তথ্য প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের উন্মুক্ত বাজারে শিল্পবোধের চর্চা যেন ভার্চুয়াল পণ্য

অরূপরতন আচার্য্য
May 20, 2026
9 views
14 mins read

সময়ের বহমান ধারা যে নতুনত্বের জন্ম দেয় তা কম বেশী সকলেরই জানা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশের অনিবার্য পরিণতি মানুষের জীবনধারণ ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর যে বদল নিয়ে এসেছে তা সমকালে প্রায় প্রযুক্তি দিয়ে মেপে নেওয়াও যেতে পারে। পুরোনকে সরিয়ে নতুনের আগমনই স্বাভাবিকতা। ঐতিহ্যের ভিত্তি প্রস্তরে পুরোনকে সরিয়ে নতুনের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই যে প্রগতিশীলতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায় তা কারুর অজানা নয়। সময়ের এই ধারাবাহিকতার আধুনিকতম নিদর্শন “জেনারেশন জেড” বা “জেন-জি”। বলা যেতে পারে এই শব্দ যুগল যুগের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইমোশন বা আবেগ বিষয়টিকে প্রযুক্তির নিরিখে ব্যবহারিক প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সমসাময়িক জীবনধারার সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে মানব সভ্যতার এক বিশাল শ্রেণীকে।

তারা কি তবে আর্ট কালচার ও লিটারেচারকে প্রযুক্তির পরিপুরক হিসেবে বিবেচনা করেন? নাকি “মঞ্চ আমাদের মালঞ্চ, শিল্প মানুষের জন্য”- আপ্ত বাক্যে বিশ্বাস রাখেন? তারা কি সত্যিই ভাবেন যে বা যারা এবং যা কিছু বিপন্নদের কথা?  শিল্পের সেই ডেফিনিশন কি ক্রমশ পরিবর্তন হচ্ছে? সবাই মিলে আনন্দ করে যে সৃষ্টির স্বার্থকতা মানুষের মনকে সৃজনের আনন্দ ও মাদকতায় সমাজ পরিবর্তনের বার্তা গঠণে এগিয়ে রাখে, কোথাও কি তা হারিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্নগুলো যে শুধু যেন জি-র মধ্যে সীমাবদ্ধ তা নয়। প্রশ্নগুলো আজ এই সমাজ সংযোগ মাধ্যম সর্বস্বতার যুগে আর্ট কালচার ও লিটারেচার প্রসঙ্গে মৌলিক কৃতির বিপরীতে চট জলদি চিত্তাকর্ষক কন্টেন্ট ক্রিয়েশন শন্দবন্ধের জন্ম দিয়েছে।  

জেন জি-র কথা বললে একটা প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখার কথা বলা হয়। যেমন ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় ২০১০-এর প্রথম দিকে জন্মগ্রহণকারীদের পোশাকি নাম “জেনারেশন জেড” বা সংক্ষেপে “জেন জি”। আর একটু বিশদে বললে বলা যায় প্রায় ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে যারা জন্মগ্রহণ করেছন তারা এই জেন জি প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত। স্বাভাবিক ভাবেই অঙ্কের হিসেবে ২০২৪ সালের নিরিখে সবচেয়ে বড় জেন জি সদস্যের বয়স ২৭, আর সর্বকনিষ্ঠ জেন জির বয়স ১২ বছর।

কিন্তু সমাজ সংযোগ মাধ্যমের সামগ্রিক চিত্রটা দেখলে কিন্তু তা শুধুমাত্র জেন জি-র মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে সঙ্কুচিত করলে চলবে না। এই জেনারেশন জেড এর পূর্ববর্তী প্রজন্মের ক্যাটাগরির নাম “জেনারেশন ওয়াই”।  যাদেরকে আবার বলা হয় “মিলেনিয়াল্স”। হিসেবের দিক থেকে এদের জন্ম ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে। দেখা যাচ্ছে তথ্য প্রযুক্তি ও ইন্টেরনেটের যুগে এই জেন জি এবং জেন ওয়াই এর চরিত্রের মধ্যে ওই মিল শুধু মৌলিক কৃতির বিপরীতে চট জলদি চিত্তাকর্ষক কন্টেন্ট ক্রিয়েশন। এই প্রবণতার বিপরীত দিকটা কি তবে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ভার্চুয়াল সংস্কৃতির দাপটে? কারণ এখানে কয়েকটি শব্দকে উপলক্ষ করে জড়িয়ে রয়েছে এই যেন জি সহ ভার্চুয়াল সাম্রাজ্যের বিস্তার। এই শব্দগুলি হল “আই” বা “ইন্টারনেট জেনারেশন”, “হোমল্যান্ড জেনারেশন”, “নেট জেন”, “ডিজিটাল নেটিভস” বা “নিও-ডিজিটাল নেটিভস”, “প্লুরালিস্ট জেনারেশন”, এবং “সেন্টিনিয়াল্স”।

এখানে লক্ষনীয় যে যারা ডিজিটালি লিটারেট বা ডিজিটালি স্বাক্ষর তারাই এই ভার্চুয়াল পরিসরের কন্টেন্ট ক্রিয়েটার এবং শ্রোতা দর্শক। পাশাপাশি খুব স্বাভাবিক ভাবেই ইন্টারনেট এবং পোর্টেবল ডিজিটাল প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যের কারণে আজকাল প্রযুক্তিগতভাবে অক্ষর-জ্ঞান না থাকলেও এরা ডিজিটাল নাগরিক হিসেবেই বিবেচিত হন। কিন্তু এটাও সত্য যে সামগ্রিক অর্থে পূর্ববর্তী প্রজন্মের চিন্তা ভাবনা ও সামগ্রিক চেতনাবোধ যেখানে নিবদ্ধ ছিল বইয়ের পাতার মাঝে, সেখানে এই নতুন প্রজন্মের অধিকাংশ বা প্রায়  প্রত্যেকেই ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের প্রতি গভীর ভাবে আসক্ত। সবকিছুই কেমন যেন ফেসবুক ওরিয়েন্টেড বা ফোট ওরিয়েন্টেড।

সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নততর ও ক্রমশ পরিবর্তনকামী প্রযুক্তি ও পরিষেবা আর্টিফিসিয়েল ইন্টেলিজেন্স। মৌলিক সৃষ্টি ও সৃজনের বিপরীতে যখন গলায় সুর না থাকার পরেও কেউ অবলীলায় গান গেয়ে ফেলেন কিংবা কবিতা লিখতে না জেনেও তিনি কবি। আবৃত্তি করতে না জেনেও তিনি আবৃত্তিকার। যেহেতু কন্টেন্ট ক্রিয়েটার ও দর্শক শ্রোতার মধ্যে এই ভার্চুয়াল সংস্কৃতি খুলে দিয়েছে এক স্তাবকতার পরিসর। যেখানে কোন মাপকাটি ছাড়াই প্রসংশার বন্যায় ভাসিয়ে দেন অনেকে। হিসেব দীর্ঘ্যায়ীত লাইক কমেন্ট আর লাভ রিয়েক্ট এর নিরিখে। আসলে গভীরতার অভাব, আর শিল্প চেতনা বিহীন কর্মকাণ্ড।  

প্রশ্ন আসে শিল্পবোধ কি তবে তলানির দিকেই যাবে? তুলনায় শিল্প বোধের চর্চার নিরিখে সমাজ মাধ্যমে কন্টেণ্ট যে পরিমাণে প্রকাশিত হচ্ছে তার তুলনায় শিল্পবোধহীন, সামাজিক বার্তাবিহীন কন্টেন্টের পরিমাণ যে অনেক বেশী তা বলাই বাহুল্য। তবে কি ব্যতিক্রম নেই? আছে। উদাহরণ ফেসবুকে কৃষক আজিবর মন্ডলের অসাধারন আবৃত্তি পরিবেশন। প্রশ্নটা তাই শুধু জেন জি নয় বরং তথ্য প্রযুক্তির এই পুঁজিবাদী দাপটের বাজারে উত্তর আধুনিকতার নামে প্রায় আট থেকে আশি এই জ্বরে ভুগছেন এবং ভুগতে চাইছেন।


অরূপরতন আচার্য্য | কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

বিভাগীয় প্রধান, সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগ, শেঠ আনন্দ্রাম জয়পুরিয়া কলেজ।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

প্রবাসে বাংলাদেশী কমিউনিটি সংগঠন

Next Story

‘সুলতানার স্বপ্ন’, শিক্ষা ও দর্শন

Latest from বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

ভালোবাসা ৩.০ : একাকীত্ব, প্রযুক্তির সঙ্গ ও পে-ওয়াল

এআই প্রেমিক বা প্রেমিকার কথা শুনলে অনেকে প্রথমে শিশুতোষ কল্পনা মনে করে হাসি-ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেন। কিন্তু ২০২৬ সালের... - লিখেছেন সাকির মোহাম্মদ।

মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়

রাতের আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় সবকিছু যেন নীরব নিথর, সবকিছু থমকে আছে। অথচ এই নীরবতার আড়ালে চলছে অবিরাম... - লিখেছেন তানভীর হোসেন।