মূল রচনা: গ্যারি ভিক্টর
অনুবাদ: শিশির ভট্টাচার্য্য
[মূল রচনা: গ্যারি ভিক্টর (১৯৫৮) হাইতির জনপ্রিয় ও বহু পুরষ্কারপ্রাপ্ত গল্পকার, নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার ও ঔপন্যাসিক। প্রাক্তন কৃষিবিদ, আমলা, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক। ভিক্টরের রচনায় হাইতির বুর্জোয়া সমাজ জীবন প্রতিফলিত হয় এবং বিতর্কের সৃষ্টি করে। ‘ভেড়া’ ফ্রঙ্কোফোন সাহিত্যের একটি অনন্য-সাধারণ গল্প।]
আজ সন্ধ্যায় সিরিউস মিলিয়্যাঁর বাড়িতে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নিমন্ত্রণ ছিল। সবাই এসেছে, কেউ বাদ যায়নি। প্রথমেই বলতে হয় সিরিউস অর্থাৎ মসিও মিলিয়্যাঁর শ্বাশুরী মাদাম ওনোরের কথা। গত দশ বছর ধরে, বিয়ের দিনটি থেকেই মসিও মিলিয়্যাঁর সমস্ত মনোযোগ তার শ্বাশুরীমাতাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এর পর বলতে হয় অসনল অর্থাৎ শ্বশুর মশাইয়ের কথা। দেখে যদিও বোঝা যায় না, অসনল ওনোরের বয়স আশির মতো হবে। অসনলের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গত প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ স্ত্রীর অন্তরের অন্তরতম প্রদেশের অন্তরঙ্গতম কামনাটিও আদেশমাত্র মুহূর্তে পূরণ করে আসছেন তিনি এবং নিজের এই কৃতিত্ব অসনলের প্রভূত আনন্দের কারণ। স্ত্রীর ধামাধরা হয়ে তিনি নিজের ‘ওনোরে’ (যার অর্থ ফরাসিতে ‘সম্মানিত’ বা ইংরেজিতে ‘অনার্ড’) নামটি সার্থক করেন।
সিরিউসের তিন শ্যালকও এসেছে। বড় জনের নাম অঁদ্রে। বছর পঁয়ত্রিশ বয়স। জীবনরসে ভরপুর দারুণ শক্তসমর্থ এক যুবা। সুরার প্রতি একটু বেশি রকমের আসক্তি আছে, নারী এবং ফুটবল খেলার বড় সমজদার, কিন্তু এখনও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। মধ্যম শ্যালকের নাম পিয়ের, পেশায় ডাক্তার। মুখচোরা, মনে কী আছে, কখনও কাউকে বলবে না, সব সময় মনে হয়, কিছু একটা ঘোটলা পাকাচ্ছে মনে মনে। সর্বকনিষ্ট জন গিত্রি, কথায় কথায় বিখ্যাত সব লেখকের রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে আঁতলামী করা তার প্রিয়তম বিনোদন।
সিরিউস মিলিয়্যাঁ শ্বশুরবাড়ি-অন্ত প্রাণ। সমাজে মসিও মিলিয়্যাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে শ্যালকেরা এমন সব পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, যে পদগুলো যে কারও মনে ইর্ষার উদ্রেক করবে। শ্বশুরকেও মোটা রকম একটি সরকারি পেনসনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি, রাজধানীর এক অখ্যাত উচ্চবিদ্যালয়ের সামান্য শিক্ষকের যেটি পাবার কথা ছিল না। এক কথায়, শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে যথাসাধ্য লাই দিয়ে মাথায় তুলতে সিরিউস খুব পছন্দ করতেন। গত দশ বছর যাবৎ তিনি যেমন তাদের ভালোবেসেছেন, তেমনি স্ত্রী সোরানিয়ার প্রতিও তার ভালোবাসার বিন্দুমাত্র কমতি ছিল না। স্ত্রীর চোখ এবং আঙ্গুলের ইশারা বশংবদের মতো অনুসরণ করেন সিরিউস। যে বিরল কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মেশার অনুমতি স্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল, সোরানিয়ার প্রতি সিরিউসের এই সারমেয়সুলভ অতি দাস্যভাবের কী কারণ থাকতে পারে তারাও ঠিক বুঝে উঠতে পারতো না। সত্যি বলতে কি, সংসারের লাগাম ছিল সোরানিয়ার হাতে। পোষা কুকুরটির মতো সোরানিয়া উঠতে বললে সিরিউস উঠতেন, শুয়ে পড়তে বললে শুয়ে পড়তেন। ‘দৌঁড়ে যাও!’, ‘চুপ করে বসে থাকো এখানে!’, ‘মোড়ের দোকান থেকে স্যানিটারি প্যাড কিনে আনো!’, ‘উইকএন্ডে আমি বাপের বাড়ি যাবো, বাচ্চাদের তুমি দেখবে।’ এমন বিচিত্র সব আদেশের জবাবে সিরিউসের মুখে ‘না’ শব্দ কেউ কখনও শোনেনি।
স্ত্রীর আদেশ বিনা প্রশ্নে পালন করা নিয়ে সিরিউসের মনে কোনো প্রকার দুঃখ ছিল না। স্ত্রীর সেবা করার অমূল্য সুযোগ পেয়ে সিরিউস নিজেকে বরং সুখী মনে করতো। ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতমা মহিলাটির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে! এমন চমৎকার স্ত্রী পৃথিবীর কারও ঘরে নেই!’ সিরিউস বলতো প্রায়ই। সিরিউসের মা মুখ ফসকে এক বার বলে ফেলেছিল: ‘বৌতো তোমাকে যাদু করেছে বাছা, ভেড়া বানিয়ে রেখেছে তোমাকে!’ এই সামান্য কথাটুকু বলার অপরাধে মায়ের সঙ্গে সর্ব প্রকার সম্পর্ক নিজের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল সিরিউস। ‘লক্ষ্মিটি, এমন করে না! নিজের জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে এমন ধারা ব্যবহার করার কোনো অধিকার তোমার নেই!’ বলে প্রতিবাদ করেছিল সোরানিয়া নিজেই। কিন্তু স্ত্রীর অনুরোধ সত্তেও মায়ের অমার্জনীয় বেয়াদবি মাফ করতে রাজি হয়নি সিরিউস, যার মানে, অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে, সিরিউস অতি সিরিয়াস হয়ে বৌয়ের কথায় কান।
১
দিতে নারাজ ছিল। হাইতির মতো পরকিয়া-জর্জর সমাজে দ্বিতীয় কোনো মহিলার দিকে সিরিউস কখনও ফিরেও তাকাতো না। সোরানিয়া ছিল সিরিউসের চোখের মণি, সিরিউসের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ, সত্যি বলতে কী, সোরানিয়াই ছিল সিরিউসের জীবন।
মূল গল্পে ফিরে আসা যাক। শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে সান্ধ্যভোজে নিমন্ত্রণ করার সময় সিরিউসের কণ্ঠে বরাবরের মতোই এতটাই আবেগ, সুখ আর তৃপ্তির ছোঁয়া ছিল যে তাদের এক জনও না বলতে পারেনি। ডিনারের মূলপদ ছিল বিরল মাংসের ততোধিক বিরল একটি ঝোল। সোরানিয়ার এক বান্ধবী হাইতির অন্তিবোনিত জেলায় থাকে। বেগুন দিয়ে ভেড়ার মাংসের রেসিপিটা সেই দিয়েছে। রান্নার আগে ঝোলকে ঘন করার জন্য ‘লালো’ অর্থাৎ বাওবাব গাছের পাতার গুড়ো আর মদ দিয়ে মাখিয়ে মাংসটাকে আগে থেকে ম্যারিনেট করে রাখতে হবে। রান্নার সুগন্ধে ইতিমধ্যেই শ্বাশুরি মাদাম ওনোরের নাসারন্ধ্র থির থির করে কাঁপতে শুরু করেছে। সিরিউস যেহেতু জানতো যে শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভালো মানের মাংস খেতে খুবই পছন্দ করে, তাদেও সে আর অপেক্ষা করাতে চাইল না। ‘আসুন আমরা খাবার টেবিলে চলে যাই এবং খামাখা দেরি না করে এখুনি খেতে শুরু করি!’ বোর্দো অঞ্চলের বিখ্যাত রক্তবর্ণ সুরা ‘গ্রঁ ক্রু’-এর একটি বোতল খুললো সিরিউস। এক বন্ধু ফ্রান্স থেকে সিরিউসের জন্য বোতলটি নিয়ে এসেছিল। আপ্যায়নের চুড়ান্ত করে শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে অবাক করে দিতে সিরিউস খুবই পছন্দ করতো। হাইতিতে উত্তম জাতের ফরাসি মদ, ভাবা যায়? সত্যি বলতে কী, সিরিউস ওদের ভালোও বাসতো, যেমনটা আগেই বলেছি, সে ভালোবাসতো তাদের বাড়ির মেয়ে, অর্থাৎ তার স্ত্রীরত্নটিকে। ‘কিন্তু সোরানিয়া কোথায় গেলো বলোতো?’ মদের গ্লাসে চিনি ঢালতে ঢালতে জিগ্যেস করলেন শ্বাশুরি মাদাম ওনোরে।
সিরিউস ছাড়া অন্য যে কারও কাছে, এমন দামি মদে, কিংবা দামি না হোক, যে কোনো গড়পড়তা মদে, চিনি ঢালার মতো অপরাধকে রীতিমতো বলাৎকারতুল্য বলে মনে হতে পারতো। কিন্তু মদে চিনি মিশিয়ে পান করা মাদাম ওনোরের চিরকালের ‘ওব্যেস’। তিন ছেলের গা রি রি করে উঠছিল বিতৃষ্ণায়, কিন্তু রা-টি না কেড়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তারা তাকিয়ে থাকলো মায়ের দিকে। আর সিরিউস? শ্বাশুরির কাণ্ড দেখে সেতো বরং পুলকিত, কারণ, আগেই বলেছি, শ্বাশুরিমাতাকে সে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
‘আজ অনেক রাত পর্যন্ত ব্যাংকে থাকতে হবে ওকে।’ কিছুটা উদভ্রান্তের মতো বললো সিরিউস: ‘কী যেন একটা সমস্যা হয়েছে ওর ব্রাঞ্চে।’ বলতে বলতে স্ত্রীর বিরহে সিরিউসের চোখ থেকে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ার উপক্রম। তিন শ্যালকের একজন আদর করে ভগ্নীপতির পিঠ চাপড়ে বললো: ‘আরে আমরা রয়েছি না, সিরিউস, কিছুক্ষণ বউকে ছাড়া থাকতে অত কষ্ট হবে না তোমার, ‘জামাইবাবু।’ ‘রান্নাটা অন্তত করে গিয়েছিলতো আমার মেয়ে?’ মাদাম ওনোরের কণ্ঠস্বরে সুস্পষ্ট দুশ্চিন্তার রেশ। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে উত্তরটা মসিও ওনোরে নিজেই দিল: ‘নিশ্চয়ই করে গেছে। সিরিউসতো ডিমটা ভেজেও খেতে জানে না!’ ‘সোরানিয়ার মতো পাকা রাঁধুনি থাকতে সিরিউসের রান্না করতে জানার প্রয়োজনটাই বা কী?’ আরেক ভাই মন্তব্য ছুঁড়ে দিল।
‘দুশ্চিন্তার কোনোই কারণ নেই। তরকারির প্রত্যেক গ্রাসে সোরানিয়ার উপস্থিতি আপনারা অনুভব করবেন! মাংসটা আপনাদের জন্যে রান্না করে যেতে ও খুব করেই চাইছিল এবং তাই সে করেছে। রান্না করতে গিয়ে ব্যাংকে পৌঁছতে নিশ্চয়ই আজ ওর দেরি হয়েছে।’ ‘তাহলে আর দেরি কেন? খাবোস্য শীঘ্রম। মাংসটা তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো বাছা!’ মসিও ওনোরে বললেন। অতি সুস্বাদু ভেড়ার মাংস গপাগপ সাঁটবার সুখভাবনায় পেটুক বুড়োর জিহ্বায় ইতিমধ্যেই লালার বান ডেকেছে।
২
বেশ ব্যস্তসমস্ত হয়েই সিরিউস রান্নাঘরে গেলো এবং বড় একটি পাত্র নিয়ে এসে খাবার টেবিলে রাখলো। পাত্রে বেগুন আর লালোর ঝোলে কম আঁচে, কষিয়ে রান্না করা মাংস। এর পর দ্বিতীয় যে পাত্রটি এনে টেবিলে রাখলো সিরিউস, সেটিতে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের খুবই প্রিয়, সিদ্ধ ধোঁয়া ওঠা ইয়াম বা মেটে আলু উপচে পড়ছিল।
মাদাম ওনেরে সশস্ত্র হতে আর দেরি করলেন না, অর্থাৎ এক হাতে ছুরি এবং অন্য হাতে কাঁটা চামচ বাগিয়ে ধরে, বেশ রসালো একটা ভেড়ার মাংসের টুকরো কেটে প্রথমেই নিজের থালায় নিলেন। প্রথম খণ্ডটি জিহ্বার উপর রেখেই তিনি তৃপ্তিতে মৃদু শীৎকার করে উঠলেন। ‘আমার মেয়ে ছাড়া অন্য কারও মাংস এত স্বাদের হতেই পারে না। এটা সে তার মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে!’ মাদামের স্বামী ও পুত্রেরা হাড্ডি থেকে মাংস আলাদা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কার আগে কে বড় টুকরাটি খাবে, ‘পড়ে গেলো কাড়াকাড়ি’। শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে এমন ভয়ঙ্কর-সুন্দর আনন্দ দিতে পেরে সিরিউস যেন মন্ত্রমুগ্ধের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে গেলো। তাড়াতাড়ি গিয়ে ভেড়ার মাংসের দ্বিতীয় পাত্রটি নিয়ে এসে টেবিলে রাখলো। গলানো চর্বি বেয়ে বেয়ে পড়ছিল, এমন বিশাল একটি মাংসের টুকরা মুখগহ্বরে চালান করতে করতে শ্বশুর মশাই বললেন: ‘জীবনে কখনও এত ভালো মাংস খাইনি!’
‘সাবধান! তোমার কোলস্টেয়রলের কথাটা মনে রেখো!’ স্ত্রীর এহেন বেরসিক মন্তব্যে মসিও ওনোরে দৃশ্যত এতটাই রেগে গেলেন যে চোখ-মুখ তার লাল হয়ে গেলো। ভয়ঙ্করভাবে তলোয়ার ঘোরানোর মতো করে শূন্যে কাঁটা চামচ ঘুরিয়ে বুড়ো বললো: ‘আমার নিজের মেয়ের নিজের রান্না করা এমন চমৎকার একটা মাংস খাচ্ছি, আর তুমি কিনা আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছ কোলস্টেয়রলের কথা! আমিতো কাঁটা চামচে সামান্য মাংস তুলছি, কীভাবে এতটা নিশ্চিত হলে যে আমার আগেই তুমি পটলই তুলবে না?
বৃদ্ধ স্বামীর কথার উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ কওে মাদাম ওনোরে সিরিউসের দিকে মনযোগ দিলেন তিনি। ‘তুমিতো কিছুই খাচ্ছো না সিরিউস। খাও বাছা খাও। এত ভালো একটা ভেড়ার মাংস আমাদেরকে একা গিলতে দিও না!’ শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে এমনিতেই পছন্দ করতো সিরিউস। আজ সন্ধ্যায় সেই ভালোবাসাটা যেন বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্বাশুরির উপদেশ সিরিউস কখনই অমান্য করতো না। বেশ বড় একটা মাংসের টুকরা কেটে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে সে মনে অনেক তৃপ্তি নিয়ে, যাকে বলে রসিয়ে রসিয়ে খেলো। খেতে খেতে সিরিউস ভাবছিল তার বউয়ের কথা। ‘সোরানিয়ার সব কিছুই ছিল অ-সাধারণ, কারও সঙ্গে মিলতো না। ওর রান্না, ওর সেক্স করার স্টাইল, সিরিউসকে কী দারুণভাবে হুকুম করতো সে, আহা! শ্বশুরবাড়ির লোকজনের যাতে কোনোমতেই মনে না হয় যে সোরানিয়ার মাংসের ঝোলটা চাখতে আমি সিরিউসের ভালো লাগছে না।’ এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে, পুরো মাংসটাতো সিরিউস খেলোই, এর পর অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে দাঁতের নিচে রেখে জোরে চাপ দিয়ে একটা হাঁড় সে ভাঙলো এবং তারপর অধরোষ্টে চেপে শব্দ করে প্রশ্বাস নিয়ে ভিতরের মজ্জ্বাটার সবটুকু মজা নিতে শুরু করলো। ‘ভদ্রলোক এভাবে খাবার টেবিলে হাড্ডি চোষে না সিরিউস’ রাগতস্বরে বললেন মাদাম ওনোরে। ‘ওভাবে খাওয়া শুধু মহিলাদেরই মানায়’ বোকার মতো বললো ভাইদের একজন। বলতে বলতে গলায় মাংস আটকে তার শ্বাস রুদ্ধ হবার উপক্রম।
৩
সিরিউসের দাঁতের ফাঁকে মাংসের আঁশ আটকে গিয়েছিল। জিহ্বা দিয়ে সে আঁশ বের করে ‘থু’ ‘থু’ করে থালার উপর ছুঁড়তে ছুঁড়তে মর্মাহত হবার ভাব করে সিরিউস বললো: ‘মাফ করবেন, ম্যামি!’ ‘প্রভূ যিশুকে ধন্যবাদ দাও!’ জামাইকে উপদেশ দিলেন মাদাম ওনোরে। ‘এমন চমৎকার একটি স্ত্রী ঈশ্বরের পক্ষ থেকে তোমার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ!’ ‘আর এই আইবুড়ো অপদার্থগুলো, এখনও বিয়েই করতে চাইছে না!’ মেঘগর্জনের মতো এক ঢেকুর তুলে হঠাৎ বলে উঠলো বুড়ো শ্বশুরমশাই। ‘আমার বাছারা ভেড়া হয়ে থাকবে অন্য মেয়ের! কখনই না।’ চিৎকার করে বলে উঠলেন মাদাম ওনোরে। ‘পরিবারে দুটো ভেড়াই যথেষ্ট!’ দুই ভাই অবজ্ঞার হাসি হাসলো। ডাক্তার ভাইটি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকালো সিরিউসের দিকে। বুড়ো অসনল
আরও এক টুকরা মাংস নিজের পাতে তুলে নিলেন।
‘বিয়ে না করার জন্য এক দিন ঠিকই ওরা অনুশোচনা করবে!’ ‘উফ এত বকতেও পারো তুমি! থামতো!’ ‘সিরিউস, তুমি কি মনে করো? আমি কি ঠিক বলিনি?’ জামাইকে জিগ্যেস করে শ্বশুরমশাই। ‘সোরানিয়ার মতোই সবাঙ্গ-সুন্দর একেকটি স্ত্রী ওদেরও ভাগ্যে জুটুক, আমি তাই চাই ড্যাডি!’ ‘যথেষ্ট হয়েছে!’ মাদাম ওনোরে চিৎকার করে উঠলেন। গুণ্ডা-মাস্তানরা সব কিলবিল করছে পোর্টোপ্রেঁসের রাতের রাস্তায়। সোরানিয়ার মাংসটা ভালো হয়েছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে এখান থেকে বেশি রাতে বিদায় হয়ে রাস্তায় খামাখা আমাদের ডাকাতের কবলে পড়তে হবে। বাছা সিরিউস, ডেজার্ট কী পরিবেশন করছো তুমি?’ ‘ভ্যানিলার দুধে সিদ্ধ মগজের পায়েস!’ সিরিউসের কণ্ঠস্বরে আনন্দ যেন উপচে পড়ছিল।
‘ছোট বাচ্চাকে লাই দেবার মতো, তোমার বউও দেখছি আজ সন্ধ্যায় আপ্যায়ন দিয়ে আমাদের মাথায় তুলছে।’ বোঝাই যাচ্ছিল, মাদাম ওনোরে কন্যার উপর সাতিশয় সন্তুষ্ট। রান্নাঘর থেকে ডেজার্ট নিয়ে এসে প্রত্যেককে পরিবেশন করলো সিরিউস এবং নিজের প্লেটেও নিল অনেকখানি। অপূর্ব স্বাদের সেই মগজ-পায়েস সবাই চেখে দেখছিল নীরবে, এক মনে। মাদাম ওনোরে ভাবছিলেন, এত সমৃদ্ধ খাবার কতকাল তিনি খাননি। সঠিক পাত্রটিকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। আজ থেকে বারো বছর আগে সিরিউসকে প্রথম যখন তিনি দেখেন, তাঁর মনে হয়েছিল, সোরানিয়ার জন্য আদর্শতম পাত্রটি তিনি খুঁজে পেয়েছেন। আদর্শ পাত্র শুধু নয়, পুরো পরিবারের উন্নততর ভবিষ্যতের সিঁড়ি হয়ে উঠবে এই সিরিউস। সুন্দরী মহিলা বলতে যা বোঝায়, সোরানিয়া তার ধারে কাছেও ছিল না। অন্য কোনো ভালো পরিবারের সুন্দরী কোনো তরুণীর দিকে সিরিউস সহজেই আকৃষ্ট হয়ে গেলেই পাত্রটি হাতছাড়া হবে। সুবর্ণ সুযোগটা হেলায় হারাতে রাজি ছিলেন না মাদাম ওনোরে। দ্রুত এবং চমৎকার সিদ্ধান্তটি নিতে তিনি দেরি করেননি। পরিচিত ওঝার সঙ্গে আলাপ করলেন এবং ওজার বাণে সিরিউস কুপোকাৎ হতে দেরি হয়নি। একই ওঝার বাণে কয়েক দশক আগে কুপোকাৎ হয়েছিল তাঁর স্বামী অসনল, যে কিনা খাওয়া ছাড়া ইদানিং আর কোনো কাজেই লাগে না। উফ! এ বয়সেও এমন খাই এই বুড়োটার! এটাকে আর ভেড়া বলা যাবে না, বলতে হবে একটা শুয়র।
প্লেট থেকে ভ্যানিলা মগজ-পায়েস চেঁছেপুঁছে খেতে খেতে মাদাম ওনোরে বললেন: ‘তুমিতো জানো সিরিউস, আমার নিজের ছেলেদের মতোই তোমাকে ভালোবাসি আমি।’ সিরিউসের চোখ অশ্রুসজল। ‘আমার এখন একজনই মা, সে তুমি, ম্যামি!’ মাদাম ওনোরে উঠে গিয়ে জামাতাকে পুত্রস্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পরিবারের সবাই উঠে দাঁড়ালো। রাখাল যেমন ‘গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে’, মাদাম ওনোরের চোখের ইঙ্গিত এবং অঙ্গুলি নির্দেশ মানতে বাধ্য ছিল তার পুরো পরিবার।
‘এবারতো পারলো না, কিন্তু সোরানিয়াকে আমি বলবো, ভবিষ্যতে যদি কখনও আমাদের সে নিমন্ত্রণ করে, তবে স্বশরীরে তাকে উপস্থিত থাকতে হবে। অসনল, ওঠো, আমাদের এবার যেতেই হবে। আসলেই কিন্তু বেশ রাত হয়ে গেছে!’ ‘আরও কিছুক্ষণ পরে গেলে হয় না? মাংস খেয়ে পেটটা কেমন ভার ভার লাগছে।’ বৃদ্ধ প্রতিবাদ করে বললো: ‘হজম করার জন্যওতো খানিকটা সময় চাই, নাকি?’
৪
‘হজম তুমি ফেরার পথে করবে গাড়িতে আমাদের নাকের বারোটা বাজিয়ে!’ নিষ্ঠুরভাবে বললেন মাদাম ওনোওে। এর পর টুপিটা মাথায় ঠিকমতো বসাতে বসাতে তিনি জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন: ‘আমাদের গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছতো, সিরিউস?’ সে আর বলতে! সিরিউস তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে আগে থেকেই পছন্দ করতো। আজ সন্ধ্যায় সেই ভালোবাসা যেন বহু গুণ বেড়ে গেছে। এতটা আদর, এতটা আপ্যায়ন সিরিউস কখনও তাদের করেনি। শ্বশুর-শ্বাশুরি-শ্যালকদের অনুসরণ করে সিরিউস গাড়ি পর্যন্ত এলো। ওরা চলে গেলেইতো সে একা হয়ে যাবে—এই ভেবে সিরিউস এতটাই কষ্ট পাচ্ছিল যে মাদাম ওনোরে জামাইবাবাজীকে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাবার হুকুম দিতে বাধ্য হলেন। কন্যার অনুপস্থিতিতে শ্বাশুরির যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ছিল জামাইয়ের উপর। ভেড়ার গলায় বাঁধা দড়িটা মা এবং মেয়ে উভয়ের হাতেই ধরা রাখতো।
‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম, তুমি চলে গেলে!’ অপসৃয়মান গাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল সিরিউস। শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে আসলেই ভালোবাসতো সে। বিশেষ করে আজ সন্ধ্যায়, হ্যাঁ আজ সন্ধ্যায়, তাদের প্রতি প্রেম যেন তার উথলে উঠেছিল। ভাবতে ভাবতে মন খারাপ করে ঘরে ফিরলো সিরিউস। সোরানিয়া তখনও ফেরেনি। সিরিউস আজ প্রথম খেয়াল করলো, ড্রয়িংরুমের দেয়ালে একটি দড়ি ঝুলছে। ভেড়ার গলায় যে দড়ি বাঁধা থাকে, তেমনই একটি দড়ি হুকে আটকানো। কেন এতদিন চোখে পড়েনি দড়িটা? গত দুই দিন ধরে অনেক কিছুই সে নতুন করে খেয়াল করছে নিজের বাড়িতে।
সিরিউসের মনটা আরও খারাপ হয়ে গেলো। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো সিরিউস। একটা ডিসে কিছুটা ভেড়ার মাংস পড়ে ছিল। তখনও বেশ ক্ষুধা ছিল সিরিউসের পেটে। এক টুকরা মাংস প্লেটে তুলে নিয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো, বেশ মজা করে রসিয়ে রসিয়ে খাবে মাংসটা। শান্তভাবে হাড্ডিটা ইচ্ছেমতো অনেকক্ষণ ধরে চিবাবে, হাঁড়ের ভিতরের মজ্জ্বাটা শব্দ করে লম্বা টান দিয়ে শুষে নেবে, নির্ভয়ে, কারণ তীর্যক মন্তব্য করার মতো যিনি ছিলেন, সেই শ্বাশুরিমাতাঠাকুরণ অনেক ক্ষণ বিদায় হয়েছেন।
পরদিন মাদাম ওনোরের ঘুম ভাঙলো যখন, সূর্য আকাশের বেশ খানিকটা উপরের উঠে গেছে। দেয়ালঘড়িতে দেখাচ্ছিল বেলা দশটা। স্বামীখানা পাশে শুয়ে ঘোৎ ঘোৎ করে নাক ডাকছিল। ইচ্ছা হচ্ছিল, জোরে একটা থাপ্পর দিয়ে শুয়রটাকে জাগিয়ে দিতে, কিন্তু পেটটা এমন ভারি মনে হচ্ছিল যে মাদাম ওনোরে তৎক্ষণাৎ সেই ইচ্ছাপূরণ করতে পারলেন না। অনেক বেশি খেয়ে ফেলেছিলেন গত রাতে। সোরানিয়ার মাংসটা খুবই স্বাদ হয়েছিল, কিন্তু — খুব বেশি তেল ছিল। মাদাম ওনোরে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, মেয়ের কাছ থেকে রেসিপিটা চেয়ে নিয়ে তিনি নিজে রান্না করবেন, কিন্তু তেল অনেক কম দিয়ে। এত তেল এই বয়সে মাদাম ওনোরের হজম হতে চায় না। বাথরুমে একটা বাক্সে নানা রকম ঔষধ রাখা থাকে। খুঁজে পেতে একটা হজমিগুলি বের করলেন মাদাম ওনোরে। একটা গ্লাসে জল ঢেলে বড়িটা গলাধঃকরণ করলেন। মনে হচ্ছিল, পাকস্থলীটা যেন বর্ষায় ফুঁসে ওটা এক সাগর।
নাড়িভুড়িগুলোতে হঠাৎ এমন একটা চাপ অনুভব করলেন যে টয়লেটে গিয়ে ওগুলোকে ভারমুক্ত না করে উপায় ছিল না। মেয়ের মাংসটা সুস্বাদু ছিল, সন্দেহ নেই, কিন্তু আসলেই খুব তৈলাক্ত ছিল। টয়লেট থেকে বের হয়েছেন কি হননি, সদর দরজায় ঘণ্টি বেজে উঠলো। শুয়রটি তখনও নাক ডেকে চলেছে। মাদাম ওনোরের মনে হলো, এই পুরুষগুলোর আদৌ কোনো মূল্য নেই, শুয়রও ওদের চেয়ে ভালো। কিন্তু কী করা, এদের নিয়েই সংসার করতে হয় মেয়েদের। এই ধরাধামে একজন পুরুষই মূল্যবান এবং তিনি হলেন ভগবান যিশু। একজন নিষ্ঠাবতী খ্রিস্টান হওয়া সত্তেও মাদাম ওনোরে ওঝার কাছে যান বটে, কিন্তু এই নিয়ে তাঁর মনে অপরাধবোধ আছে। এই একটি মাত্র পাপই নিজের জন্য তিনি অনুমোদন করেন।
আচ্ছা, কার জন্য করছেন তিনি এই পাপ, পরিবারের জন্য, নিঃসন্দেহে অন্য সবার সুখের জন্য নয় কি? ঈশ্বর নিশ্চয়ই তাঁর এই একটিমাত্র পাপ ক্ষমা করবেন। স্থানীয় গির্জার যাজক ভিলপ্যাঁ রবিবারের বক্তৃতায় প্রায়ই বলেন, কোনো মানুষই নিখুঁত-নিষ্পাপ নয়, চন্দ্রেও কলঙ্ক থাকে। গির্জায় পাপস্বীকার করতে গিয়ে মাদাম ওনোরে কখনই বলেন না যে মাঝেমধ্যে তিনি এক ওঝার সঙ্গে দেখা করেন। এ কথাতো স্বীকার করার প্রশ্নই ওঠে না যে দুটি পুরুষকে যাদু করে নিখুঁতভাবে ভেড়া বানিয়েছেন তিনি, নিজের জামাই এবং মেয়ের জামাই। হাইতিতে ‘ভেড়া’ বলতে বোঝায় এমন স্ত্রৈণ পুরুষ, বৌয়ের কথায় যে উঠে আর বসে।
৫
সদর দরজায় নাছোরবান্দা আগন্তুক ঘন্টি বাজিয়ে চলেছিল। মাদাম ওনোরে অগত্যা গিয়ে দরজা খুলে দেখলেন তাঁর বান্ধবী মাদাল উইলবের এসেছেন। মাদাম উইলবেরের নিজেরও একটি ভেড়ার পাল আছে, তাঁর নিজের স্বামী এবং তিন মেয়ে জামাইয়ের প্রত্যেকে একেক জন পাক্কা ভেড়া।
‘গ্যার্থা!’ মাদাম উইলবের এমনভাবে হাঁপাচ্ছিলেন যে মনে হতে পারে, বান্ধবীকে বিশেষ কোনো সুখবর দেবার জন্য তিনি ম্যারাথন দৌঁড়ে এসেছেন। ‘কী ব্যাপার, সিলফিস?’ ‘একজন আমাকে ফোন করে অবিশ্বাস্য এক খবর দিয়েছে!’ দুই হাত কোমড়ে রেখে দাঁড়িয়েছিলেন মাদাম উইলবের। তখনও তিনি ধাতস্থ হতে পারেননি। ‘সিরিউসকে একজন দেখেছে, সিরিউস, তোর মেয়েজামাই!’ ‘তাতে কী হয়েছে?’ বলতে বলতে মাদাম ওনোরে অনুভব করছিলেন তাঁর পাকস্থলীতে আগের সেই ঢেউ আবার, বার বার চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে নাড়িভুড়ির দেয়ালে আছড়ে পড়ছে।
‘আজ সকালে এক মহিলার সঙ্গে সিরিউসকে বিমানে উঠতে দেখা গেছে!’ ‘নিশ্চয়ই সোরানিয়া’ মাদাম ওনোরে বলে উঠলেন। ‘আমি তোকে বলছি, এক মহিলা। সুন্দরী মহিলা। সিরিউস তাকে জড়িয়ে ধরে ছিল, প্রেমে একেবারে গদগদ! যে লোক আমাকে ফোন করেছে, সে ফালতু কথা বলার লোক নয়।’ ‘অসম্ভব। তুইতো জানিস, সিরিউস নিখুঁত এক ভেড়া। মাত্র গতকাল সন্ধ্যায় ওর বাসায় আমরা ডিনার খেয়ে এসেছি।’ ‘সিরিউস হয়তো তার জন্য নির্দিষ্ট সঠিক জীবনসাথীকে খুঁজে পেয়েছে। তুইতো জানিস, জীবনসাথীকে একবার খুঁজে পেলে ভেড়ার যাদু আর কাজ করে না। যাদুর প্রভাব কেটে যাবার এটাই একমাত্র উপায়।’
‘যে কোনো পুরুষ তার জীবনসাথীকে খুঁজে পাবার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য বলা চলে।’ ‘কিন্তু এই সম্ভাবনা কিন্তু আছে!’ মুখ গোমড়া করে বললেন মাদাম উইলবের। ‘ভেতরে আয়। তোকে নিশ্চিত করার জন্য সোরানিয়াকে ফোন করা যাক।’ বান্ধবীকে অনুসরণ করে মাদাম উইলবের গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করতে করতে মাদাম উইলবের আবারও বললেন: ‘আমি তোকে বলছি, এক মহিলার সঙ্গে সিরিউস শহর ছেড়ে গেছে!’ ‘আমার কোনো সন্দেহ নেই, তোকে যে ফোন করেছে, সে ভুল দেখেছে।’ মাদাম ওনোরে নিশ্চিত, কেউ বিশ্রী একটা ঠাট্টা করছে তাঁর সঙ্গে।
মেয়ের নাম্বারে ফোন করলেন মাদাম ওনোরে। ফোন সব সময় সোনারিয়াই ধরে। জঁ বনোয়া কষ্ট পেতে পারে, এই ভয়ে সোনারিয়া কখনই সিরিউসকে ফোন ধরতে দিত না। জঁ বনোয়া পোর্টোপ্র্যাঁসের একটি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখার ডিরেক্টর। সুদর্শন জঁ বনোয়া জেরবাদি বা ম্যুলাটো, অর্থাৎ তার বাবা-মায়ের একজন সাদা, অন্যজন কালো।
সেদিন শনিবার সকাল। সোরানিয়া বাড়িতেই থাকার কথা। সোরানিয়ার কণ্ঠ নয়, আনসারিং মেশিনে রেকর্ড করা বক্তব্য কানে আসলো। মাদাম ওনোরে আশ্চর্য হলেন শুনে যে কণ্ঠটি সিরিউসের। এও কি সম্ভব? ‘শুভ সকাল ম্যামি। শুভ সকাল আমার প্রাণপ্রিয় শ্বশুরবাড়ির লোকজন। গত দশ বছর বিনা প্রতিবাদে আমি ভেড়া হয়ে পড়ে ছিলাম। আপনাদের মেয়ে যদি কিছুক্ষণের জন্য গত সন্ধ্যায় প্রথমে আপনাদের প্লেটে এবং তারপর আপনাদের পেটে ভেড়া হয়ে পড়ে থাকে, আমার বিশ্বাস আপনারাও আপত্তি করবেন না!’ কানে টেলিফোনটা ধরে মাদান ওনোরে মূর্তিবৎ দাঁড়িয়েছিলেন। একটি চিৎকার বের হতে গিয়ে ওঁর দুই ঠোঁট খুলেছিল বটে, কিন্তু অসম্ভব এই চিৎকারের শব্দ কেউ শোনেনি, যদিও মুখটা অনেক ক্ষণ ধরে হা হয়ে খুলে আছে। এই বার তাঁর পাকস্থলীর ঢেউগুলো নিম্নগামী নয়, বরং পেট পাকিয়ে উর্ধ্বগামী হচ্ছিল। মাদাম ওনোরে অনুভব করছিলেন, নাড়িভুড়ির চাপ তিনি আর নিতে পারছেন না, কিন্তু দৌঁড়ে টয়লেটে যাবার শক্তি তাঁর ছিল না। এদিকে সিরিউসের মেসেজটি বারংবার বেজে যাচ্ছিল:
৬
‘শুভ সকাল ম্যামি। শুভ সকাল আমার প্রাণপ্রিয় শ্বশুরবাড়ির লোকজন। গত দশ বছর বিনা প্রতিবাদে আমি ভেড়া হয়ে পড়ে ছিলাম। আপনাদের মেয়ে যদি কিছুক্ষণের জন্য গত সন্ধ্যায় প্রথমে আপনাদের প্লেটে এবং তারপর আপনাদের পেটে ভেড়া হয়ে পড়ে থাকে, আমার বিশ্বাস আপনারাও আপত্তি করবেন না!’ বেডরুমে বুড়ো অসনলকে আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলে বলতে শোনা গেল: ‘গতকাল আমাদের মেয়ের মাংসটা কী দারুণ হয়েছিল খেতে, তাই না গ্যার্থা? এই রেসিপিটা ওকে আবারও করতে বলবো, এক বার নয়, বার বার।’ ড্রয়িংরুমে মাদাম উইলবেরের আর্তচিৎকারে গল্প শেষ হলো: ‘গ্যার্থা, গ্যার্থা, কী হলো তোর?’

শিশির ভট্টাচার্য্য | ঢাকা, বাংলাদেশ
ভাষাবিজ্ঞানী, লেখক ও কলামিস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও ফরাসি ভাষার অধ্যাপক। তিনি বাংলা ভাষার বিস্তারে অনেক দিন ধরে কাজ করছেন।
