তাহার পরে? তাহার পরে সকলে একজোট হইয়া সিদ্ধান্ত লইলো কাদম্বিনীর সৎকার এইবার নিখুঁতভাবে করিতে হইবে। প্রথমবারের মৃত্যুতে যথেষ্ট সমাদর পায় নাই বলিয়াই-তো আবাগীর বেটিকে দ্বিতীয়বার মরিতে হইলো!
রেশমের সাদা থানে পেঁচাইয়া কাদম্বিনীর বিধবা দেহটিকে দাহ করিবার জন্য প্রস্তুত করা হইলো। জীবদ্দশায় এমন একখানা নরম থান পরিধানের সৌভাগ্য কাদম্বিনীর কখনো হয় নাই।
প্রথম মৃত্যুতে পোড়াইবার কাঠের আকাল পরিয়াছিলো। তাহার দ্বিতীয় চিতা সাজানো হইলো চন্দন কাঠে! সেই চিতা সাজাইতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যায় হইলো, সেই পরিমাণ অর্থের সিকিভাগও কাদম্বিনী সমস্ত জীবনে খরচ করিয়া মরিতে পারে নাই। চিতায় ঢালা খাঁটি, সুগন্ধি ঘি’এর কয়েক চামচ যদি অভাগী গরম ভাতের সহিত খাইতে পারিতো, তবে তাহার শীর্ণকায় দেহে খানিকটা গত্তি লাগিতো।
ঝড় – জলের রাতে প্রথম মৃত্যুর সময়, পুলিশের ভয়ে কাদম্বিনীর শ্মশান যাত্রা ঘটিয়াছিলো নিঃশব্দে। এইবার কাদম্বিনী উচ্চকিত শব্দে, ঘটা করিয়া শ্মশানের দিকে যাত্রা করিলো। জমিদারমশাই শারদাশংকরবাবু নিজে দাঁড়াইয়া খাটিয়া রওয়ানা করাইয়া দিলেন। হরিবোল ধ্বনিতে গগন কাঁপিয়া উঠিলো। শ্মশান বন্ধুরা বেশি বেশি করিয়া খাবলা ভরিয়া খইমুড়ি ছড়াইতে লাগিলো। কাদম্বিনীর দ্বিতীয় মৃত্যুতে সকলেই প্রথম মৃত্যুর সকল ঘাটতি পূরণের বেশি বেশি চেষ্টা করিতে লাগিলো!
শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাইলো গ্রামের সকলে। যে কাদম্বিনীকে যে নিন্দেমন্দ করিয়া ছিলো, যে তাহার চরিত্র নিয়া কুকথা রটাইয়া ছিলো, বিপদের দিনে যে তাহাকে মুখের মিষ্টতা দিয়াও স্বান্তনা দেয় নাই, যে তাহাকে আকন্ঠ ভালোবাসিয়া ছিলো, তাহারা সকলেই শ্রাদ্ধে পাত পাতিয়া খাইলো।
গরম ভাতে পাপড় ভাজা, শুক্তো, লাবড়া, চাটনি আর কাতলামাছের ঝোল খুব করিয়া মাখাইয়া খাইবার পর সকলেই শেষ পাতের দইয়ের প্রশংসা করিতে লাগিলো। যে কাদম্বিনীর হাতের রান্না খাইয়াছে এবং যে খায় নাই, সকলেই বলিলো “অভাগীর রান্নার হাতটি বড্ড ভালো ছিলো!” পান চাবাইতে চাবাইতে বাড়িতে গিয়া প্রায় সকলেই সৌখিন, সুখপ্রদ দিবানিদ্রায় ঢলিয়া পরিলো এবং অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই কাদম্বিনীকে বিস্মৃত হইলো!
লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রথমবার মৃত কাদম্বিনীর দ্বিতীয় মৃত্যু রানীহাটের মানুষজনের জন্য কয়েক দিনের খোশগল্পের
খোরাক হইয়া কালের গর্ভে মিলাইয়া গেল। বাল্যবিধবা, সন্তানহীনা কাদম্বিনী এইবার মরিলো!
যমকে ফাঁকি দিতে পারিলেও সে মনুষ্য জাতিকে ফাঁকি দিতে পারিলো না! খানিকটা ধৈর্য্য, সহ্য, সহানুভূতি বা ভালোবাসা দিয়া তাহাকে বাঁচাইয়া রাখিবার মতো ভুল কোনো মানুষ করিলো না! মৃত মানুষের স্মৃতিকে ভালোবাসিয়া জীবন কাটানো গেলেও, মৃত্যু হইতে ফিরিয়া আসা মানুষকে ভালোবাসা অসম্ভব।
সাদা থান পরিয়া, একাদশীতে নির্জলা উপবাস রাখিয়া আর বাকি দিনে নিরামিষ খাইয়া প্রাণধারন করা কাদম্বিনীর
জীবনের একমাত্র উল্লেখযোগ্য কর্ম ছিলো প্রথমবার মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়া দ্বিতীয় বার মরা। কতোটা চালাকচতুর হইলে একবার মরা মানুষকে দ্বিতীয় বার মরিয়া প্রমাণ করিতে হয় যে সে মরিয়াছে!
২৫ জুন, ২০২৬

