নির্মাতা মানসিকতা

বিদ্রোহী চেতনা থেকে নির্মাতা মানসিকতা: বাংলাদেশের সামনে কি নতুন এক রূপান্তরের প্রয়োজন?

ড. মশিউর রহমান
June 14, 2026
12 views
15 mins read

এই আলোচনার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই আমাদের কবি, সাহিত্যিক কিংবা তাঁদের উদ্‌যাপনকারীদের অসম্মান করা নয়। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর আমাদের ইতিহাস, নিপীড়ন ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর কবিতা ও গান উপনিবেশ, বৈষম্য ও দমননীতির বিরুদ্ধে বাঙালির মানসিক শক্তিকে জাগ্রত করেছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৌন্দর্য, গভীরতা ও নান্দনিকতা উপলব্ধি করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সামাজিক স্থিতি ও মানসিক পরিসর প্রয়োজন।

তবে প্রশ্নটি মূলত অন্য জায়গায়।

জাপানের মহান ব্যক্তিদের তালিকা দেখলে সেখানে জাতি-গঠনের কারিগর, শিল্পপ্রতিষ্ঠাতা, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, ক্রীড়া কিংবদন্তি কিংবা মাঙ্গা স্রষ্টাদের শক্ত উপস্থিতি দেখা যায়। অর্থাৎ, সেখানে “কর্মস্রষ্টা” মানুষদের বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হয়—যারা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, শিল্প নির্মাণ করেছেন, প্রযুক্তি সৃষ্টি করেছেন এবং কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত করেছেন।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশীয় সমাজে, বিশেষত বাংলাদেশে, কবি, বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তুলনামূলকভাবে বেশি কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে। এর ঐতিহাসিক কারণ অবশ্যই আছে। উপনিবেশবাদ, ভাষা আন্দোলন, রাজনৈতিক দমননীতি, মুক্তিযুদ্ধ—এই দীর্ঘ ইতিহাসে সাহিত্য ও “বিদ্রোহী চেতনা” জাতির অস্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছিল। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগত তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও আত্মপরিচয়ের ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

কিন্তু একটি জাতির বিকাশের নির্দিষ্ট পর্যায়ে “বিদ্রোহী চেতনা” থেকে “নির্মাতা মানসিকতায়” রূপান্তর প্রয়োজন হয়।

“কারার ঐ লৌহ কপাট” ভেঙে বেরিয়ে আসার মানসিকতা যদি স্বাধীনতার বহু দশক পরও একটি জাতির মনস্তত্ত্বে প্রধান অবস্থানে থাকে, তাহলে হয়তো দীর্ঘমেয়াদি জাতি-গঠনের মানসিকতা পুরোপুরি বিকশিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। আত্মপরিচয়ও প্রয়োজন। কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো—

  • প্রতিষ্ঠান নির্মাণ
  • শিল্প ও কোম্পানি গড়ে তোলা
  • বিজ্ঞান ও প্রকৌশল
  • কার্যগত উৎকর্ষতা
  • সম্পদ সৃষ্টি
  • শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মসংস্কৃতি

জাপান নিজেদের সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে শিল্পায়ন করেনি। তারা সংস্কৃতি, শৃঙ্খলা ও কার্যসম্পাদন—এই তিনটিকে একত্র করেছে। তাদের সমাজে কবিতা আছে, সাহিত্য আছে, নান্দনিকতা আছে; কিন্তু একই সঙ্গে আছে গভীর নির্মাণশীলতা, সংগঠিত কর্মনীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নচিন্তা।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় আনা প্রয়োজন—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক মনস্তত্ত্ব এখনও অনেকাংশে ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতার মধ্যে আটকে আছে।

ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তান, তারপর বাংলাদেশ—রাষ্ট্রের নাম ও রাজনৈতিক পরিচয় বদলেছে, কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোর বড় অংশ অপরিবর্তিত থেকে গেছে। উদাহরণ হিসেবে জেলা প্রশাসক বা সিভিল সার্জনের মতো পদগুলোর ক্ষমতা ও কাঠামোকে দেখা যায়। একটি শহর বা জেলায় নির্বাচিত মেয়র থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের গুরুত্ব ও প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে বেশি থাকে। তাঁদের সরকারি বাসভবন, প্রশাসনিক সুবিধা এবং ক্ষমতার বিন্যাস এখনও অনেকাংশে “সাহেবি শাসনব্যবস্থা”-র ধারাবাহিকতা বহন করে।

সমস্যাটি শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিকও। স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েও আমরা অনেক ক্ষেত্রে “শাসিত হওয়ার সংস্কৃতি” থেকে পুরোপুরি বের হতে পারিনি।

এর বিপরীতে জাপানে স্থানীয় সরকার অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রতিটি স্থানীয় সরকারের নিজস্ব পরিষদ রয়েছে, তারা বাজেট প্রণয়ন করে, স্থানীয় মেয়র বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। এমনকি সরকারি আমলাতন্ত্রও স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে পৃথকভাবে পরিচালিত হয়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের স্থানীয় নেতৃত্বের অধীনে কাজ করতে হয়। ফলে স্থানীয় সমস্যা সমাধান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নাগরিক অংশগ্রহণ অনেক বেশি কার্যকরভাবে গড়ে ওঠে।

জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বল্প সময়ের জন্য দখলদার শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাংলাদেশের মতো দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়নি। তাই তাদের রাষ্ট্র ও নাগরিক মানসিকতায় “নিজেদের দ্বারা নিজেদের নির্মাণ” ধারণাটি অনেক বেশি শক্তিশালীভাবে বিকশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের পরিবর্তন নিয়ে আমরা প্রায়ই অর্থনীতি, রাজনীতি বা প্রযুক্তির কথা বলি। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি পরিবর্তন সম্ভবত আরও গভীরে—ঔপনিবেশিক মনমানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা।

আজও উপজেলা কমপ্লেক্সে হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা আবাসন নির্মাণকে আমরা স্বাভাবিক হিসেবে দেখি। যেন প্রশাসনিক পদধারীদের জন্য বিশেষ নিরাপদ কাঠামো তৈরি করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। এই মানসিকতা শুধু অবকাঠামোতে নয়; ক্ষমতা, মর্যাদা ও নাগরিক সম্পর্কের ধারণাতেও প্রভাব ফেলে।

তাই নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা এখনও প্রাসঙ্গিক। কারণ আমাদের সমাজে এখনও ভাঙার মতো অনেক অদৃশ্য শৃঙ্খল রয়ে গেছে। কিন্তু সেই বিদ্রোহ যদি শেষ পর্যন্ত নির্মাণে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে একটি জাতি দীর্ঘসময় ধরে শুধু প্রতিবাদী হয়েই থাকতে পারে—নির্মাতা হয়ে উঠতে পারে না।

আমাদের হয়তো এখন এমন একটি সাংস্কৃতিক ভারসাম্য প্রয়োজন, যেখানে কবিতা থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে, আত্মপরিচয় থাকবে—কিন্তু একই সঙ্গে থাকবে নির্মাণ, শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা মানসিকতা এবং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান গড়ার সংস্কৃতি।

কারণ একটি জাতির পরিপক্বতা শুধু তার প্রতিবাদের শক্তিতে নয়, বরং তার নির্মাণক্ষমতায়ও প্রকাশ পায়।


ড. মশিউর রহমান | সিংগাপুর

বিজ্ঞানী, লেখক ও উদ্যোক্তা। বাংলায় বিজ্ঞান প্রচারের লক্ষ্যে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত biggani.org-এর প্রতিষ্ঠাতা। সফল ক্যারিয়ার গঠন, পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক বইয়ের লেখক।


1 Comment Leave a Reply

  1. WOW! This is one of those rare moments when I have read something truly out-of-the-box in thought and expression, yet presented in such simple and accessible language.

    Reading this reminded me of Leadership and Self-Deception: Getting Out of the Box by The Arbinger Institute — not because the subjects are the same, but because both point to a deeper shift in mindset. Real transformation begins when we stop defining ourselves only by opposition to others and start asking what we are willing to build ourselves.

    That is why the article’s idea of moving from a “rebellious consciousness” to a “builder’s mindset” feels so powerful and timely. Our history of protest, resistance, and sacrifice is deeply important. But a nation cannot live forever only on the energy of resistance. At some point, that energy has to be transformed into institution-building, knowledge creation, discipline, skill development, productivity, and responsible citizenship.

    Many countries have gone through similar transformations. Japan — as the author so eloquently described — rebuilt itself from the devastation of war through discipline, technology, and institution-building. South Korea moved from poverty to global industrial strength through education, hard work, and national focus. Singapore turned its limitations into strength through planning, governance, and social discipline. Rwanda, after unimaginable tragedy, also chose the difficult path of reconstruction and reconciliation.

    That is what makes this article so refreshing. It does not blame; it invites reflection. It does not dismiss our past struggles; it asks how we can carry that spirit forward into construction, responsibility, and national renewal.

    A truly thoughtful, timely, and necessary piece.

Leave a Reply

Your email address will not be published.

দুবাই বাংলা বইমেলা
Previous Story

উন্মোচন করা হলো না বালির পাহাড়

যুক্তির চাইতে বিশ্বাস সুন্দর
Next Story

যুক্তির চাইতে বিশ্বাস সুন্দর: প্রসঙ্গ “অনন্ত”!

Latest from পড়শীর আরশি

পাঠবিমুখতা

“ওরা শুধু স্ক্রলই করে”

বইয়ের বদলে শুধুই স্ক্রলিং? স্মার্টফোনের আগ্রাসন ও তরুণদের পাঠবিমুখতা নিয়ে মিনার মনসুর-এর এক তীক্ষ্ণ ও বাস্তবমুখী বিশ্লেষণ।
যুক্তির চাইতে বিশ্বাস সুন্দর

যুক্তির চাইতে বিশ্বাস সুন্দর: প্রসঙ্গ “অনন্ত”!

মাহমুদ রেজা চৌধুরীর 'যুক্তির চাইতে বিশ্বাস সুন্দর' প্রবন্ধে দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্মের আলোকে মানুষের বিশ্বাস এবং অনন্তের নান্দনিক রূপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

অনলাইন পত্রিকা “পড়শী” : প্রবাসে এক চিলতে বাংলাদেশ

অনলাইন পত্রিকা "পড়শী" এপ্রিল ২০২৬ এর সংখ্যাটি পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ... পড়শী'র অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লিখেছেন মাকসুদা মাহতাব।

পার্শিয়ানরা টিকে থাকবে

একটা সুপার পাওয়ার তার সমস্ত শক্তি নিয়ে এবং তার সহযোগী রাষ্ট্রগুলির শক্তি নিয়ে যখন ছোট একটি দেশকে ... ইরানে বর্তমান মার্কিন আগ্রাসন নিয়ে লিখেছেন ড.

জাদুর বাক্সের আগ্রাসনের যুগে একটি পত্রিকার বাঁচামরা

সময় বদলে গেছে। এখন প্রায় প্রত্যেকের হাতেই একটি করে জাদুর বাক্স। সামাজিক মাধ্যমে ... পড়শী'র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছেন মিনার মনসুর।