ম্যাডোনা, শাকিরা বা কে-পপ বিটিএসের শো হবে ফাইনালের হাফটাইমে – এর জন্য নয়। বত্রিশটি টিমের বদলে আটচল্লিশটি টিম খেলবে, তাই এ আসর হবে অনেক বড় পরিসরে -এজন্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোতে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল – এ জন্যও নয়। কোন কারণ ছাড়াই প্রতিটি বিশ্বকাপ ফুটবল একটি মহাআসর। কোন অর্থ ছাড়াই কোটি কোটি মানুষের ঘুম হারাম হয় এ সময়টাতে। কোন ভাষা ছাড়াই একটি ভাষাতেই আবদ্ধ হয় তাবৎ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী ফুটবলমোদিরা।
জুনের এগার তারিখে শুরু হলেও জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই – অন্তত ডিসেম্বরের পাঁচ তারিখে গ্রুপ ড্র-র পরেই। আর কোন প্রতিযোগিতায় বিশ্বে নেই, যখন পুরো পৃথিবীর প্রতিটি দেশ মাঠে বা টিমের পর্দায় বুদ হয়ে থাকে। শুধুমাত্র অংকের দিক দিয়েও এবারে আশা করা হচ্ছে-এ সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে ছয় বিলিয়ন দর্শকে। শুধু ফাইনাল খেলাটি দেখবে ১.৫ বিলিয়ন মানুষ পুরো পৃথিবী জুড়ে। মেক্সিকো-কানাডা-আমেরিকার সাথে যত সময়ের ব্যবধানই থাকুক। খেলা দেখার জন্য পাগল হয়ে থাকবে সবাই। এর মত সার্বজনীন অনুষ্ঠানত হয় না। ৪৮টি দেশের কথা বাদই দিলাম। ৪৮ দেশের দর্শকরা এই ১০৪টি দিন কাটাবে উত্তজনায়, উৎসাহে বা উন্মাদনায়। অন্য দেশগুলোও কম যাবে না। কেউ চাবে আর্জেন্টিনা তাদের অর্জিত শিরোপা ধরে রাখুক – সেটি বাংলাদেশে বসে হলেও। কেউ ব্রাজিল, কেউ জার্মানী, কেউ ফ্রান্স, কেউ স্পেন, এমন কি কেউ লুফে নেবে অন্য একটি বড় দল বা আন্ডারডগ দলকে।
এই ১০৪ দিন একটিই ধর্ম – ফুটবল। ফুটবল এ সময় শ্বাশত ধর্ম। ফুটবলের কারুকার্যতায় মুগ্ধ করে মন, প্রিয় দল জয়ে হাসায় শতশত ফুটবলমোদীকে, কিংবা আশান্বিত ফলাফল না হলে কাঁদায় সমর্থকদের। বিশ্বের কোন আয়োজনেই এমন প্রাণচাঞ্চল্য হয়না কখনো। সেখানে ধর্ম কোন বস্তু নয়, সেখানে বর্ণ কোন বিষয় নয়, সেখানে দেশ বা মহাদেশ কোন ব্যাপার নয়। এখানে খেলার আনন্দটাই বড়, এখানে ফুটবলশৈলিটাই প্রাধান্য বা এখানে প্রিয় খেলোয়াড়টাই মুখ্য বিষয়।
হ্যাঁ – প্রিয় খেলোয়াড় রাখে একটা বড় প্রভাব। ২০২৬ এর এই বিশ্বকাপে সবার চোখ পড়ে থাকবে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে, বা নরওয়ের আর্লিং হালান্ড, বা ইংল্যান্ডের হ্যারিক্যেন, বা জার্মানীর আলেক্সান্ডার পাভলোভিচ বা স্পেনের লামিন ইয়ামাল, বা ব্রাজিলের ভিনিশাস জুনিয়র, এমনকি আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। এসব খেলোয়াড়রা বিভিন্ন দেশের – বিভিন্ন ভাষাভাষি। অথচ ফুটবলের এই আসরে এরা যোগ করে দ্বিতীয় মাত্রা। কেউ কেউ সৌদি আরবের খেলা দেখবে শুধুমাত্র সালেম আল-ডাউসারীর খেলা দেখার জন্য বা দক্ষিণ কোরিয়ার খেলা দেখবে সান হিউং মিনের খেলা দেখার জন্য, বা ইরানের সরাদার আজমাউনের বা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস্টিয়ান পুলিসিকের খেলার জন্য। স্বাগতিক কানাডার আলফোনসো ডিভিস বা মেক্সিকোর স্যান্টিয়াগো হিমিনেজও কম যায় না খেলোয়াড়দের দর্শকদের অন্যতম আকর্ষণে। আর খেলোয়াড়রা চাবে তাদের শৈলতা দিয়ে সবার মন জোগাড় করতে – যাতে তারা পরবর্তিতে বাণিজ্যিক সফলতা পায়।
তার উপর আছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আছে গৌরবের আকাঙ্ক্ষা, আছে ঐতিহাসিক প্রতিহিংসা পরায়ণতা। গতবার দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা শিরোপা জেতায় ইউরোপীয়ানরা চাবে ফ্রান্স, জার্মানী, স্পেন, ইংল্যান্ড বা পর্তুগাল এবার জিতুক। এমন কি নরওয়ে, ক্রোয়েশিয়া বা নেদারল্যান্ডের সমর্থকও বিশ্বজুড়ে প্রচুর। জাপান ইদানিং খুবই ভাল খেলছে। আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি ম্যাচে জাপান ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, কোরিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও আমেরিকাকে হারিয়েছে। ব্রাজিল আর ওর সমর্থকরা অপেক্ষার উত্তেজনায় কাঁপছে সেই ২০০২ সাল থেকে। অপেক্ষায় আছে তারা। শিরোপা জিতবে আবার।
তারপর তো আছে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার – ভালো খেলার মাধ্যমে। মাঠে জিতে। ইরান এবার দেখাতে চাবে তাদের যুদ্ধ আমেরিকার মাঠে অপূর্ব খেলে – জেতার মাধ্যমে। দর্শকদের এক সারি জনতা কিছুতেই চাবে না ইংল্যান্ডের বিজয়। ভৌগলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে যাবেই – দর্শকদের পক্ষপাতিত্ব হবেই, বা রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকবেই। ১২টি গ্রুপের কোথাও না কোথাও থাকবে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজ।
তার ঊর্ধ্বে বিশ্বকাপ ফুটবল। আনন্দ দেয়ার জন্য। ফুটবলের কাব্যিক ছন্দময়তা উপভোগের জন্য। এখানে রাজনীতির কোন স্থান নেই – ভালো হয়েছে রাশিয়া, ইউক্রেন, ইসরায়েল, বা যুদ্ধরত দেশগুলো কোয়ালিফাই করে নি। ফিফা যদি ইরানকে খেলতে দেয় তাহলে হবে ফুটবলের জয়। বিশ্বকাপ ফুটবলের একটা ক্ষতের উপসম। ট্রাম্প ও আমেরিকা তা বুঝতে পারলেই ভালো। কিছুই যায় আসে না, যদি ফিফার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গলায় পড়িয়ে দেন আরেকটি শান্তির পদক – কিন্তু ইরান, তিউনিসিয়া, ইরাক, মিশর, সৌদি আরব, কাতার, বসনিয়া, মরক্কো, তুর্কিয়ে, সেনেগাল, জর্ডান ও উজবেকিস্তানসহ সকল মুসলিম দেশের নিরাপত্তা ও ভিসা দেয়া হয় যেনো কোন প্রশ্ন ছাড়া, স্বাগত জানায় মর্যাদা সহকারে আর্জেন্টিনা, কলাম্বিয়া, স্পেন, পানামাসহ সকল এশিয়া ও আফ্রিকার সমর্থকদের – ফুটবলের নামে – আনন্দের নামে – বিশ্বজনিন এই মহান ইভেন্টের নামে।
বয়ে যাক উৎফুল্লের বারিধারা। জেগে উঠুক খেলোয়াড়দের অসাধারণ শৈলি। গড়ে উঠুক স্মরণীয় মুহুর্ত বা খেলা। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি নিদর্শন রেখে যাক ঐতিহাসিক এক ফাইনালের – ১৯শে জুলাই নিউজার্সির ম্যাটলাইফ স্টেডিয়ামে।
তবেই হবে ২০২৬ বিশ্বকাপের জয় জয়কার। এবং অবশ্যই পৃথিবীর সেরা খেলার আর খেলোয়াড়েদের গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ।
বিশ্বকাপ বিজয়ী দেশ
| শিরোপা | দেশ | সাল |
| ৫ বার | ব্রাজিল | ১৯৫৮, ৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪, ২০০২ |
| ৪ বার | জার্মানী | ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০, ২০১৪ |
| ৪ বার | ইটালী | ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২, ২০০৬ |
| ৩ বার | আর্জেন্টিনা | ১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২ |
| ২ বার | ফ্রান্স | ১৯৯৮, ২০১৮ |
| ২ বার | উরুগুয়ে | ১৯৩০, ১৯৫০ |
| ১ বার | ইংল্যান্ড | ১৯৬৬ |
| ১ বার | স্পেন | ২০১০ |
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দশটি দেশ
| র্যাঙ্কিং | দেশ | পয়েন্ট |
| ১ | ফ্রান্স | ১৮৭৭ |
| ২ | স্পেন | ১৮৭৬ |
| ৩ | আর্জেন্টিনা | ১৮৭৪ |
| ৪ | ইংল্যান্ড | ১৮২৬ |
| ৫ | পর্তুগাল | ১৭৬৩ |
| ৬ | ব্রাজিল | ১৭৬১ |
| ৭ | নেদারল্যান্ড | ১৭৫৭ |
| ৮ | মরক্কো | ১৭৫৫ |
| ৯ | বেলজিয়াম | ১৭৩৪ |
| ১০ | জার্মানী | ১৭৩১ |
মে ১৬, ২০২৬

জিয়াউল করিম লোটাস | স্যান হোজে, ক্যালিফোর্নিয়া
পড়শী’র আদিকাল থেকেই জড়িত। বিশিষ্ট ক্রীড়ালেখক হিসেবে পরিচিত। থাকেন বে এরিয়াতে – পেশায় প্রকৌশলী।

জিয়া ভাই, ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে আপনার লেখাটি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়লাম। লেখাটি তথ্যসমৃদ্ধ, উপভোগ্য এবং সুন্দরভাবে সাজানো। তবে আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে—আপনি বিশ্বকাপকে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেননি; বরং একে দেখেছেন একটি বৈশ্বিক উৎসব হিসেবে, যেখানে আবেগ, পরিচয়, রাজনীতি, গর্ব, উত্তেজনা এবং আনন্দ—সবকিছু একসাথে মিশে যায়।
আমি বহু আগ থেকেই আপনার ক্রীড়া-লেখার একজন ভক্ত। এখনো মনে আছে, সৌদি আরবে আমাদের অল্প কিছু সময় একসাথে থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেই সময় আপনি কয়েকটি লেখা লিখেছিলেন এবং তার কিছু আমাদের সঙ্গে শেয়ারও করেছিলেন। তখন থেকেই মনে হয়েছিল, খেলাধুলা নিয়ে আপনার লেখার মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছে। আপনি শুধু স্কোর, পরিসংখ্যান বা ম্যাচের ফলাফলে আটকে থাকেন না; খেলাকে ঘিরে কল্পনা, রসবোধ এবং বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটও লেখায় নিয়ে আসতে পারেন।
এই লেখাটিও আমাকে সেই পুরোনো শক্তির কথাই মনে করিয়ে দিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরটির অনেক আকর্ষণীয় দিক আপনি সুন্দরভাবে ছুঁয়ে গেছেন—বর্ধিত ফরম্যাট, বিশ্বজোড়া উত্তেজনা, তারকা খেলোয়াড়, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর বৈচিত্র্য, এবং টুর্নামেন্ট ঘিরে রাজনৈতিক আবহ। বিশেষ করে ট্রাম্প এবং অন্যদের প্রতি আমেরিকার মনোভাব নিয়ে আপনার সূক্ষ্ম খোঁচাটি বেশ ভালো লেগেছে। এতে লেখাটি আরও ধারালো ও সমসাময়িক হয়েছে, কিন্তু ফুটবলের আনন্দটুকুও হারায়নি।
সব মিলিয়ে এটি একটি চিন্তাশীল, তথ্যবহুল এবং প্রাণবন্ত লেখা। লেখাটি যেমন তথ্য দেয়, তেমনি আনন্দ দেয় এবং ভাবতেও বাধ্য করে। অনেক দিন পর আপনার ক্রীড়া-লেখা পড়ে সত্যিই ভালো লাগলো। আরও লিখবেন—এ ধরনের কল্পনাশক্তি, তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রাণবন্ত মন্তব্য আমাদের আরও বেশি প্রয়োজন।
Dear মোয়াজ্জেম, তোমার মন্তব্য দেখে খুবই খুশি হয়েছি। আমি বুঝি নি যে তুমি সত্যি সত্যি এ পিসটি পড়েছো এবং এত সুন্দর করে লিখেছো। তোমার লেখাটি itself একটি সাহিত্য। তোমার লেখাটি যখন সাবির ভাই আমাকে forward করলো। আমি সত্যিই আশ্চর্য হয়েছিলাম। অনেক ধন্যবাদ পড়শী পড়ার জন্য এবং আমার লেখায় সুন্দর মন্তব্য করার জন্যে। এটা আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করবে। অনেক দিন লেখি নি – তবে এখন আমার ক্রীড়া সাহিত্য লেখা continue করায় উৎসাহ জোগাবে। অনেক ধন্যবাদ। জিয়া।