যে কোথাও ফেরে না – পাঠ অনুভব

রঞ্জনা ভট্টাচার্য্য
May 23, 2026
11 views
17 mins read

কবি তৃষ্ণা বসাকের ‘যে কোথাও ফেরে না’ কবির নিজস্ব স্বর্গের সিঁড়ি। এক একটি ধাপে দাঁড়িয়ে আছে দুঃখ, শোক, প্রেম, অপ্রেম, রাজনীতি, তৃপ্তি, অতৃপ্তির আশ্চর্য সম্পদ। প্রতিটি সিঁড়িতেই পাঠক জিরোয়, অনুভব করে মুহূর্তের স্ফূরণ, অনুভব করে বেদনা-আনন্দের ব্যাপ্তি। তৃষ্ণার কবিতা কখনো শুধু নির্মাণ হয়ে ওঠেনি। সে এক অন্দরমহলের ঠিকানা যেখানে একই শব্দ বিভিন্ন অনুভূতি নিয়ে পাঠককে কখনো অশ্রুময় করেছে; কখনো দীপ্যমান হয়ে উঠেছেন পাঠক। বড় অন্তরঙ্গ কবিতার গ্রন্থ ‘যে কোথাও ফেরে না’। বহিরঙ্গের বাহুল্য নেই। অন্ত:সলিলা প্রতিটি কবিতা ভিতরে চুল্লির আগুন নিয়ে বহমান নদী। কোথাও কবির আলস্য নেই, ফাঁকিবাজি নেই, হঠাৎ চমকে দেওয়াও নেই, শুধু প্রবাহ আছে, আছে জোয়ার-ভাঁটা। কবি তাঁর উচ্চারিত ক্ষতে ও কোষের শক্তিঘরে রেখেছেন প্রেম, উদাসী বাউলের উপকথা।

‘যে কোথাও ফেরে না’ র প্রথম কবিতা ১৯৮৮ সালে সদ্য পিতৃহারা কিশোরীর পিতৃতর্পণ-

‘কেন শুধু গীতা কেন?
শব্দ আনো, তোমাদের নিজস্ব শব্দ,
পৃথিবীর বুকের জিনিস!
জন্মদিন থেমে যায়, মৃত্যুদিন বড় হয়ে ওঠে,
লেখো,লেখো, আমি প্রতিদিনই বেঁচে উঠি,বেড়ে চলি,
ক্ষিতি-অপ-তেজ-ব্যোম-মরুত শরীর থেকে
ধুলো ছেড়ে আবার নতুন ভ্রূণে যাই,
মাতৃগর্ভে খেলা করি…’
(পিতৃতর্পণ)

গভীর শোক এক বোধের নৌকায় চড়ে পার হচ্ছে চেতনার সমূদ্র, পিতৃতর্পণ সব স্বজন হারানো মানুষের তর্পণ হয়ে উঠেছে। জন্ম-মৃত্যুর বৃত্ত ছেড়ে এই কবিতা তৃষ্ণার নিজস্ব নীহারিকার খোঁজ-

‘অসহ্য সান্ত্বনাবাক্য, স্বার্থপর দার্শনিকতা,
তবু কিছু শব্দ এখনও পবিত্র রেখেছি,
শোকে উজ্জ্বল তারা, প্রেমেতে জর্জর,
এই নাও, নিয়ে যাও
আত্মা তুমি পিতা হয়ে ওঠো,’

কবিতার এই সারি দেওয়া শব্দের ভিতরে অনুভব করি ধ্যানস্থ হয়ে আছে আঁধার আর সেই ধ্যানস্থ আঁধারের ভিতর জন্ম নিচ্ছে কবিতা যে ক্রমাগত পিতা হয়ে উঠছে, কবির আখরে শুধু পিতৃতর্পণ নয়, পিতাকে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন না হতে দেওয়ার আকুতি। আত্মার মধ্যে জেগে থাকে পিতৃশ্বাস।

পাঠক লক্ষ্য করবেন ‘অসহ্য সান্ত্বনাবাক্য, স্বার্থপর দার্শনিকতা’- এই লাইনটি শুধু অমোঘ নয়, এ যেন মহাকর্ষ বলের মতো ধ্রুব সত্য। গভীর শোকে বাইরের সান্ত্বনাকে অসহ্য মনে হয়, দার্শনিকতাকে স্বার্থপর। যে সময় এক মুঠো নিঃশ্বাস আর বাতাসের প্রয়োজন, প্রয়োজন ‘বিজন ঘরের’ বন্ধুর হাত, সেসময় স্তোকবাক্য বিষবৎ মনে হয়।

তৃষ্ণার কবিতা আমাকে শিখিয়েছে ‘আঁধার’ আর ‘অন্ধকার’ এক নয়। অন্ধকার ধীরে ধীরে শোক আর ব্যথার সবুজ শ্যাওলা সরিয়ে আঁধারের কোলে ধ্যানস্থ হয়। তৃষ্ণা লেখেন-

‘কবিতা যখন
আত্মজীবনীর একেকটা পাতা হয়ে যায়
তখন পুরো বই শেষ করতে ইচ্ছে করে না।
কয়েক পাতা উল্টে পালটে
তোমার পাঠানো কার্ডটা
পেজমার্ক করে উঠে আসি,
মাথা দপদপ করে,
ঘাড় যন্ত্রণায় শক্ত হয়ে যায়
ছাদে যাই,
এককোণ ঘাসে ছেয়ে গেছে…’
(আত্মজীবনীর একেকটা পাতা)

‘মাথা দপদপ করে’ এই লাইন থেকে গাঢ় অন্ধকারের কুণ্ডলী যেন পাক খেয়ে কোলে বসে ‘আঁধারের’ যখন কবি লেখেন-

‘ছাদে যাই,
এককোণ ঘাসে ছেয়ে গেছে…’

আঁধার কেন? কারণ, পরের স্তবক ধারণ করেছে-

‘আমি আমার চোখ দুটো খুলে
তার মধ্যে লুকিয়ে রাখি,
তারপর স্কিন রিমুভার দিয়ে
তুলে দিই চামড়া
ফুসফুসটার মুখ
সামান্য হাঁ করে
গুঁজে দিই
চারটে নিমপাতা ‘
(আত্মজীবনীর একেকটা পাতা)

চোখ দুটো খুলে রাখা, ফুসফুসের মুখে গুঁজে দেওয়া চারটে নিমপাতা তো আঁধারকেই চেনায়, ‘যে আঁধার
আলোর অধিক’। এই আঁধারের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে আলোর আশ্রয় আসে, আসে বিরহের প্রতি আসক্তি-

‘এখন এখানে অনেক হাওয়া
একটি তারা
কখন
এসে দাঁড়াল পেছনে!
আমি আর সেই তারাটি
পরস্পরের হাত ছুঁয়ে
আবাক হয়ে চেয়ে রইলাম
আকাশের দিকে!’

তারা আর কবির পরস্পরের হাত ছুঁয়ে থাকার মধ্যে জন্ম নিল যে জন্ম জন্মান্তরের বিরহ, সেই বিরহই বিস্মিত করে কবিতার আকাশকে। প্রকৃতির প্রতি দুর্নিবার প্রেম কবিকে দিয়ে বলিয়ে নেয়-

‘যে বসতে চাইবে আমি তাকে গড়িয়ে ফেলে দেব বাগানে,
প্রতিটা গাছের পায়ের কাছে ফেলে বলব-
ক্ষমা চা, শুয়োরের বাচ্চা! ক্ষমা চা!’

মনে পড়ে যায় Ted Huge-এর ‘My own true family’ যেখানে ওক গাছের জনজাতি বলছে-

‘… we are the oak –trees and your own true family.
We are copped down, we are torn up, you do not blink an eye.
Unless you make a promise now– now you are going to die.’
Whenever you see an oak–tree felled, swear now you will plant two.
Unless you swear the black oak bark will wrinkle over you
And root you among the oaks where you were born but never grew.’

তৃষ্ণার কাব্যকথায় দাঁতে চাপা যন্ত্রণার সাথে অবাধ হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় বিষণ্ণ কৌতুক। পরিযায়ী শ্রমিকের দীর্ঘ পথ হাঁটা। করোনা কাল। পরিয়ায়ী শ্রমিকদের সার সার লাইনের উপর মৃত্যু। যাঁদের ফেরা হয় না কখনো, তাঁদের নিয়ে আকুল ব্যথায় কেঁপে ওঠে কবির শব্দ, আর শেষে জেগে থাকে বিষণ্ণ কৌতুকের ছুরি, রাজনৈতিক হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে।

‘চোখের জলে আমার পা পর্যন্ত ভেসে যাচ্ছে দেশ,
আমি যে সেই কোথায় আটকে পড়েছিলাম,
সেখান থেকে ফেরার বাস নেই, ট্রেন নেই, এমনকি রাস্তা অবধি নেই, …’
…..
আমাদের লরি হর্নও দিচ্ছে না, স্রেফ ওদের পিষে দিয়ে চলে যাচ্ছে।
….
আমি ছাদে উঠে গেছি,
খড়ের ওপর শুয়ে শুয়ে দেখছি তারাবৃষ্টি,
আকাশ ও আমার পাশে শুয়ে শুয়ে দেখছে
সেই অবর্ণনীয় রাত্রি,
আর আমার পিঠ ফুঁড়ে বেজে উঠছে
‘চল ছাঁইয়া ছাঁইয়া ছাঁইয়া’
(ফেরা)

সমষ্টির দুঃখ ব্যক্তিগত দুঃখের প্রশস্ত বীথিকা তৈরি করে নিজের দেশেই নির্বাসিতের যাপনকে তুলে ধরেছে। ‘যে কোথাও ফেরে না’ ব্যক্তিগত পর্যটন থেকে হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন পর্যটন,’সামনে যখন কোনও রাস্তাই থাকে না,’ তখনও জীবনের কাছে ফেরার জন্য নতুন পথের জন্ম দেয় এই কাব্যগ্রন্থ।

পাঠক নিশ্চয়ই জানেন ‘পথ’ আর ‘রাস্তা’ এক নয়। রাস্তা যে কেউ বানাতে পারে, কিন্তু পথ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয়। তাই কবি তৃষ্ণা লেখেন-

‘আমার সামনে যখন কোনও রাস্তাই থাকে না,
তখনও একজন মা তার যৌনকর্মী মেয়ের
সুবিচারের জন্যে কুয়াশার মাঠে হারিয়ে যান।
….
‘আমার সামনে যখন কোনও রাস্তাই থাকে না,
তখনও শিউলি ফোটে, শিউলির বুকের মধ্যে চাঁদ
চাঁদের বুকে নৌকা ভাসায় কেউ কেউ’

এভাবেই ‘যখন কোনো রাস্তা’ থাকে না তখনও কবি নিজস্ব পথ তৈরি করে নেন- ‘যে কোথাও ফেরে না’, সে অনিকেত, সে প্রত্যাবর্তন করে নিজের অন্তরের নদীর কাছে, ফিরে আসে নৌকার মত দুলে দুলে চেতনার আগুনের কাছে।

বারংবার পাঠ করার মত বই কবি তৃষ্ণা বসাকের ‘যে কোথাও ফেরে না’। প্রতিবার পাঠ নতুন নতুন পরিক্রমা। বইটা হাতে তুলে নিলে পাঠক সমৃদ্ধ হবেন, একথা বলতেই পারি।

‘যে কোথাও ফেরে না’ প্রকাশিত হয়েছে শব্দ কলকাতা হাউসিং থেকে। প্রচ্ছদ করেছেন সুপ্রসন্ন কুণ্ডু। বিনিময় মূল্য: ২৫০ টাকা।


রঞ্জনা ভট্টাচার্য্য | কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

পেশা শিক্ষকতা, নেশা বই পড়া, গান শোনা। আর ভালোবাসা কবিতা, গল্প লেখার মাধ্যমে নিজের ভিতর লুকানো ছায়াপথ খুঁজে চলা।


1 Comment Leave a Reply

  1. খুব ভাল লাগল রঞ্জনা। তোমার বিশ্লেষণ মুগ্ধ করল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

ওরেগনের খবর

Next Story

‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’: যন্ত্রের থাবায় রক্তাক্ত পুরাণ

Latest from বই আলোচনা

‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’: যন্ত্রের থাবায় রক্তাক্ত পুরাণ

আগেকার দিনে কাহাররা লাঠিয়াল ছিল। সে বাবা ঠাকুরের অনেক অলৌকিক গল্প বলে। ... তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিখ্যাত উপন্যাস নিয়ে আলেচনা করেছেন রঞ্জনা ভট্টাচার্য্য।

দি ইলাভেন্থ আওয়ার

The Eleventh Hour: A Curious Mystery by Greame Rowland Base - ইংরেজীতে লেখা এই বইটি নিয়ে আলোচনা করেছেন ড. আশরাফ আহমেদ।