রম্যগদ্য: পাখি সব করে রব

তাপস রায়
May 15, 2026
7 views
26 mins read

ভিক্টর হুগো একটা কথা বলেছিলেন। উনিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ফরাসি সাহিত্যিক; রাজনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী হিসেবেও তাঁর সমান খ্যাতি। তো এমন মনীষীর কথা তো আর ‘কথার কথা’ হতে পারে না! হুগো বলেছিলেন, ‘একটা স্কুল খোলা মানে হলো একটা জেলখানা বন্ধ করে দেওয়া।’

কথাটার অর্থ সুদূর প্রসারী। লেখাপড়া শিখলে মানুষ দুষ্কর্ম করবে না, অপরাধ করবে না, ফলে তাকে জেলেও যেতে হবে না। এ কারণে এ কালের মায়েদের বড়ো দুশ্চিন্তা অবাধ্য ছেলেটিকে নিয়ে। পইপই করে বলার পরও তার হইচই থামে না। চেঁচিয়ে, লাফিয়ে-দাপিয়ে বাড়ি মাথায় না তুললে তার মন ভরে না। দাদা-দাদির চোখে এসব চঞ্চলতা। তারা হাসেন আর বলেন, ‘এ বয়সে ওরা অমন একটু-আধটু করবেই!’

মায়ের মন মানে না। তিনি ভাবেন অবাধ্যতা। এটা কোরো না, ওটা কোরো না, এভাবে নয়, ওভাবে- সারাদিন ছেলের পেছনে লেগেই আছেন। কিন্তু কে শুনছে সে কথা! স্কুলেও যে তারা ‘গুডবয়’ হয়ে থাকে তা তো নয়। এক্ষেত্রে অধিকাংশ মায়ের দল ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হন। দুরুদুরু বুকে ভাবেন- বড়ো হয়ে কী হবে কে জানে!

অথচ মায়েদের দল বিলক্ষণ জানেন, আজকাল লেখাপড়া জানা বিদ্বান, শিক্ষিত কত ভদ্দরলোক অবলীলায় অবর্ণনীয় বেশুমার অপরাধ করে চলেছেন। ফলে খট্্কা লাগে। মন খুতখুত করে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত’র মধ্যে পার্থক্য ঠিক ঠাওর হয় না।

লেখাপড়া না-জেনেও কত লোক দিব্যি ‘গাড়ি-ঘোড়া’ হাঁকাচ্ছেনÑ এও তো মিথ্যা নয়। তখন মদনমোহন তর্কালঙ্কারের বিখ্যাত শিশুতোষ ছড়াটিকেও শুধু ছড়া বলেই মনে হয়। এই ছড়ার দ্বিতীয় প্যারায় আছে ‘লেখাপড়া যেই জানে, সব লোক তারে মানে।’ অতএব পড়ো পড়ো এবং পড়ো। কেউ বলে নাÑ শেখো শেখো এবং শেখো।

মা-বাবা অবশ্য সন্তানের কান মলে মাঝেমধ্যেই তুলনা টানতে ভালোবাসেন। হা রে রে রে করে তেড়ে উঠে বলেন, অমুককে দেখে শিখতে পারিস না? ও একশতে একশ পেল! আর তুই?

সন্তান মনে মনে ভাবে, আমি তো মাত্র একটা শূন্য কম পেয়েছি। শূন্য পাওয়া খারাপ তোমরাই তো বলো!

শিক্ষার সময় বাল্যকাল। অর্থাৎ ওই যে কথায় বলে নাÑ যার হয় না পাঁচে তার হবে না পঞ্চাশে। ব্যাপার অনেকটা এ রকমই। অন্তত এই দিক থেকে আধুনিক বাবা-মায়েরা অনেক বেশি সচেতন। আর এ কারণেই শিশুর মুখে কথা ফুকুট বা না ফুকুট এ-তে যে অ্যাপল হয় সেটা আপেলের জুস খাওয়াতে খাওয়াতে এ যুগের বাবা-মায়েরা সন্তানকে পরম দক্ষতায় শিখিয়ে ফেলেন। আপেলের প্রসঙ্গ যখন এলোই তখন এ বিষয়ে একটা গল্প বলি। গল্পটা এ রকম−

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা চলছে। প্রধান শিক্ষক ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে ভাইবা বোর্ড গঠন করেছেন। ছাকনি দিয়ে ছেকে তারা মেধা যাচাই করবেন। কম মেধাবীরা কোথায় ভর্তি হবেন সে তাদের ব্যাপার। এ ব্যাপারে ভালো স্কুলগুলোর দায় নেই। কথা পরিষ্কারÑ পরীক্ষা দাও, পাস করো, ভর্তি হও।

একে একে বাচ্চাদের নাম ধরে ডাকা হচ্ছে। এর মধ্যে একজনকে দেখে প্রধান শিক্ষকের কৌতূহল হলো। তিনি আলতো করে জিজ্ঞেস করলেনÑ আচ্ছা বলো তো আপেল বানান কী?

এ-ডবলপি-এল-ই ছেলেটি উত্তর দিল। তাৎক্ষণিক জবাবে বোর্ডের কর্তারা খুশি। যাক্ একটা মেধাবী মিলেছে। সন্তানের পার্ফমেন্সে অভিভাবকের মুখেও গর্বের হাসি ফুটে উঠলো। উৎফুল্ল হয়ে প্রধান শিক্ষক বলেই ফেললেন, এই টুকুন ছেলে যখন ‘ডবলপি’ বলতে শিখেছে তখন একে ভর্তি করা যেতে পারে।

এই ‘যেতে পারে’ শব্দটি বোধ হয় ছেলেটির ঠিক পছন্দ হলো না। এই কদিনের কোচিং-এ সে যে আরো অনেক কিছুই শিখেছে এ কথা প্রমাণের জন্যই হোক, আর অতি উৎসাহেই হোক, ছেলেটি বলল, স্যার আমি শুধু আপেলই না, বুক বানানও করতে পারি।

ভেরি গুড! বোর্ডের মিসেস উৎসাহ দিয়ে বললেন, বলো দেখি।

বি-ডবলও-কে বুক। বুকের মাঝখানেও ডবল ‘ও’ থাকে। হাত দুটো গোল গোল করে ছেলেটি বলল।

আজকে সকালেও পত্রিকায় সংবাদ পড়ছিলাম- পাঁচ বছরের শিশুর সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার, কিশোরের বিরুদ্ধে মামলা।

কম বয়সে সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যাপারে তারাপদ রায় একটি চমৎকার কথা লিখেছেন- একটা সরু গলা শিশির মধ্যে তাড়াতাড়ি যদি জল ঢালার চেষ্টা করা হয় তাহলে দেখা যাবে জল ভেতরে প্রায় কিছুই ঢোকেনি। জলের প্রায় সবটুকুই বাইরে উপচিয়ে পড়ে গেছে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা। মা-বাবা জল ঢালছেন। শিক্ষক জল ঢালছেন। আত্মীয়-স্বজন তাল দিচ্ছেন। বন্ধুরা আর বাদ যাবে কেন? তারা জল ঘোলা করছে। তাদের মা-বাবারা সেই জলে কাদা ছুড়তে কসুর করছেন না- ও তো ফার্স্ট হবেই, ওর বাবার সঙ্গে প্রিন্সিপালের খাতির আছে। কয়টা প্রাইভেট পড়ে গিয়ে দেখে এসো। পরীক্ষার আগেই সব পেয়ে যায়।

বটে! মা-বাবারা শুনছেন আর গরম লুচির মতো ফুলছেন। তারা আরো বেশি বেশি প্রাইভেট টিউটরের দ্বারস্থ হচ্ছেন। সন্তানের জ্ঞানের জল যাতে ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে এ জন্য তাদের চেষ্টার কমতি নেই।

অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। একবার বেশ কিছু দিন থেমে থেমে জ্বর অর্থাৎ ম্যালেরিয়ার মত একটানা অর্থকষ্টে ভোগার পর একটা টিউশনি পেলাম, ছাত্র অ-আ পড়ে। সে তুলনায় আমি যোগ্য। আদাজল খেয়ে কাজে লেগে গেলাম। কিন্তু কিছুদিন যাবার পরই বুঝতে পারলাম- একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পক্ষে কাজটা খুব সহজ নয়। অগ্রজ তারাপদ রায়ের কথাই টিক। ছাত্রের জন্য প্রতিদিনই চকলেট, চুইংগাম নিয়ে যেতে হয়। না হলে তার আবার পড়তে বসার মুড আসে না। অথচ মাসের শেষ হতে তখনও অনেক দেরী। একদিন ছাত্রের বাবা আমার কাছে ছাত্রের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, আপনার ছেলের মেধা চমৎকার। সে বড়ো হয়ে নির্ঘাৎ ডাক্তার হবে।

সার্টিফিকেট পেয়ে ভদ্রলোক আনন্দ ও বিস্ময়ে জিলিক দিয়ে উঠলেন- তাই নাকি!

আমি তাকে দ্বিতীয়বারের মত আশ্বস্ত করার জন্য খাতা এগিয়ে দিয়ে বললাম, হাতের লেখা দেখুন। এ বয়সেই একদম ডাক্তারের মত। প্রায় কিছুই বোঝা যায় না!

বলাবাহুল্য এরপর আমাকে আর ওই বাসায় যেতে হয়নি। এখন কথা হলো সকালের সূর্য দেখে যদি দিন বলে দেওয়া যায়, তবে শিশুকাল দেখে কেন ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া যাবে না? হিসাবটা খুবই গোলমেলে। স্কুলের হোমওয়ার্ক শেষ করতে করতেই যদি মেরুদ- ধনুকের মত বাঁকা হয়ে যায়, তাহলে মেরুদ- আর সোজা হবে কীভাবে? সাদা পৃষ্ঠায় রঙিন বর্ণমালার ছাপ দেখতে দেখতেই যদি সময় কেটে যায়, তাহলে সে মাঠের সবুজ ঘাস দেখবে কীভাবে? তখন সে ধান গাছকে ধইঞ্চ্যা ভেবে ভুল করবেই। মোটা ফ্রেমের চশমা তার লাগবেই। মায়েরা হয়তো বলবেন, আরে সমসা কি, এ্যাঙ্কর মিল্ক আছে না? দুধের সেরা দুধ!

হায় যে সন্তান ‘গরু’ শব্দটিই স্পষ্ট গলায় উচ্চারণ করতে শিখলো না, তাকেই এখন শিখতে হচ্ছে ও-তে অক্স, অক্স মানে ষাড়। আজকাল শিক্ষারও হয়েছে ওই একদোষ। যে স্কুলের পাঠ্যে ইংরেজী বইয়ের সংখ্যা বেশি সেই স্কুলের বাজারদরও তত উপরে। আর সে অনুযায়ী চলে বাবা-মায়ের কোচিং। এই কোচিংটা কে দেবেন এ নিয়ে অবশ্য বাবা-মা’র মধ্যে বাকবিতন্ডা প্রায়ই যে হয় না তা নয়, তারপরও তারা মতৈক্যে পৌঁছেন যেভাবেই হোক সন্তানকে গাড়িঘোড়া চড়ানোর জন্য লেখাপড়া শেখাতেই হবে। প্রস্তুতি শেষে আসে জানুয়ারী মাস। শুরু হয় যুদ্ধ।

জীবনের প্রথম পরীক্ষা, জীবনের প্রথম ব্যবসায় ধরা খেলে নাকি পরে আর মূলধন ওঠানো যায় না। তাই প্রস্তুতি ব্যাপক। অভিভাবকদের এ নিয়ে টেনশনের শেষ নেই। শুনেছি শেষ পর্যন্ত এই টেনশনটাও নাকি মন্ত্রী-এমপিদের টেলিফোন পর্যন্ত যায়! অথচ যার ভবিষ্যৎ নিয়ে এই টেনশন সে নিজেও যে টেনশনমুক্ত নয়, তার প্রমাণ নিচের এই কৌতুক।

স্কুলের এক ছাত্র তার শিক্ষককে একদিন দুঃখ করে বলল, স্যার স্কুল আমার একদম ভালো লাগে না। অথচ ভেবে দেখুন অন্তত পনের বছর বয়স পর্যন্ত আমাকে এই স্কুলে থাকতে হবে।

উত্তরে স্যার সেই ছাত্রকে সান্ত¦না দিয়ে বললেন, একবার আমার কথা ভাবো। আমারও স্কুলটা একদম ভালো লাগে না। অথচ আমাকে এখানে আরো পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর বয়স পর্যন্ত থাকতে হবে!

লেখা শুরু করেছিলাম এক মনীষীর কথা দিয়ে। এমন অনেক মনীষী আছেন যারা ছেলেবেলায় দুষ্টু ছিলেন, অবাধ্য ছিলেন। বড়ো হয়ে তারাই কিনা এত ভালো কাজ করেছেন যে, চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেছে। তাঁরা ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথাই বলি। তাঁর নাম আজ কে না জানে! অথচ ছেলেবেলায় তিনি ভীষণ একগুঁয়ে ছিলেন। ‘বিদ্যাসাগর চরিত’-এ তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি বাল্যকালে মধ্যে মধ্যে অতিশয় অবাধ্য হইতাম। প্রহার ও তিরস্কার দ্বারা পিতৃদেব আমার অবাধ্যতা দূর করিতে পারিতেন না।’

দুখু মিয়ার দুষ্টুমিও কম ছিল না! পাড়া প্রতিবেশীরা ধরেই নিয়েছিলেন, এ ছেলের জীবনে বুঝি আর উন্নতি নেই। অথচ সেদিনের দুখু মিয়া আজকের কাজী নজরুল ইসলাম। আমাদের জাতীয় কবি। তাঁকে নিয়ে আমাদের কত গর্ব! কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ছড়া; গানও লিখেছেন অনেক। সেগুলো বিখ্যাত হয়েছে। এ তো চাট্টিখানি কথা নয়!

শেরেবাংলা ফজলুল হককে আমরা সবাই চিনি। জন্ম বরিশাল জেলায়। রাজনীতি এবং জনসেবা ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। কৃষক প্রজা সমিতি গঠন করে গ্রামের মানুষের দুঃখ দূর করতে চেয়েছেন। ১৯৩৭ সালে অখন্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সেসব কথা ইতিহাসের বইয়ে লেখা আছে। কত বড় মানুষ! কী তার তেজ! তাঁর কথার যুক্তির প্যাঁচে যে একবার পড়েছে তাঁর সহজে মুক্তি মিলত না। এ জন্যই তো তিনি ‘শের-এ-বাংলা’ উপাধি পেয়েছিলেন। অর্থাৎ বাংলার বাঘ। অথচ ছেলেবেলায় কী দুষ্টুমিই না করতেন!

কাজ দিয়ে মানুষের মন জয় করে নিতে পারাটাই হলো আসল কথা। বাকি জীবন কে মনে রাখে! তাই বলছি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মাতৃভক্ত ছিলেন। একবার তিনি মায়ের চিঠি পেয়ে ঝড়ের রাতে দামোদর নদ সাঁতার কেটে পাড়ি দিয়ে বাড়ি পৌঁছেছিলেন।

এখন যদি জিজ্ঞেস করি, মাতৃভক্ত হতে সবার আগে কী প্রয়োজন?

তখন কোনো দুষ্টু ছেলে যদি বলে, সবার আগে প্রয়োজন সাঁতার শেখা। তাহলে খুব বেশি চিন্তিত হবার প্রয়োজন নেই।


তাপস রায় | ঢাকা, বাংলাদেশ

সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক। প্রকাশিত হয়েছে রম্যগদ্য, কিশোর উপন্যাস, গল্প ও সংকলিত গ্রন্থ। তিনি ‘এই বেশ আতঙ্কে আছি’ বইটির জন্য ২০১৭ সালে কথাসাহিত্যে ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’ পেয়েছেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

প্রচ্ছদ : জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ / মে ২০২৬

Next Story

দু’টি কবিতা

Latest from হাসতে নেই মানা

আসুন, একটু হাসি!

মানুষের বিনোদনের নানা মাধ্যম রয়েছে। গল্প, গান, নাটক, কবিতা, যাত্রাপালা, পুঁথিপাঠ, বায়োস্কোপ, সিনেমা ইত্যাদি। ... লিখেছেন শিহাব শাহরিয়ার ও আহসান হাবীব।

ভেড়া

মূল রচনা: গ্যারি ভিক্টর (১৯৫৮) - হাইতির জনপ্রিয় ও বহু পুরষ্কারপ্রাপ্ত গল্পকার; অনুবাদ: শিশির ভট্টাচার্য্য।