বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের লিখা “সুলতানার স্বপ্ন” পুস্তিকায় যে নারী স্থানের বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে ধর্ম হচ্ছে ‘প্রেম ও সত্য। আমরা পরস্পরকে ভালোবাসিতে ধর্মত বাধ্য এবং প্রাণান্তেও সত্য ত্যাগ করিতে পারি না’।
ক’দিন আগে ঘটনা চক্রে ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ পরিদর্শণে গিয়ে অভূতপুর্ব এক জগতের সন্ধান পাই, জগৎটি অন্য কিছু নয়, সুলতানার স্বপ্নের জগতের উপর চিত্রিত বেশ কিছু বিমূর্ত ও মূর্ত চিত্র ও চারুকলার প্রকাশ। বিস্তৃত কক্ষ জুড়ে ছিল স্বপ্নের বাস। বেগম রোকেয়ার মনোজগতে প্রবেশে এই সৃষ্টিময় সৃজনশীল কক্ষের আবহ অনেক খানি সহয়তা করেছে আমাকে। “Sultana’s Dream” মূলত ইংরেজী ভাষাতেই লিখা, প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯০৫ সালে চেন্নাই, ভারতের ‘ইন্ডিয়ান লেডিজ’ ম্যাগাজিনে। ১৯২২ সালে ‘মতিচুর’- ২য় খন্ডে রোকেয়া এটির বাংলা ভাষ্য যুক্ত করেন। সুলতানার স্বপ্ন প্রায় ৪০ বছর আগে পড়েছিলাম রোকেয়ার অন্য সব রচনার সাথে, অনেকটা একাডেমিক পাঠের মত করে, বিশেষ ভাবে আম্মার উৎসাহে।
২০২৪ সালে ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড এশিয়া-প্যাসিফিক কমিটি “Sultana’s Dream”–কে বিশ্বস্মৃতির আঞ্চলিক রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর রোকেয়ার প্রামাণ্য রচনা ও দলিলাদির সংরক্ষক হিসেবে বিধিবদ্ধ ভাবে এই প্রস্তাবনা পেশ করেছিল এবং এর স্বীকৃতি আমাদের জন্য এক আনন্দসংযোগ। আরও আনন্দের বিষয় ২০২৫ সালের শিক্ষাবর্ষে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ENGLISH FOR TODAY-এর ’Reading for Pleasure’ অংশে এটি সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ এক পথিকৃত নারীবাদী কল্প-বিজ্ঞান কাহিনি যার রচয়িতা ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত এই নারী। লেখণী-চিন্তা-ভাষায়-কর্মে তিনি ছিলেন হাজার বছর এগিয়ে থাকা এক মানবীর প্রতিনিধি স্বরূপ। তাঁর পুরো জীবনকাল অতিবাহিত হয়েছে নারী-মুক্তি চিন্তায় ও কর্মকান্ডে। পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত এই বিজ্ঞান কল্পকাহিনীটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য শিক্ষককে পেডাগোজি, শিখণ-শিক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এবং এর সফল বাস্তবায়নে শুধু ইংরেজী পড়ানোর দক্ষতা থাকলেই হবে না, নিজে এর অন্তর্গত দর্শন অনুধাবন করে শিক্ষার্ধীদের মাঝেও নারীস্থানের দর্শন সমূহের অন্তর্নিহিত দর্শন ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিচালকের ভূমিকা গ্রহনে নিজেকে তৈরী করার মানসিকতা তৈরী করে তুলতে সহায়তা করতে হবে। সারাদিন ব্যাপী বেশ কিছু সংখ্যক শ্রেণি শিক্ষক, শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, বিশেষভাবে উল্লেখ্য এক ও অনণ্য ব্যক্তিত্ব -মফিদুল হক, ট্রাষ্টি, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর ( ইউনেস্কোর স্বিকৃতির জন্য বেগম রোকেয়াকে তিনি হন্যে হয়ে আবিষ্কার করেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে একের পর এক বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে)। শুধু ‘সুলতানার স্বপ্ন’-ই নয়, রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন সম্পূর্ণা হয়ে মূর্ত ও বিমূর্ত দুই ভাবেই উদ্ভাষিত ওনার কাছে। একদিনের অভিজ্ঞতায় আমি বুঝতে পেরেছি “নারীস্থানের” দর্শন, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ‘ধর্ম’ অনুধাবণ ও বিশ্বাসযোগ্য ভাবে শিক্ষার্থীদের মনোজগতের উন্নয়নের জন্য বিদ্যালয় জীবন থেকেই ‘রোকেয়া’ চর্চা শুরু করতে হবে, মাত্র তিনটি পিরিয়ডে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার বাধাতো রয়েছেই। সে সকল বাঁধা পেরুনোর বেশ কিছু সুপারিশ এসেছে- যেমন , নারী দিবস পালন কালে এই গ্রন্থটি থেকে নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন, ভূমিকাভিনয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠচক্র আয়োজন, বিতর্ক ক্লাবে বিতর্কের আয়োজন,সেমিনার, লাইব্রেরি ক্লাসে গ্রন্থ পাঠ শেষে কুইজের আয়োজন, বিজ্ঞান মেলা, বাৎসরিক নাটকের আয়োজন ইত্যাদি।
’এই আখ্যানে বর্ণিত হয়েছে ভবিষ্যতের কল্পিত এক নারীস্থান যেখানে সবুজ নিসর্গশোভিত নগরে মানুষ হেলিকপ্টারে যাতায়াত করে, ব্যবহার করে সৌরশক্তি এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালিত হয় নারীদের দ্বারা। এই স্বপ্নপুরী নারীদের নিজেদের এবং বিশ্বকে অবলোকনের সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ জোগায় এবং তাদের দিগন্ত প্রসারিত করে।’সুলতানার স্বপ্ন’ ও রোকেয়া উপমহাদেশে ও বাইরের দুনিয়ায় নারীমুক্তির সমার্থক হয়ে উঠেছে’ (ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড এশিয়া -প্রশান্ত আঞ্চলিক কমিটির অভিমত)।
এই নারীস্থানের মৌলিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রেক্ষিত বিবেচনায় সংগত কারণেই বিভিন্ন দার্শনিকের দর্শন আলোচনায় চলে আসতে পারে। প্রসংগত নারীস্থানের সামগ্রিক পর্যালোচনায় চলে আসে নিন্মোক্ত বিষয় সমূহ: জেন্ডার নিপীড়ন, মুক্তির অবলম্বন হিসেবে শিক্ষা, টেকসইবাদ ও ইকো-নারীবাদ, সংবেদনশীল নেতৃত্ব, ধর্মীয় সহনশীলতা, কল্পবাদ, ইউটোপিয়া ও স্বপ্ন। নারীস্থানের ধর্ম ‘প্রেম ও সত্য’-কে ঘিরেই পরিচালিত হয়েছে সকল কর্মকান্ড। নারীস্থানে শিক্ষা-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় সামরিক বাহিনী-সমরাস্ত্র ব্যবহারের কোন সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি সৌরশক্তি ব্যবহার করে আবহাওয়া ও জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগের ক্ষেত্রে হর্নার, এল, কে, লিখিত ‘Peace as an Event, Peace as Utopia’ গ্রন্থে এর সুন্দর কিছু ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ‘কর্মযজ্ঞ হিসেবে শান্তি, ইউটোপিয়া হিসেবে শান্তি’ ধারণাটি শান্তির অর্থ নিয়ে নতুন করে ভাবতে আহ্বান জানায়।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে শান্তি একটি মৌলিক ও বহুমাত্রিক ধারণা। ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই শান্তি মানবকল্যাণের জন্য অপরিহার্য। তবে শান্তির ধারণা কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি সামাজিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। তাত্ত্বিকভাবে শান্তিকে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যায়: ঘটনা হিসেবে শান্তি (Peace as an Event) এবং ইউটোপিয়া হিসেবে শান্তি (Peace as Utopia)। এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গি শান্তির বাস্তবতা ও আদর্শ—উভয় দিককে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঘটনা হিসেবে শান্তি বলতে সাধারণত কোনো সংঘাত বা যুদ্ধের সমাপ্তিকে বোঝায়। যুদ্ধবিরতি, শান্তি চুক্তি কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে যখন সহিংসতা বন্ধ হয়, তখন সেটিকে একটি নির্দিষ্ট শান্তির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে শান্তি মূলত একটি পরিস্থিতিগত অবস্থা, যা সংঘাতের একটি পর্যায়ে এসে সৃষ্টি হয়। তবে এই ধরনের শান্তি অনেক সময় স্থায়ী হয় না, কারণ সংঘাতের গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অমীমাংসিত থেকে যায়। যেমনটি ২০২৪-এর জুলাইয়ে আমাদের বাংলাদেশে ঘটেছে। যাকে আমরা আপাত একটি বিজয় হিসেবে ধরে নিতে পারলেও তাতে জনগণের আকাঙ্খা পূরণের পথ রচিত হয়নি।
শান্তি গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী Johan Galtung। তিনি শান্তিকে বোঝাতে “Negative Peace” এবং “Positive Peace” ধারণা প্রবর্তন করেন। তাঁর মতে, কেবল সহিংসতার অনুপস্থিতি হলো “Negative Peace”, যা মূলত ঘটনা হিসেবে শান্তির ধারণার সাথে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, যখন সমাজে ন্যায়বিচার, সমতা এবং সামাজিক কাঠামোর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেটিকে “Positive Peace” বলা যায়। গালটাং বলেন, “Peace is not merely the absence of violence but the presence of justice.”
অন্যদিকে, ইউটোপিয়া হিসেবে শান্তি একটি আদর্শিক ও নৈতিক লক্ষ্যকে নির্দেশ করে। এখানে শান্তি কেবল সংঘাতের অনুপস্থিতি নয়; বরং এমন একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে ন্যায়বিচার, সমতা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত থাকে। এই ধারণাটি রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। “ইউটোপিয়া” ধারণাটি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইংরেজ চিন্তাবিদ Thomas More-এর বিখ্যাত গ্রন্থ Utopia-এর মাধ্যমে, যেখানে একটি আদর্শ সমাজের কল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ইউটোপীয় শান্তি বাস্তব সমাজে সম্পূর্ণভাবে অর্জন করা কঠিন। মানব সমাজে ক্ষমতার রাজনীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণে সংঘাত সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। তবুও ইউটোপিয়ার ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একটি নৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে এবং সমাজকে একটি উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
বাস্তব জীবনে ঘটনা হিসেবে শান্তি এবং ইউটোপিয়া হিসেবে শান্তি পরস্পর বিরোধী নয়; বরং তারা একে অপরের পরিপূরক। বাস্তব শান্তি প্রক্রিয়া—যেমন কূটনীতি, সংলাপ ও সমঝোতা—সংঘাত নিরসনের মাধ্যমে একটি সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। এই ঘটনাগুলো দীর্ঘমেয়াদে ন্যায়ভিত্তিক ও স্থায়ী শান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
সর্বোপরি বলা যায়, শান্তিকে বোঝার জন্য এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় অপরিহার্য। ঘটনা হিসেবে শান্তি আমাদেরকে বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে, আর ইউটোপিয়া হিসেবে শান্তি আমাদেরকে একটি আদর্শ সমাজের লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করে। তাই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল সংঘাতের অবসানই যথেষ্ট নয়; বরং ন্যায়বিচার, সমতা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
শান্তি ও ইউটোপিয়ার সম্পর্ককে বোঝার ক্ষেত্রে জার্মান দার্শনিক Ernst Bloch-এর চিন্তাধারা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর প্রধান রচনা The Principle of Hope-এ Bloch ইউটোপিয়াকে কেবল কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি এটিকে “concrete utopia” হিসেবে উপস্থাপন করেন—একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ, যা মানুষের আশা, নৈতিকতা ও সামাজিক সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য। peace studies-এর আলোকে, এই দৃষ্টিভঙ্গি শান্তিকে কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয় বরং সামাজিক ন্যায় ও মানবমুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া হিসেবে বোঝায়।
Bloch-এর মতে শান্তি অব্যবহৃত বা অসম্পূর্ণ বর্তমানের বিপরীতে একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। বর্তমান সমাজে যুদ্ধ, বৈষম্য, শোষণ এবং দমন বিদ্যমান। Bloch মনে করতেন যে এই বাস্তবতার অসম্পূর্ণতা মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎমুখী আশা ও কল্পনাশক্তি সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, “Hope is the anticipation of something better, something not yet realized but achievable” (Bloch, 1986)। এই আশা মানুষকে শান্তিপূর্ণ সামাজিক কাঠামো গঠনের দিকে প্রণোদিত করে। peace studies-এর আলোকে এটি বোঝায় যে, শান্তি কেবল রাষ্ট্রীয় সমঝোতা নয়, বরং একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যা মানুষের অভ্যন্তরীণ প্রত্যাশা ও উদ্যোগ দ্বারা অর্জিত হয়।
নারীস্থানে দেশ পরিচালনা,পরিকল্পনার দায়িত্ব নারীরাই নিয়ে থাকেন। বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত এক যুদ্ধে ওই দেশের পুরুষেরা যখন পরাস্ত হয়,তখন নারীরা বুদ্ধিবলে পুরুষদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়ে সে যুদ্ধে জয়লাভ করে।তখন থেকেই পুরুষরা অন্তঃপুরবাসী হয়ে পড়েন। এটিকে ‘মর্দানা’ প্রথা হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। পুরুষরা পেশিশক্তি সম্পর্কিত কর্মসমূহ সম্পাদন করে থাকেন সেই স্থানে। শিক্ষিত-বিজ্ঞানমনষ্ক-সৃজনশীল-মেধাবী ও সৌন্দর্য্যপ্রিয় নারীদের দ্বারা পরিচালিত হয় এই স্থানটি।
Bloch-এর ধারণায় শান্তি কেবল যুদ্ধবিরতি নয়। এটি এমন একটি সমাজ যেখানে সকলের জন্য সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠিত, বৈষম্য দূরীকৃত এবং মানুষ স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পারে। তিনি বলেন, “True peace is not merely the absence of conflict, but the presence of justice and human flourishing” (Bloch, 1986)। peace studies-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আধুনিক শান্তি গবেষণায় ‘positive peace’ ধারণাটি ঠিক এই অর্থে ব্যবহৃত হয়। Johan Galtung-এর মতে, positive peace মানে শুধু সংঘাতের অনুপস্থিতি নয়, বরং সামাজিক কাঠামো ও নীতি যা সহিংসতা ও বৈষম্য হ্রাস করে।
Bloch-এর ইউটোপিয়ান চিন্তা শান্তির রাজনৈতিক ও সামাজিক দিককে শক্তিশালী করে। তিনি বলেন, মানুষ যে কল্পনা করে যে শান্তি অর্জনযোগ্য, তা সমাজ পরিবর্তনের জন্য একটি দিশা ও নীতি হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, Bloch-এর concrete utopia ধারণা সমবায়, সামাজিক কল্যাণ, শিক্ষা ও পরিবেশ-সুরক্ষা উদ্যোগকে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখায়। peace studies-এর মধ্যে এটি প্রয়োগ করা যায় conflict transformation এবং community-building কার্যক্রমে, যেখানে শান্তি কেবল রাষ্ট্রীয় নীতি নয়, সামাজিক কার্যক্রম ও নৈতিক প্রতিশ্রুতির ফলাফল।
তদুপরি, Bloch-এর ধারণা শান্তি ও hope-এর মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্থাপন করে। তিনি যুক্তি দেন যে, “Where hope exists, the seeds of peace can be cultivated”. peace studies-এর আলোকে, এটি মানে হচ্ছে যে মানবিক আশা ও প্রত্যাশা হলো শান্তি অর্জনের মূল চাবিকাঠি, যা শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায়। এটি আধুনিক conflict resolution এবং peace education-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করে।
শেষে, Bloch-এর “peace as utopia” ধারণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শান্তি অর্জনযোগ্য, তবে তা একটি নিরবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। এটি বর্তমান বাস্তবতার চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়াই এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্যতা সংক্রান্ত। peace studies-এর প্রেক্ষাপটে, Bloch-এর তত্ত্ব শান্তিকে একটি সক্রিয় ও স্বপ্নমুখী সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখায়, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির আশা, নৈতিকতা এবং সংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সারসংক্ষেপে, Bloch-এর “Peace as Utopia” ধারণা শুধুমাত্র দার্শনিক নয়, বরং peace studies-এর কার্যকর তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করে। এটি মনে করায় যে শান্তি কেবল রাষ্ট্রীয় সমঝোতা নয়, বরং মানুষের আশা, ন্যায় এবং সামাজিক বিকাশের সঙ্গে জড়িত একটি সম্ভাব্য, অর্জনযোগ্য ভবিষ্যৎ। Bloch-এর তত্ত্ব আজকের শান্তি গবেষণা ও নীতি নির্ধারণের জন্য একটি দার্শনিক ও নৈতিক ভিত্তি হিসেবে প্রাসঙ্গিক।
অপর দিকে আরেক শান্তিবাদি তত্ত্ববিদ Jacques Derrida শান্তিকে কেবল সংঘাতের অনুপস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করেন না; বরং তিনি এটিকে একটি গতিশীল ও আকাঙ্ক্ষিত অবস্থা হিসেবে দেখেন, যার দিকে সমাজ ক্রমাগত অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে শান্তি ইউটোপীয় এই অর্থে যে এটি একটি আদর্শ-একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য, যা কখনো সম্পূর্ণভাবে অর্জিত হয় না, কিন্তু মানবিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সংগঠনকে পরিচালিত করার জন্য একটি দিগন্ত হিসেবে কাজ করে। সংঘাত নিরসন বা সহিংসতার অবসানকে কেন্দ্র করে গঠিত বাস্তববাদী বা সীমিত সংজ্ঞার বিপরীতে দেরিদা শান্তির নৈতিক ও রূপান্তরমূলক সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেন এবং দেখান যে এটি কীভাবে নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেরিদার চিন্তায় শান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক মাত্রার পারস্পরিক সম্পর্ক। তাঁর মতে, শান্তি কেবল কোনো কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল নয়; বরং এটি মানুষের চেতনা, নৈতিকতা এবং আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের গভীরে প্রোথিত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শান্তিকে ইউটোপিয়া হিসেবে বিবেচনা করা মানে হলো সহমর্মিতা, সংলাপ এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের ধারাবাহিক চর্চা, যার মাধ্যমে এমন একটি সমাজ গড়ে ওঠে যেখানে মানুষ সক্রিয়ভাবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নির্মাণে অংশগ্রহণ করে। এই ধারণা শান্তি অধ্যয়নের “পজিটিভ পিস” তত্ত্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যা প্রবর্তন করেছিলেন Johan Galtung। তাঁর মতে, শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; বরং এতে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার উপস্থিতিও অন্তর্ভুক্ত।
মোদ্দা কথা ‘সুলতানার স্বপ্ন’- আপাত দৃষ্টিতে একটি কল্পকাহিনী মনে হলেও এটি ন্যায় বিচার ভিত্তিক একটি রাষ্ট্রকাঠামো তৈরিতে একটি দিক নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সুপরিকল্পিত উপায়ে ‘শান্তি ও সত্য’ ধর্ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে কোন স্থানেই এমন একটি দেশ গঠিত হতে পারে।
এপ্রিল ২, ২০২৬

নাফিসা খানম | ঢাকা, বাংলাদেশ
রসায়ন শিক্ষক, পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রনেতা (এন সি টি বি)।
