স্ক্যান্দিনাভিয়ান নরকে

স্ক্যান্দিনাভিয়ান নরকে

তালহা মুনতাসির নাফি
June 14, 2026
9 views
23 mins read

(২য় পর্ব – ২ পর্বে বিভক্ত)

কিন্তু তারপরও সে বসে না। দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকক্ষণ তাদের মাঝে কেউই কোনো কথা বলে না। একসময় মোহনা মুখ খোলে, “ও আজকে বললো, আমি নাকি সেক্স করতে জানি না।”

এই কথার উত্তর কী হওয়া উচিত সে বুঝতে পারে না। তবে মোহনাও বোধহয় ওর উত্তর শুনতে কথাগুলো বলছে না। তার বলার দরকার। তাই বলছে কিংবা নিজের সঙ্গেই কথা বলছে। সামনের মূর্তিটা কেবল একটা মিডিয়াম। রক্ত মাংসের মানুষ হলে বলাটা আরো সহজ।

“আজকে ও বললো যে আমার প্রতি নাকি ওর সব আগ্রহ মিটে গেছে।”

” কেন বললো হঠাৎ এই কথা?”

মোহনা জবাব দেয় না। আবারো অন্ধকার একটা মেঘ তাকে আড়াল করে ফেলে।

সেদিন বাবা-মা রাতে বাড়ি ফিরলে হঠাৎ করেই শোরগোল হয়। কথা কাটাকাটি এবং কয়েকটা থাপ্পড়ের শব্দও শোনা যায়। মোহনার কান্নার শব্দ শোনা যায় সবচেয়ে বেশি। তবে সেইসাথে মায়ের কান্নার শব্দও খানিকটা ভেসে আসে তার ঘরে। সে উঠে দেখতে বের হয় না। পাশ ফিরে ঘুমুতে চেষ্টা করে।

ওইদিন রাতেই- যখন অন্ধকার আরো গভীর হয় এবং সবাই ঘুমে তলিয়ে থাকে তখন তার ঘরে পরপর তিনটা টোকা পড়ে। দরজা খুলতেই দেখে, মোহনা দাঁড়িয়ে আছে।

“আসব রে?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, কী হয়েছে বল?”

“এমনি আসতে পারি না?”

“পারবি না কেন? আয়”

সে লাইট জ্বালাতে গেলে মোহনা না করে। আলো তার ভালো লাগছে না। তার ঘরটায় একটা বিরাট জানালা। অবশিষ্ট থাকে কেবল সবুজ ডিমলাইট এবং বাইরের সামান্য আলো।

“তুই বল, আমি কি সুন্দর না?”

“তোর কী হয়েছে আপা?”

“আমি কি এতটাই বিশ্রী দেখতে? ও যে বললো? আমাকে একবার পেলেই স্বাদ মিটে যাবে?”

“তুই ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছিলি। তোর মধ্যে তো কোনো কমতি নেই।”

মোহনা কিছুক্ষণ আবারো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে। তারপর চোখ মুছে বলে, “আমাকে বলে আমি নাকি সেক্স করতে জানি না।”

“কাউকে তো তোর কোনো কিছু প্রমাণ করবার দরকার নেই।”

“চুপ কর। উপদেশ দিবি না।”

চুপ করতে না করতেই সে দেখে মোহনার ঠোঁট তার সঙ্গে লেগে আছে। ওর চোখভর্তি কামনা নয়। অন্যকিছু। তাহলে সেটা কী? রাগ? অভিমান? কী ছিল সেই চোখে? তার মনে পড়ে না। তবে ছাড়িয়ে নিতে গিয়েও পারে না। কী প্রবল শক্তি যেন মোহনাকে পেয়ে বসেছে এবং অদ্ভুত গাঢ় প্রতাপে যেন সে শুষে নিচ্ছিল তার অস্তিত্বকে।

ও হঠাৎ করেই জিজ্ঞাসা করে, “আপা, তুই কি প্রেগন্যান্ট?”

উত্তরটা পাবার আগেই ও প্রচণ্ড ঘুমে তলিয়ে যায়।

সকালে ঘুম ভাঙলে সে দেখে তার পাশে কেউ নেই। তারা সবাই যখন নাস্তা করতে বসে। তখন বাবা-মা কারো মুখেই কোনো রা নেই। এমনিতে এই সময়টা বেশ বাকবিতণ্ডা চলে। মোহনা এক কোনায় বসে ডিম-ভাজি মুখে পুড়ছিল। তার কথাবার্তা বেশ স্বাভাবিক। যেন কালকের ঘটনা বলে তার জীবনে কিছু ছিল না।

কিছুদিন বাদেই মোহনাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। সাদামাটা ঘরোয়া অনুষ্ঠান। এর ভেতরে মোহনার সঙ্গে তার অসংখ্যবার কথা হয়েছে। কিন্তু সেদিন নিয়ে কোনো কথাবার্তা হয়নি। বরের নাম আবদুস সোবহান। সোবহান বাবারই গায়ের এক অনাথ ছেলে। ভালো ছাত্র বলে শহরে ইউনিভার্সিটি পড়েছে। আপাতত বেকার। অনেকেই অবাক হলো। তবে কিঞ্চিৎ কথা উঠলেই বাবা বলেন, “মেয়ে অনেক আদরের তো। মেয়েকে হাতের কাছে রাখতে চাই। ভালো ছেলের সঙ্কট জানেনই তো।”

বিয়েটা হয়েছিল যত জলদি, মোহনার বিদায়ও হলো ঠিক একইরকম তাড়াহুড়োয়। সোবহানকে বাবা একটা চাকরিতে ঢুকিয়ে দিলেন। নদীর ওপারের ফ্ল্যাটটা লিখে দিলেন সোবহানের নামে। অথচ তাদের আরো দু’টো ফ্ল্যাট ছিল কাছে-পিঠেই। মোহনা জানতো। তবে এ নিয়ে কোনো উচ্চবাক্য করলো না। বিদায় বেলায় মা সামনে আসেননি। মোহনা তাকে বিদায়ের আগে আগে বললো, “ভালো থাকিস”। আর একটা শব্দ বেশিও না কমও না।

মোহনা কি জানতো? যে গোটা জীবন সে আর স্বাভাবিক হতে পারেনি? বেশ কিছু নারী তার জীবনে এসেছে। কাউকেই সে ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারেনি। কেন? এই প্রশ্নটা সে বারবার নিজেকে করেছে এবং বোধহয় কোনো উত্তরই তার নিকট বারংবার উপজীব্য হয়ে উঠতে পারেনি। তার হৃদয়ে যে শূন্যতা বিরাজমান ছিল- কয়েলের কুণ্ডলী পাকানো একটা ধোঁয়ার মতো, যা তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে বহুদিন, সেই প্রবাহমান কিংবা কুণ্ডলী হয়ে ওঠা কিছু তাকে পরিপূর্ণ মানব হয়ে উঠতে দেয়নি। যে একটা কিছু সে সারাজীবন খুজে এসেছে, তার ভেতরে অপূর্ণতার অভিসম্পাত জানানো ক্ষুধা প্রতিনিয়ত তাকে তা মনে করিয়ে দেয়।

এর পর অনেকদিন তাদের দেখা হয়নি। অনেকদিন বলতে অনেক বছর। তার বাবা ইতোমধ্যে মারা গিয়েছেন। মা কোথায় আছেন সে জানে না। নিশ্চয়ই তার বাপের বাড়ি কিংবা অন্য কোথাও। তার নিশ্চিত হতেও ইচ্ছে করে না। এক বিকেলে মোহনা তার ছোট্ট এপার্টমেন্টে হাজির হয়। সাথে একটা বাচ্চা মেয়ে। অর্থাৎ তার ভাগ্নী। মেয়েটার নামটা এতক্ষণে মনে পড়েছে। নোরা।

“কেমন আছিস?”, স্বাভাবিক গলায় বলে মোহনা। যেন প্রতিদিনই তাদের দেখা হয় এমন।

“ভালো”।

“আসলে এমনি থাকতে এলাম। তোর সঙ্গে দেখা হয় না কত বছর। নোরাও বায়না করছিল ওর মামাকে দেখবে”।

“ভেতরে আয় আপা”।

সে যদিওবা আগেই এমন কিছু সন্দেহ করেছিল তবে সে কিছু বলার আগেই সেদিন রাতে মোহনা জানালো সত্য ঘটনা। সোবহান নাকি নিশ্চিত যে নোরা তার সন্তান না। তারা সবাই মিলে ওকে ঠকিয়েছে।

“হঠাৎ এরকম ধারণা কেন?”

“জানি না। কেউ বোধহয় ঢুকিয়েছে মাথায়। ক’দিন ধরেই বলছিল নোরার সঙ্গে নাকি ওর চেহারার কোনো মিল নেই। আরো কত কিছু এবং আজকে ঘোষণা দিল বাড়ি ছেড়ে যেন আমরা চলে যাই।”

“ফ্ল্যাট তো আমাদের না?”

“না, বাবা তো ওর নামেই লিখে দিয়েছিল”।

প্রথমে সে ভেবেছিল বলবে মামলা করতে। কিন্তু এমন কিছুই সে বললো না।

“নোরা তো সত্যিকার অর্থেই সোবহান ভাইয়ের না। তাই না আপা?”

মোহনা কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। ওর মুখটা আরেকটু লম্বা এবং ভারী হয়েছে। পাতলা সুতির শাড়ি পরা। দীর্ঘদিন পর দেখায় তার মন আবারো বিষণ্ণ হয়ে যায়। মুঠোভরা অন্ধকার ছেকে নিয়ে আসে একদল অদৃশ্য জোনাকি। তার কিছু একটা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু গলা দিয়ে বের হয় না। ওর ঘরটা সে তাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু দেখা গেল রাত হলে মোহনা সে ঘর ছেড়ে এসে তার গলা জড়িয়ে শুয়ে পড়ে। অল্প অল্প করে ফুপিয়ে কাঁদে সে। প্রায় প্রতি রাতেই এক ঘটনা। তার ইচ্ছে করে মেয়েটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু এই ইচ্ছের মূল্য সে দেয় না। গভীর ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে। মোহনার নিশ্বাস আছড়ে পড়ে তার ঘাড়ে।

এতদিনে সে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। মোহনা এবং নোরা তার বাসায় থাকছে আজ একমাস হলো। দিনের বেলায় সে অফিস করে বিকেলে ফিরলে নোরা তার কাঁধে এবং পিঠে চড়ে বসে। তার এই মামাকে তার ভারী পছন্দ হয়েছে।

তবে এদিকে ওর মনের শূণ্যতা কাটে না। দিনকে দিন যেন একটা ফাঁপা গোলকে পরিণত হয়। তার মোহনাকে আরো কাছে পেতে ইচ্ছে করে। তবে সে জানে, তা সম্ভব না যতদিন এই শিশুটি তাদের সঙ্গে থাকবে।

সে পাপ করছে? ওরকম কোনো চিন্তা কি তার মাথায় আদৌ কোনোদিন এসেছে?

তার কেবল মনে হতে থাকে। সেই প্রবল হতাশা তাকে গ্রাস করতে থাকে অল্প অল্প করে। নিশ্বাস নিতে তার কষ্ট হয়।

স্মৃতির খাতা টেপ প্লেয়ারে চলবার মতো করে একসময় অফ হয়ে যায়। অনেকটা আচমকা। ছোটবেলায় বাক্স টিভি অফ হয়ে গেলে যেমনটা লাগতো। আবারো সেই বরফেঢাকা প্রান্তর। ও দেখে, এর পরে আর কোনো স্মৃতি অবশিষ্ট নেই। এর পরে কী হয়েছিল? নোরাকে যখন সে ধাক্কা দেয় ট্রেনের নিচে। এর পর কি সে সুখী হতে পেরেছিল বাকি জীবন? নাকি সে ধরা পড়ে গেছে অথবা সেও আত্নহত্যা করেছে নোরার পেছন পেছন? তার প্রশ্নগুলো হাওয়ায় বাষ্পের মতোন মিলিয়ে যায়। উত্তর থাকে না।

সে চিৎকার করতে যায়, “কেউ আমাকে সাহায্য করুন! আমার ভালো লাগছে না”। কিন্তু তার স্বরযন্ত্র জমে গেছে। তাই কোনো শব্দের বদলে কেবল কিছু হাওয়া বরফের তুলো হয়ে উড়ে যায়।

অদূরে একটা বটগাছ তার নজরে এলো। গাছের নিচে একজন নগ্ন লোক বসা। লোকটা মোটা। থলথলে। শরীর অনেকটা রবিনের মতো। সে ধীরে ধীরে তার দিকে এগোয়। লোকটার চোখেমুখে কেমন একটা দুঃখী ভাব। সে ঝুঁকে তার দিকে তাকিয়ে- অনেকটা শিশুদের গলায় বলে, “তোমার কী হয়েছে?

সে বলতে চায়, “তার প্রচণ্ড শীত করছে।” কিন্তু প্রতিবারের মতোনই কোনো শব্দ বের হলো না। তবে কোনো কিছু বোঝার আগেই নগ্ন লোকটা তাকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করলো।

“এই নাও। আর শীত করবে না।”

সে এই আলিঙ্গন ছাড়াতে প্রাণপণ চেষ্টা করে। শব্দ করতে চায় কিন্তু আলিঙ্গন যেন আরো শক্ত হয়। তার শীত কমে না।

নৌকার পাটাতনে সে শুয়ে থাকে। কলকল করে একটা নদীর উপর নৌকাটি বয়ে চলে। কোনো মাঝি নেই। কিছু নেই। তার মুখের উপর একটা মেয়ে গভীর মমতায় তাকিয়ে আছে। আচ্ছা, এটা কার স্মৃতি? সে মনে করবার চেষ্টা করে। তার শরীরও তো তার নিকট অচেনা। এবং অনেকটা আচমকাই, ওর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি মনে পড়ে যায়, তার নিজ নাম সে জানে না। সে বোধ করে, তার অনেকগুলো নাম এবং অনেকগুলো স্মৃতি। প্রতিটা স্মৃতির সাথে প্রতিটা নামও আলাদা হয়ে যায়। আবারো সে প্রস্তুতি নেয় অন্য একটা স্মৃতি ছুয়ে দেখার। এইবার সে আর কোনোরকম প্রশ্ন করে না। চোখ বন্ধ করে। তার আবারো শীত পায়। শীতের তীব্রতা বাড়ছে তো বাড়ছেই। সে মেয়েটিকে বলতে শোনে, “গান শুনবে?”

(লেখাটির ২য় ও শেষ পর্বের এখানেই সমাপ্তি।)


তালহা মুনতাসির নাফি | ব্রেমেন, জার্মানি

লেখক, প্রচ্ছদশিল্পী এবং আলোকচিত্রী। বর্তমানে জার্মানিতে শিক্ষার্থী। একুশে বইমেলায় তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় যখন তিনি সদ্য তরুণ।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

মায়াবী দিগন্ত
Previous Story

মায়াবী দিগন্ত

এগুয়ানা
Next Story

এগুয়ানা

Latest from সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ঘেউউউ

ঘেউউউ

করোনা লকডাউনে অভুক্ত পথকুকুরদের অস্তিত্বের সংকট ও অবহেলা নিয়ে আজাদ বুলবুলের লেখা প্রতীকী গল্প ঘেউউউ। এটি বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের সম্মিলিত আর্তনাদ।
দুটি কবিতা

দুটি কবিতা

প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও ধ্রুপদী শিল্পের অপূর্ব মেলবন্ধনে সাজানো কবি মাহবুবা চৌধুরীর লেখা দুটি কবিতা 'মুদ্রার টংকার ধ্বনি' ও 'দুজন ভীষণ মুখোমুখি'।
এগুয়ানা

এগুয়ানা

ফাহিম রেজা নূরের লেখা 'এগুয়ানা' গল্পে বাড়ির শখের বাগানে এই উভচর প্রাণীটির উপদ্রব ও লেখকের এক মজার অভিজ্ঞতার চিত্র ফুটে উঠেছে।
মায়াবী দিগন্ত

মায়াবী দিগন্ত

কবি নিঘাত কারিমের লেখা 'মায়াবী দিগন্ত' কবিতায় জীবনের শেষ বিকেল, গোধূলির রং এবং অনন্ত তৃষ্ণার এক আবেগঘন চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রতিবিম্বে প্রতিপক্ষ

প্রতিবিম্বে প্রতিপক্ষ

কবি হোসাইন কবিরের লেখা 'প্রতিবিম্বে প্রতিপক্ষ' কবিতায় মানুষের আত্মিক বিচ্ছিন্নতা, অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অস্তিত্বের গভীর সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে।