গত মে মাসে ‘পড়শী’ (বিশ্ববাঙালির মুখপত্র) অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত জনাব মো: মোস্তাফিজুর রহমান (পারভেজ)-এর “প্রবাসে বাংলাদেশী কমিউনিটি সংগঠন” শীর্ষক লেখাটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নিবন্ধটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক সামাজিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছেন। লেখক অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় প্রবাস জীবনের প্রারম্ভিক চ্যালেঞ্জ এবং সেখানে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক বা সামাজিক সংগঠনগুলোর একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছেন।
তবে একটি গভীর ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই নিবন্ধে প্রবাস জীবনের অনেকগুলো নির্মম সত্য, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং কমিউনিটি সংগঠনগুলোর ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতাগুলো উঠে আসেনি বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। আমার দশ বছরের প্রবাস জীবনে এ বিষয়গুলো খুব নিবিড়ভাবে অনুভব করেছি এবং বিভিন্নভাবে তা প্রকাশের চেষ্টাও করেছি।
সপ্তদশ শতকের শেষভাগ থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক কাল পর্যন্ত বাঙালির অভিবাসনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। অভিবাসনের এই প্রক্রিয়ায় প্রবাসীরা শুধু নিজেদের শরীরটুকুই নিয়ে যান না, বরং সঙ্গে করে নিয়ে যান নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা, মনস্তত্ত্ব এবং এক টুকরো বাংলাদেশ। মো: মোস্তাফিজুর রহমান (পারভেজ)-এর “প্রবাসে বাংলাদেশী কমিউনিটি সংগঠন” শীর্ষক রচনাটি মূলত এই অভিবাসী জীবনের ফেলে আসা স্মৃতি, প্রারম্ভিক টিকে থাকার লড়াই এবং প্রবাসে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলোর একটি ভাসাভাসা (superficial) বিবরণ বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
লেখক ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে নিউইয়র্কে পাড়ি জমানোর পর থেকে তার দেখা অভিজ্ঞতার আলোকে প্রবাসীদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের গল্প শুনিয়েছেন। কিন্তু একজন সচেতন পাঠকের কাছে এই লেখাটি প্রবাসের রূঢ় বাস্তবতাকে আড়াল করে কেবলই এক ধরণের ‘নস্টালজিয়া’র প্রকাশ বলে মনে হতে পারে। আমাদের দেখতে হবে প্রবাসে মূল সংকটগুলো কী এবং একটি আদর্শিক কমিউনিটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সংগঠনগুলোর প্রকৃত ব্যর্থতা কোথায়।
প্রথমে আমি নিবন্ধটির ইতিবাচক দিকগুলো বলতে চাই। লেখক অত্যন্ত সততার সাথে একজন নতুন অভিবাসীর মানসিক একাকীত্ব এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার শারীরিক কষ্টের কথা উল্লেখ করেছেন। নতুন দেশে এসে যখন একজন মানুষ সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশের মুখোমুখি হয়, তখন নিজের ভাষার মানুষ বা একটি পরিচিত মুখ কতটা স্বস্তি দিতে পারে, তা লেখক সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
তবে লেখকের মূল সীমাবদ্ধতা হলো— তিনি প্রবাসের বাংলাদেশী সংগঠনগুলোকে কেবলই একটি “সাহায্যকারী সংস্থা” এবং “সাংস্কৃতিক মঞ্চ” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি সংগঠনের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক কোন্দল, উপদলীয় কোন্দল (factionalism)-এর মতো বিষয়গুলো উপেক্ষা করে গেছেন। লেখকের এই অতি-ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবাসে বাংলাদেশী কমিউনিটির প্রকৃত সমাজতাত্ত্বিক চিত্রকে আড়াল করে দিতে পারে। নিবন্ধটিকে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজতাত্ত্বিক বা বাস্তবসম্মত দলিল হিসেবে আমরা দেখতে চাই, তাহলে এতে প্রবাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেতিবাচক কিন্তু বাস্তব দিক উঠে আসা উচিত ছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতি যেভাবে বিভক্ত, প্রবাসের মাটিতেও তার অবিকল প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। এটি এই নিবন্ধে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। নিউইয়র্ক, লন্ডন বা টরন্টোর মতো বড় শহরগুলোতে যখন কোনো বাংলাদেশী কমিউনিটি সংগঠন গড়ে ওঠে, অধিকাংশ সময়ই তা কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের ছায়াতলে চলে যায় বলে অনেকেই মনে করেন।
প্রবাসের মাটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যে শাখাগুলো রয়েছে, তারা মূল দেশের রাজনীতির চেয়েও অনেক সময় বেশি অসহিষ্ণু হয়ে উঠে। এমনকি যেগুলো অরাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠন (যেমন— আঞ্চলিক সমিতি বা জেলা সমিতি), সেগুলোর নেতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। ফলে, যে সংগঠনের মূল কাজ হওয়ার কথা ছিল প্রবাসীদের কল্যাণ করা, তা পরিণত হয় রাজনৈতিক শক্তির মহড়ায়। লেখক প্রবাসীদের একতাবদ্ধ হওয়ার যে চিত্র এঁকেছেন, বাস্তবে তা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে চরমভাবে বিভক্ত।
লেখক তার নিবন্ধে প্রবাসীদের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর খুব জোর দিয়েছেন। কিন্তু প্রবাস জীবনের একটি বড় নির্মম সত্য হলো— অনেক ক্ষেত্রে বাঙালিরাই বাঙালির সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে। যদিও এটি ঢালাও ভাবে সবার ক্ষেত্রে বলা যাবে না। আমার মনে হয়েছে এই অন্ধকার দিকটি লেখক স্পর্শ করতে চাননি।
প্রবাসে এসে অনেক নতুন অভিবাসী যে বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তার জন্য স্থানীয়দের বা নিয়োগকর্তাদের ঢালাওভাবে দায়ী করা যাবে না। বরং, নিজের দেশেরই কোনো প্রতিষ্ঠিত অভিবাসীর দ্বারা তারা প্রতিকূল অবস্থার শিকার হতে পারেন। কম মজুরিতে কাজ করানো, আবাসন সুবিধা দেওয়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া কিংবা আইনি জটিলতার সুযোগ নিয়ে জিম্মি করার মতো ঘটনা প্রবাসে ঘটে থাকে। এ ঘটনাগুলো কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আরো বেশি প্রকট।
প্রবাসে ’বাংলাদেশী কমিউনিটি’ অনেক সময় এমন এক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠে যেখানে একজন অন্যজনের সাফল্যকে সহজভাবে নিতে পারে না। কেউ একটু ভালো অবস্থানে গেলে তাকে টেনে নিচে নামানোর বা তার পেছনে সমালোচনা করার এক ধরণের গোপন সংস্কৃতি কাজ করে, যা কমিউনিটির বৃহৎ ঐক্যের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
এ প্রবন্ধের লেখক প্রবাসে সংগঠনের ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে দেখিয়েছেন, কিন্তু সংগঠনের এই সংখ্যাধিক্য যে আসলে বিভাজনের প্রতীক, তা তিনি মনে হয় ধরতে পারেননি। উদাহরণস্বরূপ, কেবল নিউইয়র্কেই বাংলাদেশের একেকটি জেলার নামে একাধিক সমিতি থাকে, এমনকি উপজেলার নামেও সমিতি গড়ে ওঠে। আমার কাছে মনে হয়েছে এই সংগঠনগুলোর মূল উদ্দেশ্য সমাজসেবা নয়, বরং মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের “সভাপতি” বা “সাধারণ সম্পাদক” হওয়ার আজন্ম খোয়াইশ পূরণ করা। লেখক যদি এই সংগঠনগুলোর ভেতরের পদ-পদবী নিয়ে বিরোধ এবং পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুড়ির বিষয়টি আনতেন, তবে লেখাটি পূর্ণতা পেত। আঞ্চলিকতার এই অতি-চর্চা প্রবাসীদের একটি বৃহৎ “বাংলাদেশী প্ল্যাটফর্ম” গড়ে তুলতে বাধা দিচ্ছে এবং প্রকৃতপক্ষে তাদেরকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পকেটে বিভক্ত করে রাখছে।
লেখক সংস্কৃতির চর্চা নিয়ে কথা বলেছেন। মেলা, পিঠা উৎসব বা একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানের কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই সংস্কৃতি চর্চা কেবল প্রথম প্রজন্মের (first generation) প্রবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে অনেকে মনে করেন। প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় প্রজন্মের (second generation) শিশু কিশোররা এই সংগঠনগুলোর সাথে কতটুকু নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারছে সেটা ভেবে দেখার বিষয়। তাদের কাছে এই জেলা সমিতি বা রাজনৈতিক দলাদলির মেলাগুলো অর্থহীন মনে হতে পারে। সংগঠনগুলো কীভাবে নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শেকড়ের সাথে জড়াতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এর ফলে যে এক ধরণের “সাংস্কৃতিক শূন্যতা” তৈরি হচ্ছে, তা এই লেখার একটি বড় অনুপস্থিতি।
একজন মানুষের প্রবাস জীবনের ২০ বছর পার হওয়ার পর তার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে হওয়া স্বাভাবিক, যা লেখকের লেখায় স্পষ্ট। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে প্রবাসের ভেতরের মনস্তত্ত্ব কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তার কোনো বিশ্লেষণ এখানে কিন্তু নেই।
প্রবাস জীবন অত্যন্ত যান্ত্রিক। অর্থ আয় করার পেছনে যে হাড়ভাঙা খাটুনি এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওভারটাইম করতে হয়, তাতে মানুষের নিজের পরিবারের বাইরে অন্যকে দেওয়ার মতো সময় খুব কম থাকে। লেখক যেভাবে সহযোগিতার একটি সহজ চিত্র এঁকেছেন, বাস্তব অর্থনৈতিক চাপ তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। সময়ের এই তীব্র সংকটের কারণে মানুষ চাইলেও একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে না, যা কমিউনিটির বন্ধনের জন্য সহায়ক নয়।
প্রবাসে অনেকেই চরম একাকীত্ব ও ডিপ্রেশনে ভুগে থাকেন। এই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রবাসী সংগঠনগুলোর কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই বললেই চলে। তারা ব্যস্ত থাকে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বা নিজেদের প্রচারণায়। নিবন্ধে প্রবাসীদের এই অভ্যন্তরীণ হাহাকারের কোনো প্রতিফলন ঘটেনি বলে আমার মনে হয়েছে।
এই নিবন্ধটিকে যদি প্রবাস জীবনের একটি সার্থক ও দিকনির্দেশনামূলক প্রবন্ধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে লেখকের উচিত একটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো (three-dimensional structure) অনুসরণ করা: (ক) ২০০৭ সালে লেখক যখন এসেছিলেন, তখনকার প্রবাসীদের মানসিকতা আর ২০২৬ সালের বর্তমান প্রবাসীদের যান্ত্রিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার মধ্যকার রূপান্তরটি দেখানো, (খ) কেবল ভালো দিকগুলো না দেখিয়ে সংকটের জায়গাগুলো (রাজনীতি, দলাদলি, স্বার্থপরতা) উচ্চারণ করা এবং (গ) সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে কীভাবে ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি সত্যিকারের “থিংক ট্যাংক” বা আইনি ও অর্থনৈতিক সহায়তা কেন্দ্রে রূপান্তর করা যায়, তার একটি রূপরেখা দেওয়া।
প্রবাসে কমিউনিটির ভেতরে এই বিভাজনগুলো কেন হয় এবং এর থেকে মুক্তির উপায় কী, যা লেখক তার লেখায় নিয়ে আসতে পারতেন। প্রবাসে এসে মানুষ যখন তার সামাজিক মর্যাদা বা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে (identity crisis) ভোগে, তখন সে হয়তো একটি নিজস্ব পরিচিতি খোঁজার চেষ্টা করে। রাজনীতি বা আঞ্চলিক সমিতি তাকে সেই তাৎক্ষণিক পরিচিতি এনে দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, মো: মোস্তাফিজুর রহমান (পারভেজ)-এর “প্রবাসে বাংলাদেশী কমিউনিটি সংগঠন” লেখাটি একটি চমৎকার স্মৃতিকাতর ও আবেগী রচনা হিসেবে প্রশংসনীয় হতে পারে। তবে প্রবাসের রূঢ় সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে এটি অনেকটা অগভীর। লেখাটি প্রবাসের কেবল আলো ঝলমলে দিকটাই দেখিয়েছে, ভেতরের সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
প্রবাসে বিভাজন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য, একে অপরকে টেনে নামানোর প্রবণতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিষয়গুলো যদি এই লেখায় স্থান পেত, তবে এটি কেবল একটি পত্রিকার কলাম না হয়ে প্রবাসীদের আত্মোপলব্ধির একটি আয়না হয়ে উঠতে পারত। প্রবাসীদের সংগঠন নিয়ে লেখার সময় আমাদের শুধু উৎসবের ঢাকঢোল বাজালেই চলবে না, বরং সেই ঢাকের পেছনে লুকিয়ে থাকা প্রবাসীদের সমস্যা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতোকে সাহসের সাথে সামনে নিয়ে আসতে হবে। প্রবাসে একটি সত্যিকারের ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী বাংলাদেশী কমিউনিটি গড়ে তুলতে হলে আমাদের এ বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে।
১৩ জুলাই, ২০২৬

