এআই প্রেমিক বা প্রেমিকার কথা শুনলে অনেকে প্রথমে শিশুতোষ কল্পনা মনে করে হাসি-ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেন। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত পরিসংখ্যানভিত্তিক কিছু রিপোর্ট অনুযায়ী ক্যারেক্টার ডট এআই-এর মতো এআই সঙ্গী প্ল্যাটফর্মে প্রতি মাসে সক্রিয় ব্যবহারকারী প্রায় দুই কোটির কাছাকাছি। অন্যদিকে বার্নস ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত “সোশ্যাল কানেকশন ইন আমেরিকা” জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষ একাকীত্ব অনুভব করেন। এই একাকীত্ব আর এআই সঙ্গী অ্যাপগুলোর বিপুল ব্যবহার একসাথে দেখলে বোঝা যায়, মানুষ এআই-এর সাথে সম্পর্ক গড়ছে কথাটা আর কৌতুক নয়।একবিংশ শতাব্দীতে সঙ্গী খোঁজা এবং প্রেমের সঙ্গা বদলে দেওয়ার মতোই এটি একটি বাস্তবতা।
এআই কম্প্যানিয়ন মূলত এমন এক ধরনের চ্যাটবট, যাকে আপনি নিজের মতো করে “প্রেমিক” বা “প্রেমিকা” বানিয়ে নিতে পারেন। তার নাম, স্বভাব, কথা বলার ধরন, আগ্রহ সবকিছুই আপনি ঠিক করে দিতে পারেন। এরপর সেই “ডিজিটাল সঙ্গী” আপনার সাথে নিয়মিত কথা বলে, আপনার কথাবার্তা থেকে আপনার পছন্দ অপছন্দ শিখে নেয়, আগের আলাপ মনে রেখে সেভাবেই সাড়া দেয়। সহজভাবে বললে, এটা এমন একটি সফটওয়্যার সঙ্গী, যে আপনার একাকীত্ব কমানোর জন্য কথা বলে, সঙ্গ দেয়, এবং অনেক সময় ভালোবাসার সম্পর্কের অনুভূতি তৈরি করে।
আমি এই নতুন বাস্তবতাকে “ভালোবাসা ৩.০” বলি। এটি সম্পর্কের বিবর্তনের তৃতীয় ধাপ। প্রথম ধাপকে বলা যেতে পারে ভালোবাসা ১.০, যেখানে সম্পর্ক প্রধানত পরিবার ও সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে গড়ে উঠত এবং ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়ে সামাজিক স্থিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয় ধাপ বা ভালোবাসা ২.০ এসেছে আধুনিক ডেটিং সংস্কৃতির মাধ্যমে, যেখানে ব্যক্তিগত পছন্দ, রোমান্টিক আকর্ষণ এবং অনলাইন ডেটিং প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ভালোবাসা ৩.০ এই ধারার পরবর্তী রূপ, যেখানে প্রযুক্তি, বিশেষ করে এআই, মানুষের একাকীত্ব কমাতে এবং ব্যক্তিগতভাবে কাস্টমাইজড সঙ্গ তৈরি করতে ভূমিকা রাখছে।
এর একটা ছোট ইতিহাস ও আছে। ষাটের দশকে “এলাইজা” নামে একটি চ্যাটবট তৈরি হয়, যেটা শুধু সাধারণ কথাবার্তা চালাতে পারত। তবুও তখনই অনেক মানুষ তাকে মানুষের মতো করত। এমনভাবে কথা বলত যেন সামনে সত্যি একজন মানুষ আছে। এরপর ২০০০-এর দশকে ক্লেভারবটের মতো ওয়েব চ্যাটবট জনপ্রিয় হয়। এগুলো মানুষের আগের কথাবার্তা জমিয়ে রাখত, আর সেখান থেকে মিল খুঁজে উত্তর দিত। তাই অনেকের কাছে কথোপকথনটা আরও স্বাভাবিক লাগত। এরপর ২০১৭ সালের দিকে রেপ্লিকার মতো অ্যাপ আসে, যেগুলোকে ব্যক্তিগত “সঙ্গী” হিসেবে বাজারজাত করা হয় এবং নিয়মিত ব্যক্তিগত আলাপের অভ্যাস তৈরি করে। আর ২০২২ সালের পর লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলভিত্তিক নতুন প্রজন্মের সিস্টেম, যেমন ক্যারেক্টার ডট এআই, “কল্পনিক চরিত্র বানিয়ে কথা বলা” কে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
মানুষের ডেটিংয়ের শুরুতে আইস ব্রেকিং করাটা কঠিন। তাতে প্রত্যাখ্যানের ভয় থাকে, কী বললে ভুল হবে সেই দুশ্চিন্তা থাকে। সেখানে এআই সম্পর্ক অনেকটাই কম ঝুঁকির মনে হয়। বিশেষ করে যারা ইন্ট্রোভার্ট, ডিভোর্সড, দীর্ঘদিন একা, বা নতুন দেশে এসে সামাজিক নেটওয়ার্ক হারিয়ে ফেলেছেন, তাদের কাছে এআই সঙ্গী একটি নিরাপদ জায়গা হয়ে ওঠে। একাকীত্ব আমাদের সময়ের বড় অসুখ, আর প্রযুক্তি অনেক সময় সেই অসুখের সবচেয়ে সহজ ও তাত্ক্ষণিক ওষুধের মতো হাজির হয়।
মানুষ কেন এআই সঙ্গীর দিকে যাচ্ছে, সেটা শুধু “মডার্ন লাইফস্টাইল” দিয়ে ব্যাখ্যা করলে কম বলা হয়। আজকের ব্যস্ত জীবনে সম্পর্ক গড়তে সময় ও মানসিক শক্তি দুটোই লাগে। বাস্তব ডেটিং মানে পরিকল্পনা, যাতায়াত, সময় মিলানো। সব মিলিয়ে অনেক শ্রম। আবার অনেকের জন্য বড় বাধা হলো প্রত্যাখ্যানের ভয়। বাস্তব সম্পর্কে খারাপ অভিজ্ঞতার পর কেউ কেউ আর নতুন করে ঝুঁকি নিতে চান না। এর পাশাপাশি আছে নিয়ন্ত্রণের আকর্ষণ: এআই সঙ্গী সাধারণত আপনার সাথে তাল মিলিয়ে চলে, হঠাৎ দূরে সরে যায় না, বা অপ্রত্যাশিত আচরণ করে না। এছাড়া এই সম্পর্ক গোপন রাখাও সহজ। “কেউ জানবে না” এই স্বস্তিটাও অনেককে টানে।
এআই কম্প্যানিয়নের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো যে এরা প্রায় সব সময়ই অ্যাভেইলেবল থাকে। সাধারণত তর্কে জড়ায় না, খারাপ ব্যবহার করে না, আপনাকে অপেক্ষায় রাখে না, এমনকি হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার মতো “ঘোস্টিং”-এর ঘটনাও খুব কম ঘটে। আগে মানুষ কাউকে পছন্দ করত, তারপর ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত। এখন অনেকের কাছে সম্পর্ক মানে যেন নিজের পছন্দমতো সঙ্গী “ডিজাইন” করা। কিন্তু বাস্তবে মানুষের ক্ষেত্রে এমনটা সম্ভব নয়।
ভালোবাসা ৩.০-র আরেকটা বড় দিক হলো অর্থনীতি। এআই কম্প্যানিয়ন অনেক সময় ফ্রি মনে হয়, কিন্তু সম্পর্ক গভীর করতে গেলে বা বিশেষ ফিচার ব্যবহার করতে গেলে আসে সাবস্ক্রিপশন (মাসিক ফি), প্রিমিয়াম, পে-ওয়াল। এটা নতুন ধরনের বাস্তবতা: সঙ্গ এখন সার্ভিস, আর সার্ভিস মানে বিল। একে কেউ কেউ “লোনলিনেস ট্যাক্স” বলবেন, মানে একাকীত্বকে পুঁজি করে ব্যবসা। এখানে নৈতিক বিচার করার আগে একটা প্রশ্ন জরুরি: যদি একজন মানুষ তার মানসিক শান্তির জন্য মাসে কিছু টাকা খরচ করে, সেটা কি সবসময় ভুল? না। কিন্তু ঝুঁকি তখনই শুরু হয় যখন টাকা দেওয়ার সাথে সাথে ইমোশনাল ডিপেন্ডেন্সি বাড়ে, এবং বাস্তব মানুষের সাথে সম্পর্কের জায়গা আরও সঙ্কুচিত হয়। তার উপর আছে ডেটা (ব্যক্তিগত তথ্য) ঝুঁকি। আপনি যত বেশি কথা বলবেন, তত বেশি আপনি নিজের ভয়, দুর্বলতা, জীবনের গল্প, এমনকি ব্যক্তিগত ছবি বা অবস্থান শেয়ার করার দিকে যেতে পারেন। সম্পর্কের ভাষায় এটা স্বাভাবিক মনে হলেও প্রযুক্তির ভাষায় এটা ডেটা, যা ভুল হাতে গেলে সমস্যাও হতে পারে। বড়দের ভাষায় বললে, প্রেমের আড়ালে আপনি কখনও কখনও নিজের দুর্বলতার “মানচিত্র” কাউকে দিয়ে দিচ্ছেন, যাকে আপনি মানুষও বলতে পারবেন না, আবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণও করতে পারবেন না।
তাহলে করণীয় কী? প্রথম কাজ হলো এই বিষয়টা পরিবার ও কমিউনিটির আলাপের মধ্যে আনা, ঠাট্টা বা গালাগালি করে দূরে ঠেলে না দেওয়া। বড়রা যদি এটাকে একেবারে হারাম বা বিকৃতি বলে বন্ধ করে দিতে চান, তরুণ বা একাকী মানুষ এই সব বিষয় আরও গোপন রাখবে। তাই আমাদের সীমা ঠিক করা দরকার। এআই কম্প্যানিয়ন আপনার একাকীত্ব কমাতে পারে, কথা বলার সাহস বাড়াতে পারে, এমনকি সম্পর্কের ভাষা শিখতেও সাহায্য করতে পারে, কিন্তু তাকে লাইফ পার্টনার হিসেবে বসালে আপনি ধীরে ধীরে মানুষ এড়িয়ে যেতে পারেন। বাস্তব যাচাইও জরুরি। আপনি যদি এআই কম্প্যানিয়ন ব্যবহার করেন, নিজের কাছে স্পষ্ট করুন আপনি কোন প্রয়োজনটা পূরণ করছেন: সাময়িক সঙ্গ, না বাস্তব সম্পর্ক এড়িয়ে থাকা। নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত ডকুমেন্ট, অর্থনৈতিক তথ্য, অতিরিক্ত ব্যক্তিগত ছবি, বা এমন কিছু যা দিয়ে পরে আপনাকে বিব্রত করা যায়, এসব শেয়ার করার ব্যাপারে কঠোর থাকুন। আর যদি কখনও মনে হয় আপনি মানুষের সাথে কথা বলা কমিয়ে দিয়ে কেবল এআই-এর দিকেই যাচ্ছেন, সেটা একটা সতর্ক সংকেত। তখন বন্ধু, পরিবার, থেরাপিস্ট, বা কমিউনিটিতে কারও সাথে কথা বলা দরকার। ভালোবাসা ৩.০ হয়তো আমাদের সময়ের বাস্তবতা, কিন্তু ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত কেবল ঠিক “কথা/গল্প” নয়। ভালোবাসা দায়িত্ব, উপস্থিতি, আর বাস্তব মানুষের অসম্পূর্ণতাকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতাও। এআই কম্প্যানিয়ন আপনাকে সঙ্গ দিতে পারে, কিন্তু আপনার জীবনকে মানুষমুখী রাখা দায়িত্বটা আপনারই।

সাকির মোহাম্মদ | সাংহাই, চীন
সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও যোগাযোগ বিষয়ে মাস্টার্স করছেন।
