একটা সময় ‘নিষিদ্ধ পল্লী’ কথাটাই আমার কাছে ভীষণ গোপনীয় মনে হতো। মনে হতো, এই শব্দটা উচ্চারণ করাও যেন পাপ। ছোটবেলা থেকে আমাদের সমাজ এমনভাবেই বড় করে তোলে যে, এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করা তো দূরের কথা, ভাবতেও সংকোচ হয়। অথচ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, যেসব বিষয় নিয়ে সমাজ সবচেয়ে বেশি নীরব থাকে, সেগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় মানবিক প্রশ্ন।
আমার এই ভাবনার পরিবর্তনের শুরু কলেজজীবনে। আমার এক বান্ধবী— ঋতু। একদিন গল্প করতে করতে সে বলেছিল, তাদের বাড়ির ঠিক পাশেই ছিল একটি নিষিদ্ধ পল্লী। প্রতিদিন সেই পথ দিয়েই তাদের যাতায়াত ছিল। ছোটবেলায় সে দেখত, যৌনকর্মীদের সন্তানরাও অন্য সব শিশুর মতোই খেলাধুলা করছে, হাসছে, কাঁদছে, স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তাদের স্বপ্ন, আনন্দ, দুঃখ—সবই ছিল সাধারণ। শুধু আলাদা ছিল সমাজের চোখে তাদের পরিচয়।
ঋতুর মা ছিলেন পেশায় একজন শিক্ষিকা। তাঁকে আমি কোনোদিন চোখে দেখিনি। আজ তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তিনি আমার জীবনে এমন একটি শিক্ষা রেখে গেছেন, যা হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না।
ঋতু একদিন বলেছিল, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মা তাকে শিখিয়েছিলেন— “ওদের ঘৃণা করিস না। ওরাও মানুষ। ওরা এমন একটি কাজ করছে, যেটা নিয়ে সমাজ মুখে কথা বলতে চায় না, কিন্তু বাস্তবে যার অস্তিত্ব অস্বীকারও করতে পারে না। ওরা সমাজের নোংরা তাকে শোষণ করে নেয়। তাই আমরা নিরাপদে রাস্তায় চলতে পারি।মানুষকে তার পেশা দিয়ে নয়, তার মানবিকতা দিয়ে বিচার করতে শেখ।”
সেদিন কথাগুলো শুনে হয়তো আমি খুব বেশি কিছু বুঝিনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই কয়েকটি বাক্য আমার মনে স্থায়ী হয়ে রইল। কোনোদিন কাউকে বলিনি। এমনকি ঋতুও হয়তো জানে না, তার মায়ের সেই শিক্ষা আমার ভেতরে এত গভীরভাবে বেঁচে আছে। আজ এত বছর পরে এই লেখা লিখতে বসে মনে হচ্ছে, একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনো শুধু শ্রেণিকক্ষে পড়ান না; তাঁর মানবিক মূল্যবোধ অদৃশ্যভাবে ছড়িয়ে পড়ে আরও অনেক মানুষের মধ্যে।
আমরা সমাজে অনেক পেশাকে সম্মান দিই—কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষক, কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক, কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী। প্রত্যেকেই সমাজের প্রয়োজন মেটান। যৌনকর্মীদের পেশা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু এটাও সত্য যে তাঁরাও আমাদের সমাজেরই একটি বাস্তবতা। তাই তাঁদের মানুষ হিসেবে সম্মান ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।
প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে—যৌনকর্মীদের সন্তানদের মধ্যে কি কেউ বড় হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন? বাস্তবতা বলছে, পারেন। তবে তাঁদের অনেকের পরিচয় আমাদের অজানাই থেকে যায়।
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে যৌনকর্মীর সন্তান হয়েও আন্তর্জাতিক বা সর্বভারতীয় স্তরের সেলিব্রিটি হিসেবে নিশ্চিতভাবে নথিভুক্ত কোনো উদাহরণ প্রকাশ্যে নেই। এর অন্যতম কারণ সামাজিক কলঙ্ক। অনেকেই নিজেদের বা পরিবারের অতীত পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সাফল্যের গল্প নেই।
সোনাগাছিসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকার বহু যৌনকর্মীর ছেলে-মেয়ে আজ শিক্ষক, সমাজকর্মী, নার্স, ব্যাংককর্মী, শিল্পী এবং নানা সম্মানজনক পেশায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের অনেকেই নিরাপত্তা ও সামাজিক কারণে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখেন। ২০২৫ সালে একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে একজন শিক্ষিকা জানিয়েছিলেন, তাঁর মা ছিলেন যৌনকর্মী। আজ তিনি নিজেই শিশুদের পড়ান। কিন্তু নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে নাম প্রকাশ করেননি। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, সাফল্য অনেক সময় সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না; নীরবে মানুষের জীবন বদলে দেয়।
যৌনকর্মীদের অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ ভারতী দে-র জীবনও আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যদিও তিনি যৌনকর্মীর সন্তান নন, বরং নিজেই একজন প্রাক্তন যৌনকর্মী, তাঁর সংগ্রাম দেখায়—সুযোগ, সম্মান এবং সামাজিক স্বীকৃতি পেলে একজন মানুষ নিজের জীবন নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারেন।
সবচেয়ে বেশি কষ্টের বিষয় হলো তাঁদের সন্তানদের জীবন। একটি শিশু কখনো তার জন্মপরিস্থিতি বেছে নেয় না। অথচ সেই শিশুই অনেক সময় স্কুলে, সমাজে কিংবা কর্মক্ষেত্রে পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হয়। এই বৈষম্য শুধু অন্যায় নয়, ভবিষ্যতের প্রতিও অবিচার।
আজও অনেক যৌনকর্মী পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং পরিষেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন হন। অথচ তাঁরাও সন্তান মানুষ করেন, কর দেন, ভাড়া দেন, সংসার চালান এবং আমাদের সমাজেরই অংশ হয়ে বেঁচে থাকেন।
আমরা প্রায়ই তাঁদের নিয়ে কথা বলি, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কথা বলি না। বিচার করি, কিন্তু তাঁদের গল্প শুনি না। অথচ প্রতিটি মানুষের জীবনের পেছনে থাকে একেকটি আলাদা ইতিহাস, একেকটি সংগ্রাম।
আজ এই লেখা শেষ করতে গিয়ে শুধু একজন মানুষের কথাই মনে পড়ছে। কাকিমা, আপনাকে আমি কোনোদিন দেখিনি। কিন্তু আপনার চিন্তাভাবনা আমার ভেতরে আজও বেঁচে আছে। আপনি যেদিন আপনার মেয়েকে মানবিকতার যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, সেদিন হয়তো ভাবতেও পারেননি সেই কথাগুলো একদিন আরেকজন মানুষের কলমে সমাজের সামনে পৌঁছাবে। এতদিন পরে হলেও আজ সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা করলাম।
আপনি আজ নেই, কিন্তু আপনার শিক্ষা আছে। আপনার মতো মায়েরা, আপনার মতো শিক্ষকেরাই সমাজকে নীরবে বদলে দেন। যেখানে থাকুন, আশীর্বাদ করবেন। আমি যেন আপনার মতোই মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখি, বিচার করার আগে বুঝতে শিখি, আর আমার কলম যেন সবসময় মানবিকতার পক্ষেই কথা বলে।
হয়তো সমাজ একদিন বদলাবে। সেদিন আমরা আর কোনো শিশুকে তার জন্মপরিচয়ের জন্য বিচার করব না। কারণ কোনো মানুষ জন্মসূত্রে “নিষিদ্ধ” হতে পারে না। নিষিদ্ধ হওয়া উচিত বৈষম্য, ঘৃণা এবং উদাসীনতা। মানবিকতাই হোক আমাদের পরিচয়।


Ami o tomar lekha ta ke support kori..
Satyii valo topic e likhecho ar bastab likhecho..
Sob rokom manush er e samaj e proyojon ache..
Ar sabar e saman adhikar..
Valo likhcho..carry on..Go ahead..