পড়শী মূল রচনাবলী আগামী – শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২৪ বছর

আগামী – শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২৪ বছর

Post Views: 153

১৯৮৮ সাল, বাংলাদেশ তখন ভয়াবহ বন্যার কবলে। সারাদেশের মানুষ যেন অসহায় হয়ে পড়েছে। সেই সংবাদ যেন দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশীদের। বাবু রহমান নামের এক তরুন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। বাবু রহমানের বাবা-মা বাংলাদেশী তবে বাবু রহমানের জন্ম কানাডায়। তার মায়ের মন তখন কিভাবে বাংলাদেশের মানুষগুলোর পাশে দাড়ানো যায় সেই ভাবনায় অস্থির। ছেলেকে অনুরোধ করলেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পেইন করে কিছু করা যায় কিনা। মায়ের অনুরোধে সারা দিয়ে বাবু রহমান তখন ক্যাম্পেইন চালালেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সারাও পেলেন বেশ। কিছু অর্থ সংগ্রহ হলো। এবার পড়ে গেলেন অন্য এক সংকটে, অর্থগুলো পাঠাবেন কিভাবে দেশের মানুষের কাছে। অনেক খোজ করার পর ওয়াশিংটন ডিসি এর একটি সংগঠনের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে সক্ষম হলেন তিনি।

এই ছোট্ট ঘটনাটি তাকে ভাবিয়ে তোলে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ভ্রমনে গিয়ে মানুষের সীমাহীন কষ্টের জীবন দেখে ভাবতে থাকেন কি করা যায়। এভাবেই চলে যায় বেশ কয়েক বছর। ২০০৩ সালে বাবু রহমানের বাবা ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালী এলাকা থেকে প্রকাশিত পড়শী পত্রিকায় লেখা দিতে এসে বাবু রহমানের সেই স্বপ্নের কথা শেয়ার করেন পড়শীর সম্পাদক মন্ডলীর সাথে। ভাবনাটি পছন্দ হয় পড়শীর সম্পদক মন্ডলী আবু হাসান এবং সাবির মজুমদারের। এবার শুরু হয় সম্মিলিত প্রচেষ্টা। কারন বিদেশে বসবাসরত প্রতিটি বাংলাদেশী মানুষের মাঝেই যে বাংলাদেশ এক অনুপ্রেরনার নাম। সেই দেশটির মানুষের জন্য কিছু করতে পারার মাঝে যেন খুজে পাওয়া যায় শৈশবের স্মৃতি, মায়ের ছোয়া। তিনজনের সমন্বিত প্রচেষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত হয় এক সংগঠন। ভবিষ্যতের সমাজকে বদলে দেয়ার এক প্রত্যয় সবার মাঝে, তাই নাম দেয়া হলো “আগামী”।

আগামি

মানুষের পাশে দাড়াবার অনেক মাধ্যমই রয়েছে। আগামী বেছে নিয়েছে শিক্ষা। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে সমাজকে পরিবর্তন করার প্রত্যয় আগামী’র। আগামীর প্রতিষ্ঠাতাগন শিক্ষাকে বেছে নেবার বড় কারন হিসেবে নিয়েছেন, শিক্ষা এমন একটি মাধ্যম যার মাধ্যমে সমাজকে স্থায়ীভাবে সহযোগিতা করা সম্ভব। অন্য সব সমাধান কেবল সাময়িক সমাধান দিতে পারে। তাই আগামী’র মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের গড়ে তোলা।

প্রবাসে বাস করা প্রতিটি বাংলাদেশীই আবেগের দিক থেকে বাংলাদেশকে সমর্থন করা, নিজেদের সাধ্যমত সহযোগিতা করার চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু এই সব চেষ্টাই সার্বিকভাবে ফল দিতে পারে না খুব একটা। এর বড় কারন যে কোনও পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়, কিংবা একবারে করা সম্ভব নয়। পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। আর এই নিরন্তর চেষ্টা তখনই সম্ভব হয়, যখন মানুষ সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে একটি কাজের পেছনে বছরের পর বছর সময় ব্যয় করে। “আগামী” ২০০৩ সাল থেকে যাত্রা শুরু করে গত ২৩ বছর ধরে নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে এই পরিবর্তন আনার জন্য। শুরুতে তিনজন স্বেচ্ছাসেবীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হলেও আগামী দুই শ’রও বেশী স্বেচ্ছাসেবীদের একই ছায়াতলে নিয়ে এসেছে যারা প্রবাসে বসে বাংলাদেশের জন্য ভাবনায় নিমগ্ন থাকে। সর্বদা চেষ্টা চালিয়ে যায় কিভাবে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তার মাধ্যমে দেশের সামাজিক ও আর্থিক সহযোগিতায় হাত বাড়ানো যায়। এর ফল স্বরূপ ২০০৩ সালে মাত্র তিন হাজার ডলার সংগ্রহ করার মাধ্যমে কাজ শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে প্রতি বছর সাড়ে তিন থেকে চার লাখ ডলার সহায়তা প্রদান করে আসছে।

আগামি

অনুদান সংগ্রহ করার জন্য আগামী সারা বছর ধরে নানা ধরনের ক্যাম্পেইন চালিয়ে যায়। বছরের মাঝামাঝি সময়ে একটি বা দু’টি ফান্ডরেইজিং অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, যেখানে ভলান্টিয়ার, ডোনার, শুভাকাঙ্খীদের সরাসরি অংশগ্রহন থাকে। আগামী এই কার্যক্রমে সবার সামনে তুলে ধরার পাশাপাশী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এছাড়া বছরের শেষে অনলাইন ফান্ডরেইজিং ক্যাম্পেইন, রমাজানের সময় অনলাইন রমাজান ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের কাজ করে আগামী।

ফান্ডরেইজিং কার্যক্রমের বাইরে আগামী অন্যান্য সংগঠন, যেমন – খান একাডেমী, ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, লার্নিং ইকুয়েলিটি সহ আরও অনেক সংগঠনের সাথে পার্টনারশিপ করার মাধমেও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম পরিচালনার কাজ করেছে এবং করছে।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করার জন্য আগামী ৯টি প্রোগ্রাম পরিচালনা করে যাচ্ছ। প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে – স্কুল প্রোগ্রাম, এডুকেশন ট্যাকনোলোজি, টিচার্স ট্রেইনিং, লাইফ ইজ ফান, ইপ্রোভিং ইংলিশ টিচিং, লাইব্রেরী প্রজেক্ট, হেল্থ ফর এডুকেশন, আগামী চেজ গিল্ড এবং নিটিং প্রজেক্ট। স্কুল প্রোগ্রামের মাধ্যমে আগামী বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকদের বেতন, ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল ড্রেস, টিফিন সহ স্কুল সাপ্লাই এর সরঞ্জাম প্রদান করে থাকে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন স্কুল থেকে এপ্লিকেশন সংগ্রহের মাধ্যমে আগামী এর সাথে স্কুল সংশ্লিষ্ট করার কাজ সহ স্কুল মনিটরিং করার কাজও স্কুল প্রোগ্রামের মাধমে পরিচালনা করা হয়। এডুকেশন ট্যাকনোলজি শিক্ষা কার্যক্রমে ট্যাকনোলজি ব্যবহার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন সহ নানা ধরনের ট্যাকনোলজিকেল কার্যক্রম করে আসছে। অন্যান্য প্রোগ্রামের মাধ্যমে আগামী শিক্ষার মান উন্নয়নে নিরন্তর কাজ করে চলেছে।

আগামি
porshi cover 2026 07 agami img 3 1

সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সহায়তা করার ভাবনা আমাদেরকে যতটা না রোমাঞ্চিত করে, তার চেয়েও বেশী কাজ করে কতটা একাউন্টেবিলিটি মেইনটেইন করে সেই কাজগুলো করা হচ্ছে সে বিষয়টি। ডোনেশন কম বেশী সবাই দিতে চান, কিন্তু বিশ্বস্ত জায়গা কোনটি সেই সংকট রয়েছে আমাদের কমিউনিটি সহ সব কমিউনিটিতেই। এই বিষয়টি আগামী সর্বদা টপ প্রায়োরিটিতে রেখে কাজ করে চলেছে। আর এই কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য ইউএসএ তে ৫০১(সি) রেজিস্ট্রেশন সহ ইউএসএ এর কম্প্লায়েন্সের সাথে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশী বাংলাদেশে সমাজ কল্যান মন্ত্রনালয়ে রেজিস্ট্রেশন, এনজিও এফেয়ার্স ব্যুরো রেজিস্ট্রেশন, এনবিআর রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছে।

সাংগঠনিক কাঠামোগত দিক থেকে, আগামী ইনক ইউএসএ এর একটি বোর্ড, গ্লোবাল এক্সিকিউটিভ কমিটি, দু’টি চ্যাপ্টার (আগামী নর্থইস্ট চ্যাপ্টার ও আগামী সাউথইষ্ট চ্যাপ্টার) ও একটি গ্রুপ (ক্যারোলিনা গ্রুপ) রয়েছে। বাংলাদেশে আগামী এই সিস্টার অর্গানাইজেশন হিসেবে আগামী এডুকেশন ফাউন্ডেশন লোকাল এনজিও হিসেবে রেজিস্ট্রেশন এবং আগামী ইনক (বিডি) ফরেন এনজিও হিসেবে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়াতে নতুন চ্যাপ্টার শুরুর কার্যক্রম শুরু করার পাশাপাশী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে আগামী এর ভলান্টিয়ার।

আগামী এর সব কার্যক্রম ভলান্টিয়ারদের মাধ্যমে পরিচালনা করার পাশাপাশী প্রোগ্রামের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা সহ একাউন্টেবিলিটি মেইনটেইন করার জন্য বাংলাদেশে একটি পুর্নাঙ্গ অফিস পরিচালনা করছে আগামী যেখানে প্রায় ত্রিশ জন নিয়মিত কর্মী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

আগামী প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশীদের দেশের প্রতি ভাবনাকে দেশের সাথে সংযুক্ত করার জন্য সর্বদা চেষ্টা করে যাচ্ছে, যেখানে প্রথম জেনারেশনের সাথেই নয় পরবর্তী জেনারেশনকেও কিভাবে বাংলাদেশের সাথে সম্পৃক্ত করা যায়, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে আগামী।

আগামী এর এই চেষ্টা সর্বদা এগিয়ে যাবার পাশাপাশী আগামী-র মত অন্যান্য সংগঠনের প্রতি অনেক অনেক শুভ কামনা।

১৭ জুন, ২০২৬


জার্মানটাউন, ম্যারীল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র

সফটওয়্যার অটোমেশন আর্কিটেক্ট, সমাজকর্মী ও সংগঠক। প্রেসিডেন্ট, আগামী।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।