এগুয়ানা তৃণভোজী উভচর প্রানীটি বাস করে দু জায়গাতেই। আমার বাসার পিছনের লেকে তার বাস, তাই প্রায়ই সে আমাদের জ্বালায়। আমরাও তাকে লাঠি-সোটা নিয়ে পিছে পিছে ধাওয়া করি। আমাদের ধাওয়ায় সে তড়িৎ গতিতে হয় রনভঙ দিয়ে লেকের পানিতে ডুব দেয় নচেৎ ভো দৌড দেয়। এই ভাবেই চলছে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ন বসবাস।
এগুয়ানা দেখতে অনেকটা কুমিরের মত, দেখলেই মনে হবে এটা বুঝি কুমিরের ছানা। তবে কিন্ত তা নয়, একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে কুমির ও এগুয়ানার পার্থক্য। কুমিরের মুখটি ছুচালো (সরু) ও দাতালো (ধারালো দাঁত)। আর এগুয়ানার লম্বা ঠোঁটই নাই। কুমীর যেমন গাছ বা দেয়াল বাইতে পারে না, অথচ এগুয়ানা গাছ ও দেয়াল বাইতে পারে অনায়াসে।
আগেই বলেছি আমাদের বাসার পিছনে সুন্দর একটা লেক রয়েছে। অতএব বুঝতেই পারছেন কত ধরনের জ্বালাতন সহ্য করতে হয়। আমার বেগম সাহেবানের শখ হয়েছে তিনি পিছনের খালি জায়গায় গাছ-পালা লাগেবেন, তার বাগেনের তালিকায় দেখলাম নানান ধরনের ফুল ও ফল গাঁছ রয়েছে। সময় মতো একদিন ভোরে কাচি-কোদাল নিয়ে নেমে পড়ছেন পিছেনের খালি স্হানে। আমি জিজ্ঞাসা করাতে তিনি আমাকে জানালেন ভোরে মাটি নরম থাকে তাই বীচ লাগানোর এখনই সময়। যাহোক যথাসময়ে নানান গাছ-গাছালী লাগানো হলো, বীচ থেকে গাছ, গাছ থেকে ফুল ও ফল – বেশ লাগলো।
একদিন এগুয়ানা হানা দিলো ফলের বাগানে, সজনে গাছটির কচি পাতা খেয়ে সাবাড় করলো। এটা দেখে আমাদের মন খুব খারাপ হলো, সিদ্ধান্ত হলো বাগানের চারিদিকে বেড়া দিতে হবে। যেই চিন্তা সেই কাজ, সাথে সাথে শুরু হলো গিন্নির কাজ। দেখলাম আমার বেগম দৌড-ঝাঁপ করছেন একবার হোম ডিপো (বাড়ীর আসবাব পত্র পাওয়া যায়) অন্যবার লুস (ঐ একই)। সুতারাং আমার আর বুঝতে বাকী রইল না, খাজনার চাইতে বাজনা বেশী হয়ে গেলো। যাহোক উনি চারিদিক তারের বেড়া দিয়ে নিশ্চিন্ত তো হলেন। কিন্ত পরদিন সকালে দেখা গেল পুঁই শাকের ডগা আর সদ্য গজানো আমড়া গাছের কচি পাতায় মুখ দিয়েছে বদমাশ এগুয়ানা। গিন্নি আবার ছুটলো হোম ডিপোতে। পরে জানলাম, ঐ গাছ দুটি বেড়া থেকে অরক্ষিত ছিল, তাই এই সর্বনাশ হলো। এবার পাকাপোক্ত করে বাগানটির চতুর্দিক ঘিরে ফেলা হলো তারের বেড়া দিয়ে। তখন ফুল ও ফলের বাগান দেখতে ভালই লাগলো, আর গিন্নির মুখে হাসিও ফুটলো।
তাই বলে এগুয়ানার আশা-যাওয়া বন্ধ হলো তা কিন্ত নয়। তারা বাগানে প্রবেশ করতে নানান ফন্দি-ফিকির করতে লাগলো। কিন্ত কিছুতেই সফল হচ্ছিলো না। এই কারনে বিবি সাহেবানের মুখে হাসি আর ধরে না। একদিন বাড়ীতে এক প্রতিবেশী দম্পতি এলো। তাদের সাথে নানান ধরনের আলাপচারিতার পরে বাগানের প্রসঙ্গ এলো। উনারা বল্লেন, তিনি ফুলের গাছ লাগিয়েছেন কিন্ত ইচ্ছা থাকা সত্বেও ফলের গাছ লাগাননি। কেন লাগাননি তা আমাদের বুঝতে বাকী রইলো না। বল্লাম কি এগুয়ানার কারনে? রহিম সাহেব বলে উঠলেন, প্রানীর নাম এগুয়ানা নয়, সেটা হবে ইগুয়ানা। জবাবে বল্লাম, মশাই নামে কি আসে যায়, দুই নামের পিছনে তো আনা আছে তাই না? তাতেই বোঝা যায় কোন প্রানীর কথা বলছি। এরাকম শক্ত যুক্তির কাছে রহিম সাহেব অন্য প্রসঙ্গের অবতারনা করলেন।
যথা সময়ে বাগানে ফলে-ফুলে ভরে উঠলো। আম গাছে মুকুল ধরলেও পরে সব ঝরে গেছে, পেঁপে গাছ গা-গতরে বেড়ে উঠলেও ফল হয়েছে যতসামান্য, ওদিকে আমড়া গাছ ভালই বেড়ে উঠেছে, শরিফা গাছে প্রচুর ফল ধরেছে, সজনে গাছে সজনেতে ভরে গেছে, ওদিকে পুঁই শাকে ঝাকা ছাপিয়ে গেছে, পাথরকুচিতে আগের চাইতে পাতা অনেক বেড়েছে, পাতাবাহার গাছগুলিতে রঙীন পাতায় শোভা বর্ধন করছে, গোলাপ ফুলের লাল, গোলাপী আর সাদা গোলাপ অথিতিদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সাথে সদ্য ফোঁটা বেলী তার ঘ্রান ছড়ানোর জন্য মৌ মৌ করছে। নানান রংয়ের টিউলিপ ফুল গুলি এবং গাঁদা ফুলের কথা আর নাই বা বল্লাম। এসব দেখে আমার গিন্নির খুশী আর ধরে না। তাকে এই বাগানের জন্য খুশী দেখে আমি খুব প্রসন্ন বোধ করলাম।
এদিকে এগুয়ানার খবর কি হলো? বাগানে বেড়া দিয়ে তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছিল। সেই জারী আস্তে আস্তে শিথিল করে দিলো আমার গিন্নি স্বয়ং। কারন হিসাবে জানালো ওদের ইচ্ছা হলে বাগানের ফল ও ফুলের পাতা খাবে বা তাদের ঘাড় মটকাবে। কিন্ত আমি এমন ভাবে বেড়া দিয়েছি যে ওরা হাজার চেষ্টায়ও বেড়া ভেদ করতে পারেনি। আমার বাগান ছিল সুরক্ষিত; ওদের যন্ত্রনায় আমি আর পেরে উঠছিলাম না। তবে তারা এখন বাগানে ঘুরতে-ফিরতে আসুক তাতে আমার কোন অসুবিধা নাই।
বাগানে বেড়া দেবার আগে একদিন বিকালে কয়েকটি এগুয়ানা বাগানে দৌড-ঝাঁপ করছিলো, তাই দেখে মহা সমারহে লাঠি নিয়ে নেমে পড়লো গিন্নি। ধাওয়া খেয়ে তারা লেজ উচিয়ে পালিয়ে গেলো। যাহোক গিন্নি আর এগুয়ানার মধ্যে টম এন্ড জেরির খেলা ভালই জমে উঠেছিল। একদিন বিরাট এক এগুয়ানা বাগানে এসে হাজির। আমি দেখলাম এত বড় এবং কালো, এর আগে আমি এমন রংয়ের এগুয়ানা দেখিনি। বেশ কায়দা করে ধরে ফেল্লাম এবং একটি ঝুড়ির নীচে চাপা দিয়ে রাখলাম। এগুয়ানাটি যাতে বের হতে না পারে তাই ঝুড়ির উপরে ইট, ফুলের টব দিয়ে তাকে বন্ধী করে রাখলাম।
আমরা এই ফাঁকে জরুরী কিছু কেনা-কাটা করে যখন বাসায় এলাম তখন আটকা পড়া এগুয়ানার কাছে গেলাম। এর আগে বলে নেওয়া ভাল, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাসায় গিয়ে আমাদের প্রথম কাজ হবে এগুয়ানাটাকে মুক্ত করে দেবো। কিন্ত কাছে গিয়ে দেখি সব কিছুই আছে (টব, ইট) কিন্ত এগুয়ানা লাপাত্তা। এটা কি ভাবে সম্ভাব হলো সেটা আমরা ভেবে কোন কূল-কিনারা পেলাম না। যখন অন্যরা শুনলো, তখন প্রায় সবাই একমত হলো, তাহলে সেটা এগুয়ানা ছিল না, সেটা ছিল ছদ্মবেশী জ্বিন বা পরী।
১ জুন, ২০২৬

ফাহিম রেজা নূর | ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র
পেশায় সাংবাদিক যদিও বর্তমানে ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক। তিনি ঢাকা, নিউ ইয়র্কের ও ফ্লোরিডার পত্রিকায় দীর্ঘদিন যাবৎ লিখছেন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ইউনিট চীফ ছিলেন ও নিউ ইয়র্ক প্রেস ক্লাবের সদস্য। কলাম লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব।
