বিছানার চাদরে মায়ের গন্ধ, টেবিলে পড়ে থাকা অর্ধসমাপ্ত জলের বোতলে মায়ের হাতের ছাপ। ওই তো সেই ছেঁড়া ওষুধের পাতা যেখান থেকে মা দুটো ওষুধ নিয়ে খেয়েছিল। চারদিকে মা মা গন্ধ। আগে তো কখনো বুঝিনি আমার ভেতরের গোটাটাতেই মা বাস করেন। আমি তারই প্রতিচ্ছবি।
“নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গে” আমার মা, “আমি সাধারণ মেয়ের “প্রবল আবেগের মাঝে আমার মা,
“আনন্দ মঠ” পড়ে দেশপ্রেম জাগানোতে আমার মা,
“ম্যকসিম গোরকিতে”ও আমার মা।
মেঘদূত কাব্য পড়ে প্রথম প্রেমের অনুভূতি জাগানোতেও আমার মা।
মধ্যরাতের ইমনে আমার মা, আবার ভোরের ভৈরবীতেও মা,
ভাটিয়ালির টানেও আমার মা,
জীবন দর্শনের অনুভূতির মাঝে আমার মা, প্রতিটি মানুষকে ভালোবাসার মাঝে আমার মা।
ওই যে লাল রোয়াকটা, সেখানে দাঁড়িয়ে লাল শাড়ি আর খই দিয়ে গাঁথা অলঙ্কার পরে “দারুণ অগ্নি বানে রে”, তাতেও আমার মা।
তিল তিল করে আমায় গড়েছে আমার মা।
আমার আমিতে “মা”-এর বাস।
আকাশ ভরা বৃষ্টি সেদিন, আমার বিছানার লাগোয়া বড় জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি উঠোনের জায়গায় জায়গায় জমা জল। উঠোন পেরিয়ে বাগানের ওই পেয়ারা গাছটার মধ্যে সবুজ পাতার আড়ালে দুটো চড়াই মনের আনন্দে স্নান করে চলেছে। গাছে থোকা থোকা পেয়ারা, কোনোটা হালকা সবুজ কোনোটা বা হলুদ, বৃষ্টি নামতেই আমার দস্যি মা, উনোনের জ্বাল থেকে কড়াই নামিয়ে গাছকোমর জড়িয়ে উঠোনে নেমে পড়ল।
বড় জানলার গরাদ দিয়ে আমি দেখলাম মা উঠোন পেরিয়ে প্রায় ছুটেই চলে গেল বাগানের দিকে। যাবার সময় যেন কিছুটা ইচ্ছে করেই ওই জমে থাকা জলে ছলাত ছলাত করে গেল। মায়ের ওই আলতা রাঙা পায়ের ছোঁয়ায় জমে থাকা জলে গোলাপীর আভা। অভিমানে কেয়ার ঠৌঁট ফুলে উঠল। মা নিজেত বৃষ্টির জলে ভিজছে, আর বলে গেল ” কেয়া, একদম যেন বৃষ্টিতে ভিজবে না”, ঠান্ডা লেগে যাবে।
তারপর আমার দস্যি মা এক কোচড় সবুজ হলুদ পেয়ারা কয়েকটা জানলা দিয়ে আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। কেয়ার সামনে তখন খোলা অঙ্ক খাতা, আর খাটের বালিশের তলায় লুকোনো শুকতারা। বাবা অঙ্ক করতে দিয়ে গেছে দশটা। এদিকে বালিশের তলায় শুকতারার পাতায় তখন বাটুল দা হাঁদা- ভোদাকে ওঠবোস করাচ্ছে।……..
“মা ও মা, আর ভিজোনা। ভাতটা চাপাও। ইস্কুলের দেরী হয়ে যাবে যে?”

