পড়শী বিশ্বসংলাপ গণহত্যার অপেক্ষায় সুদানের এল ওবেইদ?

গণহত্যার অপেক্ষায় সুদানের এল ওবেইদ?

Post Views: 7
6 min read

কী ঘটবে যদি কোন একটি অঞ্চলে অদূর ভবিষ্যতে গণহত্যা, জাতিগত নিধন আর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সব লক্ষণ উপস্থিত থাকে? মনে হতে পারে, হয়তো আন্তর্জাতিক মহল সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করবে তা রোধ করার। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। গত বছরের শেষের দিকে সুদানের দারফুর অঞ্চলের মানুষ দুই দশকের মধ্যে দ্বিতীয়বার গণহত্যার শিকার হয়েছেন। এখন খুব দ্রুত একই পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এল ওবেইদ শহরে আটকে পড়া সাধারণ মানুষ। অথচ এই বিপর্যয় ঠেকানোর আগ্রহ যেন কারও নেই।

সুদানে সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। তবে সেগুলোর সাথে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, বর্তমানে সুদানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ) কোনো বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়। তাদের সামরিক সক্ষমতা, আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার, বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মিত্রের সমর্থন তাদের কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীতে পরিণত করেছে। এছাড়াও ভুলে যাওয়ার উপায় নেই যে, এই আরএসএফ ২০০৩ সালের দারফুর গণহত্যার জন্য কুখ্যাত জানজাবিদ মিলিশিয়ারই উত্তরসূরি। তাই এবারের নৃশংসতার মাত্রা আরও ভয়াবহ।

পেছনে তাকালে দেখা যাবে, প্রায় ১৮ মাস ধরে দারফুরের আল ফাশের শহর অবরুদ্ধ করে রেখেছিল আরএসএফ। এই অবরোধের উদ্দেশ্য শুধু সামরিক কৌশলগত নয়। এর উদ্দেশ্য হল জান ও মালের সর্বোচ্চ ক্ষতি নিশ্চিত করা এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যেন অবরুদ্ধ মানুষের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে পরে। ঘটেছেও ঠিক তাই। আরএসএফ যখন শহরে প্রবেশ করে তখন সেখানকার বাসিন্দাদের তাদের মোকাবেলা করার কোন সামর্থ্যই ছিল না। দীর্ঘ অবরোধে খাদ্য, ওষুধ ও মানবিক সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শহরটি শেষ পর্যন্ত আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। হাজার হাজার মানুষ নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ ও অকল্পনীয় জাতিগত সহিংসতার শিকার হন। অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে জাতিগত নিধন হিসেবে চিহ্নিত করে। নৃশংসতার ব্যাপকতা এতটাই ছিল যে জমাট বাঁধা রক্তের দাগ স্যাটেলাইট ছবিতে পর্যন্ত ধরা পড়ে।

তবে আরএসএফের এই ধ্বংসযজ্ঞকে শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ভিশনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলমান যুদ্ধের ফলে সুদানের প্রায় ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটার কৃষিজমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে পশুসম্পদ ও পানির উৎস। ভেঙে পড়েছে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা, যা দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হলেও মানুষ যেন আর নিজেদের ঘরে ফিরতে না পারে, সেই দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিও তৈরি করা হচ্ছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, আরএসএফ স্পষ্টতই দুর্ভিক্ষকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। আর এখন, আবারও, ঠিক যখন এই লেখা প্রকাশিত হচ্ছে তখন আরও একটি শহর- এল ওবেইদে একই ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষেত্র তৈরি করছে আরএসএফ। শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ। খাদ্য, পানি, ওষুধ ও মানবিক সহায়তার প্রবেশ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। বেসামরিক মানুষের নিরাপদে বের হওয়ার পথও সংকুচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, এল ওবেইদে গণহত্যা ও অন্যান্য নৃশংস অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই লক্ষণগুলো কিন্তু নতুন কিংবা অপরিচিত নয়। আল ফাশেরেও মাসের পর মাস একই ধরনের অবরোধ, খাদ্য ও মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া, বেসামরিক জনগণের ওপর ধারাবাহিক হামলা এবং জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার মতো স্পষ্ট পূর্বলক্ষণ দেখা গিয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থা এবং গণহত্যা প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা তখনও সতর্ক করেছিলেন যে, পরিস্থিতি ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অভাবে সেই সতর্কতাই বাস্তবে রূপ নেয়। আজ এল ওবেইদে আমরা যেন সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি।

প্রতিটি গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ইতিহাস থেকে এটা স্পষ্ট যে, গণহত্যা কখনোই হঠাৎ ঘটে না। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে এর ক্ষেত্র তৈরি করা হয়, লক্ষণগুলো সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়, মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্কবার্তা দিতে থাকে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তাগুলো কতটা গুরুত্ব পাবে, তা মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। তাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে থাকে ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতগুলো, আর সুদানের মতো সংকট ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নেয় স্বার্থান্বেষী পক্ষগুলো। সুদানের ক্ষেত্রেও যেমন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে; বিনিময়ে তারা পাচ্ছে আরএসএফের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর খনি থেকে তোলা সোনার বেশির ভাগ অংশ। তাই যুদ্ধ জিইয়ে রাখাই তাদের জন্য লাভজনক।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ এই জুলাইতেই জরুরি সতর্কবার্তায় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আল ফাশেরে যে লক্ষণগুলো দেখা গিয়েছিল, তার প্রায় সবই এখন দৃশ্যমান এল ওবেইদে। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে এল ওবেইদ হয়তো আরেকটি শহরের নাম হয়ে থাকবে, যেখানে গণহত্যা ঘটার আগে সবাই জানত কী ঘটতে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তা থামাতে এগিয়ে আসেনি।

৩ আগস্ট, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

শিক্ষা উন্নয়নকর্মী, কাজ করছেন শিক্ষা প্রযুক্তি ও তরুণদের উন্নয়ন নিয়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পরে আগামী’র খান একাডেমি বাংলা প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন৷ বর্তমানে Bangladesh Youth Leadership Center (BYLC)-এ কর্মরত আছেন।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।