খোলাচোখে – বর্ষা বিপ্লব: এক অসম্পূর্ণ জাগরণ

হাসান ফেরদৌস | ১৯ মার্চ, ২০২৬
April 16, 2026

আগস্ট ২০২৪-এর এক দুপুরে ঢাকার শাহবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে এক কিশোর হাতে সিগন্যাল তুলে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছিল। চারদিকে পুলিশ নেই, প্রশাসন নেই— কিন্তু বিশৃঙ্খলাও নেই। অচেনা মানুষ একে অপরকে পথ ছেড়ে দিচ্ছে, কেউ পানির বোতল বিলাচ্ছে, কেউ রাস্তা পরিষ্কার করছে।

সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল— এ যেন এক নতুন সমাজের ঝলক। জনতার দাবির সামনে নতি স্বীকার করে বিদায় নিয়েছে স্বৈরাচার, জেগে উঠেছে এক বিপ্লবী বাংলাদেশ।

কিন্তু বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা রাস্তায় নয়—ক্ষমতার সদর অন্দরে। এই দ্বিতীয় ধাপের প্রধান চ্যালেঞ্জ পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে নতুন ব্যবস্থার সংগঠন। তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ, সুবিধাভোগীদের চাপের মুখে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান ধরে রাখা। এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয় বর্ষা বিপ্লব।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ‘বর্ষা বিপ্লব’ সফলও হয়েছে, আবার হয়নি—এই বৈপরীত্যপূর্ণ কথা এক নিঃশ্বাসে বলা যায়। এই বিপ্লবের ফলে একটি কঠোর কর্তৃত্ববাদী— অনেকের ভাষ্যে স্বৈরাচারী—সরকারের পতন হয়েছে, সেটি তার একটি বড় সাফল্য। কিন্তু কোনো বিপ্লবের ফলে একটি দেশ বা জাতির খোলনলচে যেভাবে বদলে যায়, পুরোনো মরচেধরা শাসন কাঠামো দুমড়ে-মুচড়ে ছুড়ে ফেলা হয়— বর্ষা বিপ্লবের ফলে তা ঘটেনি।

ফলে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরিণতিতে ২০২৬-এর নির্বাচনী ফলাফলকে কোনোভাবেই বৈপ্লবিক সাফল্য ভেবে আত্মপ্রসাদের কোনো সুযোগ নেই। তার চেয়েও বড় কথা, এই বিপ্লবের পর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে এমন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর, যাদের সঙ্গে পতিত সরকারের কোনো মৌলিক প্রভেদ নেই।

বিপ্লব কী

বর্ষা বিপ্লবের চালিকাশক্তি ছিল নতুন প্রজন্মের ছাত্র-জনতা, যাদের ঢালাওভাবে জেনারেশন জেড বা জেন-জি নামে অভিহিত করা হয়েছে। অনেকেই এই বিপ্লবকে জেন-জি পরিচালিত প্রথম সফল বিপ্লব বলে চিহ্নিত করেছেন।

বাংলাদেশের বিপ্লবের আদলে প্রায় একই সময়ে নেপালেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। সরকারের পতন হয়েছে, ক্ষমতায় এসেছে নতুন শক্তি। বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের বিপ্লবের একটি বড় পার্থক্য হলো— বাংলাদেশে যেখানে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জেন-জি নেতৃত্ব কার্যত রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সরে গেছে, নেপালে ঘটেছে ঠিক উল্টো। বিভিন্ন ধারার ও মতের ছাত্র-জনতা, যারা সে বিপ্লবের সামনের কাতারে ছিল, বিপ্লব-পরবর্তী নির্বাচনে তারাই বিপুল সংখ্যাধিক্যে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। প্রাথমিক বিবেচনায় বলা যায়, নেপালে জেন-জি বিপ্লব সাফল্য পেয়েছে।
কার্যত একই যাত্রায় জেন-জি কেন দুই দেশে দুই রকম ফলাফলে পৌঁছালো?

এই উত্তর পেতে আমাদের ‘বিপ্লব’ কী—সে বিষয়ে একটি সাধারণ মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে। লেনিন যে অর্থে বৈপ্লবিক পরিস্থিতি বুঝতেন—যেখানে ক্ষমতাধররা পুরোনো কায়দায় ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না, এবং জনতা পুরোনো ব্যবস্থা মেনে নিতে রাজি নয়—বাংলাদেশের বর্ষা বিপ্লব ছিল সেই রকম একটি বৈপ্লবিক মুহূর্তের ফসল।

এই বৈপ্লবিক মুহূর্তের প্রাবল্য থেকেই আসে পরিবর্তন, ঘটে ক্ষমতার পালাবদল। কিন্তু শুধু ক্ষমতার হাতবদলই তো বিপ্লবের একমাত্র লক্ষ্য নয়। হানাহ আরেন্ডট তাঁর On Revolution গ্রন্থে বলেছেন, ক্ষমতার হাতবদল নয়—পুরোনো ব্যবস্থার মূলোৎপাটনই হলো বিপ্লব। ‘সকল বিপ্লবের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হলো মুক্তি অর্জন।’

বিপ্লবের ফলে ক্ষমতার হাতবদল তো হবেই, তার চেয়েও বড় কথা—এর ফলে এক সম্পূর্ণ নতুন ধারার, নতুন ধাঁচের শাসন কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিকতার জন্ম হবে। ঠিক যেমন ঘটেছিল ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে, অথবা ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর।

গণঅভ্যুত্থান বা গণজাগরণের ফলে যখন ক্ষমতার হাতবদল হয়—যা বাংলাদেশের অর্ধশতকের ইতিহাসে বেশ কয়েকবার হয়েছে—তাকে বড়জোর বিদ্রোহ বা রেবেলিয়ন বলা যায়, বিপ্লব নয়। বাংলাদেশের বর্ষা বিপ্লবের ফলে যে পরিবর্তন ঘটেছে, আরেন্ডটের সংজ্ঞায় তা ‘জনজাগরণ’— এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর ফলে গুণগতভাবে নতুন বা কাঠামোগতভাবে ভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিকতার জন্ম হয়নি। ফলে বর্ষা বিপ্লবকে বড়জোর একটি অসম্পূর্ণ বিপ্লব বলা যায়।

সফল বিপ্লবের তিন পূর্বশর্ত

বর্ষা বিপ্লবের অসম্পূর্ণতার মূল কারণ—এর পেছনে কোনো সুসংজ্ঞায়িত আদর্শ (আইডিওলজি) ছিল না, কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না, ছিল না কোনো স্বীকৃত কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব। কোনো বিপ্লবের জন্য কেন এই তিন পূর্বশর্ত প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভ্লাদিমির লেনিন তাঁর ‘কী করণীয়’ (What Is to Be Done?) গ্রন্থে। ১৯০২ সালে প্রকাশিত সে গ্রন্থে রুশ বিপ্লবের এই জনক স্পষ্ট করে বলেছিলেন—বৈপ্লবিক তত্ত্ব (থিয়োরি) ছাড়া বিপ্লব অসম্ভব।

কারণ, বৈষম্য, দুর্নীতি বা রাজনৈতিক নিপীড়নের কথা বলে মানুষকে ক্ষুব্ধ করা যায়, রাজার দরজা ভেঙেও ফেলা যায়। কিন্তু এক রাজাকে সরানোর পর নতুন যে রাজা বা শাসক আসবেন, তারা কেমন হবেন— তাদের কাছে আমরা কী চাই— সেই ‘ভিশন’টি যদি আগে থেকেই জনগণের দাবির অংশ না হয়, তাহলে বিপ্লব তার পথ হারাতে বাধ্য।
আরও একটি কারণে বৈপ্লবিক তত্ত্ব ও বৈপ্লবিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব জরুরি। ক্ষমতাসীন মহল এবং তার সঙ্গে যুক্ত শাখা-উপশাখা সবসময় তৎপর থাকে— কখন, কীভাবে একটি বিপ্লব বা গণবিস্ফোরণকে বিপথে নেওয়া যায়। আমাদের জানা এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে ক্ষমতাসীন চক্রের সমঝোতা বা চক্রান্তে বিপ্লব তার গতিপথ হারিয়েছে।

১৯০৫ সালের রাশিয়ার ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কথাই ধরা যাক। বিপদের আশঙ্কা টের পেয়ে রুশ জ্বার স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে রাজি হন; বলেন, এখন থেকে নির্বাচিত পার্লামেন্ট অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেবে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত যেসব গোষ্ঠী— যাদের মধ্যে একাধিক উদারনৈতিক দল ও ব্যক্তি ছিলেন— তারা দ্রুত সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে বিপ্লব থেকে সরে আসেন। বিপ্লবী শক্তিগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে, ব্যর্থ হয় বিপ্লব। পরে লেনিন লিখেছিলেন, জ্বারের লক্ষ্যই ছিল আন্দোলনকে বিভক্ত করা এবং তাকে ভিন্ন পথে নিয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশেও প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে।

নতুন বোতলে পুরোনো মদ

বাংলাদেশে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের প্রাথমিক সাফল্য ছিল স্বৈরতন্ত্রের পতন। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতনের পরপরই সব মনোযোগ গিয়ে পড়ে প্রথামাফিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের দিকে।
কিছু জেন-জি নেতা নির্বাচনের আগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা সংস্কার—প্রয়োজনে পুরোনো শাসনতন্ত্র বাতিলের—দাবি তুললেও, সেই অবস্থানে অটুট না থেকে তারাও নির্বাচনী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, তা মূলত “নতুন বোতলে পুরোনো মদ” ছাড়া অন্য কিছু নয়। জেন-জি নিজে সেই সরকারের অংশ হয়ে নতুন বন্দোবস্তের বদলে পুরোনো ব্যবস্থাকেই বৈধতা দেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন দল গঠন, নির্বাচনী প্রচারণা, জোট রাজনীতি— সব মিলিয়ে তারা পুরোনো ভোটের রাজনীতিতেই মিশে যান। এসবই হয়েছে পুরোনো কাঠামো অক্ষত রেখেই।

আরও একটি বিষয় আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে, অথচ তার তেমন কোনো প্রতিরোধ হয়নি—বর্ষা বিপ্লবকে মূলধারার তথাকথিত ‘এলিট’ শক্তিগুলো আত্মীকরণ করে নেয়। এই বিপ্লবের কেন্দ্রীয় বার্তা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হলেও, এলিট শক্তিগুলো তা নিজেদের এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করে— বাস্তবায়নের জন্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের জন্য।
তারা বিপ্লবের ভাষা, প্রতীক, এমনকি তার বয়ানও গ্রহণ করে। এর ফলে রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জেন-জির হাত থেকে সরে গিয়ে এলিটদের হাতে চলে যায়। বিপ্লবের ‘রূপান্তরশীল সম্ভাবনা’ প্রথমে দুর্বল হয়, পরে প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়।

ভাষা ও বিপ্লবের বয়ান

মাহফুজ আলম ও নাহিদ ইসলাম এই বিপ্লবের দুই প্রধান রূপকার। লক্ষ্য করুন, তারা এই বিপ্লবের লক্ষ্য কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:

মাহফুজ আলম: “আমাদের আন্দোলন কোনো একক সরকারের বিরুদ্ধে নয়; এটি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে মানুষের মর্যাদা বারবার পদদলিত হয়েছে। আমরা সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। এই প্রজন্ম আর পুরোনো রাজনৈতিক সমঝোতার রাজনীতি মেনে নেবে না। আমরা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই।”

নাহিদ ইসলাম: “জুলাই মানে একটি দেশ, যা আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদমুক্ত— একটি নতুন বন্দোবস্ত, একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ।”

কিন্তু দেশের দুই প্রধান ‘এলিট’ রাজনৈতিক দল— বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী—বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে প্রায় একই ভাষায় সমর্থন জানালেও, তারা এই ঘটনাকে ‘বিপ্লব’ না বলে ‘আন্দোলন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সম্ভবত তাদের লক্ষ্য ছিল বিপ্লব বাস্তবায়ন নয়, বরং তাদের বয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা।

মির্জা ফখরুল ইসলাম (বিএনপি): “এই আন্দোলন নতুন বাংলাদেশের সূচনা করেছে— একটি বাংলাদেশ, যেখানে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।”

শফিকুর রহমান (জামায়াত): “জুলাইয়ের আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে জনগণ অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে। আমরা সেই আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে একটি ন্যায্যভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।”

শুরু থেকেই এলিট শক্তিগুলো বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা নতুন বন্দোবস্তের পরিবর্তে ‘সংস্কার’-এর ওপর জোর দেয়। আর সেই সংস্কার অর্জনের পথ হিসেবে তুলে ধরা হয় নির্বাচন— যা স্বাভাবিকভাবেই তাদের ক্ষমতার অবস্থানকে বৈধতা দেয়।

ফলে ‘নতুন বাংলাদেশ’ বা ‘নয়া বন্দোবস্ত’-এর দাবি ধীরে ধীরে রূপ নেয় নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে। অন্যভাবে বললে, জুলাইয়ের আন্দোলনের ভাষা ছিল ভাঙনের ভাষা— “নতুন বাংলাদেশ”, “ব্যবস্থা বদল”, “পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান।” কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা হয়ে যায় সংস্কারের ভাষা—“সুষ্ঠু নির্বাচন”, “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া”, “ধীরে ধীরে পরিবর্তন।”

বিপ্লবের শব্দগুলো রয়ে গেল, কিন্তু তাদের অর্থ বদলে গেল।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে বিপ্লব তার পথ হারায়— তা হলো বৈপ্লবিক শক্তিগুলোর ‘আপোসকামিতা’। বাংলাদেশে ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে। রাস্তায় বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া জনতা যে বৈপ্লবিক শক্তি ও উত্তাপ সৃষ্টি করেছিল, যুব নেতৃত্বের আপোসকামিতার ফলে তা দ্রুতই রূপ নেয় গতানুগতিক রাজনৈতিক বন্দোবস্তে।

যুব নেতৃত্বের দুর্বলতা, অনভিজ্ঞতা এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব এই পালাবদলকে ত্বরান্বিত করে। নতুন প্রজন্ম, যারা এই বিপ্লবের চালিকাশক্তি ছিল, তারা ধীরে ধীরে এলিট শ্রেণির পাতা ফাঁদে ‘কো-অপ্ট’ হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারে অংশগ্রহণ ছিল সেই ফাঁদের প্রথম ধাপ।

এরপর ধাপে ধাপে নির্বাচনমুখী এলিট রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারাও একপ্রকার অদৃশ্য শক্তিতে পরিণত হয়। ক্ষমতার নিজস্ব মাদকতা আছে, অর্থের ঝনঝনানিরও নিজস্ব আকর্ষণ আছে—যুব নেতৃত্ব সেই প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। মাত্র এক বছরের মধ্যেই তারা এলিট রাজনৈতিক শক্তির অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে।

যারা ছিল বিপ্লবের প্রধান শক্তি, তারাই শেষ পর্যন্ত বিপ্লব বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

এখন বোধহয় একথা বলা যায়, জুলাই-আগস্টের বিপ্লবের ফল থেকে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ফসল ঘরে তুলতে পেরেছে বিএনপি। বর্তমানে তারাই ক্ষমতার শীর্ষে, এবং স্বাভাবিকভাবেই তারাই বিপ্লবের মৌলিক দাবিগুলো বাস্তবায়নে সবচেয়ে কম আগ্রহী।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারা যে ‘সংস্কার কর্মসূচি’-তে সক্রিয় সমর্থন দিয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সেই উৎসাহে স্পষ্ট ভাটা পড়েছে। এই মুহূর্তে বর্ষা-বিপ্লবের কর্মসূচি নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুগতদের পদায়ন—এসবই তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

বেহাত বিপ্লব

গণঅভ্যুত্থান এবং বিপ্লব এক জিনিস নয়, তবে প্রতিটি বিপ্লবের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক বৈপ্লবিক সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাকে আমরা বাংলাদেশে—এমনকি বিশ্বের আরও অনেক দেশে—অকালেই নিঃশেষ হতে দেখেছি। একদিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যহীনতা, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রতিরোধ ও দমন—এই দুইয়ের চাপে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়।

শুরুর দিকেই বলেছি, বাংলাদেশে যেখানে এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে নেপালে জেন-জি পরিচালিত আন্দোলন তুলনামূলকভাবে সফলতার পথে এগিয়েছে। পুরোপুরি সফল বলা এখনই সম্ভব নয়, তবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে তারা তাদের বিপ্লবী ‘ভিশন’ বাস্তবায়নের একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে।
এখন তাদের সামনে রয়েছে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ:

গণপ্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের আমূল সংস্কার
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন
কায়েমি স্বার্থবাদী কাঠামোর উচ্ছেদ

বাংলাদেশের তরুণ নেতৃত্বও বর্ষা-বিপ্লবের পর এমন দাবিই তুলেছিল। কিন্তু সেই দাবিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি—কারণ তারা নিজেরাই ধীরে ধীরে কায়েমি স্বার্থের অংশে পরিণত হয়েছে।

যে মুখোশধারী কায়েমি স্বার্থবাদ বাংলাদেশে বিপ্লবকে ব্যর্থ করেছে, সেই একই শক্তি নেপালেও সক্রিয়। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নেপালের নতুন প্রজন্ম সঠিক পথ বেছে নিতে পারে কি না।

শেষকথা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ এক ক্ষণস্থায়ী সময়ের জন্য এমন এক পরিস্থিতিতে প্রবেশ করেছিল, যাকে ভ্লাদিমির লেনিন ‘বিপ্লবী পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন—এ ধরনের মুহূর্ত দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

একটি সুসংহত মতাদর্শ এবং ক্ষমতা দখলে সক্ষম শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়া বিপ্লবী সংকট প্রায়ই স্তিমিত হয়ে যায়। তখন যা আসে, তা প্রকৃত রূপান্তর নয়—বরং এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত রূপান্তর-প্রক্রিয়া, যা বিপ্লবের বাইরের শক্তি দ্বারা পরিচালিত।

আজকের বাংলাদেশে ঠিক সেই চিত্রই প্রতিফলিত হচ্ছে। পরিবর্তনের ভাষা ব্যবহার করা হলেও, প্রকৃত লক্ষ্য হয়ে উঠেছে পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং কায়েমি স্বার্থকে টিকিয়ে রাখা।

আমার মতে, যারা বিপ্লবের ঘোড়ায় চড়ে আজ ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এখন বিপ্লবী এজেন্ডা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

আন্দোলনের ভাষা—‘নতুন বাংলাদেশ’, ‘স্বৈরাচারের অবসান’, ‘জনতার শক্তি’— এখনও রাজনৈতিক বক্তৃতায় টিকে আছে। কিন্তু এর অন্তর্গত অর্থ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে, এবং তা পুনর্নির্দেশিত হচ্ছে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার দিকে।

রাজনীতিই ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে বিপ্লবকে।

এই আশঙ্কার কথাই বলেছিলেন হানা আরন্ডট। তাঁর মতে, বিপ্লব তখনই সফল, যখন তা মানুষের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করে। সেই মুক্তি যদি অর্জিত না হয়, তবে তা প্রকৃত বিপ্লব নয়— বরং একটি ক্ষণস্থায়ী গণবিস্ফোরণ মাত্র।
স্বীকার করতে হয়, জুলাই-আগস্টের গণবিস্ফোরণ একটি কার্যকর বিপ্লবে রূপ নেয়নি। কিন্তু তবুও এটি এক নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করেছিল—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

নতুন প্রজন্ম, যারা সেই স্বপ্নের বাহক ছিল, তারা মূল মঞ্চ থেকে সরে এসেছে। কিন্তু নাট্যমঞ্চের বাইরে এখনও অনেকে নিভু নিভু মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

একসময় তারাই ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল— আবারও তারা সেই মশাল তুলে নিতে পারে, আবারও জ্বলে উঠতে পারে সেই আগুন। এ বিষয়ে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই।


হাসান ফেরদৌস | নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক ও সাংবাদিক

সর্বশেষ প্রকাধিত গ্রন্থ: ভুট্টোর তওবা ও মুক্তিযুদ্ধের নানাদিক (প্রথমা, ঢাকা, ২০২৪)

Previous Story

সলঝেনিৎসিন, তাজউদ্দীন এবং নৈতিক রাষ্ট্রনায়কত্বের পথরেখা

Next Story

রচিত রচনা: আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখো দেখি কঠিন মাটির তলে…

Latest from নিয়মিত কলাম

সলঝেনিৎসিন, তাজউদ্দীন এবং নৈতিক রাষ্ট্রনায়কত্বের পথরেখা

মানুষের জীবনে সত্য, সৃষ্টিশীল চিন্তা, আত্মসংযম ও মানবিক কর্তব্য—এই চারটি মূল্যবোধই আমাদের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে। - লিখেছেন শারমিন আহমদ।

অদ্বিতীয়া বইগল্প

“নারীদের খুব সহজেই চরিত্রহীন বলে বিভূষিত করা যায়। ‘বার-বিলাসিনী’, ‘বারনারী’, ‘বারবণিতা’, ‘গণিকা’, ‘বারাঙ্গনা’— আলোচনা করেছেন ড. জাকিয়া আফরিন।