আলমগীর কবিরের মৃত্যুসংবাদ আমাদের বাসায় পৌঁছেছিল এক শীতের সকালের নিস্তব্ধতায়। বাবার কাছে একটি ফোন কল এসেছিল অফিস থেকে। বাবা তখন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা সংবাদটি যেন মুহূর্তেই আমাদের পৃথিবী বদলে দিয়েছিল, নগরবাড়ী ফেরিঘাটে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন আলমগীর কবির, আমাদের সবার প্রিয় মামা। তিনি যাচ্ছিলেন বগুড়ায়, একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব উদ্বোধন করতে। ১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি, মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন।
আমার পাঁচ খালার একমাত্র ভাই ছিলেন তিনি। পরিবারের জন্য এটি ছিল এক ভয়াবহ আঘাত, কিন্তু শুধু আমাদের পরিবার নয়, পুরো দেশের সাংস্কৃতিক জগত যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ আলমগীর কবির শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক চিন্তক, এক কর্মী, এক স্বপ্নদ্রষ্টা।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশলবিদ্যা পড়তে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ইংল্যান্ডে পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে ছাত্রজীবনেই তার ভেতরে জন্ম নেয় অন্য এক সত্তা, একজন রাজনৈতিক সচেতন মানুষ, একজন সাংবাদিক, একজন কর্মী। পরিবারের ইচ্ছা ছিল তিনি পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত প্রকৌশলী হবেন। আমার নানা তাকে বলেছিলেন, “আগে পড়াশোনা শেষ করো, তারপর যা ইচ্ছা করো।” মামা সেই কথাই রেখেছিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি শেষ করেছিলেন, কিন্তু নিজের পথ নিজেই বেছে নিয়েছিলেন।

ইংল্যান্ডে থাকতেই তার জীবন এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। লন্ডনের ছাত্রজীবন ছিল তার জন্য একদিকে বৌদ্ধিক মুক্তির সময়, অন্যদিকে রাজনৈতিক জাগরণের সূচনা। তিনি অক্সফোর্ড ও লন্ডনের চলচ্চিত্র ক্লাবগুলোতে নিয়মিত যেতেন এবং সেখানে ইউরোপীয় সিনেমার নতুন ভাষার সঙ্গে পরিচিত হন। বিশেষ করে ইঙ্গমার বার্গম্যান, দে সিকা এবং ফরাসি নিউ ওয়েভ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই সময়েই তিনি চলচ্চিত্রকে শুধু গল্প বলা নয়, মানুষের অস্তিত্ব ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভাষা হিসেবে ভাবতে শুরু করেন।
লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি ধীরে ধীরে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তার যোগাযোগ তৈরি হয় এবং তিনি Daily Worker–এর মতো প্রকাশনার সঙ্গে সাংবাদিকতা শুরু করেন। একই সময়ে তিনি “East Bengal” বা “East Pakistan” আন্দোলনের প্রবাসী রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও সক্রিয় ছিলেন।
পরিবারে একটি গল্প বহুবার শুনেছি; লন্ডনে জেনারেল আইয়ুব খান সরকারি সফরে গেলে মামা প্রতিবাদ হিসেবে কালো পতাকা প্রদর্শন করেছিলেন। এই ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ তার চরিত্রেরই অংশ ছিল, তিনি বিশ্বাস করতেন শিল্প ও প্রতীকই সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষা।
লন্ডনে তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা। তিনি শুধু ব্রিটেনেই নয়, আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ কাভার করতে গিয়েছিলেন এবং সেই অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। আফ্রিকার উপনিবেশবাদবিরোধী আন্দোলন তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও দৃঢ় করে তোলে। একইভাবে কিউবা এবং লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী রাজনীতিও তাকে আকর্ষণ করেছিল, যেখানে তিনি ফিদেল কাস্ত্রো যুগের রাজনৈতিক উত্তালতা নিয়ে রিপোর্টিং করেছিলেন।
এই লন্ডন পর্বেই তিনি চলচ্চিত্র শিক্ষা আরও গভীরভাবে গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে চলচ্চিত্র তত্ত্ব, ইতিহাস ও নির্মাণশৈলী নিয়ে পড়াশোনা করেন। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তার চলচ্চিত্রকে বাণিজ্যিক কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক ভাষা দেয়।
ষাটের দশকের শেষভাগে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চলচ্চিত্রের দিকে ধীরে ধীরে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু তার চলচ্চিত্র জীবন শুরু থেকেই আলাদা ছিল, তিনি কখনোই প্রচলিত বাণিজ্যিক ধারার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি।
তার প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), যা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত হলেও প্রচলিত যুদ্ধচিত্রের মতো নয়। এটি ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী মানুষের ভাঙা জীবন, স্মৃতি, ক্ষতি এবং পুনর্গঠনের এক গভীর মানবিক প্রতিচ্ছবি। চলচ্চিত্রটি ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছিল এবং এতে প্রথমবারের মতো যুদ্ধকে কেবল “বিজয়” নয়, “ক্ষত” হিসেবেও দেখা হয়।
এরপর আসে সূর্যকন্যা (১৯৭৫), যা ছিল বাংলাদেশের বিকল্পধারার সিনেমার এক নতুন ভাষা। এই চলচ্চিত্রে তিনি নারীর স্বাধীনতা, সামাজিক কাঠামো এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই সময়ের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী একটি সিনেমা, যা মূলধারার সিনেমার বাইরে নতুন দর্শন তৈরি করে।
তার সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর একটি ছিল সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭)। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ এবং জয়শ্রী কবির। এটি ছিল এক প্রেমের গল্প, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল পরিচয়, বিচ্ছেদ, শ্রেণি এবং অস্তিত্বের প্রশ্নে ভরা একটি দার্শনিক চলচ্চিত্র। ভূপেন হাজারিকার সংগীত এই চলচ্চিত্রকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
এরপর আসে রূপালী সৈকতে (১৯৭৯), যা অনেকের মতে তার সবচেয়ে কাব্যিক চলচ্চিত্রগুলোর একটি। এখানে তিনি সমুদ্রকে শুধু পটভূমি নয়, বরং মানুষের আবেগ, স্মৃতি এবং অনিশ্চয়তার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এটি ছিল এক ধরনের ভিজ্যুয়াল কবিতা, যেখানে কাহিনির চেয়ে অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তার চলচ্চিত্র মোহনা এবং মহানায়ক এ তিনি আরও গভীরভাবে সমাজ, রাজনীতি এবং শিল্পীর দ্বন্দ্ব নিয়ে কাজ করেন। বিশেষ করে মহানায়ক চলচ্চিত্রে তিনি তার সময়ের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের সংকট, তারকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি এবং শিল্পীর আত্মসংকটকে প্রশ্ন করেছিলেন, যা তখনকার জন্য অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ছিল।
আলমগীর কবিরের চলচ্চিত্রে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি কখনো সরল ন্যারেটিভে বিশ্বাস করতেন না। তার ছবিতে রাজনীতি ছিল, কিন্তু সেটি বক্তৃতা নয়; ছিল মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ভেতর দিয়ে উঠে আসা রাজনীতি। তার ক্যামেরা সবসময় মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব খুঁজে ফিরত।
তিনি প্রামাণ্যচিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। বিশেষ করে স্টপ জেনোসাইড–এর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সেখানে তার কণ্ঠ শুধু একটি বর্ণনা ছিল না—এটি ছিল একটি জাতির আর্তনাদ।
তার চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে। গবেষকরা তাকে বাংলাদেশের “অল্টারনেটিভ সিনেমা মুভমেন্ট”-এর প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি চলচ্চিত্রকে শুধুমাত্র গল্প বলার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে সামাজিক পরিবর্তনের একটি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
মামার সঙ্গে ভারতীয় কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। চলচ্চিত্র, নন্দনচিন্তা ও রাজনৈতিক বোধ নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে মামা বিয়ে করেন কলকাতার অভিনেত্রী জয়শ্রী রায়কে, যিনি সত্যজিৎ রায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বিয়ের পর তিনি জয়শ্রী কবির নামে ঢাকায় চলে আসেন এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় ও সুন্দরী অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত হন। সীমানা পেরিয়ে, সূর্যকন্যা ও রূপালী সৈকতে চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন মামার প্রধান নায়িকা।
এই বছরের শুরুতে জয়শ্রী কবির লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের একমাত্র ছেলে লেনিন সৌরভ কবির বর্তমানে সিঙ্গাপুরে একজন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার হিসেবে কর্মরত।
আলমগীর কবির ছিলেন বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বিশ্বাস করতেন চলচ্চিত্র কেবল বাণিজ্যিক শিল্প নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। তার আজিমপুরের বাসা ছিল এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক চলচ্চিত্র স্কুল। সেখানে তরুণরা আসত এডিটিং শিখতে, চলচ্চিত্র নির্মাণ শিখতে। ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে থাকত ফিল্ম রিল, বই, পোস্টার এবং সম্পাদনার সরঞ্জাম।
তিনি ছিলেন এক অসাধারণ পাঠক ও চিন্তক। তার বিশাল লাইব্রেরি ছিল ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন ও চলচ্চিত্র তত্ত্বে ভরা। অনেক গবেষক তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিক্ষার এক অনানুষ্ঠানিক মেন্টর হিসেবে উল্লেখ করেন।
আমার শৈশবের স্মৃতিতে মামার আজিমপুরের বাসাটি যেন ছিল এক অন্য জগৎ। সেখানে সবসময় তরুণ ছাত্ররা আসত কেউ এডিটিং শিখতে, কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণ। ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে থাকত ফিল্মের স্পুল। বাসার ভেতরে ছিল একটি ছোট এডিটিং রুম, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন তিনি।
আবার এই গম্ভীর, চিন্তাশীল মানুষটিই যখন আমাদের বাসায় আসতেন, পুরো বাড়ি প্রাণে ভরে উঠত। মুখভরা হাসি নিয়ে আসতেন। আমার মায়ের রান্না তিনি খুব ভালোবাসতেন, বিশেষ করে গরুর ভুনা ছিল তার প্রিয়। ছোটবেলার স্মৃতিতে মামা ছিলেন বিশালদেহী, প্রাণবন্ত একজন মানুষ। আমাদের ঢাকা ক্লাবে নিয়ে যেতেন সাঁতার কাটতে, তারপর খাওয়াতেন দারুণ সব স্যান্ডউইচ।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে তার অসংখ্য বন্ধু ছিল। লেখক, কবি, সাংবাদিক, শিল্পী—সবাই তার আড্ডার মানুষ। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে শিল্পী ও সংগ্রামী মানুষ। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ছিল এক ধরনের অদম্য স্বাধীনচেতা মন।
আজ এত বছর পরও মনে হয়, আলমগীর কবির কেবল একজন চলচ্চিত্রকার ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক প্রজন্মের বিবেক, এক অসমাপ্ত স্বপ্নের নাম। তার চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি ছিল না; বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও চিন্তার জগত এক বিরল মানুষকে হারিয়েছিল সেদিন।
১৮ মে, ২০২৬

জাভেদ মাহমুদ শিপলু | নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র
শৈশবে একজন প্রতিভাবান শিশু অভিনেতা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। বিটিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ শিশু অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান। বর্তমানে তিনি একজন সফল ক্যান্সার বিজ্ঞানী এবং “মডার্না থেরাপিউটিকস”-এর মেডিকেল ডিরেক্টর, বিশ্বব্যাপী অনকোলজি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করেন।
