অদ্বিতীয়া বইগল্প

জাকিয়া আফরিন | মার্চ ৩০, ২০২৬
April 16, 2026

আমি দ্রৌপদী — ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

“নারীদের খুব সহজেই চরিত্রহীন বলে বিভূষিত করা যায়। ‘বার-বিলাসিনী’, ‘বারনারী’, ‘বারবণিতা’, ‘গণিকা’, ‘বারাঙ্গনা’— শব্দগুলো খুব সহজেই বলা যায়। (জীবনের শেষ বেলায় জিজ্ঞেস করছি—) সে কি আমাকে না পাওয়ার বহিঃপ্রকাশ?”

ব্যাসদেবের রচনায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের পূর্ববর্তী এই সৃষ্টি— মহাভারত-এর অন্যতম চরিত্র দ্রৌপদীর ভাষ্যে— লেখিকা নিজে কেমন করে তুলে দিলেন এই আমার মনস্তত্ত্বের ব্যাখ্যা— অবাক হয়ে ভাবি। বিশ্বজুড়ে নারী বিদ্বেষ আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, এর চেয়ে সহজভাবে তাকে বুঝি কী করে? ২০২২ সালে সুপরিচিত লেখিকা ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ রচিত ‘আমি দ্রৌপদী’ পড়তে গিয়ে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে বর্তমানের নারী নিপীড়ক, সুবিধাভোগী আর ভঙ্গুর সমাজের চিত্র। তাই বুঝি বিশ্বের মহাকাব্য এখনো প্রাসঙ্গিক। পশ্চিমা দেশে ‘অডিসি’ এখনো স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগে পড়ানো হয়। আমরা বিভিন্ন বিনোদনের খোরাক হিসেবে রামায়ণ, মহাভারত-এর কাছে ঘুরে ফিরে যাই। তবে — ‘আমি দ্রৌপদী’ — নারীর জীবনসংগ্রাম ফুটিয়ে তুলতে পৌঁছে গেছে একেবারে ভিন্ন মাত্রায়। সে কথাই বলছি। তবে শুরুতে ‘সেরেনডিপিটি’ কিংবা ‘হঠাৎ বৃষ্টির’ সেই অনুভূতির গল্পটা বলা যাক।

বাংলা সাহিত্যে দাপুটে/যোগ্য নারী চরিত্রের কাউকে খুঁজছিলাম একটি আলোচনার জন্য। সেই ঘুরে ফিরে রবীন্দ্রনাথের চরিত্র, হুমায়ূন আহমেদের জরি, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জমিলা, শওকত ওসমান, সৈয়দ হক, আনিসুল হক-এর ‘মা’ চরিত্রসমূহ এবং স্বাধীন মানুষ বলতে ‘সুলতানা’ — রোকেয়ার সেই স্বপ্নচারী নারীর কথা মনে এলো। অল্প পড়াশোনায় হিমু, ফেলুদার সাথে টেক্কা দেয়ার কাউকে পাইনি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্র বুঝতে সময় লাগবে আরো— তাই কিছুটা হতাশ হয়ে ঘুরছিলাম অনলাইনে বাংলা বইয়ের রাজ্যে। চোখ আটকে গেলো ‘আমি দ্রৌপদী’ নাম দেখেই। পরিচিত চরিত্রের নিজ ভাষ্যে লেখা দু-একটি বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। হরিশংকর জলদাস (একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ নানা সম্মানে ভূষিত)-এর লেখা ‘আমি মৃণালিনী নই’, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহধর্মিণীর আত্মকথা হিসেবে লেখা; এবং ‘সেই আমি নই আমি’— মহাভারতের খলচরিত্র হিসেবে পরিচিত ‘শকুনি’র ভাষ্যে লেখা। এ এক নতুন ধারা—পার্শ্ব চরিত্রগুলোর গল্পের মধ্যমণি হয়ে ওঠার এই যাত্রায় বাংলায় যুক্ত হলো দ্রৌপদী। ইংরেজিতে (এবং বোধ করি অন্য ভাষাতেও) এমনটা ঘটেছে আগেই। আমেরিকা প্রবাসী চিত্রা ব্যানার্জী দিবাকারুনি যথাক্রমে ‘সীতা’ ও ‘দ্রৌপদী’কে নিয়ে লিখেছেন ‘The Forest of Enchantments’ ও ‘The Palace of Illusions’।

বাংলায় ‘আমি দ্রৌপদী’ দেখে তাই সেই ‘হঠাৎ বৃষ্টির’ মতো ভাবের উদয়। মহাভারতের গল্পে দূর থেকে দ্রৌপদীর জীবন নাটকের মতো দেখেছি। মনে জেগেছে, কেমন করে সহ্য করেছে? এত কিছুর পরও কেমন করে ভগবান/প্রকৃতিতে সমর্পণ? নাহ, লেখক সেই জবাব দিতে পারেননি। তবে সফলভাবে আজকের দিনের মেয়েদের সংগ্রামের সাথে দ্রৌপদীর ভাবনাগুলো একাকার করে দিয়েছেন বলে মনে করি। কেমন করে?
‘কান্না রেখে একটুখানি বসো,
দুঃখ-ঝোলা একেক করে খোলো,
দেখাও তোমার গোপন ক্ষতগুলো
এ ক’দিনে গভীর কত হলো।’

তসলিমা নাসরিনের ‘দুঃখপোষা মেয়ে’— সেই যেন দ্রৌপদী। জন্মের সময়ই ছিল অভিশাপ। ‘যজ্ঞবেদী’ থেকে উত্থিত হওয়ার সেই মুহূর্তে দৈববাণী হয়েছিল— সর্বনারী শ্রেষ্ঠা এই কৃষ্ণা হতে ক্ষত্রিয়গণ এবং কৌরবকুলের মাঝে মহাভয় উপস্থিত হবে। তাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের জন্য সবাই দায়ী করেছে দ্রৌপদীকে। যাজ্ঞসেনী, পাঞ্চালী, কৃষ্ণা, দ্রৌপদী — সুন্দর সব নামের মাঝে আড়াল হয়েছে ‘লক্ষ্মীস্বরূপা’, ‘শ্রেষ্ঠা’। স্বয়ংবর সভায় নিজের পছন্দের মানুষ নির্বাচন করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে নিম্নবর্ণের কর্ণকে। পুরুষশাসিত সমাজে এ ‘গর্হিত’ প্রতিবাদ করেছে সে। তার ভাষ্যে— অন্যায়ের প্রতিবাদ; স্বয়ংবর সভায় তো নিজের পছন্দের সঙ্গীকে বেছে নেওয়া! তাই নয় কি? ঝলমলে রাজপোশাকে সজ্জিত কর্ণকে উপেক্ষা করে দীনবেশধারী অর্জুন/ফাল্গুনীর গলায় বরমাল্য দিয়ে নির্লোভতার কোনো প্রশংসা তার ভাগ্যে জোটেনি। বরং ক্ষুব্ধ হয়ে যুদ্ধের ঘোষণা এসেছে। ভালোবাসার মূল্য দ্রৌপদীর মতো আজকের নারীরাও দিচ্ছে নানা অবিচারের বলী হয়ে। আজকের কৃষ্ণা-কর্ণের মতো? কোনো দুরাচারের পথ রোধ করলে কখনো ভাগ্যে জোটে অ্যাসিডের দহন, কখনো প্রাণটাই কেড়ে নেওয়া হয়। সে যাত্রা বাঁচা গেলেও পরিবারের সম্মান ধুয়ে দেওয়ার অপরাধে কখনো কখনো সবার অগোচরে জীবননাশ ঘটাতে দেখা যায়। স্বপ্ন রয়ে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কৃষ্ণা তখন ভাসছে স্বপ্নরাজ্যে—‘আকাশ ছোঁয়া সাগর—তরঙ্গের পর তরঙ্গের মতো ভালোবাসার ঢেউ আমার বুকে আছড়ে পড়ছে। সে যে কী অভূতপূর্ব আনন্দ আর সুখ! শিরায়-উপশিরায় প্রবহমান রক্তস্রোতের মাঝে অপার্থিব আনন্দ বিন্দু বিন্দু হয়ে ঝরে পড়ছিল—অবিরাম টুপটাপ আওয়াজে’।

ঝর্ণা দাশ তুলে নিয়ে আসেন বাস্তবের রুক্ষ ক্যানভাস থেকে— ঢুকে পড়ি দ্রৌপদীর ভুবনে। স্বপ্নভাবনা তার স্বল্পস্থায়ী। জীবনের প্রথম রাত কাটে প্রথম পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের সাথে। ভাবেন— ‘কি কুৎসিতভাবে শুরু হলো আমার বিবাহিত জীবন।‘ প্রিয়তম স্বামীর বহুগামিতা মেনে নিয়ে নীরবে কষ্ট চেপে পাঁচ স্বামীর ঘর করা— এই তার অদৃষ্ট। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে— ‘মেয়ে জীবনের চিরকালীন শিক্ষাই আমাকে এমন করে গড়ে তুলেছে।‘ এই মুখ বুজে সহ্য করার শিক্ষা তার সার্বজনীন। পৌরাণিক চরিত্র থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর আধুনিকা—একই বাঁধনে বাঁধা যেন।

তবে দ্রৌপদীর জীবনে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা তার বস্ত্রহরণ। মহাভারতে—‘কপট পাশাখেলায় পাণ্ডবদের হারিয়ে দিয়ে কৌরবরা আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল। পাষণ্ড দুঃশাসন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অবগুণ্ঠিতা আমাকে উন্মোচিত করে দিয়েছিল। আনন্দে দিশেহারা হয়ে দুর্যোধন উরু দেখিয়ে অপমান করেছিল আমাকে। সেদিন সব বীরপুরুষরা মূক, বধির ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।’ নারীর বস্ত্রহরণ কিংবা নারীর পোশাক নিয়ে পুরুষজাতির মোহাবিষ্ট হয়ে যাওয়া আজও বিদ্যমান। নারীর পোশাকের মূল্যায়ন করা, অপমান-অপদস্থ করতে পোশাক নিয়ে টানাটানি (তাত্ত্বিক এবং আক্ষরিক অর্থে), এবং পছন্দমতো পোশাক চাপিয়ে দেওয়া— সবকিছুই চলছে। দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামীর মতো— নীরব দর্শকের ভূমিকায় সমাজ, এমনকি আইনও। সরাসরি যৌন হামলার পাশাপাশি সাইবার অ্যাটাকও বাড়ছে নারীর সম্মানহানি করতে। ২০২৬ সালের শুরুতে ধনকুবের ইলন মাস্কের AI প্ল্যাটফর্ম GROK অভিযুক্ত হয়েছে আক্ষরিক অর্থেই যেকোনো নারীর বস্ত্রহানি করার সুযোগ দিতে। নগ্নতাকে পৃথিবীর নানা দেশে নারীরা নিজেরাই বেছে নিয়েছে। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। তবু দ্রৌপদীর মতো সুরক্ষা-কবচ নিয়ে বিপদতাড়িত নারীর পাশে কৃষ্ণ বাস্তবে দাঁড়ায় না। আইনের বজ্র-আঁটনি ফসকে নারীর অপমান চলছে প্রতিনিয়তই।

এত যন্ত্রণার পরও শেষ নেই যাজ্ঞসেনীর দীর্ঘশ্বাসের। পাঁচ সন্তানের মৃত্যু তাকে ক্রোধান্ধ করেছে। প্রতিজ্ঞা করেছিল— সন্তান হত্যাকারীর মাথার মণি না এনে দিলে পরিত্যাগ করবে অন্ন-জল। সন্তানের শোক কি তায় ভোলা যায়? ‘সন্তানহারা মায়ের বুকে চন্দনকাঠের শীতল প্রলেপ বুলিয়েও তো আমি শান্তি পাব না। রোগে ভুগে ওরা যদি পরপারে যেত তবে আমি পোড়া হৃদয়কে স্বরচিত স্বান্তনায় শান্তি দিতে পারতাম। শুধুমাত্র নির্মম প্রতিহিংসার শিকার হলো আমার শিশুপুত্ররা— এ দুঃখ যে আমার আমৃত্যু থাকবে।’ আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র হিসেব করে না বয়সের। যুদ্ধবিগ্রহে বিদ্যালয়, বাসস্থান, হাসপাতাল, খেলার মাঠ— সর্বত্র মৃত্যু নেমে আসে শিশুদের ওপর। সন্তানের লাশ নিয়ে আহাজারি করে মায়েরা। অসুখে ভুগে মরার সুযোগই হয় না সদ্যজাত শিশুর। ২০২৬ সালেও যুদ্ধ হয়— দ্রৌপদীর মতো শত শত মায়ের বুক খালি হয়।

দ্রৌপদীর প্রশংসা সবার মুখে। মহামহিম ভীষ্ম বলেন— ‘কৃষ্ণা তো কুসুমকলিকা ছিল না, সে ছিল আলোকসম্ভবা, একাদশদর্শী।’ ধৃতরাষ্ট্র বলেন— ‘আমি জানি কৃষ্ণা, তুমি মোহান্ধকারসহ মধ্যাহ্নের দীপ্র সূর্যের মতো দীপ্তিময়ী।’ কুরুকুলবধূ গান্ধারী বলেন— ‘দ্রৌপদী পুরুষের চিরকালীন ধ্যান-ধারণা থেকে একেবারেই অন্যরকম। ব্যক্তিত্ব, স্বাভিমান ও আত্মমর্যাদাবোধে সে আলোকসম্ভবা।’ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন— ‘তোমার ব্যক্তিত্বকে অনন্য করে তুলেছে আগ্নেয় উপাদান। চরিত্রে তোমার অগ্নিসম তেজ, দৃপ্ততা ও দৃঢ়তায় তুমি সবার কাছে- অসাধারণ নারী হিসেবে প্রতিভাত হয়েছ।’ এত প্রশংসা, এত সম্মান— সব কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর—কী মূল্য রাখে? নারীর এই সর্বসহিংস মূর্তি সমাজের, পুরুষের খুবই প্রিয়। এতে কথামালার ফুলঝুরি ফোটানো সহজ হয়, কর্তব্য তেমন বাড়ে না।

‘বড় ভালো মানুষ ছিল!’— চলে যাওয়ার পর সহজ করে অনুভূতি প্রকাশ আমাদের বড় প্রিয়। দ্রৌপদী তাই গভীর বিশ্বাসে নিজেকে সমর্পণ করেন ভাগ্যের হাতে। প্রতিবাদমুখর জীবনের শেষ পরাজয় বরণ করেন শান্তচিত্তে। মুখে আসে— ‘আহ্— সর্বতাপহারিণী মৃত্যু— তুমি এসো।’

মনে করি, পাঠচক্রে ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থের ‘আমি দ্রৌপদী’ পড়া আবশ্যক। গল্পবলা, সমাজ-ভাবনা, ভাষার অলংকার এবং সর্বোপরি স্বাধীন শক্তিময়ী নারী চরিত্র নিয়ে প্রচুর আলোচনার অবকাশ রয়েছে। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ।

সহায়িকা: মহাভারত; রাজশেখর বসু, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, বাংলাপিডিয়া।


জাকিয়া আফরিন | ইউনিয়ন সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

আইনের অধ্যাপক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও লেখক

Previous Story

রচিত রচনা: আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখো দেখি কঠিন মাটির তলে…

Next Story

বেহাগ

Latest from নিয়মিত কলাম

সলঝেনিৎসিন, তাজউদ্দীন এবং নৈতিক রাষ্ট্রনায়কত্বের পথরেখা

মানুষের জীবনে সত্য, সৃষ্টিশীল চিন্তা, আত্মসংযম ও মানবিক কর্তব্য—এই চারটি মূল্যবোধই আমাদের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে। - লিখেছেন শারমিন আহমদ।