রাতের অন্ধকারে এমন কিছু নৃশংস ঘটনা ঘটে, যা কল্পনা করলেও শরীর শিউরে ওঠে। আমরা হয়তো এসব বিভীষিকা নিয়ে কথা বলতে চাই না, কিন্তু চুপ করে থাকাটাও ঠিক নয়, কারণ আজ যদি আমরা এই অপরাধগুলো নিয়ে না ভাবি বা না লিখি, তবে আমাদের এই চুপ করে থাকাই অপরাধীকে আরও সাহসী করে তুলবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে আমরা এক ভয়ংকর বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় দেখা যায়, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী—যার শরীরে বেড়ে উঠছিল আরেকটি জীবন—তাকে ধর্ষণের পর পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার গর্ভের শিশুটিকেও নির্মমভাবে বের করে এনে মা ও সন্তান দু’জনকেই মৃত অবস্থায় ফেলে রেখে গেছে দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনা কোনো কল্পকাহিনি নয়, এটি আমাদের সমাজেরই এক অন্ধকার, বিকৃত এবং নিষ্ঠুর মুখ, যা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
মানবসভ্যতার দীর্ঘ পথচলায় আমরা অনেক অগ্রগতির গল্প বলি—প্রযুক্তি, শিক্ষা, উন্নয়ন কিন্তু এই অগ্রগতির ভেতরেই কোথাও যেন এক গভীর অন্ধকার জমে আছে, যা মাঝেমধ্যে হঠাৎ আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের সেই রক্তাক্ত পথ ধরে যখন একটি নিষ্পাপ শিশু তার কাটা গলা চেপে ধরে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন যেন খোদ মানবতা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। বাবার সাথে ব্যক্তিগত বিরোধের প্রতিহিংসা মেটাতে এক পাষণ্ড যখন একটি অবুঝ শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করতে চায়, তখন বুঝতে হবে আমাদের সমাজ কতটা গভীরে পচে গিয়েছে। এগুলো সাধারণ অপরাধের খবর নয় বরং আমাদের সমাজের নৈতিক অবস্থার সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে। আমরা কি সত্যিই এগোচ্ছি, নাকি কেবল বাহ্যিক উন্নয়নের আড়ালে মানবিকতার অবক্ষয়কে লুকিয়ে রাখছি।
নারীর প্রতি সহিংসতা আজ কোনো নির্দিষ্ট বয়স, শ্রেণি বা অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জন্মের পর থেকেই একটি মেয়ে শিশুর জীবনে অনিরাপত্তার ছায়া নেমে আসে। অনেক ক্ষেত্রে জন্মের আগেই কন্যাশিশু অবহেলার শিকার হয়। শৈশবে সে নিরাপদ নয়—পরিচিত মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিকৃত মানসিকতার মানুষদের কাছেও সে ঝুঁকির মধ্যে থাকে। কৈশোরে পৌঁছালে তাকে মোকাবিলা করতে হয় কটূক্তি, পথেঘাটে হয়রানি, সাইবার নির্যাতন কিংবা অল্প বয়সে বিয়ের চাপ। যৌতুকের দাবি, সংসারের ভেতর নিপীড়ন, অকারণ সন্দেহ, কিংবা প্রতিদিনের মানসিক চাপ। বার্ধক্যেও তিনি হন নানা ধরণের নিপীড়নের শিকার। নারীর জীবনের প্রতিটি ধাপেই সহিংসতার ঝুঁকি, যেন একটি অদৃশ্য ছায়া তাকে সারাজীবন তাড়া করে।
এই সহিংসতার রূপ বহুস্তরীয়। শারীরিক নির্যাতন সবচেয়ে দৃশ্যমান, এর বাইরেও রয়েছে মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন, যা আরও গভীর ক্ষত তৈরি করে। প্রতিনিয়ত অপমান করা, ভয় দেখানো, স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, বা একজন মানুষকে নিজের ইচ্ছামতো বাঁচতে না দেওয়া—এসবও সমানভাবে সহিংসতা। একজন নারীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা তার ঘর, সেই ঘরও অনেক সময় তার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
যৌতুকের জন্য নির্যাতন আমাদের সমাজে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা, যা এখনও বিদ্যমান। একটি মেয়ের বিয়ে যেন অনেক সময় একটি আর্থিক লেনদেনের রূপ নেয়। বিয়ের পর যদি সেই দাবিগুলো পূরণ না হয়, তাহলে শুরু হয় নির্যাতন—প্রথমে মানসিক চাপ, পরে শারীরিক আঘাত, কখনো কখনো প্রাণঘাতী পরিণতি। এই নির্মম বাস্তবতা আমাদের সমাজের একটি গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত দেয়।
ধর্ষণ এমন এক ভয়াবহ সহিংসতা, যার কোনো বয়সসীমা নেই—শিশু থেকে বৃদ্ধা, কেউই এর বাইরে নয়। এটা কেবল একটি শারীরিক আক্রমণ নয় বরং একজন নারীর অস্তিত্ব, সম্মান এবং নিরাপত্তাবোধকে গভীরভাবে ভেঙে দেয়। একটি মুহূর্তের এই নৃশংসতা একজন মানুষের পুরো জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে—মানসিক আঘাত, সামাজিক লাঞ্ছনা, আর অজানা আতঙ্ক তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে এই সহিংসতার পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, যখন প্রমাণ গোপন করতে বা প্রতিরোধ ভাঙতে ভুক্তভোগীকেই হত্যা করা হয়। এই বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু বাড়ছেই না, বরং তার রূপও দিন দিন আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। একটি সমাজের মানবিকতার পরিমাপ হয় সেখানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কতটা নিরাপদ—আর সেই জায়গায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে।
এই ভয়াবহতার পেছনে কাজ করছে কিছু গভীর ও জটিল কারণ। প্রথমত, আমাদের সমাজে এখনো একটি দৃঢ় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বিদ্যমান, নারীকে সমান মানুষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাকে দুর্বল, নির্ভরশীল বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য হিসেবে ভাবা হয়। এই ধারণা পরিবার, সামাজিক আচরণ, এমনকি ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়েও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে। ছোটবেলা থেকেই অনেক ছেলেকে শেখানো হয় তার প্রাধান্যের কথা, আর মেয়েদের শেখানো হয় সহ্য করা ও মানিয়ে নেওয়া—ফলে এক ধরনের অসম ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে সহিংসতার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তোলে। যখন একটি অপরাধের দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার হয় না এবং ভুক্তভোগীকেই প্রমাণ দিতে হয় বারবার, আর অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারে, তখন সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে মামলা দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়, সাক্ষী নিরাপত্তা পায় না, কিংবা সামাজিক চাপের মুখে ভুক্তভোগীই ন্যায়বিচার থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। এই পরিস্থিতি অপরাধীদের নিরুৎসাহিত না করে বরং আরও সাহসী করে তোলে। তৃতীয়ত, মূল্যবোধের অবক্ষয় একটি নীরব কিন্তু গভীর সংকট। আমরা সন্তানদের শিক্ষিত করতে আগ্রহী, কিন্তু মানবিকতা, সহমর্মিতা, সম্মানবোধ—এই মৌলিক গুণগুলো গড়ে তোলার দিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিই না। ফলে অনেক সময় একজন ব্যক্তি শিক্ষিত হলেও মানবিক হয়ে উঠতে পারে না। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং বিনোদন মাধ্যমেও যখন নারীর অবমাননাকর বা বস্তুগত উপস্থাপন দেখা যায়, তখন তা তরুণ প্রজন্মের চিন্তাধারায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সবকিছু মিলিয়ে একটি এমন পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে সহিংসতা শুধু সম্ভবই নয়, বরং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে।
প্রযুক্তির অপব্যবহারও এই পরিস্থিতিকে জটিল করছে। ইন্টারনেটে সহজলভ্য অনেক বিকৃত কনটেন্ট মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করছে, বিশেষ করে যখন তা নিয়ন্ত্রণ বা সচেতনতার অভাবে সীমাহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মাদকাসক্তিও একটি বড় কারণ, যা মানুষকে নিজের নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তখন সে ভালো-মন্দের পার্থক্য ভুলে গিয়ে এমন কাজ করতে পারে, যা সাধারণ অবস্থায় কল্পনাও করা কঠিন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে এসব ঘটনার সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। কোনো একটি ঘটনা আমাদের নাড়িয়ে দেয়, আমরা কিছুক্ষণ আলোচনা করি, তারপর আবার দৈনন্দিন জীবনে ফিরে যাই। এই অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াটাই সহিংসতার জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে। কারণ যখন প্রতিবাদ কমে যায়, তখন অপরাধের পথ আরও সহজ হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই প্রেক্ষাপটে একদিকে সচেতনতা তৈরি করছে, অন্যদিকে কখনো কখনো বিভ্রান্তিও ছড়াচ্ছে। যাচাইবিহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। তাই দায়িত্বশীলভাবে তথ্য গ্রহণ এবং প্রচার করা এখন অত্যন্ত জরুরি। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। রাষ্ট্রকে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে। বিশেষ করে নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরাধীদের জন্য একটি শক্ত বার্তা হতে পারে।
তবে শুধু আইন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পরিবর্তনের শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। একটি শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—সম্মান, সহমর্মিতা এবং সমতার মূল্য। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। একইসাথে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা প্রয়োজন, যাতে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরে সেখানে আমরা শুধু অপরাধীদের দেখি না; দেখি আমাদের নিজেদেরও—আমাদের নীরবতা, আমাদের উদাসীনতা, আমাদের অক্ষমতা। এই উপলব্ধিই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
সীতাকুণ্ডের সেই রক্তাক্ত গলাকাটা ধর্ষিত শিশুটি কিংবা একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে ধর্ষণ করে তার গর্ভস্থ সন্তানকে ছিন্নভিন্ন করার মতো পৈশাচিকতা—এসবই একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং এটি আমাদের সামষ্টিক বিবেক ও মানবতার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ আঘাত। এই ধরনের পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে এখনই কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কেবল আইন করলেই হবে না, বরং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করতে হবে, আমাদের সমাজকে এমন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো দানব আর এমন জঘন্য সাহস না পায়। পরিশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার সুউচ্চ দালানে কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়, বরং তার মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষায়—সেখানে নারী ও শিশু কতটা নিরাপদ।
প্রতিবাদ হোক এখনই, নিরাপদ হোক আগামীর প্রতিটি প্রাণ।
২৬ এপ্রিল, ২০২৬

লীনা ফেরদৌস | ঢাকা, বাংলাদেশ
একাধারে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ, কিডজ লিডজ চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। কবি, ফিচার লেখক ও শিশুসাহিত্যিক। প্রকাশিত বই সাতটি; ৪টি শিশুতোষ ও ৩টি কাব্যগ্রন্থ।
