২০০৭ সালের নভেম্বর মাস। বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার নিউইয়র্কের উদ্দেশ্য রওয়ানা হলাম। আসার আগে আমেরিকার আবহাওয়া, সামাজিক অবস্থা, বাংলাদেশী কমিউনিটি এই সবকিছু সম্পর্কে খুব একটা ধারনা ছিলনা। জেএফকে বিমানবন্দরে নামার পর কাচের ভেতর থেকে বাইরের ঝল ঝল করা রোদ্দুর দেখে মনে হচ্ছিল বেশ সুন্দর আবহাওয়া আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমাদেরকে স্বাগত জানাতে আমার খালু গাড়ী নিয়ে অপেক্ষায় আছেন, কিন্তু কিভাবে উনার সাথে যোগাযোগ করব সেটিও জানা নেই। এক ভারতীয় শিখ ভাইয়ের কাছে সাহায্য চাইতেই তিনি খালুকে ফোন করে আমাদের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন। দরজা খুলে বের হবার সাথে সাথে প্রথম ধাক্কা খেলাম তীব্র ঠান্ডায়। আমাদের আসার দু’দিন আগের স্নো পড়েছিল। চারিদিক সাদা হয়ে আছে। শীত মোকাবেলা করার প্রস্তুতি না থাকায় শুরুতেই চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়েছিল, যদিও গাড়ীতে উঠা এবং নামার মাঝে খুব একটা সময় থাকতে হয়নি, ফলে এ যাত্রায় রক্ষা পাওয়া গেছে।
আমেরিকায় আসার পর শুরুতেই মূল ধারায় কাজ পাওয়া সহজ হয় না। ফলে স্টোর জব বা অড জব করা ছাড়া উপায় থাকে না জীবিকা নির্বাহ করার জন্য। আমার শুরুটা অবশ্য হয়েছিল নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বাংলা সংবাদ মাধ্যম ‘বাংলা পত্রিকা’তে। এর বাইরেও একটি গ্যাস স্টেশনে কাজ করতে হতো সাংসারিক আর্থিক যোগান দেয়ার জন্য। গ্যাস স্টেশনে কাজ করার সময় বাংলাদেশ থেকে নতুন আগত একজনকে চাকুরীর জন্য আমার বাংলাদেশী ম্যানেজারের মাধ্যমে স্টোরের আইরিশ মালিকের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু তার চাকুরী হয়নি, কারন ছিল আইরিশ মালিকের ইংরেজী কথা তিনি বুঝতে পারেননি ফলে ঠিকভাবে জবাব দিতে পারেননি। পরে অবশ্য বাংলাদেশী ম্যানেজর সেটি ম্যানেজ করে নিয়ে তাকে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
এই দুটি ঘটনার সাক্ষী আমি নিজে। এই রকম হাজার হাজার ঘটনা আমাদের কমিউনিটির যারা আগে এসেছেন তাদের কাছে শুনতে পাওয়া যায় নিজেদের দাড় করানোর জন্য কত কিছু করতে হয়েছে তাদের। ২০০৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের ব্যবধানটুকু খুব একটা বেশী না। এর মাঝেই দুটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো। তার আগে গেলে আরও অনেক গল্প উঠে আসবে আমাদের সামনে। বাংলাদেশ থেকে শুরুতে অন্য কোনও স্টেটে না এসে, নিউইয়র্কে আসার ইচ্ছে কমবেশী সবাই রাখার এটি একটি বড় কারন যে, শুরুতে নানা ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে, আর নিউইয়র্কে বাংলাদেশী কমিউনিটির লোকজনের সংখ্যা অনেক বেশী, ফলে নিজের কমিউনিটির মানুষদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাবার সুযোগ বেশী থাকবে। আর বাস্তবে মিলছেও তা-ই। আর কমিউনিটিকে সংগঠিত করে রাখার জন্য, বাংলাদেশী কমিউনিটির মানুষদের মাঝে গড়ে উঠেছে অনেকগুলো সংগঠন। তাদের এই সাংগঠনিক কার্যক্রমগুলো শুধু যে নবাগতদের সহায়তা করছে তা নয়, বাংলাদেশী সংস্কৃতিকে বিদেশের মাটিতে তুলে ধরছে, কমিউনিটির মানুষদের এক অপরের মাঝে একটি সখ্যতা গড়ে তুলেছে।
শুরুতেই কমিউনিটি সংবাদ মাধ্যমে কাজ করার সুবাদে কমিউনিটি সংগঠনগুলোর অনেকের সাথেই কথা বলা থেকে শুরু করে একটি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশী বাংলাদেশী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। প্রায় সময় লক্ষ্য করতাম, রাত ১টা বেজে গেছে, পরদিন পত্রিকা বের করা হবে। কমিউনিটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ফোন করছেন, তাদের একটি সংবাদ বা বিজ্ঞাপন পত্রিকাতে দিতেই হবে। সংগঠনের নির্বাচন, কিংবা কোনও ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। যার ফলে পত্রিকার মাধ্যমে সংগঠনের সকল সদস্য সহ শুভানুধ্যায়ীদের কাছে যেন সকাল বেলায়ই সেটি পৌছে যায়, সেজন্য রাতের ঘুম নষ্ট করে ছুটে আসছেন পত্রিকা অফিসে। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এসেও কমিউনিটি সংগঠনগুলোর কারনে যেন বাংলাদেশকেই ফিরে পেয়েছি।
একটি লম্বা সময় প্রবাসে থাকার ফলে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, সামাজিক অনেক কিছু থেকে হয়তো অনেকটাই দূরে সরে যাওয়া হতো- যদি না প্রবাসে বাংলাদেশী কমিউনিটি সংগঠনগুলো না থাকত। আমাদের আড্ডায় কিংবা গল্পের মাঝে আমাদের কমিউনিটি সংগঠনগুলোর নানা রকম সমালোচনা থাকলেও, এই সংগঠনগুলো আমাদের সবার মাঝে বাঙ্গালিয়ানাকে ধরে রাখতে সর্বদায় কাজ করে চলেছে। এ কারনে কমিউনিটি সংগঠনগুলোর সাথে সম্পৃক্ত সকল ব্যক্তিবর্গকে সাধুবাদ জানাতে হয়।
বাংলাদেশী কমিউনিটি সংগঠনগুলো গড়ে উঠার ফলে, প্রবাসে ধীরে ধীরে নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বাংলা সংবাদ মাধ্যম, বাংলাদেশী গ্রোসারী, রেস্টুরেন্ট, বিভিন্ন ধরনের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কমিউনিটি সংগঠনগুলো না থাকলে হয়তো এই রকম প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ত। বর্তমানে বাংলাদেশীদের মূল ধারার রাজনীতিতে এগিয়ে যাবার খবর পাওয়া যায়। আর এটিও সম্ভবপর হচ্ছে বাংলাদেশী কমিউনিটির সংগঠনগুলোর কারনেই।
কমিউনিটিকে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে কমিউনিটি সংগঠনগুলোর যাত্রা শুরু হলেও, কমিউনিটিতে রয়েছে নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা। এই সব সমালোচনাগুলো একেবার দূরে ঠেলে দেয়া যায় না। এর বড় কারন পরিলক্ষিত হয়, আমাদের কমিউনিটি সংগঠনগুলো থেকে কমিউনিটির মানুষজন যে ধরনের তথ্য নির্ভর সহায়তা পাবার কথা তা পাচ্ছে না, ফলে কমিউনিটির বেশীর ভাগ মানুষ এই সব সংগঠন থেকে নিজেদের দূরে রাখতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এর বাইরে রয়েছে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের মাঝে প্রতিযোগিতার জন্য কারনে-অকারনে সংগঠন গড়ে উঠার ফলে তা কমিউনিটিকে সংগঠিত রাখার চাইতে নিজেদের মধ্য বিভাজন তৈরি করে তুলছে। উদহারণ হিসেবে আমি ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার সংগঠনের সংখ্যাই যদি উল্লেখ করি তাতে দেখা যায়, আজ থেকে ৫/৭ বছর আগ সংগঠনের সংখ্যা শোনা গেছে ১৫/২০ টির মত, আর বর্তমানে আন-অফিসিয়াল গননা শোনা যায ৬০টিরও বেশী। এই গণহারে সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনের গল্প শোনা যায়, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের পারস্পরিক কোন্দলের কারনেই একের পর এক সংগঠন বেড়ে চলেছে। কমিউনিটিকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে নয়। ফলে, কমিউনিটির বেশীর ভাগ মানুষই সংগঠন কতৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানমালায় অংশগ্রহন করতে অনেক ক্ষেত্রেই অনীহা প্রকাশ করেন। আর অনেকেই মুখ রক্ষার্থে অংশগ্রহন করার বাধ্যবাধকতার কারনে তাদের জীবন বিষিয়ে উঠার গল্পও শোনা যায়। দাওয়াত সংস্কৃতি যেন আনন্দের চেয়ে বেশী বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। কমিউনিটি সংগঠনগুলো এই সব বিষয়গুলো নজরে না আনলে হয়তো আমাদের কমিউনিটির মানুষজনের কাছে কমিউনিটি সংগঠন একটি আশার জায়গা না হয়ে ভীতির কারন হয়ে উঠবে।
আমাদের কমিউনিটি সংগঠনগুলো আমাদের কমিউনিটিকে বিদেশে আরও অনেক বড় অবস্থানে নিয়ে যাবে, এই কামনা করি। সেই সাথে এই সব সংগঠনগুলোর পেছনে যারা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তাদের সবাইকে শ্রদ্ধা জানাই।
২ মে, ২০২৬

মো: মোস্তাফিজুর রহমান (পারভেজ) | জার্মানটাউন, ম্যারীল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র
সফটওয়্যার অটোমেশন আর্কিটেক্ট, সমাজকর্মী ও সংগঠক। প্রেসিডেন্ট, আগামী।
