। তিনি কর্মী মানুষ জানেন নিশ্চয়ই কার্ল মার্ক্সের পর্যবেক্ষণ পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করেছেন অনেকই এখন প্রয়োজন পরিবর্তন করার, তিনিও একই ঘরানার। অনেকই ভাবেন, তাঁর চাইতে বড় চেঞ্জ মেকার কে বাংলাদেশে? তাঁর জীবনের নানা পর্বে কখনো মাইক্রো ক্রেডিট কখনো সোশ্যাল বিজনেস আবার সাম্প্রতিক থ্রি জিরোর মতো সব স্বপ্ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছেন।এগুলো আসলে ড. ইউনূসের ক্যাথারটিক রিলিজের (আবেগমুক্তিকর) মাধ্যম। তাঁর নতুন দায়িত্ব ছিল সংস্কারোত্তর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রুপান্তর। সেখানে তিনি কেমন করেছেন? ফেরেশতা তুল্য নাকি অন্য কিছু? সে উত্তর তোলা থাক সময়ের কাছে।
২ মে, ২০২৬

এম এম খালেকুজ্জামান | ঢাকা, বাংলাদেশ
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও নীতি বিশ্লেষক। “দ্যা কনস্টিটিউশন অফ বাংলাদেশ :সার্চ ফর আ জাস্ট সোসাইটি” বইয়ের সহ লেখক ও সম্পাদক।
